# জাল (শেষ পর্ব)

Author: দালান জাহান
Published: 2022-06-25
Category: গল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac/

1.  রানুর জ্বর হয়েছে অনেক দিন হলো। ভালো হচ্ছে না। বাজার থেকে নাপা এন্টিবায়োটিক এনে খাওয়ালেও কাজ হয়নি। খুকখুক কাশে সারারাত। লোকজন বলছে করোনা হয়েছে। বাড়ি লকডাউন হয়েছে । কিন্তু সুমঙ্গল লকডাউন বোঝে না। কাছে যাওয়া যাবে না ছোঁয়া যাবে না এসব বোঝে না সে । সে বলে “এতোদিন যে মানুষটা সারাজীবন দুঃখ কষ্টের মধ্যেও কাছে রইলো ; নিজে না খায়া আমারে খাওয়াইলো, আজ তারে ধরা যাইবো না ছোঁয়া যাইবো না! এমন কোন আইন সুমঙ্গল তা মানতে পারে না।”

1.সে রানুর কাছে বসে, মাথায় পানি দেয় শরীর মুছে দেয় ঔষধ খাইয়ে দেয়। রানু বার বার সুবিমলের কথা জিজ্ঞেস করে ” সুবিমলরে কী দেইখা মরতে পারতাম না আমি!  সে না ডাক্তার  অইছে আমার চিকিৎসা সে করবে না! ” সুমঙ্গল কোন উত্তর দেয় না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।  বিছানায় শয্যাশায়ী রানু সুমঙ্গলকে বলে, “একটা কতা কই রাকবা? ” “কও কী কতা কইবা, “তুমি একবার সুমঙ্গলের কাছে যাও!” কিন্তু তার কোন ঠিহানা তো আমার কাছে নাই , ফোন যায় না, কেমনে তারে পাইব। গাড়ি চলে না। কেমনে যাইব?” “তুমি গোসাঁই বাবুর কাছে যাও তার কাছে, সুবিমলের ঠিকানা থাকবার পারে। “

মৃত্যুযাত্রী স্ত্রী’র অনুরোধে সুমঙ্গল গোসাঁইয়ের কাছ থেকে ঠিকানা নেয়, সুবিমল না-কি পাশের জেলা শহরের মেডিক্যালে চাকরি করেন। একটা ভ্যানে করে রওনা হয় সুবিমলের উদ্দেশ্যে। প্যাডেল ঘুরতে ঘুরতে দিন শেষে ঠিকানা জড়ো হয় এক সন্ধ্যার বাড়িতে। কলিং বেল চাপতেই বের হয়ে আসে পাঁচ বছরের এক শিশু। শিশুটি দরজা খোলায়, ডিম পাড়া মুরগীর মতো একটা খকখক শব্দ আগুনে গোলার মতো তেড়ে আসে!  সুমঙ্গল ঘাবড়ে যায়।

আস্তে আস্তে শব্দটি কাছে আসে মানুষের রুপ নেয়। সুমঙ্গল তার চোখের দিকে তাকায়, চোখ কেমন চেনা-চেনা লাগে। নাকটা কেমন  গোসাঁই বাবুর মতো খাঁড়া। তটস্থ মেয়েটি জোর গলায় বলছেন , ” আপনারা কারা? কেন এসেছেন কোথা থেকে এসেছেন?”  আত্মবিশ্বাস হারা মানুষের মতো হয়ে সুমঙ্গল

কথা বলার জন্য একটা বড়ো নিঃশ্বাস নেয় এবং বলেন “আমি সুবিমলের বাবা। সুবিমল কোথায় ? সুবিমলকে একটু ডাইক্কা দিবা?”। আচ্ছা আরেকটা কতা কই! তুমিই  কী সেই মেয়ে! যে ফোন করলেই বলে, সংযোগ নাই!

” না না কী সব বলছেন আপনি ? আমি এসব বলব কেন?”

আমার খুব ক্ষুধা পাইছে সাথে ভ্যান ওয়ালাটাও জেলে পাড়ার।”

“দেখুন এখন মহামারীর সময়, আমি কাউকে খাবার দিতে পারব না।” এই বলে মেয়েটি শিশুটিকে নিয়ে ভেতরের চলে গেলেন। শিশুটি ফিরে ফিরে তাকায়, এই তাকানোর মধ্যে সুমঙ্গল দেখতে পায় জাল থেকে বেরিয়ে যাওয়া মাছের প্রাণান্ত দৌড়।

সুমঙ্গল আবারও ডাক দেয় এবং গলা উঁচিয়ে বলে,  হুন মেয়ে কতাডা হুইন্না যাও “সুবিমল কী বাসায় আছে ? সুবিমলের মা মৃত্যুশয্যায় আছে, সুবিমলকে খুব দেখতে চাইছে।”

” না বাসায় নেই! সুবিমল আসলে আমি জানাব। আপনি এখন চলে যান। এখন মহামারীর সময় কাউকে ঘরে তোলা যাবে না।”

সুমঙ্গল জানেও না সে এমন এক বাতাসের সামনে দাঁড়িয়েছে যে বাতাস মানুষকে উড়িয়ে নিয়ে যায় তুলোর টুকরোর মতো। তার নিস্ফল দুটো চোখ বিফলতার মতো বড়ো ব্যর্থতা নিয়ে আকাশে তাকায়।

ঘন কালো মেঘে তার শুকনো চোখে

ছেড়ে দেয় দু’ফোটা অশ্রু। মেঘের গর্জন আকাশের এই বৈদ্যুতিক হুঙ্কার সুবিমলকে প্রশ্ন করে, তোর কি আমার মতো দুঃখ আছে ?

রাতের শেষ ভাগে  সুমঙ্গল যখন বাড়িতে পৌঁছালো তখন রানুর শ্বাসকষ্ট আরও অনেক বেড়েছে। দুর্ভিক্ষের মতো ক্ষুধার্ত শরীরটা নিয়ে সুমঙ্গল যখন রানুর সামনে দাঁড়ালো, রানু তখন ঘরের দরজার দিকে এক ধ্যানে  তাকিয়ে আছেন। অনেকক্ষণ পর রানু বলেন ,

” সুবিমল কই! সুবিমল আসে নাই গো ? ” সুমঙ্গল চোখ মোছে বলে, “সুমঙ্গল আইতেছে তার একটু দেরি অইব, ডাক্তার মানুষ কতো ব্যস্ত থাহে, আইব তুমি চিন্তা কইরো না, সুবিমল অবশ্যই আইব।”

রানুর শ্বাসকষ্ট এখন চরম পর্যায়ে পৃথিবী শুষে শুষে যেন সে একটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে, যেন তার গলায় গলায় একটা জাহাজ আটকে গেছে। একটা জাল যার ছিদ্রগুলো পৃথিবীর মতো বড় বড় যার সুতো গুলো নিঃশ্বাসে পেঁচিয়ে গেছে। কুয়াশার ভেতর থেকে ওঠে আসছে একটি বিশাল অজগর যার বিষে পৃথিবীর সমস্ত অক্সিজেন জ্বলে পোড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত ফুসফুস আর অশ্রু ভেজা রানুর দু’টো চোখ এখনও দরজায় পড়ে আছে।

জীবন ও মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সুমঙ্গল বলছে, “যে মাছ জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায় , তাকে আর ধরা যায় না রানু, তার জন্য প্রস্তুত থাকে অন্য কারও জাল।”
