# জীবন মানে গতিময়, স্থিতি নয়।

- Author: [রিতু জাহান](https://sonelablog.com/author/mounata/)
- Published: 2016-08-31T13:47:21+00:00
- Updated: 2016-08-31T16:13:59+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a7%9f/

---

জীবন একটা গতির নাম। গতির মৌলিক ধারা রয়েছে। জন্ম লাভের সাথে সাথে মানুষের জীবন শুরু হয়ে যায়। মানুষ আস্তে আস্তে বড় হয়। তারপর একসময় তাকে জীবনের দায়িত্ব গ্রহন করতে হয়। মানব জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও গতির হিসেব মতে মানুষকে কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। মানুষের জীবন হল সজীব শক্তি, মূল্যবান এক অপার শক্তি। গতিময় জীবনে মানুষ শিশু থেকে ছাত্রজীবন তারপর কর্মজীবন এবং অবসর, মানে বার্ধক্য। মানুষ যখন হাঁটে, তখন তার একটি পা থাকে মাটির সাথে লাগানো আর একটি পা থাকে গতিশীল। স্থিতি ও গতি দুয়ে মিলে চলে বলেই সে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে সমর্থ হয়। যদি শুধু স্থিতি থাকত বা শুধু গতি থাকত তা হলে বারবার চলা সম্পূর্ণ হতে পারত না। শুধু স্থিতি থাকলে মানুষ জড় পদার্থে পরিণত হত। পৃথিবীর এই কর্মমুখর জীবন থেকে মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হত। আর যদি শুধু পা এগিয়ে যেত, হয় হুমড়ি খেয়ে পড়ে হাড় পাঁজর ভাঙত, না হয় পাখির মতো আকাশে উড়ত। অন্তত তখন মানুষ তার ধর্ম হারাত। তাই গতিময় জীবনে মানুষের কর্ম জীবন থেকে অবসর নিতে হয়। কিন্তু এই অবসর মানে একেবারেই স্থিতি নয়। মানুষের জীবনটা বৈচিত্রময় আর জীবনের বৈচিত্র আনতেই এই পেশাগত অবসর। পরিবারের চাকা ঘোরানো এই কর্মব্যস্ত মানুষটি দিনের পর দিন ঝড় তুফান উপেক্ষা করে তার কর্মস্থলে উপস্থিত থেকেছে।পরিবার ও সন্তানকে প্রতিষ্ঠা করতে কেটে গেছে তার কর্মময় জীবনটা। ঘূর্ণায়মান চাকরির নিয়মে অভ্যাসগত এই কর্মময় জীবন থেকে একসময় অবসর নিতে হয়। কিন্তু পরিবার সংসার নিয়ম অনুযায়ী তার গতিময়তা বজায় রাখে। তার আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শেখা সন্তানরাই আজ কর্মব্যস্ত। গতিময় জীবনে হঠাৎ স্থিতি মানে মরণ।কোনো কারণে নিয়মের বেড়াজালে কর্মময় ব্যক্তি যদি তার গতিশীলতা হারিয়ে ফেলে, তবে বিষণ্নতা তাকে গ্রাস করে ফেলে। আর বিষণ্নতা দুশ্চিন্তা থেকেও মারাত্বক ক্ষতিকর। স্রোত বন্ধ হয়ে গেলে নদী তার গতিশীলতা হারায়। তেমনি হঠাৎ গতিহীনতা মানুষকে বিষণ্নতার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। ফলে বার্ধক্যের আগেই সে বার্ধক্যে পৌছে যায়। মানুষের জীবন প্রকৃতির মতোই গতিশীল। আর মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। পরিবারের দুঃখ কষ্ট লাঘব করতে করতে কর্মময় মানুষটি শেষ জীবনে একটা সুন্দর সাজানো জীবন চায়। সেই জীবনে ও সে থাকতে চায় গতিময়। অবসর জীবনে চার দেয়ালে মানুষ আর কতটুকুই বা কর্মমুখর থাকতে পারে। মানুষ আজ শহরমুখী। সন্তান পালন করতে ও চাকরির সূত্র ধরে মানুষ শহরমুখী হয় কিন্তু পিছনে সেই গ্রামে ফিরে যায় না। তারা শহরের চার দেয়ালের ঘরের এক জীবনে অভ্যস্ত হতে শেখে। অবসরের আগে কর্মমুখর থাকতে তার জীবন বৈচিত্র্যময় থাকে। একসময় কর্মমুখর নয়টা পাঁচটা জীবন তার থেমে যায়। চার দেয়াল বিশিষ্ট ঘরে সকালের খবরের কাগজে আর কতটুকুই বা সময় কাটে !সকালের খবরের কাগজ ক্ষনিকের জন্য সময়ের গতিকে চালালেও সারাদিনের গতিশীলতা হারিয়ে স্রোতহীন নদীর মতো জীবনটা অচল অসাড় ও প্রাণশূন্য হয়ে পড়ে। আর এতে সে ভেঙে পড়ে। বিষণ্নতায় ঢেকে যায় তার জীবন। তখন সমস্ত পৃথিবী তার কাছে মনে হয় জঞ্জাল। জীবনটা হয়ে পড়ে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ। নতুন নতুন রোগ, সমস্যা ও বিপত্তির মুখে পড়ে ক্রমাগত অবনতির দিকে ধাবিত হয় তার জীবন। জীবনের এই স্থবিরতা তাকে ক্রমাগত অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেয়।

জাগতিক সব কিছুই এক সময় ফুরিয়ে যায় এটাই নিয়ম। প্রাণবন্ত শরীর সময়ের আগেই জরাগ্রস্ত হলে, বেঁচে থাকার মানেই ফুরিয়ে যায়।সুখের জীবন বলতে প্রাণবন্ত শরীর ও মন দুটোই আমরা বুঝি।

আমাদের সমাজে অনেকেই চিন্তা করে, আমাদের সময়তো শেষ, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য যান্ত্রিক এই শহরের চার দেয়ালের ছোট এক ফ্লাটের মধ্যেই জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। তাই সে চাকরি থেকে অবসরের সময় পাওয়া অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইটের সমন্বয়ে সুবিশাল অট্টালিকার মাঝে ছোট এক ফ্লাটে যেন, তিনি এক কয়েদি। আমার কাছে তখন তাদের এই জীবনটা শিকল পরা বানরের মতো মনে হয়। নাতি নাতনিদের রুটিনমাফিক জীবনে সামান্য সান্নিধ্যে বানরের মতো খেলা দেখিয়েই যেন আনন্দ। আর এই বানরের জীবন কখনোই কাম্য নয়।

আমার অনুভূতি মতে, মেয়েদের থেকে পুরুষরা বেশী অভিমানি। মেয়েরা তার সংসারে একই গতিতে চলে, তাই তার জীবনে অবসর আসে না। জীবনটা তাই তার গতিহীন নয়। তাই সন্তান ও পরিবারের অসংলগ্ন কোনো কথাই তাকে বেশিক্ষণ বিষণ্ন্নতায় আটকাতে পারে না। আর পুরুষরা বয়স হলে একটু অভিমান যেন বেশীই হয়।

আমি তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি উনার অবসরের পর, গ্রামে প্রকৃতির সজীবতার মাঝে থাকব। ছোট একটা বাড়ি, বাড়ির চতুর্পার্শ্বে প্রচুর গাছ, সবজির বাগান থাকবে। থাকবে পুকুর, কবুতর, মুরগী, গরু। সারাদিন উনি এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। সন্ধ্যার পর দুজনে লাইব্রেরী রুমে, সেই প্রথম জীবনের মতো, সমরেশ এর বাবলি বই পড়ে ঝগড়া করব। ইতিহাস নিয়ে দুজনে আলোচনা করব। আমি আমার নাতি নাতনিদের জন্য কবিতা লিখব। রুমের একপাশের দেয়াল জুড়ে থাকবে আমার ছেলেদের ছোটবেলার সব ছবি ও ওদের প্রাপ্তি। আমি আমার নাতিদের জন্য, আমার হাতে যত্নে গড়া সবজি বাগানের নির্ভেজাল সবজি, পুকুরের মাছ পাঠাব। তারা শহর থেকে আমাদের দুই বুড়াবুড়ির এই সবুজ প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে আসবে। ছুটে বেড়াবে সারা মাঠ জুড়ে।

জীবনের এই পরিনত বয়সে আমি, আমরা দুজনে এই একটা সময়ের অপেক্ষায় থাকি। পাওয়া হবে এই আশায় থাকি। জীবন থেকে এক সময় কামনা বাসনা, প্রেম চলে যায়, রয়ে যায় শুধু শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর মায়ার টান। এরই নাম জীবন। সেই ভরাট প্রাণবন্ত জীবে বিষণ্নতা আমার কাম্য নয়। তাই অন্তত শেষ সময়টা পর্যন্ত আমি তার পাশেই থাকতে চাই। জীবন তার গতিমত চলবে, সন্তানরা তাদের মত চলবে। তবে আমরা কেন চার দেয়ালে স্থিতি থাকব! জীবনের শেষ মুহুর্ত আসার আগ পর্যন্ত থাকতে চাই প্রাণবন্ত। যে সন্তানদের সুখের জন্য, জীবনের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে ছোট ছোট ইটের সমন্বয়ে চার দেয়ালের ফ্লাটে বাস করা, সেই নিজেরই ফ্লাটে তখন বাবা মা সন্তানদের কাছে হয়ে যায় বাড়তি ঝামেলা। সন্তানরা বোঝেই না এই চারদেয়ালের এক ঘেয়েমি জীবনটা তাদের অনেকটা রূঢ় করে দেয়। আর এতে সবারই জীবন দুর্বিসহ হয়ে যায়। সম্পর্কে তিক্ততা বাড়ে। পরিবারে নতুন সদস্য ও বেড়ে ওঠে এইসব তিক্ততার মাঝে। ফলে সেই শিশুটির মাঝে তৈরি হয় হিংস্রতা। সন্তানদের উচিৎ বাবা মাকে তাদের আপন ঠিকানায় মুক্ত পরিবেশে রাখা। সেই তার চিরচেনা প্রকৃতির মাঝে। তাদের চারদেয়ালের মাঝে কয়েদখানায় রাখা মোটেও মানবিকতার পরিচয় নয়।

*এই সোনেলায় আমার দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। সবার ভালবাসা ও স্নেহে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। সবাইকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শুভকামনা। *

জিসান ভাইয়ার প্রতি কৃতজ্ঞ আজীবন, কারণ এই যাই লিখি ননা কেন, এমন উৎসাহ কম মানুষই দিতে পারে।

---

Comments: 25 — https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ae%e0%a7%9f-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%a8%e0%a7%9f/#comments
