# জাতিস্মর…..৫

- Author: [বনলতা সেন](https://sonelablog.com/author/bonolota/)
- Published: 2014-04-26T22:25:21+00:00
- Updated: 2014-04-28T10:29:28+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0-%e0%a7%ab/

---

সই,লতা,

মন খারাপ ভীষণ। কথামত ঢিল ছুড়েছি,শূন্য ফলাফলে।ওদের সাথে দেখা নেই বেশ কয়েকদিন। লাপাত্তা। দিন দু’এক পরে দেখি লাল রঙয়ের গাছের পাতায় নীল কালিতে লেখা একটি চিরকুট ফেলে রেখেছে। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে এসে অপেক্ষা। কিন্তু না,কারও টিকিটির দেখা নেই। বিরক্ত হচ্ছি এমন সময়ে হঠাৎ বুদ্বুদ তারপর ফুস করে প্রথমে অনুসূয়া পরে প্রিয়ংবদা শেষে শকুন্তলা,চোখ ঝলসে দেয়া ঝলমলে রূপ নিয়ে।যেমন তার ঠাট তেমনি বাট। চোখ কপালে নয়,অন্য কোথাও তুলে রাখতে পারলে ভাল হত। প্রথম দেখায় দারুণ এক সুখের অনুভুতি ছুঁয়ে গেল।

ওরা এলো,শুরু হোল আলাপন। এতো অনাদি কালের চেনা জানা আপনজন ! তাদের তিনটি শর্ত,প্রথমে দুটি,এরপর শেষেরটি। প্রথমটি হোল,বনলতা যে দিন এখানে আসবে,হতে পারে তা কাল কিম্বা পরশু বা শতবর্ষ পরে,প্রথমে কোন অজুহাত ছাড়াই তাদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়,কিছুতেই মুখপুরি কচুখেকো কাদাখেকো শাঁকচুন্নি বনপরী ও ফুলপড়ীদের সাথে সারাক্ষণ থাকা যাবে না,যাবে না। মাখমাখি গলাগলি বন্ধ পুরোপুরি। তথাস্তু বললাম সময় না নিয়েই। আকাশছোঁয়া ভালোবাসার পূর্ণগ্রহণের বাকী নেই কিছুই। গপ-সপ শুরু হলে গেল,মজা করে। আমি প্রায় শ্রোতা বনে গেলাম।ওদের হাসি আনন্দের তোরে ভেসে চলতে চলতে অবাক হয়ে লক্ষ্য করি,অনুসূয়া শুধুই হাসে,তাও প্রায় নিঃশব্দে , রা শব্দটি মুখে নেই। একটু পরে পরে শকুন্তলার কানের কাছে মুখ এগিয়ে কী যেন বলে আমাকে দেখিয়ে,তখন হাসিটি হয় আরও একটু বিস্তৃত,শকুন্তলা মুখে কিছু বলে না,শুধু চোখে চোখে হাসে। খুব ন্যাওটা হয়েছে ওটা।শকুন্তলা কথা বলে খুব কম।ছোট ছোট বাক্যে।অবাক করা মজার বিষয় হল,কথা শুনলে মনে হবে বাক্যে কয়টি শব্দ থাকবে ও শব্দে কয়টি করে অক্ষর থাকবে তা যেন আগে থেকেই মাপ-ঝোপ করে ঠিক করে রাখা।শব্দ বাক্য গুলো এমন সুন্দর মনোমুগ্ধকর ও ভারী যে কেউ আঁজলা ভরে তুলে নিতে পারবে,কথাদের গায়ে হাত বুলিয় আদর করে দিতে পারবে,এমনকি তুলে নিয়ে আঁচলে বেঁধে রাখতে চাইলেও সমস্যা নেই।একটি কথায় থাকে হাজার বলা ও না বলা কথা। কথা বলে এমন করে,অবলীলায়।একটু হাসলে আলো ছড়িয়ে মুক্তো ঝরায় দশ দিকে। প্রিয়ংবদা কথা বলে কবিতায়,গানের সুরে।কথা শুরু হলে সমস্ত সৃষ্টি যেন ওর কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে,হাসলে সব গাছ ফুলে ফুলে রং ছড়ায়।কাঁদলে সৃষ্টির সব কিছু যেন ডুকরে ওঠে।হাসি আনন্দের কথায় সময় বয়ে যায় বয়ে যায়,আবার বলতে শুরু করে প্রিয়ংবদা এবারে……………………………..

“মা,জননী মোদের,তোমাকেই খুঁজেছি হাজার বছর,এই দৃশ্যমান অদৃশ্য ব্রহ্মাণ্ডের নক্ষত্র মাঝে,ছায়া পথের শেষ প্রান্তেও,শুধু পূর্ণশশীতে নয় পূর্ণা তিথিতেও।অপেক্ষায় রয়েছি এই সবুজ সরোবরের সরোরুহর মাঝে,তুমি আসবে বলে,এই দেখ স্বর্গপাখির ডিম রেখেছি পুঁটুলি ভরে তোমায় দেব বলে, বড় অনিঃশেষ যন্ত্রণা তৃষ্ণার্ত এ বুকে,পানি চাই,এক ফোটা পানি চাই,যন্ত্রণা নেভানোর ছলে,দেবে না?দেবে না? মা,মা ……………………………….’

আমার কান্না পেল,বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল। নিজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে যুগ যুগ ধরে কাঁদতে থাকলাম। সম্বিত ফিরলে শেষ কথা রেশ কানে এলো “মা,কথা দাও কথা দাও,যাবে না আমাদের ছেড়ে নক্ষত্র ছুঁয়ে ঐ ছায়া পথের দূর দেশে,কখনও না।”

চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি চোখজলে শকুন্তলা অনুসূয়া প্রিয়ংবদা আমাকে জড়িয়ে তাকিয়ে আছে  
মুখপানে । প্রিয়ংবদা বলে-“মা,তোমাকে কহলীল জিবরান থেকে একটি কবিতা শোনাই।”  
‘শোনাও শোনাও,বাছা আমার’। আমি বলি ।

“‘এটা আমার ও যে কোনো মানুষের জন্য ভাল হত  
যদি আমি নারী মঠে প্রবেশ করতাম।’  
‘তুমি যেহেতু নারীমঠে প্রবেশ করেছিলে  
সেহেতু আমার পৃথিবীতে আসা উচিত হয়নি,’আমি বলেছিলাম ।  
‘প্রিয় পুত্র,তোমার জন্মের আগে থেকেই  
নির্ধারিত হয়েছিল,’তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ।  
‘হ্যা,কিন্তু পৃথিবীতে আসার বহু আগেই,মা হিসাবে  
আমি তোমাকে পছন্দ করেছিলাম’,আমি বললাম ।  
‘তোমার জন্ম না হলে তুমি স্বর্গে থাকতে  
দেবদূত হয়ে।’  
‘কিন্তু এখনও আমি দেবদূত’। আমি উত্তর দেই।  
তিনি হাসেন এবং বলেন, ‘তোমার পাখা কই?’  
আমি তার হাত ধরে আমার কাঁধে রেখে  
বলেছিলাম, ‘এখানে।’  
তিনি বলেছিলেন, ‘ওগুলি ভাঙা ।'”

(এখানে এই কবিতায় ছেলে ও মায়ের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে,যেখানে ছেলে চেয়েছিল তার মা যেন নানের জীবন বেছে নেন,কিন্তু মা তা হন-নি।)

সুস্থ ও ধাতস্থ হয়ে জানতে চাইলাম শেষ শর্ত। সমস্বরে উত্তর ‘তিন জনকে এখন এই মুহুর্তে কোলে নিতে হবে’। বলেছিলাম ‘তিন জনকে কী করে একসাথে কোলে নেব’ ?একজন একজন করে তিন জনকেই বুকে তুলে নিয়েছিলাম পরম যত্নে । আচ্ছা বলতো লতা ‘কাকে প্রথম,দ্বিতীয় ও শেষে কোলে তুলে নিয়েছিলাম?’

তোকে এক্ষুণি চলে আশার জন্য জোর তাগাদা দিচ্ছিনে। ভালো থাকিস সারাবেলা ।

ইতি  
নাছরিন,শকুন্তলাদের কাছ থেকে।

এ চিঠির কোন উত্তর হয় না,হবেও না,চেষ্টাও নেব না।  
তবে অনুমান করে বলুন-তো,’নাছরিন- প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয়কে কাকে কাকে কোলে তুলেছিল’ ?

আজান শেষে  দূরে ভেসে আসছে সূরা আর রহ্‌মান তেলাওয়াতের সুমধুর সুর,সৈয়দ সাদাকাত আলীর-ই তো বলেই মনে হচ্ছে। নাছরিনের রেখে যাওয়া অনেক অনুসূক্ষ্ম মানবিক কর্মকাণ্ড এখনও বাকী পড়ে আছে ।  
যেতে হবে ।

=================================================

প্রহেলিকাকে বলেছিলাম ‘জাগ জাগ জননী………… ‘লেখায় তুলে আনব।আমার ভাঙা কলম তার কিছুই তুলে ধরতে পারেনি,পারবেও না।তবে ,’জননী’ এর একটি রূপ তুলে ধরার ব্যর্থ প্রচেষ্টা নিলাম জান-প্রাণ ঢেলে দিয়ে। কিন্তু হায়! ঈশ্বর সামান্যতম আড়াল না নিয়ে প্রকাশ্যেই ফিক করে নয় আকর্ণ হেসে ফেলেছেন আমারই ব্যর্থতায়।(বোধ করি ঈশ্বরের কাজ-কর্মের খুবই অভাব ইদানিং)

=================================================

বলে-কয়ে সুনির্দিষ্ট ভাবেই নিলাম লেখা বিরতি কিছু কালের জন্য , চিরস্থায়ীত্বটুকু বাদ রেখে।  
পাঠক হয়ে থাকব এই এখানেই। শুভেচ্ছা সবাইকে।

---

Comments: 55 — https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0-%e0%a7%ab/#comments
