# ধাবমান যে প্রজন্ম (৪র্থ পর্ব)

- Author: [আজিজুল ইসলাম](https://sonelablog.com/author/azizul-islam/)
- Published: 2014-09-27T13:53:47+00:00
- Updated: 2014-09-27T13:53:47+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/), [সাহিত্য](https://sonelablog.com/category/literacy/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a7%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%aa%e0%a6%b0/

---

অফিস হওয়ার পর ঝন্টুর এক বন্ধু, মিডিয়াকর্মী জসীম ঝন্টুকে নিয়ে মাঝে-মধ্যে ওখানে যায়। ঢাকা ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা, টিউশনি নিয়ে অবসর তো নেই ওদের, তবুও এরই মধ্যে সময় করে নিয়ে ওরা যায় ওখানে। গ্রামে আন্দোলন করতে গিয়ে আজিজ যখন হাসপাতালে ছিলেন মাসখানেক, তখন একবার তাঁকে দেখতে গিয়েছিল জসীম। খুব বেশী কথা হয়নি তখন অবশ্য, তবে দু’জনেরই চিন্তা-ভাবনা এক হওয়ার কারনে অভিব্যক্তিও ছিল একই; কাজেই চিনে নিতে অসুবিধা হয়নি একে অন্যকে। সাংবাদিক হিসেবে একটি কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন জসীম আজিজকে, আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমি এই আন্দোলনকে সারা দেশব্যপী ছড়িয়ে দিতে চাই। এখানে ইউপি চেয়ারম্যান, এমপি, এদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে আমরা কিছুটা সফল বলব, কমপক্ষে এতো মানুষের সংশ্লিষ্টতা, এই আন্দোলনকে অসফল তো বলা যাবেনা। তেমনিভাবে সারাদেশব্যপী এই আন্দোলন শুরু হলে সেটাও অবশ্যই অসফল হবেনা। পুরো দেশ এই আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

হাসপাতাল বলে আলোচনা সেদিন এগোয়নি আর। উপজেলা শহরের একটা জুনিয়র স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আজিজ। সারাজীবন দেখেছেন গ্রামে দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার যে ত্রান প্রদান করে থাকে, তা লুটপাট হযে যায়। আগে কিছু কাজ তবুও হোত, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই কাজ হওয়ার পরিমান কমে যাচ্ছে। কমতে কমতে গত কয়েক বছরে অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, কোন কাজ তো হচ্ছেই না, উপরোন্ত ভুয়া ভুয়া সব প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে ত্রানের সমস্ত গম-চাউল-টাকা, সম্পূনর্টা-ই মেরে দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক দরিদ্রের প্রাপ্য লোপাট করে দিয়ে এক শ্রেণির মানুষ ফুলে ফেঁপে ওঠে।

আর সহ্য হয়না আজিজের। জণমত গড়ে তোলেন তিনি এবং শুধু জণমতই নয়, প্রথমে গ্রাম তারপর ইউনিয়ন এবং সবর্শেষ উপজেলা পযার্য়ে প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে ওঠে তাঁর সক্রিয়তায়। দুর্বার আন্দোলনের বিভিন্ন পযার্য়ে তাদের উপর হামলা হয়। হামলা মোকাবেলা করে আবার আন্দোলন হয়। দীঘর্দিনের সচল আন্দোলনের তীব্রতায় স্থানীয় চেয়ারম্যান, এমপি, সরকারী কর্মকর্তারা আর ওরকম লোপাট করতে সাহস পাননা ত্রান । এভাবে গরীবের হক গরীব আদায় করে নিতে কিছুটা সক্ষম হন। এই আন্দোলনের সফলতায় সারাদেশব্যপী সুশাসনের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয়ে কর্পোরেট এই নগরীতে তাঁর প্রবেশ। দেখতে চান তিনি কতটা হতে পারে বানিজ্য-বেনিয়া এই শহর, এই দেশ। প্রানে নি:শ্বাস থাকা পযর্ন্ত দেখে যাবেন তিনি।

রাজনীতিবিদরা এদেশে রাজনীতি করেন, যার মানে হচ্ছে দুর্নীতি-লুটপাট-অবিচার-অত্যাচার। শেয়ারবাজার লুটপাট, ব্যাংক লুটপাট চলছেই অবিরতভাবে। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজ-জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে ক্রমেই দেশটা। টাকা না দিলে কোন অফিসে কোন কাজ হয়না। অফিসের কর্তাদের মানুষের উপর কোন সহানুভূতি নাই। সাবির্ক এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরকারী, বিরোধী, কোন দলেরই নেই কোন ভুমিকা, নেই কোন ব্যবস্থা গ্রহন।

হাসপাতালে আহত হয়ে একটা মাস কাটানোর সময়টাতে এসমস্ত-ই ভাবেন আজিজ। দেশে সুশীল সমাজের অবস্থান কী! কারো কোন দায়বদ্ধতা নাই নাকি? বক্তব্য-বিবৃতি-টকশো এসমস্ত কাজের মধ্যেই উনারা নিজেদের ব্যপ্ত রেখেছেন। ওদিকে মরছে গরীব। দেশে নদী খনন হচ্ছেনা, খাল খননের নামে, বাঁধ নির্মানের নামে লুটপাট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা আর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে লক্ষ-কোটি মানুষ। আজ যিনি সম্পন্ন কৃষক, কাল তিনি হয়ে যাচ্ছেন সবর্হারা, হয়ে যাচ্ছে শ্রমিক-রিক্সাচালক।

মন শক্ত করেন আজিজ, অবসর নিয়ে ফেলেন চাকরী থেকে। শেষ সম্বল অবসরভাতা দিয়ে আসেন স্ত্রীর হাতে আর নিজে চলে আসেন ঢাকা শহরে সুশাসনের জন্য আন্দোলন শুরু করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। অংক তাঁর বিষয় ছিল, একারনে দু’চারটে টিউশনি জুটিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। কর্পোরেট এই শহরে প্রথমদিকে নিজেকে একা একা লাগলেও আত্মবিশ্বাসের জোরে এবং প্রচন্ডভাবে দেশের প্রতি নিজের একধরনের ঋণ অনূভব করার কারনে সবকিছু কাটিয়ে ওঠেন একসময়ে।

মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে জসীম, ঝন্টুদেরই বয়সী, একইসাথে পড়ে ওরা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। জসীমের মামা জাহিদ বামপন্থী রাজনীতি করতেন। চুয়াত্তর-পঁচাত্তরকালে রাজনীতিতে দারুন সক্রিয় ছিলেন তিনি। এদেশে তখন পড়েছিল ভারতের নক্সালবাড়ী আন্দোলনের ঢল। চীনের মাও-সে-তুংপন্থী রাজনীতির চরমপন্থা, শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতি শুরু হয় সেখানে নক্সালবাড়ী নামক এক রেলষ্টেশন থেকে। তাই নাম হয় নক্সালবাড়ী আন্দোলন। আসলে চীনে মাও-সে-তুং শ্রেণিশত্রু অর্থাৎ জমিদার-জোতদার খতমের রাজনীতি করতেননা। সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের সাথে সরাসরি যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল এবং চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি গেরিলা দল গঠন করে সরকারের সাথে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছিল। কিন্তু ভারতে তৎকালীন জমিদার শ্রেণির প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সাথে কৃষকের উপর অত্যাচার-অবিচার-নিষ্ঠুরতা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে, ক্রমান্বয়ে শিক্ষিত হতে থাকা বিশেষত: ছাত্রদের মধ্যে এদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছিল প্রচন্ডভাবে। এমনই ছিল এই ঘৃনা যে, কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য মাষ্টার্স করা একদল ছাত্র নিজেদের সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলেন জমিদার-সামন্তদের অত্যাচারের প্রতিবাদে এবং এরপর তারা নক্সালবাড়ীর আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন।

চারু মজুমদার ছিলেন এই নক্সালবাড়ী আন্দোলনের নেতা। একজন অসুস্থ ব্যক্তি উনি এবং এমন-ই অসুস্থ যে, বুকের মধ্যে সার্জারী করে ঢোকানো এক নল দিয়ে তিনি নি:শ্বাস নিতেন। তাঁকে বন্দী করার পর সরকার সরাসরি তাঁকে মারার সাহস পায়নি, হাসপাতালে তাঁর নাক থেকে নলটা খুলে নিয়ে নি:শ্বাস বন্দ করে মেরে ফেলে।

আরেক নেতা ছিলেন এদের আজিজুল হক। তাঁকে বন্দী করে টর্চার করতে করতে এমনই অবস্থা করেছিল সরকার তাঁর যে, ছেড়ে দেয়ার পর তাঁর শরীর সারতে ছয়মাস লেগে গিয়েছিল সময়, শুকনো শরীর একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। জমিদারদের অবণর্নীয় অত্যাচার এবং এঁদের আহ্বান ছাত্রসমাজকে তখন এমনই উত্তাল করে তোলে যে, সে হাওয়া সীমানা ছাড়িয়ে চলে আসে বাংলাদেশেও।

দলীয় কোন্দলে সাতাত্তরে মারা যান মামা জাহিদ। মায়ের কাছে ওঁর গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছে জসীম। তাই রাজনীতি একরকম ওর রক্তে । পড়াশুনা শেষ করে কোন চাকরী না পেয়ে অবশেষে চাকরী নেয় একটা পত্রিকা অফিসে। চাকরী করতে করতেই অনেক কিছু দেখে ও। বিশেষ করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের অসহায়ত্ব মেনে নিতে পারেনা। তাই গার্মেন্ট কারখানার যেখানেই কোন সমস্যা অথবা যেখানেই আন্দোলন, ছুটে যায় ও। বিপদের কোন ধার ধারেনা। দুই বছরের জুনিয়র ঝন্টুকে নিয়ে যায়। ঝন্টু মিতা অথবা অনুকে ডাকে। কখনও যায় ওরা, কখনো যেতে পারেনা।

এভাবেই এগিয়ে চলে ওরা। অনু পাশ করে একটা বেসরকারী চাকরী করে আর রাজনীতি তো আছেই। ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে এখন ও বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহন করেছে। ঝন্টু অনার্স শেষ বর্ষে আর মিতার অনার্স শেষ হবে আরো দু’বছর পর। জসীমের কাছে প্রেশার গ্রুপের কাযর্ক্রম শুনে ওরা আগ্রহী হয়। সময় সময় যায় ওখানে ওরা, শোনে, দেখে কী হয় ওখানে।

সাবেক এক নিরপেক্ষ সাংসদ এই অফিসের ব্যবস্থাপনা করে দিয়েছেন এবং মাসিক খরচও  বহন করেন তিনি-ই আপাতত:।চুক্তি হয়েছে তাঁর সাথে সেভাবেই, কোন হাঙ্কি-বাঙ্কি চলবেনা। অবশ্য প্রেশারগ্রুপের তিনি একজন সদস্য-ও।

দু’টি মূলনীতি এখানে মেনে চলা হবে দৃঢ়ভাবে-(১) প্রেশার গ্রুপ কখনো দেশের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোন ধরনের চেষ্টা কখনো-ই করবেনা; আর (২) দুর্নীতিবাজ কোন ব্যক্তি কখনোই এর সদস্য হতে পারবেনা। ব্যক্তিগতভাবে সদস্যদের মাসিক ১০ টাকার ন্যুনতম একটা চাঁদা ধরা আছে এবং এই হিসাব যথাযথভাবে মেনটেইন করার জন্য দু’জন সি,এ স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিজেদের কঁধে নিয়ে নিয়েছেন। তারপরও ক্রসচেকের একটা বিধান আছে।

ফেসবুক, টুইটার এর মাধ্যমে প্রেশার গ্রুপের কাযর্ক্রম তুলে ধরা হয়। আপাতত: টেন্ডারবাজী আর নিয়োগবাজী যেখানেই হবে, সেখানেই প্রচন্ড আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে এর পরিসর বাড়বে আস্তে আস্তে। মিডিয়ায় এ-সংক্রান্ত কোন নিউজ এলেই সেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, সেখানে প্রেশার গ্রুপ গঠিত হয়েছে কি-না, দেখা হচ্ছে। না হলে সেখানকার ঠিকাদারবৃন্দ আন্দোলন করতে চান কি-না অথবা পারবেন কি-না, ইত্যাদি বিষয়গুলি বিশ্লেষন করা হচ্ছে। এই কাজে কিছু প্রযূক্তিবিদ আন্তরিকভাবে স্বেচ্ছা-নিয়োজিত আছেন।

মাসখানেক হোল অফিসটার কাযর্ক্রম শুরু হয়েছে। অবশ্য আজিজ আগে থেকেই ব্লগে লিখালিখি করে প্রেশারগ্রুপ সম্পর্কে মানুষকে অবগত করার কাজটি চালিয়ে গেছেন। আজিজ এবং কিছু মানুষ মনে করেন, আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ইত্যাদি সব হবে এসমস্ত স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে জণসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে।

মুখের কথায় কাজ হয়না, মানুষ কাজ দেখতে চায়। কাজ না দেখলে কীভাবে আস্থায় নেবে মানুষ! মানুষের আস্থা এজন্য দরকার যে, একটা শক্তি দৃশ্যমান না হলে সরকার চাপ অনূভব করবেনা, সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাবেনা এবং অন্যায় কাজগুলি সংশোধনও হবেনা।

এক জেলা শহরে পানি উন্নয়ন বোর্ডে ৩ কোটি টাকার টেন্ডারবাজীর ঘটনা প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে দু’দিন আগে। প্রেশার গ্রুপে সিদ্ধান্ত হয়েছে ওখানে আন্দোলন করে প্রেশার গ্রুপের কাজ শুরু করতে হবে। নাইটকোচে ঝন্টুকে নিয়ে রওনা হন আজিজ। প্রেশারগ্রুপ গঠিত হয়েছে উক্ত জেলায় এবং ঠিকাদারবৃন্দও রাজি তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলতে।

ঝন্টুকে ভাল লাগে আজিজের। প্রথম পরিচয়ে কিছু কথার মধ্যে ওর এই কথাটা ভাল লেগেছিল আজিজের যে, আমি রাজনীতি করার মতো রাজনৈতিক কোন মঞ্চ পাইনি আজিজ ভাই। আমি গরীবের ছেলে, কষ্টকর শ্রম করে বড় হয়েছি আমি, কষ্টকর শ্রম করতে দেখেওছি মানুষকে, অন্যায়-অবিচার-অনাচারও দেখেছি। কীভাবে কী হবে এদেশের, তা ভেবে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। সবসময় আমি চাইতাম দু:শাসন-অনাচার-মূক্ত বাংলাদেশ। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাযর্ক্রম দেখে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। আপনার লেখা পড়ে মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। আর এখন আপনি নতুন ধরনের রাজনীতি শুরু করার প্রক্রিয়ায়, খুব ভাল লাগছে আজিজ ভাই।(চলমান)

---

Comments: 7 — https://sonelablog.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a7%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%aa%e0%a6%b0/#comments
