# তাসনুভা আনান শিশির- বাংলাদেশের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার সংবাদ পাঠিকা

Author: তৌহিদুল ইসলাম
Published: 2021-03-06
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%ad%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be/

ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি মাথায় এলেই মাথায় আসে হিজরাদের কথা। বাস, ট্রেন, লঞ্চে ভ্রমণকারী মানুষমাত্রেই নানানরকম নেতিবাচক স্মৃতি ধারণ করে আছেন এই হিজরা জনগোষ্ঠীর মানুষদের সম্পর্কে। তাদের দেখলে অনেকে নাক সিটকাই, মুখ ফিরিয়ে নেই। বোধকরি এর পিছনে মুল কারন হিজরাদের নানান বিরক্তিকর কর্মকাণ্ড। আমি একবার শুনেছিলাম এরাও নাকি সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত হয়ে নানান অপকর্মে লিপ্ত। সত্যমিথ্যা জানিনা, তবে তাদের নেতিবাচক কর্মকান্ডে এমনটা ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক। **অথচ অনেকেই জানিনা হিজরা এবং ট্রান্সজেন্ডার এক নয়।**

এতো গেলো আমাদের কথা। একবার তাদের দিকটাও ভাবুনতো! একজন ছেলে বা মেয়ে যখন নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারছে যে তার ভেতরে বিপরীত লিঙ্গের তীব্র অনুভূতিগুলো দিনকেদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে? পরিবার সমাজ থেকে নানান বঞ্চনা সহ্য করে একসময় তাকে এসবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, একঘরে করা হয় তাকে।

তখন আশ্রয়হীন সেই মানুষটির জায়গা হয় অবহেলিতদের মাঝে। আমাদের কটুদৃষ্টি উপেক্ষা করে না পারে কাজ চাইতে, না পারে হাত পাততে। বাধ্য হয়েই অসহায়ের মতন জীবনযাপনের টাকা উপার্জনের জন্য তাকে নানাবিধ কাজেকর্মে নিজেকে সঁপে দিতে হয়। হ্যা, আমি স্বীকার করছি যে এদের অনেকেই ইচ্ছেকৃত হিজরা সেজে টাকা উপার্জনের পথ বেছে নিয়েছে হয়তো। কিন্তু যারা সত্যিকারের ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি আসলে যে তারাও সব সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত এটা অনস্বীকার্য।

ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের  মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও আবহমান কাল থেকে এ জনগোষ্ঠী অবহেলিত ও অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। সরকার, সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই বর্তমানে এই জনগোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করে চলেছে। তাদের দেয়া হচ্ছে সামাজিক স্বীকৃতি। কর্মসংস্থান করা হচ্ছে, তাদের নিজেদের পরিচয় দেয়া হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রে। সকলের এই সমন্বিত উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা এখনো আমাদের সমাজে আশানুরূপ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এর কারন আমাদের অনেকের নেতিবাচক মনোভাব। এই মনোভাব একদিন নিশ্চয় পরিবর্তিত হবে। আশার কথা হচ্ছে সমাজের অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেরাও নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থান পরিবর্তনে আজ সোচ্চার হচ্ছে। পড়াশুনা করছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করছেন অনেকেই যার অন্যতম জলজ্যান্ত উদাহরণ হলো তাসনুভা আনান শিশির।

তাসনুভার বাড়ি বাগেরহাট। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় থাকা শুরু করেন। বর্তমানে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কর্মরত বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামক একটি এনজিওতে প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন তাসনুভা। এর আগে তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও কাজ করেছেন।

তাসনুভা সমাজকর্ম বিষয়ে এমএ করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে বটতলা থিয়েটার দলের সদস্য। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই নাচতেন তাসনুভা আনান শিশির। সমাজ এবং পরিবারের নানান বঞ্চনাকে পাশ কাটিয়ে যিনি আজ মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছেন।

সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পারলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এই মার্চ মাসেই ‘নারী দিবস’ উদযাপনের প্রাক্কালে তাসনুভা আনান শিশির হচ্ছেন প্রথম একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী যিনি বৈশাখী টিভিতে নিয়মিত খবর পাঠ করবেন। নজিরবিহীন এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করার জন্য আমিও বৈশাখী টেলিভিশন চ্যানেলকে সাধুবাদ জানাই।

সকল প্রতিকুলতা উপেক্ষা করে সকল ট্রান্সজেন্ডার মানুষ একদিন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

\[ছবি- সংগৃহীত\]
