# তৃতীয় শক্তির উত্থানঃ অবশ্যম্ভাবী না অত্যাবশ্যকীয়?

- Author: [একজন আইজুদ্দিন](https://sonelablog.com/author/m-r-zaman/)
- Published: 2014-07-04T14:16:41+00:00
- Updated: 2014-07-05T10:29:29+00:00
- Category: [সমসাময়িক](https://sonelablog.com/category/current_affairs/)
- Tags: রাজনীতি, সমসাময়িক
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%83-%e0%a6%85%e0%a6%ac/

---

মাঝে মধ্যেই রুচি পরিবর্তনের প্রয়োজন হইয়া পড়ে, এ কারনে সেকালে ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধার ও অগ্নিমন্দা থেকে রক্ষা পাইবার আশায় কেউ কেউ বায়ু পরিবর্তনের জন্য দক্ষিণে যাইতেন আর একালের মানুষ তাদের ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করিবার জন্য ডানে ছোটেন, বামে যান, গদি অথবা পয়সার লোভে রীতি-নীতির বালাই নেই যত্রতত্র পাত পাড়িয়া বসেন। ক্ষমতার বায়ু যেদিকে প্রবাহিত হয়, দলে দলে ভগ্নস্বাস্থ্যের রুগিরা সেদিকেই হুড়মুড় করিয়া ঝাঁপিয়া পড়েন। উন্নাসিক শ্রেণীর যে রুগিরা মরিব তবু নড়িব না বলিয়া গাঁট বাঁধিয়া গোঁ ধরিয়া বসিয়া থাকেন, তাহাদের জন্য যে খুব বেশি আফসোস কেউ করে এমনটি খুব কমই শোনা যায়। এসব শ্রেণীর লোকেরা শেষ কালে বাত ব্যাথায় ভুগিয়া মরে, অথবা না পাবার ব্যাথায় কাঁদিতে কোঁকাতে থাকে। সংসারের জন্য বহুত কিছু করিয়া শেষ কালে সবার কাছে অপাংতেয় সাব্যস্ত হইয়াছেন বলিয়া আফসোস করিয়া প্রাণ পাত করেন কিন্তু সংসারের হাল যাহাদের মুঠোর মধ্যে তারা ইহাতে খুব বেশি নজর করেন বলিয়া বোধ হয় না।

 

গনতান্ত্রিকভাবে গঠিত এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ পরিক্রমা অতিবাহিত করে এক সময় একটি সুস্থির দেশের গনতান্ত্রিক অবকাঠামো তৈরি করিতে পারে। মতগত বিভেদ থাকা সত্ত্বেও গনমানুষের লক্ষ্য পুরনের অভিপ্সা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সমুন্নত করনে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি দেশ গঠনে সচেষ্ট হবে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এটাই সর্বজনস্বীকৃত সার্বজনীন দাবী। দেশের মানুষের আকাঙ্খা উপলব্ধি করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেটার পরিস্ফুরন ঘটানো একটা গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য। পাশাপাশি দেশের এবং মানুষের মঙ্গল কামনায় একটা বিরোধী দলের কর্তব্য হল সরকারী কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতা করা। সরকারের একনায়কতন্ত্রসুলভ কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করিতে গিয়া বিরোধী দল যদি স্বৈরাচারী আচরনমুলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হইয়া পড়ে অথবা বেয়াড়া বিরোধীদল আইন-গণতন্ত্রের ধার না ধারিয়া স্বেচ্ছাচারিতামূলক যাচ্ছেতাই করিতে থাকে তখন সেটার ফল যে কিরুপ মারাত্মক ভয়াবহ হইয়া উঠিতে পারে হালে তাহার ভুরি ভুরি প্রমান আমরা হাতেনাতেই পাইয়াছি।

 

দিন দিন মানুষ সরকার এবং বিরোধী পক্ষের এরুপ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড দেখিয়া ক্ষিপ্ত এবং বিভ্রান্ত হইয়া পড়িতেছে। স্বভাবত, একপক্ষের সমর্থন কমিয়া গেলে অন্যপক্ষের সমর্থন বাড়িয়া যাইবার কথা, কিন্তু মোদ্দা কথা হইতেছে এক্ষেত্রে এরুপ ভাব পরিলক্ষিত হইতেছে না বরং স্পষ্ট দেখা যাইতেছে দু’দলের-ই সমর্থন আশঙ্কাজনক হারে কমিয়া যাইতেছে। কাহারো মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাব না খাকিবার কারনে অথবা উভয়-ই দেশের মানুষকে তুর্কি-নাচ নাচাইতেছে ভাবিয়া মানুষ অনেকটা বীতশ্রদ্ধ হইয়া তাহাদের নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লইতেছে। সতকরা হিসেবে তাদের ভাগে যে বরাদ্দ ভোটার ছিল তা তো কমিয়াছেই উপরন্ত ভাসমান যে ভোটাররা ঝোপ বুঝিয়া কোপ মারিবার তালে থাকিতো তাহারাও শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙ্গিয়া প্রকাশ্যে সরকার এবং বিরোধী পক্ষের সমালোচনা করিতেছে। পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করা যায়, সরকার তাহার সমর্থন হারাইতেছে এবং বিরোধীদল তাহাদের আস্থা হারাইতেছে।

 

তাহা হইলে এই জনগনগুলো আস্থা খুঁজিতেছে কোথায়? তাহারা কি তৃতীয় শক্তির উত্থান সম্পর্কে কিছু ভাবিয়া রাখিয়াছে?

 

গনজাগরন মঞ্চ ফ্লপ খাইবার পূর্বে মানুষের মাঝে জাগরনের যে অভূতপূর্ব আলোড়নে সারাদেশ জাগিয়া উঠিয়াছিল তাহা স্তিমিত হইবার কারণ কি? বিবাদমান পক্ষ বিপক্ষের চুলচেরা বিশ্লেষণে ইহার নানা দিক উঠিয়া আসিয়াছে। সত্যমিথ্যার বাছবিচারে না গিয়া সোজা কথায় যাহা বোঝা গিয়াছে তাহা হইলো তাহারা কোন না কোন ভাবে আত্মপ্রচার, স্বার্থশিদ্ধি, দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়ন ইত্যকার নানাবিষয়কে মুখ্য করিয়া আন্দোলন করিয়াছে। সাধারন জনগনের যে বিশাল সমাবেশ তাহা বাঙ্গালীর নাকের ডগায় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং একাত্তরের চেতনা বাস্তবায়নের মুলা ঝুলিয়ে একটা বৃহৎ আন্দোলন ঘনাইয়া তুলিবার চেস্টা মাত্র এবং তাহাদের পারস্পারিক স্বার্থমুলে আঘাত আসিবার পর তাহারা বিবাদে লিপ্ত হইয়াছেন বুঝিতে পারিয়া হতোদ্যম বাঙ্গালীরা পরবর্তীতে তাহাদের নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়াছেন তাহা আজকের মঞ্চের কার্যক্রম লক্ষ্য করিলেই বুঝিয়ে পারা যাইতেছে।তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে সমুহসম্ভাবনা, তাহা সৃষ্টির প্রাক্কালেই ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে।

 

এখনো অনেকেই তৃতীয় শক্তির উত্থানের ব্যপারে ব্যাপক আশাবাদী। আশাবাদী হইবার জন্যও অনেক কারণ রহিয়াছে, তার মধ্যে প্রধান কারণ হইতেছে প্রচলিত দলগুলির প্রতি সাধারন গনমানুষের বিমুখতা। পরিপক্ক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর অভাব, প্রচলিত আইন ব্যবস্থা, ক্ষমতাসীন দলগুলোর ব্যপক লুটপাট, বিরোধীদলের দায়িত্ব পালনে অনিহা ইত্যাদি নানা নিয়ামকের প্রভাবে মানুষ শেষ পর্যন্ত অন্য কোথাও মুখ লুকাতে চাইবেন সেটাই স্বাভাবিক। তৃতীয় শক্তির অঙ্কুরোদগমটাও এভাবেই হইয়া থাকে।

 

মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, ভারতের কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির উত্থান এ দেশের সাধারন মানুষের মনে যে আশার সঞ্চার করিয়াছিল সেটার বিচ্ছুরণ ঘটিয়াছিল গনমানুষের গনজাগরনে। তারা ভাবিতে শুরু করিয়াছিল যে এ দেশেও এ রকম একটি শক্তির উত্থান হইলে হাফ ছাড়িয়া বাঁচা যাইতে পারে। ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই মিশর এবং ভারতে তাহার অসারতা প্রমাণ হইয়াছে, বাংলাদেশে তাহার অসারতা প্রমাণের সুযোগ ঘটিয়া উঠিবার ফুসরতটুকু পায় নাই।

একটি দেশের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব করিবার জন্য হুট করিয়া গজিয়া ওঠা একটি অরাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘকালীন মেয়াদে সুষ্ঠভাবে দেশ পরিচালনা করিতে পারিয়াছে তাহার নজীর নাই। এ ধরনের শক্তি অঙ্কুরোদগমমাত্রই পর্যাপ্ত আলো বাতাসের অভাবে মরিয়া যায়, যদিওবা কোনটা শেষ পর্যন্ত টিকিয়া যায় তবে তাহা কোন কালেই বিশাল বৃক্ষে পরিনত হইবার সুযোগ পায় না, রুগ্ন জঙ্গল রুপে ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া শেষ পর্যন্ত টিকিয়া থাকিবার প্রচেষ্টা করে মাত্র।

 

যাহারা ভাবিয়াছেন, বাংলাদেশে তৃতীয় শক্তির উত্থান কেবল সময়ের ব্যপারমাত্র তাহারা হয় উজবুক শ্রেণির হইবেন নতুবা তাহারা রাজনৈতিক জ্ঞানের বিষয়ে নির্লিপ্ত হইবেন বলিয়াই আশঙ্কা করা যাইতে পারে। ছোট বড় দলগুলোর মধ্য হইতে যদিও বা কাহারো কাহারো ক্ষমতার স্বাদ পাইবার সুযোগ হইতে পারে তথাপিও আনকোরা আনাড়ি কোন লোকের পক্ষে তৃতীয় মোর্চা গঠন করিয়া ক্ষমতায় আরোহণ করিবার প্রত্যাশা শুধু অসম্ভবই নয় অলীক-ও বটে। দেশের বৃহৎ দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করা ছোট ছোট দলগুলোর জন্য টিকিয়া থাকিবার স্বার্থে অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়িয়াছে, তৃতীয় শক্তির আগমনে ইহারাও খুব খুশি হইবেন বলিয়া আশা করা উচিত নয়।

 

এ দেশে কেন, পৃথিবীর কোন দেশেই অরাজনৈতিক তৃতীয় শক্তির উত্থান কাম্য হইতে পারে না। তৃতীয় শক্তির উত্থান বস্তুত একটি দেশের সর্বনাশ ডাকিয়া আনিতে পারে, স্বল্প সময়ের পরিসরে দীর্ঘকালীন অনিরাময়যোগ্য ক্ষতের সৃষ্টি করিতে পারে, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু এবং রাজনৈতিকভাবে খোঁড়া করিয়া দিতে পারে। যাহারা এ দেশের পরীক্ষিত রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শক্তির উত্থানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা মুলত তাদের নিজেদের মৃত্যুক্ষনের-ই অপেক্ষায় থাকেন।

 

শুরু থেকে শেষাবধী এ অপেক্ষা থাকবেই!

---

Comments: 13 — https://sonelablog.com/%e0%a6%a4%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a7%80%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%89%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%83-%e0%a6%85%e0%a6%ac/#comments
