# তৃপ্ত (উপন্যাস-২য় পর্ব) উৎসর্গ- কবি শায়লা হাফিজ কে

- Author: [পাগলা জাঈদ](https://sonelablog.com/author/pagla-jayed/)
- Published: 2013-10-05T08:44:02+00:00
- Updated: 2013-10-05T09:02:34+00:00
- Category: [বিবিধ](https://sonelablog.com/category/misc/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a7%a8%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a4%e0%a6%b8/

---

##### আজকের খাবারে তৃপ্ত বেশ মুশকিলে ছিল, মেনুতে করল্লা ভাঁজি , ওর বাবার মত কেন জানি এই খাবার টা বেশির ভাগ বাঙালীর ই খুব প্রিয় তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, ও করল্লা ভাঁজি দু’চোখে দেখতে পারেনা, আরে বাবা চিরতা খাওয়া যায়, কিন্তু ভাতের সাথে কি করে তিতা জিনিস খাবে ? কিন্তু মামী এত আদর করে করল্লা ভাঁজি টা পাতে উঠিয়ে দিল যে মানা করা তৃপ্ত’র পক্ষে সম্ভব হয়নি। এমন আদর যখন কেউ করে, তখন তাকে মায়ের প্রতিচ্ছবি মনে হয়, আর ওর পক্ষে কোন মা’কে কষ্ট দেয়া সম্ভব নয়। আর ডালটা এত সুস্বাদু ছিল যা বলার নয়, হালকা রসুনের ঘ্রাণ আর আমের টক, ওটাকে যেন অমৃত বানিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সোবাহান মিয়া কথা রাখেনাই, সে ডিম কিনে আনতে ভুলে গেছে, ভুলে গেলেও তৃপ্ত মনে মনে ঠিক করে রাখল এর জন্যে শাস্তি দিতে হবে তাকে।

##### তৃপ্ত পরে আমাকে বলেছিল ” যদি আমেরিকান’রা এমন ডাল ভাত খেতে পারতো অনেক আগে তবে বার্গার বা ফাস্ট ফুড জাতীয় কোন খাবার ইতিহাসে ঠাই পেত না” । ভাগ্যিস পায়নি, আমি আবার তৃপ্ত নই, চিকেন রোল আর মিটলব টা বেশি করে সস দিয়ে আমার বেশ লাগে।আসুন এবার গত রাতের ছবিটা তুলে ধরি আপনাদের কাছে।

খাবার পর দোকানদার মামা বললো,  
-মামা, রাত তো অনেক হল, আজ যদি গরীবের বাড়িতে আপনি থেকে যেতেন। আপনার মামী কাল সকালে চিতই পিঠা বানাবে বলছিল।  
তৃপ্ত বললো,  
-মামা, আমি আপনাকে এমনিতেই বিপদে ফেলে দিলাম। আর কেন কষ্ট করবেন ?  
দোকানি বললো,  
-মামা, আমরা গরীব মানুষ, এইটা ঠিক, কিন্তুক তাই বইলা কি আমগো এমনে লইজ্জা দিবেন ? আমার তো আর খাট পালঙ্কন নাই, চৌকি আছে, আপনের থাকতে কষ্ট ই হইবো, থাউক, চলেন আপনেরে আগাই দেই।  
মনটা খারাপ হয়ে গেল তৃপ্ত’র। না বুঝে ও কষ্ট দিয়ে ফেলেছে গরীব কিন্তু বড় মনের এই মানুষটিকে। ও বললো,  
-মামা, থাকবো, কিন্তু মামী কে ডাকেন, আগে নাস্তার মেনু ঠিক করি।

দোকানী হাসলো, কিছু বললো না, এই কারনেই সে তৃপ্ত কে এত পছন্দ করে। তৃপ্ত আখাউড়াতে আসে ফেন্সিডিল খেতে, সে নেশাখোর, কিন্তু এই মানুষ কে যেভাবে সম্মান করতে জানে সে, তা অনেক সৎ বা শিক্ষিত মানুষ ও পারবে না। ছেলেটা কি চমৎকার ভাবে তার স্ত্রী কে মামি বলে ডাকছে, তার ছেলেটাকে নিয়ে খেললো,এমনকি তার দেড় বছর বয়সী মেয়েটা যখন তৃপ্ত’র কোলে প্রসাব করে দিল, তখন সে বললো “দেখছেন মামা, টুকটুকি আমাকে কি পছন্দ করছে ? আমার কোলে এসেই হিসু করে দিল, বাচ্চারা সবার কোলে হিসু করেনা, যাকে ভালবাসে তার কোলেই হিসু করে”।  
দোকানী চলে গেল তার স্ত্রী কে ডাকতে, আর বিরবির করে বলে চললো “আল্লাহ, আমার ছেলেটা যেন এর মতই হয়” ।

চলছে তৃপ্ত আর মামির কথা,  
-মামী, কাল নাকি চিতই পিঠা বানাবেন ?  
-হুম, হাসের মাংস দিয়া চিতই পিঠা বানামু তর লাইগা (তৃপ্ত মানা করায় সে ওকে “আপনি” সম্মোধন করে না, তুমি সে কাউকেই বলতে পারেনা, তাই সরাসরি তুই)  
-কিন্তু মামী, হাসের মাংস তো চালের গুঁড়ার রুটি দিয়ে মজা, আমি শুটকি ভর্তা ছাড়া চিতই পিঠা খাবোনা, শুটকি ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা আর সরষে ভর্তা। সাথে বেশি করে আদা দিয়ে লাল চা।  
-কস কি ? শুটকি তো ঘরে নাই, আমি আরও তর মামা রে হাঁস জবাই করতে কইলাম, হে কইল বিয়ান রাইতে হাঁস জবাই দিব।  
-আমি’ত এই সব জানিনা মামী, আমার ভর্তাই চাই, ঘুম থেকে উঠবো ১২ টায়, ঊঠে ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠা খাবো, আমার ভাগের গুঁড়ি রেখে দিবা আলাদা করে, আমি চুলোর কাছে বসে খাবো, তুমি ভাজবা আর দিবা, এখন গেলাম ঘুমোতে, একটা বই পড়বো আজ, স্টেশন থেকেই কিনেছি। দেখো তোমার টুকটুকি যেন আবার কোলে হিসু করার জন্যে আমাকে সকালে ঘুম থেকে না জাগায়।

মামীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে তৃপ্ত চললো ঘুমোতে, একটা চৌকি তে দু’ পরতা কাঁথা ফেলে বিছানা করা হয়েছে, দেখেই বোঝা যায় এতে মমতার কি নিপুণ ছোঁয়া লেগে আছে। মোমের আলোতে বই পড়ছে তৃপ্ত। “দি রোড ব্যাক” দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা একটা বিখ্যাত উপন্যাস যা এক সাথে বিশ্বের ২৫ টি ভাষায় মুদ্রিত হয়ে রেকর্ড করেছে। বইটা ভালই, যুদ্ধ ফেরত সৈনিকদের নিয়ে লেখা। খুব আবেগি একটা বই। পড়তে পড়তে তৃপ্ত’র মনে হল, যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কেউ জাঁদরেল একটা উপন্যাস ইংরেজি তে লিখতো তবে এই বইটার লেখক এরিক মারিয়া রিমার্ক লজ্জায় লাল হয়ে যেত তার উপন্যাসের যুদ্ধবাজ সৈনিকদের দুর্বলতা আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন বীরদের লড়াই ও ত্যাগ দেখে। তবে একটা ব্যাপার, তার বইয়ের যুদ্ধ পরবর্তি অবস্থা ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তিকালীন অবস্থার খুব মিল। সে বইয়ে ও যুদ্ধের পর সত্যিকার যোদ্ধা সৈনিক’রা আমরণ অবহেলিত আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর ও আমাদের সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা রা চরম ভাবে অবহেলিত।

ঘুমের এক পর্যায় তৃপ্ত’র হঠাৎ ওর মনে হল ও স্বপ্ন দেখছে, “এক সুন্দরী রমনী তৃপ্ত’র পাশে বসে ঔষধ খেতে গিয়ে ফেলে দিল, ভয়ে ভয়ে ঔষধটা ঊঠাতে গিয়ে ফেলে দিল পানির গ্লাসটাও, ভিজে গেল ওর বুকের এক পাশ” স্বপ্নরা দ্রুত পরিবর্তন হয়, এখানেই তাই হল, তৃপ্ত এখন স্বপ্নে ঐ সুন্দরীর হাত ধরে কোথাও ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একি বুকের কাছটা ভেজা ভাজেই মনে হচ্ছে কেন ? ভেঙ্গে গেল ঘুম, আর উদ্ঘাটিত হল বুকটা ভেজা থাকার রহস্য। টুকটুকি কোন এক ভাবে ঠিক ই ওকে খুঁজে বের করে ওর বুকে উঠে বসেছে আর যথারীতি হিসু ও করেছে। জীবনে এই প্রথম তৃপ্ত ঘুম থেকে উঠে দেখলো একটা বাচ্চা পরী ওর বুকে বসে আছে, দু’হাত দিয়ে পিচ্চিটা কে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,  
– কিরে তোর কি হিসু করার আর কোন যায়গা ছিলনা ?  
কি জানি কি বুঝে টুকটুকি খিলখিল করে হেসে উঠলো ।  
তৃপ্ত বিছানা থেকে নেমে টুকটুকি কে কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো, মামী মামী বলে হাঁক ছেড়ে দিয়ে টুকটুকির সাথে কথা বলায় মগ্ন হয়ে গেল,  
-এই টুকটুকি তুই বড় হয়ে কি হবি রে ? তুই কি একটা ভেবলা টাইপ ছেলে বিয়ে করে সংসারী হবি ? আর সারাদিন তার পিত্তি জ্বালাবি ? নাকি তুই লেখাপড়া করে অনেক বড় কিছু হবি ?  
টুকটুকির তো আর এত বোঝার ক্ষমতা নেই, সে হাসছে আর অবোধ্য কিছু শব্দ করে যাচ্ছে, যার কিছুই তৃপ্ত বুঝতে পারছে না, আবার তৃপ্ত কিছু বলছে আর টুকটুকি হাসছে, কতটা হাঁসি কথা বুঝে আর কতটা কাঁধে চড়ার মজায় তা সৃষ্টি কর্তাই জানেন। ওরা একে অন্যের কথা বুঝতে পারুক আর না পারুক দুজনের প্রতি দুজনের গভীর মমতা ওরা ঠিকই উপলব্ধি করে চলেছে।

---

Comments: 4 — https://sonelablog.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a7%a8%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a4%e0%a6%b8/#comments
