# পছন্দসমূহ

Author: নাজমুস সাকিব রহমান
Published: 2020-04-09
Category: বুক রিভিউ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%aa%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%82%e0%a6%b9/

> *আমার পছন্দের পাঁচটি বইয়ের কথা বলি। প্রথমেই ওরহান পামুকের ‘ইস্তানবুল, একটি স্মৃতির শহর’। স্কেচধর্মী এই বইটা নানা কারণে ভালো লেগেছে। প্রথমত, গদ্যের বই হিসেবে এটি দুর্দান্ত। দ্বিতীয়ত, এই বইটা পড়লে ইস্তানবুল শহরটা ভিসা ছাড়া ঘুরে ফেলা যায়। স্থাপত্যের শহরে ঘোরাঘুরি সবসময় আনন্দদায়ক।আর একটা ব্যাপার হচ্ছে,―বইটা ওরহান পামুক এমনভাবে লিখেছেন, যেন চমৎকার একটা উপন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতা হয়। পড়ার পর তাই ঢেঁকুর ওঠে। মনে হয়, ইস্তানবুল শহরটা পৃথিবীতে ছিল না―এটা ওরহান পামুক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সৃষ্টি করেছেন।*
> 
> *এরকম আর একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে আহমদ ছফার লেখা ‘যদ্যপি আমার গুরু’। এই বইটা মূলত একজন শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের ট্রিবিউট। কিন্তু এর যে ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে তা হলো স্টাইল। এটা প্রতিবারই ফ্রেশ। কোনো ভনিতা নেই। একেবারে সরাসরি। যেন আহমদ ছফা মাত্রই লিখে শেষ করেছেন। আমি ‘যদ্যপি আমার গুরু’ দশ-বারো বার পড়েছি এবং প্রতিবারই আহমদ ছফার গদ্যের মুনশিয়ানা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।*
> 
> *মোঘল স্থপতি বাবুরের আত্মজীবনী পড়েও এরকম মুগ্ধ হয়েছিলাম। বইটার নাম ‘বাবুরনামা’। এই বইটা দারুণ একটা অভিজ্ঞতা আমার জন্যে। সাধারণত আত্মজীবনীগুলো যেমন হয়, বাবুরনামা তার থেকে একটু আলাদা। এটার শুরু হয়েছে, এভাবে―*
> 
> *‘শাবান মাসে সূর্য যখন কুম্ব রাশিতে আমি তখন কাবুল থেকে হিন্দুস্থান পানে যাত্রা করলাম। বাদাম চশমা ও জাগদালিকের পথ ধরে ছয় দিনের দিন আমরা আদিনাপুর এসে পৌঁছালাম। এর পূর্বে কোন উষ্ণ দেশ কিংবা হিন্দুস্থান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি।*
> 
> *আদিনাপুর যখন এসে পৌঁছলাম তখন এক সম্পূর্ণ অভিনব জগতের দৃশ্য আমার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠল। আমি দেখলাম এ জগতের ঘাস পৃথক, বৃক্ষরাজি পৃথক; এখানকার বন্যজন্তু আলাদা, এর পাখি আলাদা। এমনকি এ জগতের যাযাবর জাতি ইল এবং উলুসদের আচার আচরণও আলাদা।’*
> 
> *কাজেই বাবুরনামা আত্মজীবনী হলেও এটা মূলত ভিনদেশী এক মানুষের হিন্দুস্তান দেখার অভিজ্ঞতা। তিনি এখানে আনারস, তরমুজ এমনকি ময়ূরের মাংস খেতে কেমন তাও বর্ণনা করেছেন। আমি যে কয়বার বইটা পড়েছি, প্রত্যেকবারই বাবুরের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। একইসঙ্গে আমার মনে হয়েছে, বাবুরের নামের আগে ‘সম্রাট’ শব্দটা যুক্ত হওয়া কোনো ঘটনা না। যার এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আছে―তিনি তো সম্রাট হবেনই।*
> 
> *আত্মজীবনী ঘরানার আর একটি বই আছে আমার পছন্দের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘জীবনস্মৃতি’। এখানে তার লেখালেখির পুরো জার্নি আছে। এর মধ্যে সঙ্গীত বিষয়ক প্রবন্ধগুলো তো খুবই দারুণ। তবে আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে জীবনস্মৃতির মেকিং। আঙ্গিকগত দিক থেকে এই বইটা অসাধারণ। চাবি লেখা জাতীয় যে রচনাগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন এর কোনো তুলনা হয় না। যারা সৈয়দ মুজতবা আলী বা হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার লেখাগুলো পড়েছেন, তারা বুঝতে পারবেন এই ধরনের লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী অসাধ্য সাধন করেছেন। বলতে বিব্রত লাগছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বড় ফিচারিস্ট ছিলেন।*
> 
> *আমার কাছে মনে হয়―ভালোমত জীবনস্মৃতির পোস্টমর্টেম করতে পারলে যে কারো পক্ষেই সহজে লেখালেখি করা সম্ভব। পড়ার সময় শুধু তিনি কি বলছেন না দেখে, কি করছেন তা দেখতে হবে। এখানে তিনি ‘শ্রীকণ্ঠবাবু’, ‘অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী’, ‘প্রিয়বাবু’, ‘রাজেন্দ্রলাল মিত্র’, ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ ও ‘শ্রীযুক্ত আশুতোষ চৌধুরী’ নামের যে রচনাগুলো লিখেছেন―খুশিতে, ঠ্যালায়, ঘোরতে এগুলো আমরা এখনো লিখে চলেছি।*
> 
> *চারটা বইয়ের কথা বলে ফেলেছি। এবার কিং অব হররের কথা বলা যাক। স্টিফেন কিং এর একটা বই আছে, ‘অন রাইটিং’। এটা তার বেশিরভাগ বইয়ের মত ভূতের গল্প না। ক্রাফট বিষয়ক রচনা। এই বইয়ের কথাবার্তাগুলো অনেকটা এরকম―‘An opening line should invite the reader to begin the story. it should say : Listen, Come in here. You Want to know more about this’.*
> 
> *আপাত দৃষ্টিতে অত্যন্ত কাটখোট্টা লাগতে পারে। কিন্তু এই বইটা অদ্ভুত। স্টোরি টেলিং, হিউমার আর বোঝাপড়ার দুর্দান্ত রসায়ন হলো ‘অন রাইটিং’। ভূতের গল্পের গ্র্যান্ডমাস্টার এখানে যা বলেছেন, বাংলা ভাষায় তার সারমর্ম হলো―বিড়াল শুধু বাসর রাতে নয়, লেখালেখিতেও মারতে হয়। কাজেই আসুন, বিড়াল মারি।*
> 
> ***স্পেশাল মেনশন :** সিপাহী বিদ্রোহের সময় মির্জা গালিব ফার্সি ভাষায় একটা ডায়েরি লিখেছিলেন। ‘দাস্তাম্বু’। ১৮৮৭ সালের মে থেকে পরের বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত ১৫ মাসের দিল্লি শহরের পরিস্থিতি দাস্তাম্বুতে আছে। সঙ্গে আছে মির্জা গালিবের বন্দী জীবন-যাপনের বর্ণনা।*
> 
> *সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, এখানে ভাষা নিয়ে মির্জা গালিব রীতিমত ছেলেখেলা করেছেন। গদ্যের ক্লাস নিয়েছেন। এখানকার প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি কোমল পাথর। যেন পৃথিবী মির্জা গালিবের পায়ের কাছে নতজানু হয়ে আছে। বলছে, গালিব, তুমি আমাকে আঘাত করো। আর তিনি উৎসাহ পেয়ে ব্লাড ডায়মন্ড সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মত সবকিছু ভেঙ্গেচুরে ফেলছেন। তো, এখন পর্যন্ত এই হলো আমার পছন্দসমূহ। নিজের জন্য আমি এই বইগুলো পড়তে চাই।*
> 
> *জুলাই, ২০১৯*
