# জীবনের গল্প-৯

Author: নিতাই বাবু
Published: 2020-07-27
Category: স্মৃতিকথা
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a7%af/

[জীবনের গল্প-৮ এখানে](/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a7%ae/)☚

জীবনের গল্প-৮-এর শেষাংশ:☛ বাসায় গিয়ে দেখি মায়ের পরনে সাদা কাপড়। বড় দাদার পরনে সাদা মার্কিন কাপড়। হাতে বগলে কুশান। গলায় সাদা কাপড়ে চিকন দড়ির মতো মালার  সাথে একটা লোহার চাবি ঝুলানো। সেদিনই সেই বেশ আমারও ধরতে হয়েছিল।

বোনের মৃত্যুর পর, আর বাবার মৃত্যুর পর আমার মা একরকম আধ-পাগলের মতো হয়েগিয়েছি। বোন মরা ভাগ্নীটা আমাদের সংসারে থেকে আস্তে আস্তে হাঁটি-হাঁটি পা-পা, করতে লাগলো। আমিও লেখাপড়া বাদ দিয়ে বড় দাদার সাথে সংসারের বোজা ভাগাভাগি করে মাথায় নিয়ে নিয়মিত কাজ করতে ছিলাম। এরমধ্যে কতো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হয়, আসে-যায়! ওইসব  ধর্মীয় উৎসবে মিলের ভেতরে থাকা সমবয়সীরা কতো নতুন নতুন জামা-কাপড় পরে, আনন্দ-উল্লাস করে! কিন্তু আমাকে সবসময়ই থাকতে হয় কাজের ধান্দায়। ঘরে এসে বসে থাকি একমুঠ ভাতে আশায়। এভাবে চলতে চলতে একসময় আদর্শ কটন মিল কর্তৃপক্ষ থেকে ঘোষণা আসলো, মিলের পুরাতন মেশিনপত্র বিক্রি করে মিল আধুনিকায়ন করা হবে। এই ঘোষণার ফলে মিলের সব শ্রমিকরা ছাটাই হয়ে গেলো। শ্রমিকরা চাকরি ছেড়ে যাঁর-যাঁরমতো হিসাব বুঝে নিতে লাগলো। আমার বড় দাদার অবস্থাও আরও দশজনের মতো হলো। কিন্তু তখনো মিল কর্তৃপক্ষ মিলের ভেতর থেকে ফ্যামিলি কোয়ার্টার ছাড়ার কোনও ঘোষণা দিচ্ছিল না। তাই মিল থেকে বড় দাদার হিসাব বুঝে পেলেও, আমরা  মিলের ভেতরেই থাকতে ছিলাম।

তখন মিলের ভেতরে ফ্যামিলি কোয়ার্টারে বাসাভাড়া ছিল না ঠিক, কিন্তু বড় দাদা চাকরি ছিল না বলে সংসারের অভাব আরও বেড়ে গিয়েছিল। বড় দাদা সার্ভিসের যে ক’টা টাকা এককালীন পেয়েছিল, তা সুদের টাকা আর দোকান বাকি দিতে গিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সংসারের বড় বোজাটা তখন আমার মাথার উপরেই ঠেসে বসেছিল। আমি তখনো আদর্শ কটন মিলে ডেইলি কাজে ছিলাম। সেসময় ১২ ঠাকা থেকে দৈনিক মজুরি ১৫ টাকা হয়েছিল। একদিন ঠিক দুপুরের আগে একটা বাঁশের মাচার উপর দাঁড়িয়ে একজন মিস্ত্রিকে টিন উঠিয়ে দিচ্ছিলাম। হঠাৎ বাঁশের মাচা ভেঙে আমার ডান হাতের তালুর একপাশে নতুন টিনের কোণা ঢুকে হাত কেটে যায়। সাথের লোকজন ধরাধরি করে মিলের ভেতরে থাকা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। ডাক্তার প্রথমেই আমার হাতে ৭টা সেলাই করলো। তারপর ব্যথা কমানোর জন্য ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে লোক মারফত বাসায় পাঠিয়ে দেয়। আমার এই অবস্থা দেখে আমার মা জ্ঞানহারা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শুনেছিলাম, আমার জ্ঞান ফেরার পর বৌদির কাছে, বড় বোনের কাছে। সেই হাত এক্সিডেন্টে আমি অন্তত একমাস কাজ করতে পারিনি। তবে এক্সিডেন্ট হওয়ার চার-পাঁচ দিন পর মিলে গিয়ে নিয়মিত হাজিরা দিয়েছিলাম। এর বিনিময়ে মিলের সরদার দয়া করে আমাকে প্রতিদিন অর্ধেক হাজিরা হিসাব করে সপ্তাহের দিন দিয়ে দিতো। ওই নামমাত্র টাকা পেয়ে সাথে সাথে বড় দাদার হাতে দিয়ে দিতাম। বড় দাদা তা দিয়ে নগদ-বাকিতে মিলিয়ে সংসার চালাতেন, আর সারাদিন কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন।

বড় দাদা ঘুরতে ঘুরতে একসময় একটা কাজও পেয়ে গেলেন। কাজ পেয়েছেন আদর্শ কটন মিল ঘেষা মাউরা মিল নামে একটা ছোট কাপড়ের মিলে। সেই মিলে দিনরাত কাজ করে যেই টাকা পেতো, সেই টাকা দিয়েই কোনরকমভাবে সংসার চলতে লাগলো। আমিও আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগলাম। একসময় আমি যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠি, তখন আমার বড় দাদা ওই এক্সিডেন্টের ভয়ে আমাকে আর আদর্শ কটন মিলের ডেইলি কাজে যেতে দিতেন না। দাদার ইচ্ছা আমাকে তাঁর সাথে রেখে কাপড় বুনানোর (তাঁতে) কাজ শেখাবেন। তাই সুস্থ হয়ে দাদার কথামতো প্রতিদিন বড় দাদার সাথে নিকটস্থ মাউরা মিলে যেতাম। দাদার সাথে কাজ শিখতাম।

একদিন হঠাৎ করে বড় দাদার এক বন্ধুর ছেলে মুন্সিগঞ্জ রিকাবি বাজার সংলগ্ন কমালাঘাট থেকে আদর্শ কটন মিলে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে আসে। লোকটার নাম সুনিল। ওই লোক (সুনিল) বড় দাদার সাথে দেখা করে আমাদের সংসারের ভালো-মন্দের খবর নেয়। আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বড় দাদা সব বৃত্তান্ত খুলে বলে। তারপর সুনিল কাকা আমাকে কমলাঘাট একটা বড় বাণিয়া দোকানে চাকরি দিতে পারবে বলে বড় দাদাকে কথা দেয়। সুনিল কাকার কথায় আমার বড় দাদা খুশি হয়ে আমাকে সুনিল কাকার সাথে কমলাঘাট যেতে বলে। আমার ইচ্ছা না থাকা স্বত্বেও বড় দাদার কথায় সুনিল কাকার সাথে আমাকে বানিয়া দোকানে চাকরি করতে কমলাঘাট যেতে হয়।

গেলাম মুন্সিগঞ্জ কমলাঘাট। লাগলাম বাণিয়া দোকানে কর্মচারীর কাজে। খাওয়া-দাওয়া দুপুরে রাতে বাণিয়া দোকানের মালিকের বাসায়। সকালের খাবার দোকানের সাথে থাকা এক মিষ্টির দোকানে। প্রতিদিন নাস্তা বাবদ ১ টাকা। তখনকার সময় কমলাঘাটে থাকা মিষ্টির দোকানগুলোতে একটা পরোটার দাম ছিল চারআনা। পরোটার সাথে ডাল-ভাজিও চারআনা। আমি প্রতিদিন নগদ ১টাকা হাতে পেয়ে দুটো পরোটা আটআনা, আর ডাল অথবা ভাজি নিতাম চারআনার। মোট বারো আনা নাস্তা, আর বাকি থাকা চারআনা দিয়ে আধা প্যাকেট কমলাঘাটের নামকরা হোসেন বিড়ি কিনে নিতাম। রাতে দোকানের দোতালায় ঘুমাতাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা খেয়ে দোকানে থাকতাম। দুপুরের একটু আগে মালিকের বাড়ি থেকে মাথায় করে খাবারের ভাত নিয়ে আসতাম। আবার রাতে দোকান বন্ধ করে মালিক-সহ আমরা আরও দুইজন কর্মচারী মালিকের বাড়িতে যেতাম। রাতের খাবার একসাথে খেয়ে আবার দোকানে এসে ঘুমিয়ে পড়তাম।

কমলাঘাট ওই বাণিয়া দোকানে যে-ক’দিন ছিলাম, খাওয়া-দাওয়ার দিক দিয়ে ভালোভাবেই ছিলাম। কিন্তু মাকিল কিছুর থেকে কিছু হলেই গালমন্দ করতে, বকা-ঝকা করতো। এতে আমার মনটা সবসময় খারাপ হয়ে থাকতো। একদিন সুনিল কাকার সবকিছু খুলে বললাম। আমার কথা শুনে সুনিল কাকা তেলে-বেগুনে জেলে উঠলো। ওইদিনই সুনিল কাকা আমার জন্য আরেক মালিকের সাথে আলাপ করলে। তখন মালিক আমাকে তাঁর দোকানে নিয়ে যেতে বললো। পরদিন সুনিল কাকা আমাকে  ওই দোকানে নিয়ে গেলেন। এই দোকানের কাজ হলো, তেলের টিনে মুখ ঝালাই করার কাজ। এখনে আরও ৮জন কর্মচারী আছে। ওঁরা কেউ লেখাপড়া জানতো না। মালিকও লেখাপড়া জানতেন না। মালিকের নাম জগদীশ বাবু। উনার এক ভাইও এই কাজে মালিকের সাথেই থাকতো। থাকা, খাওয়া-দাওয়ার জন্য বড় এক গোডাউনে মতো দোকানঘর ছিল। আমার সম্বন্ধে সুনিল কাকা থেকে আগেই শুনেছিল, আমি একটু-আধটু লেখা-পড়া জানি। তাই কাজের মালিক আমাকে এখানে রাখতে চায় এবং এ-দিনই তাঁর এখানে চলে আসতে বলে। মালিকের কথা শুনে সুনিল কাকা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমি এখানে থাকবো কি-না?’ আমি সুনিল কাকার কথায় রাজি হলাম। সাথে সাথে সুনিল কাকা আমাকে নিয়ে আগের বাণিয়া দোকানে যায়। বাণিয়া দোকানে গিয়ে দোকান মালিককে জানিয়ে দেয়, ‘নিতাইকে আমি অন্য জায়গায় কাজে লাগিয়ে দিচ্ছি। নিতাই আজ থেকে আর আপনার দোকানে কাজ করবে না।’ এরপর আমাকে তেলের মুখ ঝালাইয়ের মালিকের দোকানে এনে দিয়ে যায়। ওই তেলে মুখ ঝালাইয়ের দোকানে আমি প্রায় মাসেক ছয়মাস কাজ করে একবার জগদীশ দাদাকে বলে-কয়ে ছুটি নিয়ে আমাদের বাসায় আসি।

আদর্শ কটন মিলে আসার পর দেখি আমার সমবয়সীরা আদর্শ কটন মিলে নতুন কন্ট্রাক্টারের আন্ডারে কাজ করছে। তা দেখে আমি আর কমলাঘাট ঝালাই কাজে গেলাম না। আমি সমবয়সীদের সাথে আদর্শ কটন মিলে দৈনিক ১৫ টাকা মজুরিতে কাজ করতে থাকি। তখন আদর্শ কটন মিলের পুরাতন মেশিনপত্র বিক্রির পর নতুন মেশিনপত্র আসতে শুরু করলো। মিলের ডিপার্টমেন্টগুলো নতুন করে মেরামত করার জন্য নতুন করে কাজ শুরু হলো। যেই কন্ট্রাক্টর সাহেব এই কাজ পেয়েছিল, উনার নাম ছিল মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন। আমরা কাজের সাইটে সব লেবাররা তাঁকে বিল্লাল ভাই বলেই ডাকতাম। উনি আমার কাজের খুব প্রশংসা করতেন এবং সব লেবারদের চেয়ে আমাকেই বেশি আদর করতেন। আমি ছিলাম ঢালাই মাল বানানোর জন্য এক্সপার্ট। তাই যেদিন ঢালাই কাজ হতো, সেদিন কন্ট্রাক্টর সাহেব আমাকে হাত খরচ বাবদ ৫-১০ টাকা খুশি হয়ে দিয়ে দিতো। আমিও খুশিতে নিয়মিত প্রতিদিন কাজ করতে লাগলাম।  

একসময় আদর্শ কটন মিল কর্তৃপক্ষ মিলের ফ্যামিলি কোয়ার্টার থেকে সবাইকে বাসা ছেড়ে দিতে বললে, আমরা পড়ে যাই বিপাকে। তখন আমার বড় দাদা শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড় নগর খাঁনপুর এলাকায় বাসা ভাড়া ঠিক করে। এরপর আমরা সপরিবারে আদর্শ কটন মিল থেকে নগর খাঁনপুর ভাড়া বাসায় গিয়ে উঠি। আমি নগর খাঁনপুর থেকে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে আদর্শ কটন মিল ওই বিল্লাল কন্ট্রাক্টরের অধীনে কাজ করতে থাকি। আমার কাজ করার এমন ইচ্ছা দেখে সম্মানিত বিল্লাল কন্ট্রাক্টর সাহেব প্রতিদিন মিলের কাজ শেষে আমাকে চার-পাঁচ টাকা করে গাড়িভাড়া বাবদ দিয়ে দিতো। রোজের মজুরি তো থাকতই। সপ্তাহে কাজ করে যা পেতাম, তা বাসায় এসে মায়ের কাছে, নাহয় বড় দাদার কাছে দিয়ে দিতাম। তারপরও আমাদের সংসার চলছিল না। কারণ আদর্শ কটন মিল থেকে আসার পর বড় দাদার কাজ ছিলো না। তখন আমার মা নগর খাঁনপুর মহল্লায় থাকা এক বাড়িতে রান্না-বান্না করার কাজ নিলো। এর ক’দিন পরই বড় দাদাও নগর খাঁনপুরের সাথেই কিল্লার পুল সংলগ্ন একটা টেক্সটাইল মিলে কাজ জোগাড় করে সেই মিলে কাজ করতে লাগলো। আর আমি কাজ করতে থাকি আদর্শ কটন মিলে বিল্লাল কন্ট্রাক্টরের কাজ।

প্রতিদিন নগর খাঁনপুর থেকে আদর্শ কটন মিলে সকাল-সন্ধ্যা আসা-যাওয়ার মাঝে নগর খাঁনপুর মহল্লার কয়েকজন সমবয়সীদের সাথে পরিচয় হলো। ওঁরা কেউ রিকশা চালক, কেউ ঝালমুড়ি বিক্রেতা, কেউ ভ্যানগাড়ি চালক, কেউ কমলাপুর রেলস্টেশনের চানাচুর বিক্রেতা। একদিন সন্ধ্যাবেলা আমি আদর্শ কটন মিল থেকে নগর খাঁনপুর বাসায় আসছিলাম। আসার পথে রুহিদাস নামে একজন সমবয়সী চানাচুরওয়ালা আমাকে ডাক দিলো, ‘এই শোন!’ আমি ওঁর সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কি ভাই? বলেন, কি বলতে চান!’ আমাকে বললো, ‘তুই কোথায় কাজ করিছ?’ বললাম, ‘নদীর ওপার আদর্শ কটন মিলে।’ আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘কী কাজ?’ বললাম, রাজমিস্ত্রীর যোগালি কাজ।’ আমার কথা শুনে চানাচুর বিক্রেতা রুহিদাস হাসতে লাগলো। ওঁর হাসি দেখে আমার মাথাটা চেন করে গরম হয়ে গেলো। আমি তখন রাগের মাথায় ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাসলেন কেন, ভাই?’ আমার রাগ দেখে ও তখন থতমত হয়ে বললো, ‘আরে না, এমনি হাসলাম! যোগালি কাজ করে কি আর পেটের ভাত জুটবে? এর চেয়ে বরং তুই আমার সাথে চানাচুর বিক্রি কর, ভালো ইনকাম হবে।’ তখন আমার মাথা কিছুটা ঠাণ্ডা হলো! আমি বললাম, ‘চানাচুর বিক্রি করতে কত টাকা চালান লাগে, ভাই?’ চানাচুর বিক্রেতা রুহিদাস বললো, ‘তোর কাছে টাকা না থাকলে, আমি নিজেই তোকে চালান-সহ সবকিছু ঠিকঠাক করে দিবো।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা, বাসায় গিয়ে আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করে নিই।’ এই বলেই চানাচুর বিক্রেতা রুহিদাস থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় এসে মাকে সবকিছু বললাম! মা বললো, ‘তুই যেটা করতে পারবি, সেটাই করবি।’

মায়ের কথা শুনে আবার বাসা থেকে বের হয়ে চানাচুর বিক্রেতা রুহিদাসের খোঁজ নিয়ে ওঁদের বাসায় গেলাম। মায়ের সম্মতির কথা জানালাম। রুহিদাস আমার কথা শুনে বললো, ‘তোর কাছে অল্পকিছু টাকা আছে?’ আমি সত্য কথা বললাম, ‘না!’ আমার কথা শুনে রুহিদাস বললো, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আগামীকাল তোকে চানাচুর বিক্রি করার সবকিছু ঠিক করে দিবো। তুই সকালে আমার সাথে দেখা করবি।’ পরদিন সকালে রুহিদাস আমাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ গেলো। নারায়ণগঞ্জ থেকে একটা টুকরি, ছোট একটা দাঁড়িপাল্লা, ছোট ছোট কয়েকটা বাটখারা, চানাচুর বানানের জন্য একটা পট, বড় সাইজের দুই প্যাকেট চানাচুর, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ছটাকখানি ভিট লবণ, সরিষার তেল, পেঁয়াজ কাটার জন্য ছোট একটা ছুড়ি কিনলো। মোট খরচ হলো, ১০০ টাকার মতো। এরপর দুইজনে আবার বাসায় আসলাম। বাসায় এসে রুহিদাস সবকিছু টুকরিতে সাজালো। এরপর আমাকে রুহিদাস বললো, ‘তুই বাসা থেকে খেয়ে আয়। আসার সময় একটা গামছা নিয়ে আসবি। তারপর আমরা আস্তেধীরে চানাচুর নিয়ে বের হবো।’ আমি বাসায় গেলাম। ভাতা খেলাম। ভাত খেয়ে একটা গামছা কাঁধে ফেলে রুহিদাসের বাসায় আসলাম। তারপর সন্ধ্যার একটু আগে দুইজনে একসাথে চানাচুর সাজানো টুকরি মাথায় নিয়ে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন গেলাম। রুহিদাস রেলস্টেশনে বসে চানাচুর সাজানো টুকরির দুইপাশে ছিদ্র করে গামছা বেঁধে দিয়ে বললো, ‘ট্রেন আসলে তুই এক বগিতে উঠবি। আমি অন্য বগিতে উঠবো। প্রত্যেক স্টেশনে নামবি। ট্রেনের এক বগি থেকে অন্য বগিতে উঠবি। এভাবে ট্রেন যখন কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দুইজন একসাথ হবো।’

একসময় ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে ট্রেন আসলো। যাত্রী ওঠা-নামা করার সময় রেলস্টেশনেই ১০/১২টাকা বিক্রি হয়ে গেলো। ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরিয়ে সামনে লাগানো হলো। আমরা দুইজনে ট্রেনের দুই বগিতে ওঠালাম। রুহিদাস যেভাবে আমাকে বলেছিল, ঠিক সেভাবেই চানাচুর চানাচুর বলে চিল্লাতে চিল্লাতে ট্রেনের বগিতে বগিতে চানাচুর বিক্রি করতে করতে একসময় কমালাপুর গিয়ে পৌঁছলাম। রুহিদাস আর আমি একসাথ হলাম। রাত তখন ৮টার মতো বাজতে লাগলো। কিন্তু তখনও সব চানাচুর শেষ হয়নি। আমদানি করলাম ৬০ টাকার মতো। রুহিদাস বললো, ‘চিন্তা করবি না! ট্রেন আবার নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার সময় সব চানাচুর শেষ হয়ে যাবে।’ এর কিছুক্ষণ পরই আবার ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার ট্রেন ছাড়ার সময় হলো। আমরা দুইজন দুই বগিতে উঠে গেলাম। ট্রেন ছাড়লো। আবার চানাচুর বিক্রি করা শুরু করলাম।

সেদিন চানাচুর বিক্রি হয়েছিল ১২০ টাকার মতো। আমি রুহিদাসকে ১০০ টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু রুহিদাস তখন ওঁর ১০০টাকা ফেরত নেয়নি। রুহিদাস বললো, ‘এই টাকা দিয়ে আগে নিজের চালান করে নে। তারপর আমার টাকা পরিশোধ করবি।’ এরপর থেকে প্রতিদিন নিয়মিত নারায়ণগঞ্জ টু কমলাপুর– কমলাপুর টু নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে আমি চানাচুরওয়ালা সেজে ট্রেনের এই বগি থেকে ওই বগিতে চানাচুর বিক্রি করতে লাগলাম। অনেক সময় সারারাত পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুরে ঘুরে চানাচুর বিক্রি করতাম। এর মাঝেই একদিন আদর্শ কটন মিলে গিয়ে বিল্লাল কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে চার-পাঁচ দিনের পাওনা টাকা নিয়ে আসলাম। রুহিদাসের দেওয়া চালান বাবদ ১০০টাকা ফেরত দিলাম। এভাবে চলতে চলতে একসময় নগর খাঁনপুর মহল্লার সমবয়সী বন্ধু-বান্ধব অনেক হয়ে গিয়েছিল। একসময় চানাচুর বিক্রি বাদ দিলাম। নগর খাঁনপুর মহল্লার সমবয়সীদের সাথে রিকশা চালানো শিখলাম। রিকশা চালানো শিখে নারায়ণগঞ্জ শহরে রিকশা চালাতে শুরু করলাম।

*চলবে…*

[জীবনের গল্প-১০ এখানে](/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a7%a7%e0%a7%a6/) ☚

[জীবনের গল্প-১এখানে](/%e0%a6%9c%e0%a7%80%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-%e0%a7%a7/) ☚
