# ঢাকাই সিনেমা: সু-কাল, অকাল, আকাল এবং রাজনীতি (ম্যাগাজিন ২০২২)

Author: তির্থক আহসান রুবেল
Published: 2022-08-04
Category: বিবিধ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a2%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%81-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%85%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%86/

সিনেমার বিরতির সময় ফান্টা আর সেভেন আপের কাচেঁর বোতলে লোহার বাড়ির টুংটাং শব্দ আর বিক্রেতার হাক সেভেন আপ-ফান্টার কথা মনে আছে! মনে কি পড়ে বাদামওলার সেই ডাক, এই বাদাম! সেই বাদামের রাউন্ড ত্রিকোণ ইয়া বড় প্যাকেট। কিন্তু ভেতরে বাদামের পরিমাণ খুবই কম। তা নিয়ে ঝগড়া। মনে পড়ে, হঠাৎ পর্দা ঘোলা হয়ে গেলে চিৎকার, সিটে বাড়ি আর হৈচৈ!

সর্বশেষ কবে পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছেন? কেন যাচ্ছেন না? সিনেমা ভাল না? হলের পরিবেশ ভাল না? আশেপাশে হল নাই? নাকি টিকিটের উচ্চমূল্য!

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/D-2.jpg)

একসময় সিনেমা ছিল বিনোদনের অনেক বড় মাধ্যম। একেকটা সিনেমা মাসের পর মাস ধরেও চলতো। দর্শক রিপিট হতো। সিনেমা হল ঘিরে গড়ে উঠতো বাণিজ্যিক অঙ্গন। এখন এসব শুধুই স্মৃতি। ৩০ বছর আগেও কোটি টাকা বাজেটে সিনেমা হতো। সে সিনেমা ২০/৩০ কোটি টাকা ব্যবসাও করতো। আর এখন মাত্র ১ কোটি টাকার সিনেমা মানে বিলাসীতা। কলকাতার সিনেমা ইন্ডাষ্ট্রি প্রায় দেড় দশক টিকেছিল আমাদের দেশের সিনেমার নির্মাতা, সঙ্গীত পরিচালক থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সহযোগীতায়। আমাদের দেশের হিট সিনেমার রিমেক শুধু না, কলকাতার মৌলিক বহু সিনেমা বানিয়ে দিয়েছে এই দেশের মানুষেরা। এমন কি দক্ষিণ ভারতের সিনেমাও বানাতে এই দেশ থেকে পরিচালক নিয়ে যাওয়া হতো।

সিনেমা হচ্ছে রাজকীয় ব্যবসা। রাজার ভান্ডার যেমন কখনো খালি হয় না, তেমনি সিনেমার প্রযোজকের ভান্ডারও কখনো খালি হয় না। যখন খালি হয়, তখন রাজার রাজত্ব শেষ। তেমনি প্রযোজকও। আমরা সেই রাজভান্ডার থেকে তলানীতে এসে ঠেকেছি আমাদের সিনেমার লোকজনের কারণেই। সিনেমার মারমার কাটকাট ব্যবসার সময় আরো ব্যবসার লোভে বাংলা সিনেমাতে প্রথমে কাটপিস তারপর সরাসরি নায়ক-নায়িকাদের নগ্ন এবং যৌনতার দৃশ্য দেখানো শুরু হয়। গল্পের প্রয়োজনে নয়, শুধুমাত্র দর্শক বিনোদনের জন্য এটা করা হয়। সময়টা ২০০০-২০০৭ সাল। এই সময়টাতে ঢাকাই সিনেমা সু-কাল থেকে অকালে পড়ে যায়। সিনেমা তখন হারায় তার প্রধান শক্তি মহিলা দর্শক। সিনেমা হারায় পারিবারিক দর্শক। যে ব্যাক্তি ৫ টা টিকিট কিনতো একসাথে স্ত্রী-সন্তান সহ সিনেমা দেখতে, সেই ব্যাক্তি তখন শুধুমাত্র সেই দৃশ্যগুলো দেখতে ১ টা টিকিট কেটে গোপনে সিনেমা দেখা শুরু করে। এক সময় প্রযুক্তির কল্যাণে পর্ণ এই দেশে সহজলভ্য হয়ে যায়। ফলে সেই ব্যাক্তিও হলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। সেই যে দর্শক বেরিয়ে গেল, আর ফিরলো না। মাঝেমধ্যে হয়ত দর্শক একটু আধটু ফিরেছে হঠাৎ বৃষ্টি, মনের মাঝে তুমি, শশুরবাড়ি জিন্দাবাদ জাতীয় সিনেমার কল্যাণে। কিন্তু নড়ে যাওয়া ভিত আর শক্ত হয় নি। তার উপর পরপর তিনটা বড় ধাক্কা সালমান শাহ, জসিম এবং মান্নার মৃত্যু সিনেমাকে অভিভাবকহীন করে দেয়।

সে ভয়াবহ সময়টাতে সিনে বাজারে আবির্ভাব ঘটে নতুন কিছু পরিচালক এবং প্রযোজকের। যাদের হাত ধরে আসে কিছু অচেনা-অজানা অভিনেতা-অভিনেত্রী। যারা পর্দায় পুরোপুরি নগ্ন হয়ে যেতো। দৃশ্যগুলোকে আরো ভালগার করতে কাওরান বাজারের এমন কোন সবজি নেই যা পর্দায় আসেনি নায়িকার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ঘষার জন্য। কাওরান বাজারের আলুর আড়ৎদার থেকে মাছের আড়ৎদার সবাই তখন সিনেমায় টাকা ঢালা শুরু করে।

ঢাকাই সিনেমার প্রেম এবং যৌনতার প্রতীক হিসেবে বৃষ্টি ভেজা গান ছিল শুরু থেকেই জমজমাট। বৃষ্টিভেজা নায়ক-নায়িকা ছিল কামনার দেব-দেবী। সেখানে বৃষ্টি ভেজা দৃশ্য সরে গিয়ে আসে বাথরুমের দৃশ্য। এই সিনেমাগুলোর দাপটে মার খেতে থাকে সামাজিক-পারিবারিক-সভ্য নির্মাতাদের সিনেমা। ফলে অনেক নামী-দামী তারকারাও স্রোতে গা ভাসিয়ে সেসব সিনেমাতে নাম লেখানো শুরু করে। অথচ সেদিন যদি রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, আলমগীর, সোহেল রানারা একটিবার প্রতিবাদ জানিয়ে ঘোষণা দিতো যে, এসব চলতে দেয়া যায় না, এসব বন্ধ করো। তারা যদি একটিবার প্রেসক্লাবে দাঁড়াতো, সারা দেশ থেকে কোটি কোটি মানুষ তাদের সাথে অংশ নিতো। কিন্তু তারা নিরাপদ দূরত্বে থেকেছেন। কেউ কেউ দেশের সিনেমাকে পিঠ দেখিয়ে কলকাতার বাজারে নিজেকে বিক্রি করা করেন সে সময়। নূন্যতম দায়বোধ দেখাননি সে সময়ের সুপারস্টার জ্যেষ্ঠ নির্মাতা-কলাকুশলীগণ।

রাজা-বাদশার মতো যে শক্তিশালী প্রযোজক ছিল, তারাও গুটিয়ে গেল। যে ঢাকাই সিনেমা তাদের শতশত কোটি টাকা দিয়েছে, সে সিনেমার সাথে প্রতারণা করে তারাও মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। আর ফিরলো না। ফলে এফডিসি চলে গেল স্থানীয় গুন্ডা-মাস্তানদের হাতে। সন্ধ্যা হলেই এফডিসিতে চলতো অস্ত্রের মহরা। আর রাত ১০ টার পর সেসব দৃশ্য ধারণ। কোন কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী সেসব দৃশ্যে অভিনয় করতে না চাইলে মাথায় পিস্তল পর্যন্ত ঠেকানো হতো। অনেক সময় অভিনেত্রীদের জোর করে মদ খাওয়ানো হতো বা নেশা জাতীয় দ্রব্য। তারপর শুরু হতো সেই শুটিং।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/D-6.jpg)

এবার একটু হিসেব করেন। পুরাতন প্রযোজক চলে গেছেন। চলে গেছেন পুরাতন পরিচালক। হারিয়ে গেছেন সিনিয়র সুপারস্টাররা। সেখানে কারা দখলে এসেছেন! নতুন প্রযোজক, সহকারী পরিচালক থেকে এক রাতে পরিচালক বনে যাওয়া নির্মাতা। অবশ্য ভালভাল সিনেমা বানানো পুরাতন পরিচালকদের একটা অংশও তাতে জড়িয়ে যায়। ফলাফল হচ্ছে: সিনেমা শেষ। দর্শক শেষ। কিন্তু এই যে সাধারণ দর্শক, তাদের তো বিনোদন প্রয়োজন। তাহলে তারা যাবে কোথায়! আর ঠিক, এখানেই শুরু রাজনীতির।

দুম করে সিনেমার উপর এই আঘাতটা আসে নি। এখানে রয়েছে অনেক বড় বৈশ্বিক রাজনীতি। কারণ সিনেমার উপর এই আঘাতটা যখন চলছে, ঠিক তখনই আমাদের বহু বছরের ঐতিহ্য যাত্রাপালার মঞ্চেও শুরু হয় নগ্নতা। এসব না থাকলে দর্শক মঞ্চে ঢিল ছুড়ে। তাহলে আপনি কোথায় যাবেন পরিবার নিয়ে একটু আনন্দ করতে! মাঠে-ময়দানে? দুম করে চোখ ফেরান। সেই সময়টাতেই ব্যাঙের ছাতার মতো আবাসন শুরু হয় মাঠ-ঘাট-নদী দখল করে। ঠিক একই সময় শতশত গানের এ্যলবাম বের হওয়া শুরু করে টাংকি ফুটা, টাংকি ছ্যাদা, জুয়ান একটা মাইয়া ইত্যাদি শিরোনামে। আর এই চরম অস্থির সময়ে চলে আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। জঙ্গী হামলা। দুমদাম বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা হল, যাত্রা, কনসার্ট সহ সকল বিনোদন জমায়েত। অর্থাৎ একটা সময় এবং প্রজন্মকে যতভাবে আনন্দহীন মানসিক হতাশায় প্রবেশ করানো যায় তার সব রকম আয়োজনই সম্পন্ন হয়। বর্তমানে সেই প্রজন্মই কিন্তু দেশ চালাচ্ছে। তাদের বয়স আজ ৩৫-৪৫ বছর। এইবার বিচার করেন গত দশ বছরে দেশের মানুষের এই নৈতিক অবক্ষয়টার গোড়া কোথায়! এখন কেউ যুদ্ধ করে দেশ দখল দেয় না। হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন না হয় প্রজন্মকে মানসিক অবক্ষয়ে করে নিজের রাজত্ব চালায় অন্য দেশে। স্বাধীন এই দেশটি চলছে অনেক অনেক আন্তর্জাতিক অপ-শক্তির মানসিক খেলায়। কারণ দেশ সরকার চালায় না, চালায় জনগণ। জনগণের মানসিকতা একটা দেশকে এগিয়ে নেয় বা পেছনে টেনে ধরে।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/D-5-1.jpg)

যাই হোক, পুরাতন কথায় ফিরি। সিনেমার সেই নগ্নতার সময় হল মালিকরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে প্রযোজকদের কাছ থেকে সেই দৃশ্যগুলো নিয়ে যেতো। সেসব দৃশ্যের জন্য হলে নানান বয়সী পুরুষের ভিড় লেগেই থাকতো। হল মালিক আর প্রযোজকরা শুধু টাকাই কামিয়েছে। কিন্তু হলের সিট-পাখা-টয়লেট এসব নষ্ট হলে তা ঠিক করার প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ সেসবের দরকার নেই। দর্শক এমনিতেই হচ্ছে। এক সময় ঝড় থেমে যায়। পড়ে থাকে ভাঙ্গা সিট, পাখাহীন গুদাম ঘর, নোংরা টয়লেটের একটা বিল্ডিং। পর্ণ ততদিনে সহজলভ্য হওয়ায় সেই নগ্ন দর্শকও আর হলে যায় না। অন্যদিকে দেড় দশক আগে বের হয়ে যাওয়া দর্শকও আর হলে ফিরে না। কারণ অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে। সেই প্রজন্মের বয়স হয়ে গেছে ৪০-৬০ বছর। অন্যদিকে তাদের পরের প্রজন্মের কাছে বাংলা সিনেমা নাক ছিটকানোর জিনিস। দর্শক খরায় সিনেমাহল গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয় মিনি পতিতাপল্লীতে। এখনো টিকে থাকা বেশীরভাগ হলের সাইড ব্যবসা পতিতাবৃত্তি। তাতেও টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে বেশীর ভাগ সিনেমা হল। সেখানে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন। অথচ এই হল থেকেই তারা কোটি কোটি টাকা কামাই করেছে এক সময়। সে দায়বদ্ধতা থেকে ছোট পরিসরে হলেও একটা ফ্লোরকে সিনেমা দেখার জন্য রাখে নি তারা।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/D-3.jpg)

আসলে এই বিষয়টা নিয়ে লিখতে গেলে আরো অনেক কথা লিখতে হবে। তাতে লেখাটির জন্য কমপক্ষে আরো পাঁচ/সাত হাজার শব্দ লাগবে। তাই ছোট করে শুধু স্পর্শ করি কিছু বিষয়।

সিনেমাকে এখন বড়লোকের বিনোদন মাধ্যম হিসেবে বানানো হচ্ছে। সিনেপ্লেক্সে কোনদিন সিনেমার মূল দর্শক খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষরা আসবে না। এমনকি মধ্যবিত্তরাও নিয়মিত আসতে পারবে না অতি উচ্চমূল্যের জন্য। সিনেমার ব্যবসা এবং নাগরিক বিনোদন ফিরিয়ে আনতে হলে প্রচুর পরিমাণ সিংগেল স্ক্রীন প্রস্তুত করতে হবে।৫০/১০০ টাকায় ৭/৮ শ দর্শকের সাথে সিনেমা দেখার যে আনন্দ, তা কোটি টাকাতেও কেউ পাবে না। এর বাইরে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, কয়েক বছর ধরে সিনেমা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবার ধাক্কা খাচ্ছে সিনেমার মানুষের নোংরা রাজনীতির জন্য। তারচেয়েও ভয়াবহ ব্যপার হচ্ছে সিনেমা হল মালিক, বুকিং এজেন্ট আর ডিস্ট্রিবিউটরদের পুকুরচুরি। একটা সিনেমার শতভাগ সঠিক হিসাব সামনে এলে একজন প্রযোজক প্রতি ১০০ টাকায় পায় ৭-১৫ টাকা মাত্র। সিনেপ্লেক্সে কিছু বেশী পায়। সিনেপ্লেক্সে তবু ডিজিটাল টিকিটিং সিস্টেম থাকায় টাকার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু সিঙ্গেল স্ক্রীনে তার কোন হিসাব নাই। আপনি লাখ টাকা খরচ করে সিনেমা হল মালিকদের বিনামূল্যে ডিজিটাল টিকিটিং করে দিলেও তারা সেটা নেবে না। অন্যদিকে মরার উপর খড়ার ঘা হয়ে বিভিন্ন হলে প্রজেক্টর বসিয়ে হল দখল করেছে আরেক দুষ্টুচক্র। তারা সেই প্রজেক্টরের কারণে হলে সিনেমা চালাতে বাধা দেয় ডিস্ট্রিবিউশন না পেলে। তার উপর তাদেরও চাঁদাবাজি আছে টিকিট প্রতি। এমন অসংখ্য বিষয় নিয়ে বিদ্ধস্ত অবস্থায় আছে ঢাকাই সিনেমা। ফেসবুকে বাইরের চাকচিক্য দেখা গেলেও, ভেতরে তা ঘুণে ধরা। আজকের শিক্ষিত তারুণ্য যারা বিদেশী সিনেমা নিয়ে আবেগে ভাসে, তাদের সংখ্যা নেহাত-ই কম নয়। কিন্তু তাদের দেশী সিনেমার জন্য হলে পাওয়া যায় না। তাদের সমর্থনটাও জরুরী। কিন্তু দু:খজনক ব্যপার হচ্ছে, তারা পাইরেসীতে ৬-২২ ইঞ্চি মনিটরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ৭০-৮০ ফুট পর্দার ম্যাজিক তারা পায় নি। আগ্রহীও না। কারণ বাংলা সিনেমা দেখলে জাতে উঠা যাবে না। তবে এটাও সত্য যে, জাতে উঠার মতো সিনেমাও হয়ত সেভাবে হচ্ছে না। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, অনেকে ভাল গল্প, ভাল বাজেট, ভাল ক্যানভাসের সিনেমা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দর্শক এখনো সাড়া দিচ্ছে না। ফলে পরাজিত হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে নতুন প্রযোজকদের।

আরো বহু বহু বিষয় ছিল আলোচনার। আপাতত বাদ দিলাম।

সর্বশেষ দুটো সত্য ঘটনা জানিয়ে এই দীর্ঘ লেখাটার পরিসমাপ্তি টানছি।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/D-4.jpg)

প্রথম ঘটনাটা আনুমানিক ৩০ বছর আগের। একজন নতুন প্রযোজক এসেছেন এক নামী পরিচালকের কাছে। তিনি জানালেন বাজেট কোন সমস্যা না, আপনি সিনেমা বানান। পরিচালক প্রযোজকের কাছে অগ্রীম টাকা চাইলেন। প্রযোজক দুটো বান্ডেল দিলে পরিচালক জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেন। প্রযোজক লাফ দিয়ে উঠে জানতে চান, হায় হায় করছেন কি! পরিচালক বলেন, এটুকু টাকার মায়া ছাড়তে পারছেন না! তাহলে সিনেমায় টাকা ঢালবেন কিভাবে! সিনেমা করতে হলে টাকার মায়া ছাড়তে হবে। এখানে নদীর স্রোতের মতো টাকা যায়। তারপর পরিচালক তার সহকারীকে দিয়ে বাইরে থেকে টাকার বান্ডেল দুটো এনে তাকে ফেরত দিয়ে বলেন: যেদিন টাকার মায়া ছাড়তে পারবেন, সেদিন সিনেমা প্রযোজনা করতে আসবেন।

এবার দ্বিতীয় ঘটনা। আনুমানিক ৩/৪ বছর আগের ঘটনা। মুটামুটি এক নামী এক নায়ক নতুন এক প্রযোজককে ম্যানেজ করেছে তার সিনেমাতে টাকা ঢালতে। ঢাকার এক তারকা হোটেলে খুব নামী এক পরিচালক সহ মিটিং-এর আয়োজন হলো। প্রযোজক সেই পরিচালকের নাম জানেন। তার সিনেমাও দেখেছেন অনেক। কিন্তু সামনাসামনি এই প্রথম। আগেই নায়কের সাথে ঠিক হয়েছে যে, তিনি এক লাখ টাকা এডভান্স করবেন পরিচালককে গল্প তৈরি করার জন্য। যা-ই হোক। তারা পান করতে করতে গল্প করছে। প্রযোজক পরিচালককে দেখে আশাহত হয়েছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব অভাবগ্রস্থ অবস্থায় আছে। তিনি ২ লাখ টাকা পরিচালককে অগ্রীম দেয়ার জন্য মনোস্থির করলেন। কারণ তিনি জানেন সিনেমার অবস্থা ভাল না। অগ্রীম টাকাটা পেলে কাজটা ভালভাবে শুরু হবে। সেই নায়ক দুজনের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে টয়লেটে যায়। এ সময় একটা ঘটনা ঘটে যায়। সেই পরিচালক, প্রযোজককে বলে বসেন: কিছু মনে না করলে আমাকে কি ৫ হাজার টাকা ধার দেয়া যায়! একটু ঝামেলায় আছি, হাত ফাঁকা। প্রযোজক থ মেরে তাকিয়ে থাকলেন। ইতিমধ্যে সেই নায়ক ফেরত এসেছে। এসেই বুঝে ফেলেন যে, কিছু একটা হয়েছে। প্রযোজক উঠে দাঁড়িয়ে বলেন: আমার একটা কাজ আছে। আমি আসি পরে কথা হবে। বলে হাটা দেয়। নায়ক কাছে গিয়ে বলে যে, ভাই এডভান্স! প্রযোজক কিছু না বলে চলে যায়।

পরবর্তীতে সেই ঘটনারা ব্যাখ্যা দুজনই নায়ককে দেয়।

পরিচালক: যে ব্যাক্তি আমার হাতে ৫ হাজার টাকা দেয়ার ভরসা পায় না, সে কোটি টাকার কিভাবে আমার হাতে দেবে! এসব ফকিরনি প্রযোজক নিয়ে সিনেমা হয় নাকি!

প্রযোজক: পরিচালক মানে গড। তার ব্যাক্তিত্ব হবে বিশাল। যে লোক মাত্র ৫ হাজার টাকা ধার চায়, তাকে আমি কোটি টাকা কিভাবে দেই!

পরিসমাপ্তি:

সিনেমা প্রযোজনায় যতদিন শিক্ষিত, সংস্কৃতিপ্রেমী, রাজকীয় লোকজন ফেরত না আসবে, যেমনটা ছিল বাংলা সিনেমার শুরু থেকে। সত্যিকারের জমিদার এবং নবাব পরিবার সিনেমা প্রযোজনায় যুক্ত ছিল। তারপর সেখানে আসে বড় বড় ব্যবসায়ী। ততদিন সিনেমা বাইরে চাকচিক্য রাখলেও ভেতর থাকবে ফাঁপা। দর্শককে সমর্থন দিতে হবে অন্ধের মতো। সাধারণ মানুষের জন্য বেশী বেশী সিঙ্গেল স্ক্রীন বানাতে হবে। আর সিনেমার চুরি ঠেকাতে হল মালিক, ডিস্ট্রিবিউটর, বুকিং এজেন্ট নামক ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। আর হ্যা, অবশ্যই ভাল সিনেমা বানাতে হবে। নতুবা দর্শক হলে এসে প্রতারিত হলে আবার ফিরে যাবে বাড়িতে। আর ভাল সিনেমার জন্য ভাল নির্মাতা, কাহিনীকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী-কলাকুশলী এবং সর্বশেষ পর্যাপ্ত বাজেট লাগবে।

টিকে থাকুক বাংলাদেশী চলচ্চিত্র। সুদিন ফিরে আসুক ঢাকাই সিনেমার।
