# ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা এবং অতঃপর

Author: শাহানা আক্তার
Published: 2017-05-28
Category: একান্ত অনুভূতি, বিবিধ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%9b%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%98%e0%a6%9f%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%ac%e0%a6%82-%e0%a6%85/

ঘটনাটি গত কুরবানি ঈদের পরেরদিনের ঘটনা। ড্রাইভার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছে। সেদিন আবার ধানমন্ডিতে আপুর বাসায় দাওয়াত। আমার বাসা মিরপুরে, তাই ঠিক করেছি সিএনজি নিয়েই যাবো। কিন্তু আমার বড় ছেলে সৌমিক বলছে সে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে। যদিও আরও কয়েক বছর আগেই সে ড্রাইভিং শিখেছে, লাইসেন্সও নিতে চেয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু আমরা ইচ্ছে করেই লাইসেন্স নিয়ে দেইনি। লাইসেন্স পেলে আর থামিয়ে রাখা যাবেনা তাই এটাসেটা বলে আটকে রেখেছি। ১৮ বছর হবার আগে যখন রাস্তায় গাড়ি চালাতে চাইতো তখন বলেছি ১৮ বছর হবার পর লাইসেন্স নিয়ে দিবো তখন চালাতে পারবা। এরপর যখন ১৮ বছর হলো তখন থেকেই বলে আসছি দাঁড়াও আমিওতো লাইসেন্স নিবো তখন দুজন একসাথেই নিবো,এসব বলে বলে সময় পার করেছি শুধু। যাইহোক, সৌমিক ড্রাইভ করবে শুনে আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিনা। সে আমাকে আস্বস্ত করছে যে ওর কোন বন্ধু নাকি বলেছে যেহেতু ঈদের সময় যানবাহন কম থাকে তাই ঈদের সময় লাইসেন্স চেক করেনা, শুধু একটু দেখেশুনে ড্রাইভ করলেই হলো। ওর বাবাও লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দিতে রাজি নয়, তবুও ওর জোরালো আবদারে শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম, তাও অনেক ভয়ে। কবিরের(বাচ্চাদের বাবা) বাইরে কাজ থাকায় সে যায়নি, আমরা চারজন আল্লাহর নাম নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছি। সৌমিক একটু স্পীডেই গাড়ি চালায় এটা আমি জানি তাই গাড়ি স্টার্ট দেয়ার সাথে সাথেই বলে দিয়েছি বাবা সাবধানে আস্তে আস্তে যেও কিন্তু। এরপর যেতে যেতে সারাটা রাস্তা আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে আর ওকে সাবধান করতে করতে গিয়েছি। আল্লাহর রহমতে শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই গিয়ে পৌঁছালাম। সারাদিন আপুর বাসায় কাটিয়ে সন্ধ্যার পর এবার নিজের বাসায় ফেরার পালা। আবারো সেই একই অবস্থা, পুরোটা রাস্তা সাবধান করা আস্তে যাও, আস্তে যাও, এই করতে করতে বিজয় স্মরণীর সিগন্যাল পার হলাম…দেখলাম খুব ফাঁকা রাস্তা শুধু এক দুইটা লোকাল বাস আর দুই একটা ব্যাক্তিগত গাড়ি তাই আর কিছু বলছিনা, এই সুযোগে সে তার ইচ্ছেমত স্পীডে রোলার কোষ্টারের মতো করে এঁকেবেঁকে সামনের সব গাড়ি এবং বাস গুলোকে ওভারটেক করে গিয়ে থামলো আগারগাঁওয়ের সিগন্যালে! রুদ্ধশ্বাসে কেবল দেখে গেলাম! সিগন্যালে গাড়ি থামানোর পর নিঃশ্বাসটা কেবলমাত্র ভালোভাবে নিলাম আর ওমনি পেছন থেকে একটা বাস এসে গাড়ির ডান সাইডের দরজায় লাগিয়ে দিলো। আমরা সবাই জোরে একটা ঝাঁকুনি খেলাম। সামনেই ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়ানো। গাড়ির কি ক্ষতি হয়েছে সে চিন্তা মাথায় নেই, মাথায় শুধু একটাই চিন্তা সৌমিকের লাইসেন্স নেই। এখন যদি কোনো ঝামেলা করতে যাই তখন যদি ট্রাফিক পুলিশ এসে লাইসেন্স চায় তখন উল্টো আমরাই বিপদে পড়ে যাবো। এই ভাবনা থেকেই কিছু না করে চুপচাপ সেখান থেকে চলে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু যেহেতু সৌমিকের কোনো দোষ ছিলোনা তাই সৌমিক ক্ষতিপূরণ না নিয়ে সেখান থেকে আসতে রাজি নয়। এখন কি করি, পড়ে গেলাম বিপদে। ওর বাবাকে জানালাম, ওর বাবাও বললো ঝামেলা করার দরকার নেই চলে এসো, তবুও সৌমিক আসতে রাজি নয়। ওদিকে বাস ভর্তি পেসেঞ্জার নিয়ে বাস দাঁড়িয়ে আছে, যেতে পারছেনা কারন বাসের সামনেই আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে। বাসের লোকজন ক্ষেপে গেলে বাস ড্রাইভার বিপদে পড়ে যাবে তাই কন্ডাক্টার দ্রুত নেমে এসে বললো আপা আপনারা যা বলবেন আমরা তাই করবো বলেন আপা কি করবো? আমি বুঝতে পারছিনা কি বলবো কারন আমার কোনো ধারনা নেই। তাই আবারো কবিরকে ফোন করলাম…সেও কিছু বলতে পারছেনা যেহেতু সে দেখেনি কতটা ক্ষতি হয়েছে। তখন সে বললো আন্দাজ করে একটা কিছু বলে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে এসো। ওদিকে কন্ডাক্টার বার বার তাড়া দিচ্ছে আপা তাড়াতাড়ি বলেন।আমার মনে হলো এটা ঠিক করতে হয়তোবা পাঁচ হাজার টাকার মতো লাগতে পারে। আমি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দেয়ার কথা বলতে যাবো অমনি সৌমিক কন্ডাক্টারকে বলে বসলো পাঁচশো টাকা দিতে পারবেন? ওর কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম, বললাম তুমি এটা কি বললা, মাত্র পাঁচশো টাকা!! ওদিকে কন্ডাক্টার ওর কথা শুনে তড়িঘড়ি করে পাঁচশো টাকা বের করে ওর হাতে দিতে দিতে বলছে ভাইতো গাড়ি চালায়, ভাই জানে এটা ঠিক করতে পাঁচশো টাকাই লাগবে।হাহাহা আমি মনে মনে বলি হ্যাঁ ভাই ভালোই গাড়ি চালায় তাইতো পাঁচশো টাকা দিতে বলেছে। যাইহোক শেষে সৌমিককে বললাম তুমি পাঁচশো টাকা দিয়ে কি করবা তার থেকে না নেয়াইতো ভালো ছিলো। ও বললো তাহলে কি ফেরত দিয়ে দিবো? আমি বললাম হ্যাঁ দিয়ে দাও। তখন উৎসুক জনতার মাঝখান থেকে কেউ একজন বলে উঠলো আপা টাকাটা ফেরত দিয়ে দেন, গরীব মানুষ মাফ করে দেন। ইচ্ছা করছিলো ওই জনতারে কষিয়ে দুইটা থাপ্পড় দেই,ওরা উল্টাপাল্টা গাড়ি চালিয়ে এক্সিডেন্ট করবে, মানুষ মারবে আর গরীব মানুষ বলে আমরা ওদেরকে মাফ করে দিবো, কি সুন্দর কথা!!! সেইসময় কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইনি বলে চলে এসেছিলাম। আসতে আসতে সৌমিককে জিজ্ঞেস করলাম, যেখানে ওরা যেকোন পরিমাণ ক্ষতিপূরন দিতে রাজি ছিলো সেখানে তুমি মাত্র পাঁচশো টাকা কেন দিতে বলেছো!? সে জানালো সে নাকি একবার দেখেছে একটা ছোট বাস অন্য একটা বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলেছিলো তখন তাদেরকে মাত্র একশো টাকা জরিমানা দিতে বলেছে সেটাই নাকি ওরা দিতে রাজি হয়নি এই নিয়ে মারামারি পর্যন্ত হয়ে গেছে, তাই সে ভেবেছে পাঁচশো টাকাই অনেক বেশি টাকা, এই টাকাই হয়তো দিতে রাজি হবেনা। বাচ্চাদের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টাকা পয়সা দিলে ওদের বিপথে যাবার সম্ভাবনা বেশি থাকে এরকম একটা ধারনা থেকেই খুব হিসেব করেই ওদের হাতে টাকা পয়সা দেই যাতে প্রয়োজনের বাইরে উল্টাপাল্টা খরচ করতে না পারে, আসলে এটা হচ্ছে তারই ফল। ওর কাছে আসলে পাঁচশো টাকাই হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকার সমান। এদিকে সেই টাকা ফেরত দিয়েছি শুনে ওর বাবা বলেছে টাকাটা নিয়ে কোনো ভিক্ষুককে দিলেওতো হতো তবুওতো সেই ড্রাইভারের অন্তত একটু শিক্ষা হতো। এরপর থেকে সে একটু সাবধানে চালাতো।
