# “নিস্তব্ধতা”

- Author: [আতকিয়া ফাইরুজ রিসা](https://sonelablog.com/author/afr40/)
- Published: 2020-06-30T14:06:50+00:00
- Updated: 2020-07-05T04:26:55+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a4%e0%a6%be/

---

রাগ চেপে রাখা আসলে কতটা কঠিন? নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখার মতোই কি? এই মুহূর্তে রাগে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে৷ আমি সজীবের দিকে আরো কয়েকবার রাগী রাগী চোখে তাকালাম। চোখমুখ কুচকে বসে থাকলাম। নাহ্, কিছুতেই কিছু হলোনা। একটা মানুষ রাগে ফোস ফোস করছে, অথচ তার পাশে বসে থাকা মানুষটার কোনো ভাবান্তর হচ্ছেনা। এটা এক প্রকার অপমান। সজীব আমাকে অপমান করছে, এটা ভেবে রাগটা আরো বহুগুণ বেড়ে গেলো। আমি আর থাকতে পারলাম নাহ্।  
– সজীব, এই সজীব।  
খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে আমার দিকে ফিরে বলল,  
– হুম, বলো।  
– আমার তোমার উপর রাগ উঠেছে খুব।  
– ওহ্, ভালো।  
– নাহ্। রাগ উঠা মোটেও ভালো না।  
– তাহলে রাগকে নামাও।  
– নামাতে পারছিনা বলেই তোমাকে বলছি।  
– আমাকে বলে কি লাভ?  
– কারণ তোমার কারণেই রাগটা উঠেছে।  
– ও আচ্ছা।  
– তুমি কিছু বলবেনা?  
– কি বলব?  
– আচ্ছা, তুমি এমন কেন? বলেই আমি প্রায় কেঁদে দিলাম। রাগ উঠলেই কেন জানি আমার কান্না পেতে থাকে।  
সজীব তারমতো চুপচাপ বসে আছে।  
আমি তার পাশে বসে অনবরত চোখের পানি ঝরাচ্ছি। আমার শুধু বারবার মনে হচ্ছে, আমার স্বামী আমাকে একটুও ভালোবাসেনা। তবু নিজেকে কিছুটা শক্ত করে, জিজ্ঞেস করলাম,  
– আচ্ছা, আমরা এখানে কেন বসে আছি? চলো, বাসায় যাই।  
অনেকদিন পর বাহিরে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। অথচ ঘুরাঘুরি শুরু হওয়ার আগেই রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান দেখেই সজীব বসে পড়লো৷ তারপর থেকে পুরো একঘন্টা যাবত বসে আছি ।আশপাশের মানুষ আসছে। আমাদের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে। সজীবের কিছু হচ্ছে না। রাগে শুধু আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।  
সজীব উদাস একটা ভঙ্গি নিয়ে বললো,  
– এখনি আসলাম। আর কিছুক্ষণ পর যাই। ভালোই লাগছে। ঠান্ডা বাতাস।  
মুখ ফুটে বলেই ফেললাম,  
– সজীব, আমার এখন খুব কান্না পাচ্ছে। তুমি জানো রাগ উঠলেই আমার কান্না পায়।  
সজীব শুধু শুনলো মনে হলো। তারপর সে আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে ঠান্ডা বাতাস খেতে লাগলো।  
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। রাগটা ঠিক কি কারণে সেটাও তাকে বলে লাভ নেই৷ কারণ আমার রাগ দুঃখ কিছুতেই সজীবের তেমন যায় আসেনা৷ সে তারমতো থাকে আর আমি আমার মতো। খুব রাগ উঠলেও সে সবকিছু নিবে হালকাভাবে। কত স্বপ্ন ছিলো আমার! আমার জামাইটা হবে সিনেমার নায়কদের মতো। কি আবেগ! নায়িকার চোখের পানিতে তার বুক মোচর দিয়ে উঠবে। অথচ সজীব এমন আচরণ করে,যেন সে খুব আবেগহীন।মাঝেমধ্যে সে কোনো কারণ ছাড়া কথা বলাও বন্ধ করে দেয়৷ কখনো আমার শত কথার একটাই জবাব দেয়, ‘হুম’। মাঝখানে মনে হতো, সজীব মনে হয়, আমাকে ভুলে অন্য কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছে। তাই আমার প্রতি আর কোনো আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছেনা। আমি লুকিয়ে ওর ফোনের সব চেক করলাম। নাহ্,কিছু পেলাম না। ফোন চেক করার কারণে ধরাও পড়লাম। ফোন হাতে নিয়েই সে বুঝে ফেলল। জিজ্ঞেস করলো, ফোনে কি করলে এতোক্ষণ? আমি বললাম,কই, কিছুনা তো। সে কেবল বলল, ও আচ্ছা। আমার কাছে সজীবের এই নিস্তব্ধতা, এই রাগ- অভিমান- অনুভূতিহীন, আবেগ বিবর্জিত ভাবটা খুব অদ্ভুত লাগে। যার ভেতর সামান্য অভিমান নেই, সে তো ভালোবাসতেও জানেনা বোধ হয়।মাঝেমধ্যে ওর জন্য খুব মায়া হয়। ভালোবাসতে না পারার অক্ষমতা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। সজীব কি এই অক্ষমতা নিয়েই জন্মেছে? নাকি হুট করে অক্ষম হয়ে গেছে? তার এই নির্লিপ্ততায় আমার রাগ কেবল বাড়ে৷ অভিমান হয় শুধু। কখনো চেপে রাখি। কখনো প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়ি,কখনোবা কেঁদে কেটে একাকার। কিন্তু মানুষটার কোনো ভাবান্তর নেই। একজন আবেগহীন মানুষের সাথে বসবাস করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা হয়তো। আমি সজীবকে বুঝতে পারিনা। কিন্তু কেন জানি ভালোবাসাটা বেড়েই যায় শুধু। অবহেলা ব্যাপারটাও অবাক করে। যত অবহেলা, তত আকর্ষণ। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, সবকিছু ছেড়েছুড়ে কোথাও হারিয়ে যাই। তারপর মনে হয়, একা থাকবে ও, কষ্ট হবে বেচারার। আমার মাঝে এতো আবেগ,আর ওর মাঝে কিছুই নেই।  
.  
আমি আর রাগ থামাতে পারলাম না। হুট করে একটা রিক্সা ডেকে উঠে পড়লাম। সজীব একমনে আকাশ দেখে যাচ্ছে। আমি রিক্সা নিয়ে চলে গেলাম৷ বাসার কাছাকাছি এসে মনে হলো, ওকে এভাবে ফেলে আসা উচিত হয়নি। আবার রিক্সা ঘুরিয়ে চায়ের দোকানে ফিরে গেলাম। সজীব এখনো বসেই আছে।  
আমি রিক্সা থেকে নেমে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।  
– কি হলো? বসেই থাকবে? বাসায় যাবেনা?  
– সজীব খানিকটা হাসলো। তারপর চুপচাপ রিক্সায় উঠে গেলো।  
আমি অভিমানের সুরে বললাম,  
– আর যদি না আসতাম?  
সজীব তার স্বভাবমতো চুপ করে থাকলো। আমি তার কাঁধে মাথা রাখলাম।প্রকৃতির নিয়মগুলোও বড় অদ্ভুত। যাকে ভালোবাসা যায় একসময় হয়তো তার নিস্তব্ধতাও প্রিয় হয়ে উঠে!

---

Comments: 18 — https://sonelablog.com/%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a4%e0%a6%be/#comments
