# ঠিকানা জেনেভা ক্যাম্প

- Author: [আজিম](https://sonelablog.com/author/azim75107/)
- Published: 2014-09-28T15:57:20+00:00
- Updated: 2014-09-28T15:57:20+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%a0%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%ad%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa/

---

স্কুল ছুটির দিনগুলোতে ছোট্ট শিশু নাজমা ওর বাবার দোকানে আসে। বাবা সেলিম মিয়া লুচি ভাজেন। বাবার লুচি ভাজার গরম তাওয়াটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ও। লুচি ভেজে বাবা রাখতেই নিজের সামনে রাখা কাগজের ঠোঙ্গায় তুলে রাখতে শুরু করে নাজমা। একটা একটা লুচির দুইপ্রান্ত দুই হাতের তালু দ্বারা খুবই আলতোভাবে উঠিয়ে ঠোঙ্গার ওপর ধরে তালু আলগা করে ফেলে ও এবং লুচিগুলো আপনা-আপনিই পড়ে যায় ঠোঙ্গার মধ্যে। এভাবে খরিদ্দারের চাহিদামতো লুচি দিয়ে চলেছে ও।

খরিদ্দার হচ্ছে আশপাশের মানুষ, মহিলাই বেশী। জেনেভা ক্যাম্প এটা। মোহাম্মদপুরের কলেজগেইট এলাকার এই ক্যাম্পের অতি ছোট্ট পরিসরে গাদাগাদি করে বাস করেন প্রায় দশ হাজার মানুষ। এক একটা পরিবারের ৪/৫ জন লোকের জন্য বরাদ্দ মাত্র সর্বোচ্চ ১৫০ হতে ২০০ বর্গফুট স্পেস, একটা বা দু’টা রুম। অতি কষ্টে বাস করেন এই মানুষগুলি। ক্যাম্পের মধ্যেই সকল রকমের নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান। এক পরিবার নাস্তার ব্যবসা করেন, আরেক পরিবার সবজির, রেষ্টুরেন্টের ব্যবসা আরেক পরিবারের। চায়ের দোকান, পান-সিগ্রেটের দোকান করেন আরেকজন, এইরকম।

কী নাই এখানে! মুরগীর নাড়িভুড়ি থেকে ফলসহ সকল প্রকার খাবারের দোকান, ফলমূল, সস্তা কসমেটিকস সবই পাওয়া যায়। ইনারাই ব্যবসায়ী, ক্রেতাও ইনারা। পন্যের বিনিময় সিস্টেম শুধু হয়না এখানে, টাকা দিয়েই সব লেনদেন হয়। প্রত্যেক পরিবারই ব্যবসা করেন এখানে, পন্যও কেনেন এদেরই কারো কাছে।

সেলিম মিয়া বলেন, একাত্তরের আগে মোহাম্মদপুরের অনেক এলাকায় আমাদের বসতবাড়ী ছিল, প্রভাবশালীরা সেগুলি দখল করে নিয়েছে। কাগজপত্র! তা-ও ছিল। তবে কথায় বোঝা গেল, পাকাপোক্ত কাগজপত্র ছিলনা তাদের। যেমন এখনও মোহাম্মদপুরে অনেক বিহারী পোক্ত কাগজের জোরেই নিজের বাড়ীতেই বাস করেন। এই জেনেভা ক্যাম্পের বিহারীদের সন্তানদের লেখাপড়া করা কষ্টকর। ক্যাম্পের ঠিকানা বললে ওদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি নেয়না। এরা তাই আত্মীয়, যারা এখনো মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় থাকেন, তাদের ঠিকানা ব্যবহার করে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করেন।

ঘিঞ্জি পরিবেশে বাস করেন ওরা, সেটা সয়ে গেছে; দারিদ্রতা ওদের নিত্যসিঙ্গী, সেটাও সকলের যখন একই অবস্থা, মেনে নেন অথবা নিয়েছেন ওরা। কিন্তু এদেশটা ওনাদের কী, প্রশ্ন করেন সেলিম মিয়া। বাধ্য হয়েই হোক কিংবা যেকোন কারনেই হোক, থাকেন যখন, তারা এদেশকে তাদেরই মনে করেন। কিন্তু অন্যরা, বাঙ্গালীরা! তারা কী ওনাদের এদেশী ভাবেন? ভাবলেও সেলিম মিয়ারা মনে করেন, ভাবেননা। এখানেই দুঃখ সেলিম মিয়াদের। তাদের একটি দেশ নেই। যেকোন মানুষের এটা একটা বিরাট মর্মবেদনায় জায়গা।

এই বেদনা নিয়েই লুচি ভেজে চলেন সেলিম মিয়া আর গণভবন সরকারী স্কুলের ক্লাস ওয়ানের বুদ্ধিদীপ্ত স্মার্ট ছাত্রী নাজমা তার মতো করে বাবার ভাজা লুচি কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে চলে। একাত্তরে ওর বাবা শিশু ছিল এবং বাঙ্গালীদের সাথে কম মেশার কারনে মর্মবেদনা আছে তার, কিন্তু নাজমারা বাঙ্গালীদের সাথেই তো লেখাপড়া করছে, মিশছে। বাবার মতোই কী একই মর্মবেদনা সেও অনুভব করবে!

---

Comments: 22 — https://sonelablog.com/%e0%a6%a0%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%ad%e0%a6%be-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa/#comments
