# পোয়াতি সময়

Author: নাজমুল আহসান
Published: 2019-12-16
Category: গল্প
Tags: ১৯৭১ এর যুদ্ধ, পাকিস্তানি, পোয়াতি, পোয়াতি সময়, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%9f/

আসমা বেড়ার আরও কাছে সরে এল। পিছন দিকটা থেকে গলির মুখ দেখা যায়। গলির সামনে টানা তিনটা মেহগনি গাছ। তার একটাতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজিত খাঁ। বুড়ো বিড়ি ধরানোর চেষ্টা করছে। সুবিধে করতে পারছে না। হাত দিয়ে আড়াল করেও লাভ হচ্ছে না, বাতাসে আগুণ নিভে যাচ্ছে। পরপর কয়েকবার চেষ্টা করে বিড়িটা ফতুয়ার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল।

জুতার মচমচ শব্দ বেড়ে গেছে। আসমা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকাল। ফর্সা, লম্বা একজন মানুষ আসমাদের ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। সবাই বলে গ্রামের সবচেয়ে লম্বা মানুষটা হল তাহেরার বাপ, শুনে আসমার বুকটা গর্বে ফুলে ওঠে। এই লোকটা তাহেরার বাপের চেয়েও অন্তত ছ’ ইঞ্চি লম্বা। আসমা দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল।

তাহেরা নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, কোলের মধ্যে মোচড়ামুচড়ি করছে। কিছুক্ষণ পরপর আসমা কয়েক সেকেন্ডের জন্যে ওর মুখটা ছেড়ে দিচ্ছে, বাচ্চাটা সেই ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতেই আবার চেপে ধরছে। আসমা আতংকিত হয়ে গেল। এভাবে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। ছোট বাচ্চা, দীর্ঘক্ষণ নিঃশ্বাস নিতে না পারলে মরে যাবে। আর মুখ চেপে ধরে না রাখলে বিপদ, একবার চিৎকার করে উঠলে সব শেষ।

বেড়ার ফাঁক দিয়ে আরেকবার তাকিয়ে আসমা অবাক হয়ে গেল। কেউ নেই। লম্বা যে লোকটা এদিকে এসেছিল, তাকে দেখা যাচ্ছে না। আম গাছের নিচে চার-পাঁচজন ছিল, তারাও নেই। একটু সরে এসে মেহগনি গাছের দিকে তাকাল, আজিত খাঁ দাঁড়িয়ে পড়েছে। হাতের ধুলা ঝাড়ছে। তারমানে এরা সবাই চলে যাচ্ছে!

আসমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডোবার ঢালের দিকে নেমে গিয়ে ডাকল, আম্মা, ও আম্মা?  
ঝোপের আড়াল থেকে মইতন বুড়ি বেরিয়ে এল। গলা খাঁদে নামিয়ে বলল, চইলে গেছে বউ?  
– হ।  
– তুই নেইমে আয় বউ।  
– না, আম্মা। আমার জোঁকের ডর করে।

আসমা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা বাড়ির পেছনের অংশ। প্রায়ই শেয়াল ঢুকে মুরগি খেয়ে ফেলত, সেই ভয়ে তাহেরার বাপ পাটখড়ি দিয়ে বেড়া দিয়েছিল, আসমা দাঁড়িয়েছে বেড়াটার পাশে। এরপর বাড়ির সমান্তরাল একটা ডোবা।

সলেহা ভাবি যখন খবরটা দিয়ে গেল, তখন মইতন বলল, অখন কই যাবি?  
আসমা বলল, কই যাইবেন?  
মইতন কিছু না বলে আসমাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল। বেড়ার পাশে গিয়ে বলল, তাহেরারে আমার কাছে দে। দিয়ে পার হইয়ে যা।

আসমা ডোবার পানির দিকে তাকাল। কুচকুচে কালো। এদিকটাতে কোমর-সমান পানি হলেও উত্তরদিকে অথৈ। ঢালের অংশ প্রায় পুরোটাই ঝোপঝাড়ে ঢাকা। ওর মনে হল, এই জোঁকে-ভর্তি ডোবা পার হতে গেলে সে এমনিতেই মরে যাবে। শাশুড়িকে বলল, আম্মা, আপনে আগে যান।

মইতন বুড়ি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ডোবার প্যাঁক-পানিতে নেমে গেল। ডোবার ওপারে উঠে আসমাকে ডাকল। আসমা গেল না।  
বুড়ি বলল, অই ছেমড়ি, কী হইল, নেইমে আয়।  
আসমা বলল, আমার ডর করে গো আম্মা।

–

এরা যে আসবে সেটা আসমা জানত। আজিত খাঁ সকালে এসেছিল। আসমা মাত্রই পুকুর থেকে গোসল সেরে উঠেছে। আসমাকে দেখে বলল, তুমি ফরমানের বউ না?  
আসমা বলল, জ্বে।  
– ফরমান কই?  
– চাচা, উনি তো নাই।  
– গেইছে ক’নে?

ফরমান কোথায় গেছে, এটা আসমা বলতে চায় না। মোবারক ভাই, শানু আর ফরমান গতকাল রাতেই বর্ডারের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। বিকেল থেকে আসমা পিঠা বানিয়েছে, মুরগির সালুন আর পোলাও রেঁধেছে; একটা ব্যাগে ভর্তি করে সেগুলো দিয়েছিল। ফরমান শুধু চিঁড়া আর গুড় রেখে বাকি সব বের করে দিল। বলল, মাইনষের জীবনের চারআনা দাম নাই, আর তুই রয়েছিস তোর পিঠা নিয়ে?

আজিত খাঁ বলল, কী ব্যাপার, বইললে না, ফরমান ক’নে?  
– গঞ্জে, চাচা।  
– অহ! আর শোনো, ফরমানরে বুঝাইয়ে বইল, আমাগের সাথে আসতি। দেশের অবস্থা কিন্তু ভালা না।  
– জ্বে, চাচা।

আজিত খাঁ আসমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত আরেকবার দেখল, তুমি তো ভালো ডাঙ্গর হইয়ে গেছ। তোমার ছাওয়াল-পাওয়াল ক’ডা?  
আসমা প্রমাদ গুনল। বুড়োর এসব খোঁজখবরের মানে সে বোঝে। বলল, এক মাইয়া চাচা।  
– এক মাইয়া! অ, ভালো। তা ফরমান তো এখন নাই, বিকালে আসি।  
আসমা বলল, চাচা উনার ফিরতি রাইত হবে। বিকেলে আ’লি তো পা’বেন না।  
আজিত খাঁ উঠে দাঁড়াল। আসমার ঘরের বেড়ায় পানের পিক ফেলল। ঠাঠা করে হেসে বলল, না পাইলে নাই।

–

লোকগুলো আবার বাড়িতে ঢুকেছে। আজিত খাঁ সাথে আছে। আম গাছের নিচে এসে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। আজিত খাঁ আসমাদের ঘরের দিকে ইশারা করল। এরপর আগের লম্বা লোকটা এগিয়ে এল।

আসমা ফিসফিস করে ডাকল, আম্মা?  
– কী?  
– আবার এইসেছে।  
মইতন বুড়ি বলল, তাত্তারি নেইমে আয় মুখপুড়ি।

আসমা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকাল। লম্বা লোকটা আসতে আসতে হঠাৎ করে থেমে গেছে। হাত দিয়ে ইশারা করে আজিত খাঁকে ডাকল। এরপর আজিত খাঁকে আসমাদের ঘরে পাঠিয়ে লম্বা পা ফেলে বেড়ার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

হঠাৎ করে আসমার মনে হল, শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি ভর করেছে। লোকটা একদম কাছে চলে এসেছে। সে কি ওদেরকে দেখে ফেলেছে? আসমা নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। নিজের হৃৎপিণ্ডের দ্রিমদ্রিম শব্দ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে ইশারায় শাশুড়িকে পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করল। বুড়িও ইশারায় কাকুতিমিনতি করতে লাগল। আসমার মনে হল, জোঁকের ভয় ফেলে ডোবায় নেমে যাওয়া উচিৎ ছিল। ওপারে গেলে কিছু একটা উপায় হতোই। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন নিঃশ্বাসের শব্দ করা মানে যমদূতকে জানান দেওয়া।

সে আবার বেড়ার ফাঁকে চোখ রাখল। এবং সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলল। লোকটা দু’হাত দূরে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক কর্ম সারছে। এতক্ষণে আসমা খেয়াল করল, লম্বুটার মাথায় মিলিটারি ক্যাপ আর কাঁধে বেয়নেট লাগানো বন্দুক।

লোকটা কাজ সেরে ঘুরে হাঁটতে শুরু করেছে। আসমা লম্বা করে একটা নিশ্বাস নিল। মনে হচ্ছে এ যাত্রায় বাঁচা গেল।

অনেকক্ষণ মুখ চেপে রাখায় মেয়ের চেহারা লাল হয়ে গেছে। ছটফট করছে। আসমা তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিল। এবং সাথে সাথেই তাহেরা চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

–

শিকারি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কুতকুতে চোখে বেড়ার দিকে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করছে শব্দটা ঠিক কোথায় হয়েছে।

মইতন বুড়ি সোজা হয়ে দাঁড়াল। ইশারায় আসমাকে বুঝাল, আয় দৌড় দেই। আসমা নড়ল না। সে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আর তাছাড়া পালানোর চেষ্টা করেও লাভ হবে না।

সে তাহেরাকে মাটিতে শুইয়ে রাখল। বেড়ার পাশ থেকে সূচালো একটা বাঁশ টান দিয়ে তুলে ফেলল। হুড়মুড় করে বেড়ার এদিকটা খুলে পড়ল। চোখাচোখি হয়ে গেল শিকারি আর শিকারের।

আসমার রণ-মূর্তি দেখে লোকটা ভড়কে গেলেও দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। মুখে পৈশাচিক হাসি টেনে এগিয়ে আসতে লাগল। আসমা টের পেল লোকটার প্রতি কদমে পৃথিবী কেঁপে কেঁপে উঠছে।

এক পা, দুই পা.. আসমা সজোরে বাঁশটা শিকারির পেটে ঢুকিয়ে মোচড় দিল।

ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল শিকারি ব্যথায় কুঁকড়ে পড়ে গেল। আসমা ঘুরে দাঁড়াল। বাকি শিকারিরা ছুটে আসছে।

আসমা তাহেরাকে কোলে নিল, শাশুড়িকে ডাকল, আম্মা?  
মইতন বলল, ফিইক্কে মার বউ। ফিইক্কে মার।

আসমা একবার তাকিয়ে আন্দাজ করে নিল। ডোবা মোটামুটি হাত দশেক চওড়া। মইতন বুড়ি ততক্ষণে মাঝ বরাবর নেমে এসেছে। আসমা আদরের কন্যাকে ছুঁড়ে দিয়ে ডোবার উত্তর দিকে ছুটতে লাগল।

মইতন তাকিয়ে আছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিদীর্ণ করে উড়ে আসছে তার নাতনি।
