# প্রতিবেশী-২ (শেকড়ের সন্ধানে)

- Author: [রোকসানা খন্দকার রুকু](https://sonelablog.com/author/ruku007/)
- Published: 2020-10-18T11:08:44+00:00
- Updated: 2020-10-19T05:59:29+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a7%a8-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7/

---

সামায়রার আজ একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে। নয়টায় ক্লাস। রিকসা থেকে নেমে সে খুব দ্রুতই  ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছে। মেয়েদের সালাম নেবারও সময় নেই। পরপর তিনটা ক্লাস নিতে হবে। রমজান মাস চলছে। সেহেরী খেয়ে ঘুমালে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যায়। তার উপর বিকেলে পরীক্ষার ডিউটি। এটা প্রায় সারা বছরই লেগে থাকে। বাসায় ফিরে এতটুকু শক্তি থাকেনা অন্যকিছু করার। কোনরকমে ইফতার সেরে নিতে হয়। কলেজেও কারও সাথে বসে গল্প বা আড্ডা দেবার মত খুব একটা সময় হয়ে ওঠেনা। বেশ ক’জন নবীন শিক্ষক এসেছেন। তাদের সাথে এখনও সেভাবে পরিচয় হয়নি। শুধু হাই হ্যালো টুকুই হয়েছে আরকি?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বল্পতা একটা বড় ধরনের সমস্যা। কোন কোন ডিপার্টমেন্টে শুধু একজন শিক্ষকই থাকেন। তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ পাশের কলেজ থেকে অতিথি শিক্ষক এনে ক্লাস চালান। একজন বাইরের শিক্ষক কতটুকু আন্তরিকতা দেখান সেটাও দেখার ব্যাপার। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা হাউজ টিউটর এবং কোচিং সেন্টারের শরনাপন্ন হন।

বাংলাদেশের দুটি ঘুনে ধরা সেক্টর শিক্ষা আর স্বাস্থ্য। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ দুটিই সুগঠিত।

বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও সেরার তালিকায় নেই। বিগত সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এবার তাও নেই। থাকবেই বা কেমন করে। সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে রাজনৈতিক নোংরামি। এই এক দেশ যেখানে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার জন্য আন্দোলন করতে হয়। সন্তান টিভিতে মায়ের কান্না দেখে। অনশন- ধর্মঘট করতে হয়। না খেয়ে থাকা শিক্ষকদের করোনাকালীন সাহায্য দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। অন্য সব সেক্টরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। সে দেশে আর কিইবা হবে।

বেসরকারি কলেজের একজন শিক্ষক প্রাইমারী স্কুলের পিয়নের সমান বেতন পান। একই পরীক্ষায় বসে কেউ প্রসাশন ক্যাডার , অন্যান্য ক্যাডার হয়ে বিলাশবহুল জীবন যাপন করেন। প্রমোশন পেয়ে পেয়ে অনেক দুরে চলে যান। আর শিক্ষা ক্যাডার মাসের পর মাস একই পদে থেকে সামান্য বেতন দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সংসার চালান। প্রমোশনের ও তেমন খোঁজ খবর থাকেনা। সন্তান সংসার চালাতে তাদের অন্য অপশন খুঁজে নিতে হয়।

এছাড়াও শিক্ষার বেহাল দশার আরও অনেক কারন রয়েছে যেমন- শিক্ষকের আবাসন স্বল্পতা। ডরমেটরি নামে যে সব টিনশেড ঘর শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় সেগুলোতে মশা,মাছি, সাপ খোপ তাড়িয়ে শিক্ষকদের বসবাস করতে হয়। শিক্ষার্থীদের হোস্টেল স্বল্পতা, স্থানীয় শিক্ষকদের প্রভাব ও দলীয় প্রভাব। দলীয় ছাত্ররা পরীক্ষার হলকে শশুর বাড়ি বানিয়ে কোনপ্রকার পড়াশুনা ছাড়াই পরীক্ষা দেয়। শিক্ষকদের ভয়ে চুপ থাকা ছাড়া উপায় থাকেনা। আর যে শিক্ষক প্রতিবাদ করবে তাকে রাস্তায় আটক করা হয় , অপমান কিংবা খুনও করে ফেলা হয়। দলীয় ছাত্রের খোঁড়া যুক্তি আমরা সারাবছর দলের হয়ে সময় দেই পড়াশুনা করব কখন? পাশাপাশি এই সুবিধা নেয়ার জন্য কিছু পাতি নেতা তৈরি হয়। যারা সবসময়ই শিক্ষা ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। এভাবে তৈরি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মেধাশূন্য ডিগ্রীধারী। যতদিন এগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারবে ততদিন এভাবে চলতেই থাকবে। আরও পিছিয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকবেনা।

 

অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পরীক্ষা চলছে। সামায়রার ডিউটি পড়েছে হলরুমে। একশ আশিজন শিক্ষার্থীর জন্য পুরাতন নতুন মিলিয়ে মাত্র ছয়জন শিক্ষক। নতুন বাংলা শিক্ষক এখনও অনুপস্থিত। তাকে ফোন করা হয়েছে তিনি এখনও বাসে। সামায়রা শেষ মাথায় পায়চারী করছে। রমজান মাসে একশ কিলোমিটার বাস জার্নি করে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে একজন ঢুকলেন। দুষ্টু মিষ্টি সাতাশ আটাশ বছরের শ্যামলা গড়নের একটি মেয়ে। লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে মুচকি হেসে সরি বললেন। দেরি করে ফেলার জন্য খুব দ্রুতই সিগনেচার সহ অন্যান্য কাজ করতে লাগলেন। যেন দেরিতে আসার সমস্ত টুকু নিমিষেই পুষিয়ে দেবেন। সামায়রার অসম্ভব ভালো লেগে গেল মেয়েটিকে। কেমন মায়া মায়া চেহারা।

পরিচয়ে জানা গেল, নতুন শিক্ষকের নাম ইসমাত মুকতুজা। দুমাস হল কলেজ জয়েন করেছেন কিন্তু এখনও বাসা খুঁজে পাননি। যতই বিসিএস হোক বাড়িওলা ব্যাচেলর ভাড়া দিতে চাননা। নতুন জায়গায় তার পরিচিতও কেউ নেই। কলেজের কয়েকজনকে বলেও কোন সমাধান হয়নি।অগত্যা তিনি বাড়ি থেকেই যাওয়া আসা করছেন। কলেজ এ অবশ্য মেয়েদের হোস্টেল আছে। সেখানে দিব্যি থাকতে পারতেন । আবেদন করার পরও তাকে হোস্টেল সুপার উঠতে দেননি। প্রিন্সিপাল স্যার এর সাথে কথা বলেও কোন লাভ হয়নি।

সামায়রা ভাবছে, বাংলাদেশের কোন একটা সেক্টর কি  দুর্নীতিমুক্ত আছে? অসহায় একটা মেয়ে এতদুর থেকে এসেছে। বাড়িঅলারা ব্যাচেলর বলে ভাড়া দেয়নি কিন্তু কলেজের অধ্যক্ষ কিংবা হোস্টেল সুপারের উচিত ছিল তাকে সম্মানের সাথে রাখা। হোস্টেলের একটা ঘর দেওয়া এমন আহামরি কিছু না।

আসলে দেয়নি অন্যকারনে। এখনকার হোস্টেল সুপার স্থানীয় হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘ দিন থেকে হোস্টেলের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মেয়েরা মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস পায়না। সমস্ত গোপন শেষ পর্যন্ত গোপনই থেকে যায়। এ অবস্থায় তাকে উঠালে সব খবর আস্তে আস্তে সে জেনে যাবে। এমনও হতে পারে মেয়েরা তাকে পছন্দ করে একসময় হোস্টেল সুপার হিসেবে চেয়ে বসতে পারে। এজন্যই উঠতে দেয়া হয়নি। মুকতুজা বোধহয় তেল দেয়া টাইপ মানুষ নয় সেটাও কারন।

“পাশের বাড়ির মানুষরাই শুধু প্রতিবেশী তা নয়। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরী করা মানুষগুলোও একে অপরের প্রতিবেশী। একে অপরের প্রতি কিছু দায়িত্ব কর্তব্য অবশ্যই সবার পালন করা উচিত।”

সামায়রা প্রতিবেশীর দায়িত্বে পড়ে গেল। আর মানুষ সবাই কে সবকথা বলেও না, আশাও করেনা। কিছু মানুষের মুখে বিশ্বস্ততার আভাস থাকে বলেই মানুষ তার কাছেই প্রত্যাশা করে।

পরীক্ষা শেষ হল বিকেল পাঁচটায় । যেহেতু তার বাসার পাশের ফ্ল্যাট ফাঁকা তাই সামায়রা  একপ্রকার জোর করেই তাকে বাসায় নিয়ে গেল। সামায়রার বাড়িঅলী আন্টি এরই মধ্যে তাকে ভীষন পছন্দ করে ফেলেছেন। তাকে সহজেই ম্যানেজ করা গেল। অধ্যক্ষ স্যারও সব শুনে কষ্ট পেলেন। দ্রুতই সবঠিকঠাক হয়ে গেল। সামায়রা একজন নতুন প্রতিবেশী পেয়ে মনে মনে বেশ খুশি। তারও একা সময়গুলো গল্পে আড্ডায় কেটে যাবে।

পরদিনই নতুন বাসা গুছিয়ে বাসযোগ্য করে ফেলা হল। হবেই বা না কেন? আসবাবপত্র বলতে শুধু তোশক বালিশ। মেঝে সুন্দর করে মুছে বিছানা পত্র সব ফ্লোরিং করা খুব বেশি সময় লাগার কথা না। শিক্ষক নাকি জাতির কর্নধার, শেকড়। মাটিতে শুয়ে কর্নধার দেখছে আহা! ছাদটা ঠিকঠাক পরিস্কার হয়নি। আর এখন তো মাসের মাঝামাঝি পরের মাসে টুকটাক জিনিস কিনে ফেলতে হবে। তেত্রিশ হাজার টাকা বেতনে এর চেয়ে আর কিইবা সম্ভব। পাশের ফ্ল্যাটের উকিল আন্টি নতুন বাসিন্দার ঘরদোর আসবাবহীন দেখে হতাশ হয়ে চলে গেলেন।

এক সকালে দুজনে হাঁটতে বেড়িয়েছে। আরও অনেকেই নদীর পাড়ে হাঁটতে যাচ্ছে। কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের দলও হাঁটতে বেড়িয়েছে। সামায়রাদের দেখে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়ছে। সালাম বিনিময় করে আবার হাঁটছে। এরপর একজন শিক্ষকের আর কিছুই পাবার নেই। সকালের সোনা রোদের মতই দু’জনের মুখ চকচকে আভায় ও শিক্ষক হবার গর্ব অহংকারে ফুলে ফুলে উঠছে। না থাকুক বিলাসিতা না থাকুক জৌলুস। এই সম্মানটুকুই বা কম কিসে! এটা নিয়েই শিক্ষকের বেঁচে থাকা।

 

---

Comments: 23 — https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%80-%e0%a7%a8-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a6%a1%e0%a6%bc%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7/#comments
