# ট্রিবিউট টু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

Author: অপার্থিব
Published: 2015-01-16
Category: খেলাধুলা, বিবিধ, সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%89%e0%a6%9f-%e0%a6%9f%e0%a7%81-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8b/

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর খেলা প্রথম দেখি  স্কুলে পড়াকালীন ২০০৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। কোয়াটার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সে সময়ের ১৮ বছর বয়সী তরুণ রোনালদোর  গতি ও ড্রিবলিং দিয়ে ইংলিশ ডিফেন্ডারদের তটস্থ করার দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভাসে ।  ঘরের মাঠের  ফাইনালে গ্রীসের কাছে হারার পর রোনালদোর সে কি কান্না। মুলত তখন থেকেই রোনালদোর খেলা নিয়মিতই ফলো করি।  এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  রোনালদোর ফুটবল দক্ষতার সাথে সাথে  তার প্রতি মুগ্ধতাও যেন দিন কে দিন বেড়েছে।  ২০১৪ সালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য অতি সম্প্রতি ফিফা ব্যালন ডি ওর জিতেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাই তাকে উৎসর্গ করে আজকের লেখাটি লিখছি।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সালে সালে পর্তুগালের ক্ষুদ্র ও দারিদ্র পীড়িত দীপপুঞ্জ মেদেইরাতে। জনপ্রিয় মার্কিন অভিনেতা ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট  হওয়া রোনাল্ড রিগ্যানের নাম অনুসারে বাবা নাম রেখেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরা। খুব অল্প বয়সেই রোনালদোর ফুটবল প্রতিভার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে মেদেইরা  নামের এই ক্ষুদ্র দীপ পুঞ্জে।  ১২ বছর বয়সেই পর্তুগালের নামকরা ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের স্কাউটদের নজরে পড়ে সে। রোনালদোর  প্রতিভা চিনতে মোটেও ভুল হয়নি লিসবনের  ঝানু স্কাউটদের।  সেখান থেকে তার ঠাই হয় স্পোর্টিং লিসবনের যুব একাডেমীতে। ২০০৩ সালে  স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে সে সময়ের ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড কোচ স্যার অ্যালেক্স ফারগুসনের নজর কাড়েন তিনি । ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের চাপাচাপিতে ঐ বছরই রোনালদোকে দলে ভেড়ান ফারগুসন। মুলত এর পর থেকে রোনালদোর  পেশাদার ক্যারিয়ার পূর্ণ রুপে শুরু হয় । ছয় বছরের ইংল্যান্ড জীবনে  ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের হয়ে  জিতেছেন ৩ টি লীগ, ১ টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ,১ টি  এফ এ কাপ,১টি ক্লাব বিশ্বকাপ সহ আরও কিছু ট্রফি । জিতেছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি ওর।  এছাড়াও  দুইবার  ইংলিশ লীগের সেরা প্লেয়ার নির্বাচিত  হয়েছেন। ৩৮ ম্যাচের ইংলিশ লীগে এক মৌসুমে সর্বচ্চো ৩১ গোলের রেকর্ডের মালিকও তিনি। মাত্র ছয় বছরেই নিজেকে  প্রতিষ্ঠিত করেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে সেরা ফর্মে থাকা অবস্থায় রোনালদোর ক্যারিয়ারে একজন বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটে। তার নাম লিওনেল মেসি। ফুটবল জাদুতে বিশ্বকে সম্মোহিত করতে তারও খুব বেশি সময় লাগেনি। এর পর থেকে মেসি রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন  ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা নুতুন মাত্রা লাভ করে যখন রোনালদো সেসময়ের ট্রান্সফার ফির রেকর্ড গড়ে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখায়। প্রতি সপ্তাহে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার হয়ে রোনালদো ও মেসির  একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াই শুধু ফুটবল বিশ্বকে রোমাঞ্চিত করেনি আমাদের মত সাধারন ফুটবল প্রেমীদের দিয়েছে নির্মল বিনোদন । মেসি সেরা না  রোনালদো তা নিয়ে যে কত তর্ক করেছি তার কোন হিসেব নেই  তবে এটা স্বীকার করতে মোটেও দ্বিধা নেই যে  নিজেদের ফুটবল মান আর পারষ্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কে আরও এক ধাপ উপরে তোলার জন্য মেসি ও রোনালদোর পরষ্পর পরষ্পরকে প্রয়োজন। ২০০৯-২০১২ টানা ৪ বছর মেসি ব্যালন ডি ও জিতেছে। রেকর্ডের পর রেকর্ড করেছে,  ফুটবল বিশ্বকে সম্মোহিত করেছে বাঁ পায়ের মনোমুগ্ধকর যাদুতে কিন্ত এ সময় গুলোতেও রোনালদোও মেসির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত ছিল। প্রায় সমান তালে পাল্লা দিয়ে সেও ম্যাচের পর ম্যাচ গোল করেছে। অনেকেই তাই  ভেবেছিল রোনালদোকে বোধ হয়  সারা জীবন মেসির আড়ালেই পড়ে থাকতে হবে।  কিন্ত রোনালদো তাদেরকে  ভুল প্রমাণ করে ব্যক্তিগত গোলের রেকর্ডে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছনে ফেলে ২০১৩ সালের ব্যালন ডিও জিতে নেয়।  যদিও ঐ বছর রোনালদোর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের শিরোপাহীনতা ও ফিফার ভোট দানের সময় বাড়ানোকে কেন্দ্র করে অনেকেই এটা নিয়ে  বিতর্ক করতে চান কিন্ত স্বয়ং ফিফা যখন বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে ভোটদানের সময় বাড়ানোর পূর্বেও রোনালদো মোট  ভোটে এগিয়ে ছিল তখন আর এ  বিষয়ে তর্ক করা অর্থহীন। আর ২০১৪  সাল ছিল রোনালদোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল বছর।রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে  এ  বছর সে জিতেছে ৪ টি শিরোপা যার মধ্যে আছে বহু আরাধ্যের লা দেসিমা। লা দেসিমা জয়ের পথে ১৭ গোল করে  চ্যাম্পিয়ন্স লীগে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলের নুতুন রেকর্ড গড়েছে রোনালদো।এছাড়াও জিতেছে স্প্যানিশ লীগের সর্বচ্চো  গোলদাতা হিসেবে পিচিচি ট্রফি ও ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট।  চলতি ২০১৪-১৫ মৌসুমেও যথারীতি সে রয়েছে দুর্দান্ত ফর্মে।  যদিও পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে তার সময়টা খুব একটা ভাল কাটেনি কিন্ত মাঝারি মানের একটি দল নিয়ে পর্তুগালের পক্ষে যে খুব বেশী দূর এগোনো সম্ভব হবে না তা টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অনেক ফুটবল বোদ্ধাই অনুমান করেছিলেন। হয়েছেও তাই। ফুটবল একটা দলীয় খেলা। দিন শেষে দলগত সফলতা নির্ভর করে দলগত পারফরম্যান্সের উপর, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পারফরম্যান্সের উপর নয় ।অনেকেই বলেন যে রোনালদো ক্লাব ফুটবলার, জাতীয় দলের হয়ে তাকে খুজে পাওয়া যায় না। কিন্ত রেকর্ড ঘাটলে দেখা যায়  যে জাতীয় দলের হয়ে রোনালদোর রেকর্ড ক্লাবের মত অতটা ঈর্ষনীয়  না হলেও  যথেষ্ট ভাল। ইউসেবিওর মত গ্রেট প্লেয়ারকে ছাড়িয়ে পর্তুগালের সর্বকালের  সর্বচ্চো গোলদাতা এখন রোনালদো । গত বছর ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় (বাছাই পর্ব ও মূলপর্ব মিলিয়ে)  সবচেয়ে বেশী গোলের রেকর্ডও  স্পর্শ করেছে রোনালদো । বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপ মিলিয়ে টানা ছয়টি মেজর টুর্নামেন্টে গোল করার কৃতিত্বও আছে রোনালদোর যা আছে শুধু জার্মানীর  সাবেক প্লেয়ার ইয়ুরগেন  ক্লিন্সম্যানের। হ্যা এটা সত্য যে রোনালদো গত বিশ্ব কাপে খুব একটা ভাল খেলতে পারেনি  কিন্ত সেই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে  রোনালদোর দুর্ভাগ্য যে তার জন্ম ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা  জার্মানি ,ইটালির মত ফুটবল বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ও তুলনামুলক সমৃদ্ধ ফুটবল প্রতিভার দেশগুলোতে হয় নি । এটাই নিয়তি, রোনালদোকে এই নিয়তি মেনেই খেলতে হয় ।

রোনালদোর সম্পর্কে বলা হয় যে সে উদ্ধত , স্বার্থপর । সতীর্থদের বল পাস দেয় না। ,সতীর্থদের গোল উদযাপনেও সে খানিকটা উদাসীন।  এই অভিযোগ গুলোর কিছুটা হলেও যে সত্যতা আছে তা নিয়ে  সন্দেহ নেই।  ক্যারিয়ারের শুরুতে এই জাতীয় সমস্যা রোনালদোর ছিল কিন্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসবের অনেকটাই সে কাটিয়ে উঠেছে। এ মওসুমে সর্বচ্চো গোলের পাশাপাশি সর্বচ্চো এসিষ্টও যে রোনালদোর  এই তথ্যটিই প্রমাণ করে রোনালদোকে আর যাই হোক  এখন আর স্বার্থপর বলা যায় না। আর মাঠের বাইরে প্রাকটিস সেশনের রোনালদো সম্পর্কে  ব্রাজিল ও পর্তুগালের সাবেক কোচ লুইস ফিলিপ স্কলারি বলেছিলেন  কোচিং করার জন্য সেই পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শ খেলোয়াড়। ম্যান ইউয়ের সাবেক কোচ অ্যালেক্স ফাগুরসনও তার আত্বজীবনিতে রোনালদোর প্রশংসা করে লিখেছেন রোনালদোই তার সঙ্গে কাজ করা সেরা খেলোয়াড়। আর একজন মানুষ কেমন তা সবচেয়ে ভাল বলতে পারে তার বন্ধু ও সহকর্মীরা।  কিন্ত দেখা যায় যে ব্যক্তি রোনালদো সম্পর্কে  তার সতীর্থরা সব সময়ই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এ প্রসঙ্গে  রোনালদোর সাবেক টিমমেট জার্মান মিড ফিল্ডার মেসুট ওজিলের উক্তিকে স্মরণ করা যায় “আমি যখন মাদ্রিদে যাই তখন সে মাঠে ও মাঠের বাইরে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। সে মোটেও উদ্ধত নয় বরং মাঠে ও মাঠের বাইরে   অসাধারন একজন  মানুষ।”। শেষ করার আগে রোনালদো সম্পর্কে রিয়াল ও আর্জেন্টাইন গ্রেট আলফ্রেডো ডি ষ্টেফানোর ২০১৩ সালের একটি উক্তিকে স্মরণ করছি। “The Ballon d’Or should go to Cristiano Ronaldo. He’s doing a really good job. He’s a phenomenon, number one, an extraordinary player.

আসছে ২০১৫ সালেও হয়তো  যথারীতি আরো একটি মেসি  রোনালদোর প্রবল দ্বৈরথ দেখতে হবে । যথারীতি এই  দ্বৈরথ নিয়েও পত্রিকায় কলামের পর কলাম লেখা হবে।আমরা সাধারন ফুটবল প্রেমীরা হয়তো ইউনিভার্সিটিতে হলের সামনে  চায়ের আড্ডায়  কিংবা অফিসে বসে তর্কের পর তর্ক জমাব। কখনো কখনো  সেই আলোচনাটি হয়তো  শালীনতার মাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে। তারপর আবারও কোন এল ক্লাসিকোর দিনে সেসব ভুলে গিয়ে নুতুন করে  আলোচনায় মাতবো।আবারও হয়তো জমে উঠবে চায়ের আড্ডা। আশা করি এই আগামী দ্বৈরথও আমাদের মত সাধারন ফুটবল প্রেমীদের নুতুন আনন্দে রোমাঞ্চিত করবে, রাত জাগা গুলোকে করে তুলবে আরও স্বার্থক। জীবনের শত দুঃখ , কষ্ট , বেদনাগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখে হয়তো ক্ষণিকের  সুখের পরশ বয়ে আনবে আমাদের জীবনে । হয়তো এটাই ফুটবল  আর মেসি-রোনালদোর স্বার্থকতা। আগামী বছরের ব্যালন ডি ওর কে জিতবে সে প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতে তোলা থাক । তবে শুধু গত বছরের পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে ব্যালন ডি ওর অবশ্যই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরই প্রাপ্য। অভিনন্দন ক্রিস্টিয়ানো, ফিলিং প্রিভিলেজড টু ওয়াচ ইউ প্লে এভরি টাইম।
