# পাঠ পর্যালোচনা- কথা সাহিত্যিক সোনালী ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘অমৃত অর্জন’।

- Author: [মারজানা ফেরদৌস রুবা](https://sonelablog.com/author/marjanaruba2979/)
- Published: 2016-05-31T18:37:37+00:00
- Updated: 2016-05-31T18:37:37+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/), [মুক্তিযুদ্ধ](https://sonelablog.com/category/freedom-war/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4/

---

[!\[FB_IMG_1464719658706\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/06/FB_IMG_1464719658706-202x300.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2016/06/FB_IMG_1464719658706.jpg)

৭১ সিরিজের বেহুলা বাংলা প্রকাশনী হতে প্রকাশিত ‘অমৃত অর্জন’ উপন্যাসটি পড়তে বসে টের পেলাম মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো, তারই করুন সুর বেজে উঠেছে উপন্যাসটিতে। বরাবরের মতো এখানেও ফুটে উঠেছে, সংখ্যালঘু মানেই নিরীহ গোছের। আর নিরীহ বলেই হয়তো তারা সাধাসিধা জীবনে অভ্যস্ত। আলোচ্য উপন্যাসটিতে দামু এক সহজ সরল গোবেচারা মানুষ। কারো সাথেও নাই, পাছেও নাই। ভূসম্পত্তি থাকা সত্বেও চাল-চুলোহীন এক উদাস গানপাগল মানুষ সে। এই দামুকে ঘিরেই উপন্যাসটির কাহিনী আবর্তিত হয়।

দামুকে ঘিরে আবর্তিত হলেও উপন্যাসটির প্রধান উল্লেখ্যযোগ্য চরিত্র আমার কাছে আজহার মীরকেই মনে হয়েছে। পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে হাজার হাজার সুবিধাবাদী ভণ্ড লোক ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিদের সহচর হিসাবে সারা বাঙলায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো। ভীনদেশে যুদ্ধ করতে আসা পাক বাহিনীকে মুলত এরাই পথ দেখাতে, মুক্তিযোদ্ধা চিনিয়ে দিতে সহায়তা করতো। এদের সহযোগিতার কারণেই লাখ লাখ মুক্তিসেনাকে পাকসেনার হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। হাজার হাজার নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। এদের কাছে বিধর্মী যারা তারা ভারতের দালাল আর মুসলমান হয়েও যারা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করছিলো না তারা সাচ্চা মুসলমান না। মোদ্দাকথা, মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরোটা সময়ই এরা ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ধর্মের নামে ভণ্ডামীর মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী অজস্র বাঙালী নিধনে মেতে উঠেছিলো। আর উপন্যাসটিতে আজহার মীর চরিত্রটি তারই প্রতীক।  
দুই পুত্রের জনক হলেও আজহার মীর নিজ চরিত্রগুনে পুত্রদের কাছে উপেক্ষিত। হামিদুল-সাইদুল দুই ছেলেই বাপের বিপরীত, মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন সৎ চিন্তার অধিকারী। নিজ মানসিকতায় পুত্রদের বড় করতে না পারায় আজহার মীরের দুঃখের শেষ নেই। তবে বরাবরই এ দায়টি সে বউয়ের উপরই চাপায়। তাইতো তাকে বলতে শুনি, “একটা অপদার্থ মেয়েমানুষ দুটো ঢ্যামনা ছাওয়াল জন্ম দিছে গো।”

বরাবরই যারা অসহায়ের সহায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েও তারা শহর থেকে ছুটে আসা বিপদগ্রস্ত আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তেমনি একটি  
পরিবার হচ্ছে কাজীবাড়ি। কাজীবাড়িতে খাটি মানুষ দামুর খুব কদর। সময়ে সময়ে কাজীবাড়ির অন্ন খেয়েই দামুর দিন কেটে যায়। কাজীবাড়ির সাথে আজহার মীরের দা-কুমড়ো সম্পর্ক। কাজীবাড়ির মেয়ে কুসুম ভালোবাসতো আজহার মীরের বড়ছেলে সাইদুলকে। সাইদুল-কুসুমের ভালোবাসাকে ঘিরে আজহার মীরের আপত্তিকর আচরণ দুই পরিবারে দুরত্ব তৈরি করে। শুধুমাত্র আওয়ামী পরিবারের মেয়ে বলে গোঁয়ার টাইপ বাপ এই বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার ভাষ্য, ওরা হচ্ছে নামে মুসলমান, আদতে হিন্দু।  
একই রকম মানসিকতার পরিবার সৈয়দবাড়ি। এ বাড়ির একমাত্র ছেলে যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীতে। এ খবর আজহার মীরকে আরোও উশৃঙ্খল করে তোলে। সে পাক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলে আর নিজে হয় ‘শান্তি কমিটি’র চেয়ারম্যান। গ্রামের জোয়ান ছেলেপুলেকে রুজি রোজগারের লোভ দেখিয়ে রাজাকার বাহিনীতে টানতে থাকে। আর নিজেও অংক কষতে থাকে এ সুযোগে কাকে কিভাবে ফাঁসিয়ে তার জমিজিরাত দখলে নেয়া যায়।

‘শান্তি কমিটি’র চেয়ারম্যান হয়েই আজহার মীর মনেমনে ভাবতে থাকে নিজেকে প্রকাশ করতে ঠিক কি ধরণের আঘাত হানলে গ্রামসুদ্ধ সকলের বুক কাঁপিয়ে তার শক্তির পরিচয় তুলে ধরা যায়। একাজে তার বুদ্ধির সহযোগী হয় সহচর জমির। তারা টার্গেট করে নিরীহ সংখ্যালঘু দামুকে। কোনো এক জুম্মাবারে নিরীহ দামুকে মুসলমান বানানোর কাজে নেমে পড়ে আজহার মীর। সকলকে নির্দেশ দেয় নামাজ শেষে অংশগ্রহণের। সাদাসিধে দামুও ভাবে, মা-মাটি আঁকড়ে থাকতে চাইলে কি আর করা কলেমা পড়ে মুসলমান তাকে হতেই হবে। দামুর কলেমা পড়া শেষ হলে সকলে হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু কেউ তখনো টের পায়নি কি বিভৎস আর নিষ্ঠুর দৃশ্য তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। ছুরিকাঁচির ঘষায় দামুর বুকফাটা আর্তনাদ আর গোঙানি চারদিক কাঁপিয়ে জানিয়ে দেয় সংখ্যালঘু হিন্দু থেকে সাচ্চা মুসলমান হওয়ার যন্ত্রণা কতো। দামু যখন লালাঝরা মুখে যন্ত্রণায় হাসফাস করছিলো, তখন আরো একধাপ তাকে মুসলমান করতে তার মুখে ঠেসে দেয়া হয় গরুর মাংস।  
এরপরেও দামু দেশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চাইলে, রাজাকার মীর আটে অন্য ফন্দি! এক রাতের আধারে মুখে গামছা আর পায়ে ইট বাধা দামু তলিয়ে যায় নদীর অতল গহবরে।

উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে এক জায়গায় চোখ আটকে গেলো! আর সেখানেই আমি উপন্যাসটির নামের সার্থকতা খুঁজে পেলাম। লেখক উপন্যাসটিতে ফুলি চরিত্রটিকে দেখিয়েছেন পাক সেনা আর তাদের সহচর রাজাকারদের ভয়ে যাকে দমবন্ধ হওয়া এক শ্বাসরদ্ধকর জীবন যাপন করতে হয়েছে। দিনভর ধানের গোলা আর মাঁচায় লুকিয়ে থেকে নিঃশব্দ দিন যাপন আর মধ্য রাতের আধারে নেমে পিনপতন নিরবতায় গোসল আর খাওয়া সেরে ভোর রাতের আগেই আবার একই অবস্থায় ফিরে যাওয়া। মুহুর্তেই মনে পড়ে গেলো লেখকের সাথে আমার পরিচয় হওয়ার প্রথমদিকে একদিন তিনি আমায় কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁরা কিভাবে আতঙ্ক বুকে নিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখতেন। বলেছিলেন যুদ্ধকালীন সময়টিতে তিনি ছিলেন ষোল বছরের যুবতী। সেদিন আমি তাঁকে বলেছিলাম, আপু কেনো আপনারা এগুলো তুলে ধরছেন না? আপনাদের নিজেদের স্মৃতিচারনই তো একেকটা দলিল। যাহোক, ফুলি চরিত্রের বিবরণ পড়ে বইটির পাতা উলটে নিশ্চিত হলাম মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে উপন্যাসটি লিখা হয়েছে।

এবার আসি অন্য এক দৃশ্যে। বর্ষাকালের হাটুকাদা মাড়িয়ে পাক বাহিনী গ্রামে না আসলেও রাজাকারের হাত থেকে বাঁচতে কাজীবাড়ি একসময় জনশূন্য হয়ে উঠে। কাজীবাড়ির মেয়েদেরও আর দেখা যায় না। ইজ্জত বাঁচাতে মেয়েবউ তিনজনকেই সারাদিন লুকিয়ে নিঃশব্দ সময় কাটাতে হতো। আর এভাবেই শরীর বাঁচাতে রাজাকারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাঙলার ঘরেঘরে নারীরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতো। যারা নজরে পড়তো তারা ফেঁসে যেতো। একসময় রাজাকারে দল টের পেয়ে যায় কাজীবাড়ির মেয়েদের লুকিয়ে থাকার ব্যাপারটা। আর তারপর থেকেই চলতে থাকে পাকসেনাদের হাতে তাঁদের তুলে দেয়ার নানা ফন্দিফিকির। উপন্যাসটি পড়লেই জানা যাবে সে বাস্তব ঘটনা আর শিউরে উঠতে হবে ঘটনার বিবরণ জেনে।

উপন্যাসটি ঘিরে যে বিবরণ ফুটে উঠেছে, তাই ছিলো যুদ্ধকালীন সময়ে অধিকাংশ গ্রামের বাস্তবতা। বর্ণনায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার লক্ষণীয়। উপন্যাসটির শেষদিকে এক নারী চরিত্রকে জানা যায়, যে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতো। এছাড়া হামিদুল-সাইদুল, মধুমাঝি এমন অনেক সহযোগীর সহায়তায় এই বাংলায় স্বাধীনতার লাল সূর্য উত্থিত হয়।

উপন্যাসটির সার্বিক সাফল্য কামনা করি। ইতিমধ্যে উপন্যাসটির জন্য লেখক ‘আয়েশা ফয়েজ সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৬’ অর্জন করেছেন। লেখকের প্রতি রইলো শুভ কামনা।

---

Comments: 8 — https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a0-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4/#comments
