# জীবন ‘পদ্ম পাতায় শিশিরবিন্দু’

Author: রিমি রুম্মান
Published: 2020-01-18
Category: একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a8/

নিউইয়র্ক নগরীতে সেদিন ছিল মন উদাস করা আবহাওয়া। বাহিরে ফুরফুরে বাতাস। বিশাল স্কুল ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে বইপ্রেমী মানুষের কোলাহল। তিনদিন ব্যাপী বইমেলার শেষ দিন। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পাঠকদের পছন্দের বই কেনার হিড়িক। কখনো পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছি, কখনোবা তাঁদের সাথে ছবি তুলছি। এমনই ব্যস্ত সময়ে ভিড়ভাট্টা ঠেলে এগিয়ে এলেন একজন। আপাদমস্তক কালো বোরখায় আবৃত। চোখ ছাড়া শরীরের আর কোন অংশই দেখা যাচ্ছে না। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ রিমি, ক্যামন আছ ?’ বুকের ভেতরে চমকে উঠার আওয়াজ টের পাই। বহু বহুদিনের চেনা স্বর! কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই কণ্ঠটা এক নিমেষেই চিনে ফেললাম। ঘুরে তাকালাম। বাদামী হাস্যোজ্বল চোখজোড়া আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আবেগে জড়িয়ে ধরলাম একে অপরকে। এক পৃথিবীসম বিস্ময় আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এক পলক মুখের উপর থেকে পর্দা সরালেন। সেই চেনামুখ ! আমার স্কুল জীবনের বন্ধু তাহমিনা! শুনেছিলাম সে মধ্যপ্রাচ্যের কোন এক দেশে থাকে। এতোকাল পর এই শহরে কোথা থেকে এলো! কিছু বলার আগেই বলে উঠলো তাহমিনা, তিনদিনের জন্যে নিউইয়র্ক এসেছে সপরিবারে। রাতেই ফিরতি ফ্লাইট। যে আত্মীয়ের বাসায় উঠেছে, তাঁদের জানিয়ে রেখেছে, নিউইয়র্কে তাঁর ছোট্টবেলার বন্ধু থাকেন, দেখা করা চাই যে করেই হোক। নাম ‘রিমি রুম্মান’। এত বড় শহর, ঠিকানা জানা নেই। তবুও লেখালেখির সাথে সংশ্লিষ্ট বলে বইমেলায় দেখা হতে পারে সেই আশা বুকে নিয়ে আত্মীয়রা নিয়ে এসেছে তাহমিনাকে সপরিবারে। সেই সুবাদে আমাদের দেখা হয়ে গেলো সহজেই। বিস্ময়ে বলে উঠলাম, আমাদের কতো বছর পর দেখা হোল ? তাহমিনার ঝটপট উত্তর, ‘৩১ বছর’। আমার চোখ গোলাকৃতি হোল। কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়লো। অস্ফুটে বলে উঠি, এক-ত্রি-শ বছর ! আমরা আকাশী নীল কামিজ, শাদা সেলোয়ার আর শাদা ভাঁজ করা ওড়না পরা, চুলে দুইবেনি করা অবস্থায় সেই বালিকা বয়সে একই স্কুলে পড়েছি। এরই মাঝে সময় বয়ে গেছে আমার শহরের পাশ দিয়ে বহমান মেঘনার স্রোতধারার মতো। আমাদের সংসার হয়েছে, সন্তানরা বড় হয়েছে। আমরা মধ্যবয়সে উপনীত হয়েছি। সেদিন জনমানুষের কোলাহলের মাঝেও হঠাৎ নৈঃশব্দ্য নেমে আসে যেন ! আচমকা জলোচ্ছ্বাস এসে সমুদ্র তীরবর্তী মানুষের বাড়িঘর তছনছ করে দেয়ার পর যেমন সুনসান নিরবতা নেমে আসে, ঠিক তেমন। আমাদের গলা ভারি হয়ে উঠে। কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। সময় কতো দ্রুত ফুরায়! জীবন এতো সংক্ষিপ্ত! তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিকই বলেছিলেন, ‘হায়! জীবন এতো ছোট কেনে, এ ভুবনে ?’

হ্যাঁ জীবন আসলেই ছোট। নইলে আমার মহল্লার আরেক সমবয়েসি বন্ধু পরপারে চলে গেলো কেন ? প্রবল ভালোবাসার টানে পরিবারের অমতে বিয়ে করেও সুখি হতে পারেনি বলে অভিমানে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিলো ! স্বামীর পরনারীতে আসক্তির বিষয়টি যেদিন জানলো, সেদিন থেকেই বেঁচে থাকার সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেললো বোকা মেয়েটি।। ডায়াবেটিস তো মরণঘ্যাতি রোগ নয় যে, আমার বন্ধুটি দ্রুতই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে ! কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাই হোল। নিজের প্রতি অবহেলা করলো দিনের পর দিন। ফলে ব্লাড সুগার বাড়লো এবং কমলো সীমাহীন গতিতে। কিডনী হারালো কার্যকারিতা, নষ্ট হোল শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও। এবং সহসাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। অথচ এই বয়সে তাঁর সন্তানদের গড়ে তুলবার সময়। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করার সময়। মাতৃজীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগের আগেই ভীষণ এক একাকীত্বকে সঙ্গী করে বিবর্ণ ভাগ্য নিয়ে চলে যেতে হোল আমার বন্ধুটিকে। জানি মৃত্যু অমোঘ। প্রকৃতির নিয়মেই আমাদের আসা-যাওয়া। তবুও কাছের মানুষদের এইসব চলে যাওয়া দেখে ভাবি, জীবন আসলেই ‘পদ্ম পাতায় শিশিরবিন্দু’। খুব ক্ষণস্থায়ী।

যে কারণে এতকিছু লেখা, এবার সেই প্রসঙ্গে আসি। বিভিন্ন সংবাদপত্রে দু’দিন ধরে যে খবরটি পড়ে মন ভারাক্রান্ত হল, ‘ ২৪ বছর পর আমেরিকা প্রবাসী যুবকের দেশে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু’। দীর্ঘদিন বৈধ কাগজপত্র না থাকায় দেশে যাওয়া হয়ে উঠেনি যে ছেলেটির, সে তো গ্রিনকার্ড হাতে পেলে পরম আনন্দে, তুমুল উচ্ছ্বাসে দেশে ফিরতে চাইবে স্বাভাবিকভাবেই। স্বদেশের মাটিতে পা রেখেছিলো দীর্ঘ দুই যুগ পর। বাবা-মা এসেছিল বিমানবন্দরে ছেলেকে সাথে করে নিয়ে যেতে। অতঃপর সপরিবারে ফিরছিল ঢাকা থেকে বিয়ানীবাজারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু হায়, পথিমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় ছেলেটির প্রাণ। তার আর কখনোই ফেরা হবে না চিরচেনা ঘরে। পরিবারটির সকল স্বপ্ন, সাধ ধূলিসাৎ হয়ে যায় মুহূর্তেই।

জীবন এতটাই ঠুনকো, জেনেও আমাদের অন্তহীন আস্ফালন ! আমাদের রিক্ত হস্তে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হতে পারে যে কোনো সময়, জেনেও আমরা একে অপরকে ঠকাতে কুণ্ঠা বোধ করি না। আমাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে খুব বেশি অর্থের পিছনে ছুটতে হয় না। আমাদের আকাশচুম্বী চাওয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা, অর্থই সকল সুখ নয়। সুখ কেবলই নিজের কাছে। বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য তো অর্থ উপার্জন নয়। তবুও আমরা হাপিত্যেশ করি। ক্ষণস্থায়ী জেনেও জীবনকে জটিল, দুর্বোধ্য করে তুলি। অথচ চাইলেই সহজ এই জীবনটিকে আনন্দদায়ক এবং উপভোগ্য করে বেঁচে থাকতে পারি, ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবন কাটাতে পারি। চাইলেই ক্ষণস্থায়ী জীবনে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করে যেতে পারি।

রিমি রুম্মান

কুইন্স, নিউইয়র্ক
