# জন্ম যাদের আজন্ম পাপ

Author: পুষ্পিতা আনন্দিতা
Published: 2021-08-08
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%aa/

শিয়ালী আমার মামাবাড়ি, আমার মায়ের জন্ম ওই গ্রামে, আমার ছোটবেলার বছরগুলোর বড় একটা সময় ওই গ্রামে কেটেছে। আজকে সকালে মানে বাংলাদেশ আগস্ট ৭ তারিখ রাতে ফেসবুকে দেখি সেই গ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে, মন্দির ভাঙা হয়েছে, নারী পুরুষ আহত হয়েছে, মুসলিমরা হিন্দু গ্রামে এসে হামলা করেছে। আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। বারবার নামটা দেখছি গ্রামের। এরপর আতংকিত হয়ে মাসতুতো ভাইকে কল দিলাম। ২০০৭ এরপর আমি আর শিয়ালী যাইনি। দাদু মারা গেছে মা একটা বোন, মায়ের বেশিরভাগ ভাই বোন আত্মীয় ওখানে আর নেই। তাই শিয়ালী যাওয়া হয়না তেমন। ভাইটারে কল দিয়ে যখন শুনলাম ফেসবুকে দেখা ছবিটা সত্যি তখন প্রথম কথা আমার মুখে দিয়ে যেটা বের হলো তোদের গ্রামে তো কোনো মুসলমান ছিলো না তাহলে তারা হামলা করলো কিভাবে! ইয়েস গ্রামটা একেবারে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম। যেখানে হামলার কথা হচ্ছে সেটাও গ্রামের একেবারে মাঝামাঝি। আমার মাথায় এলো না এই গ্রামে কিভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা হয় ?

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/08/B571BC6B-47A1-48C1-B2CA-72B88552F9BB.jpeg)

এরপর ভাই যেটা বলল তার মর্মার্থ হলো গ্রামের শুরুতে বাজারের পাশে তিন চার ঘর মুসলিম পরিবার আছে আর একটা মসজিদও আছে। এরপর নদী সেই নদী পার হলে তবে মুসলিম গ্রাম। শিয়ালীর শ্মশান যেখানে সেখানে যেতে হয় মসজিদের সামনে দিয়ে। আর কয়েকদিন ধরে ওরা সকালে নামকীর্তন করতে বের হয়। শ্মশানে গিয়ে শেষ করে। মসজিদের সামনে দিয়ে যেতে হয়। শনিবারও করতে গেছিলো তখন মসজিদের থেকে তাদের কীর্তন না করতে বলা হয়। যারা কীর্তন করছিলো তারা শোনেনি। এরপর কথা কাটাকাটি হয়েছে। যার ফলাফল এই হামলা। শিয়ালী গ্রামের শেষে ওই কয়েক ঘর মুসলিম আর নদীর ওইপাড়ের শেখপুরা আর আনন্দনগরের মুসলিমরা লাঠি সড়কি দা নিয়ে হামলা করে। তারা বাজারের দিক থেকে আসেনি যেহেতু বাজারে পুলিশ ফাঁড়ি আছে। তারা ঘুরে বিল দিয়ে উল্টা পাশের পূর্বপাড়া দিয়ে হামলা করে। কীর্তনের সামনে যে ছিলো তার বাড়ি আর গ্রামের মন্দিরগুলো মূল লক্ষ্য ছিলো এরপর রাস্তায় যতো দোকান ফার্মেসি পেয়েছে সব ভেঙেছে। গ্রামে শীতলা দূর্গা মন্দিরসহ বেশ কয়েকটা মন্দির ছিলো। মেরে ফেলবে মনে করে আমার এক দাদার বাড়ি যাচ্ছিলো তার আগেই পুলিশ এসেছে। হামলার আরেকটা বড় কারণ শ্মশানের পাশের অনেকটা খালি জমি দখলের ফন্দি একটা ঝামেলা করে।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/08/B5A35158-A28B-409A-8AD9-6C72E14C21FE.jpeg)

আমার ২য় যে প্রশ্ন ছিলো তা হলো তোরা কি করলি? তোদের গ্রামে ঢুকে চলে এলো! ও বলল দিদি এতো লোক একসাথে এসেছে। দুইশত লোকের সামনে দাঁড়াতে ৫০ জন তো লাগে। সবাই যার যার বাড়ি ছিলো। একসাথে হবার আগেই এই হামলা। পরে ভাবলাম ঠিকই তো! দুই পাঁচজন সামনে গেলে তো মারা যেতো। পরে অবশ্য ছেলেরা এক হয়ে প্রতিবাদ করতে গেছে তখন আবার পুলিশ বাঁধা দিয়েছে। আমার ভাইটা ইন্টার্ন করছে মেডিকেলে। ও আমাকে বলল দিদি আমার মন ভেঙে গেছে আমি আর এই দেশে থাকব না! আমি বললাম আমার কাছে চলে আয়। বিশ্বাস করেন আমি খুশি হইছি। কোনো সংখ্যালঘু ছেলেমেয়ে দেশ ছাড়লে আমি খুশি হই। ভাবি একটা পরিবার বেঁচে গেলো। যখন রাষ্ট্র বসে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রশ্রয় দেয় তখন তাদের আর কিছু বলার থাকে না। নামেই সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার দিয়েছে।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/08/63279659-C153-4473-B64D-7CC82F2F9FF6.jpeg)

আগে যখন কোথাও এমন হামলা হতো আমি নিজের বাড়ির কথা ভাবতাম যে আমার মা বোন নিরাপদ আছে। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় আছে অন্তত ঘরবাড়িতে হামলার ভয় নেই। এখন জানি আমি বোকার স্বর্গে বাস করছি। কোনোখানেই আমরা নিরাপদ না। আইন রাষ্ট্র সব বিপক্ষে গেলে কোথাও আমাদের কিছু করার থাকে না। একটা সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার হয়না। যার জন্য ঝুমন দাস আজও জেলে থাকে, অথচ হামলাকারীরা  জামিন পায়। কাদের যেন পোস্ট দেখলাম ঝুমন জেলে নিরাপদ আছে। সিরিয়াসলি? আরে পুরো দেশই তো জেল আমাদের জন্য। এমন নিরাপদ আমরা থাকতে চাইনা। ঝুমনদের বের করে দেন। আমার ভাইয়ের মতো যারা বিদেশে আসতে পারবে চলে আসুক। আর যারা পারবে না সেই ৪৭ থেকে তারা যেখানে যাচ্ছে সেখানেই যাবে। পা চাটা হিন্দু যারা তাদেরও সময় আসবে। আমারে কেউ ভারতের দালাল বললে, সাম্প্রদায়িক বললে আমার কিছু যায় আসে না। দিনের পর দিন তোমাদের অবিচার, মালা..ন গালি আমাকে সাম্প্রদায়িক বানিয়ে দিয়েছে। আমি হিন্দুদের ফাইট করে মরতে বলিনা। দেশকে ভালবাসার দায় তাদের একার না, দেশেরও দায়িত্ব ছিলো।  একটা দেশের পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়ে তারা বাঁচবে না, হয় কনভার্টেড হতে হবে নইলে মরতে হবে।  বরং অন্তত নিজের ভবিষৎ প্রজন্মের কথা ভেবে হলেও পালাতে বলি। মনটা খারাপ খুব, আমার মা কাঁদছে সকাল থেকে।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/08/2446AAB0-BFC7-45C6-8C90-EA24AF2FFD05.jpeg)

\==========

পুস্পিতা আনন্দিতা

নিউইয়র্ক
