# গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টায় মরিয়া একটি গোষ্ঠী

Author: মাহবুবুল আলম
Published: 2019-10-26
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a6%ac-%e0%a6%9b%e0%a7%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%87-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%bf%e0%a6%95/

**মাহবুবুল আলম //  
**

পরিকল্পিতভাবে কোন সংখ্যালঘু ব্যক্তির নামে ফেসবুকে ধর্ম বা মহানবীর (সাঃ) অবমাননার গুজব ছড়িয়ে জনতাকে উস্কানি দিয়ে বার বার সাম্প্রদায়িক হামলার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে দেশের চিহ্নিত একটি মহল । বিএনপি ও তার মিত্র শক্তি পেছনে থাকলেও প্রকাশ্যেই সামনে থেকে নেতৃত্বে জামায়াত, হেফাজতসহ মৌলবাদীরা। প্রতিবারই গুজবের বিষয়টি প্রমাণিত হলেও অবস্থার অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। উস্কানি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোতে কাজ করছে এরা। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা সাঈদীর বিচারের পর তাকে চাঁ দেখা গেছে বলে গুজব ছড়িয়ে দেশে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এর পরেই কক্সবাজারের রামুর কলঙ্কিত অধ্যায়ের ধারাবাহিকতায় নীলনক্সা অনুযায়ীই চলছে নাশকতা। টার্গেট হিন্দু, বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘু পরিবার ও উপাসনালয়। যথারীতি এবারো একই কৌশলে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করে সংখ্যালঘুর নাম দিয়ে গুজব ছড়িয়ে তা-ব চালানো হয়েছে ভোলার বোরহানউদ্দিনে।

এবারও ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় সংখ্যালঘু যুবক বিপ্লবের হ্যাক করা ফেসবুকের একটি মেসেজকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতার ব্যানারে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছে। বর্বর তা-বে যোগ দেয় স্থানীয় কিছু শার্ট, জিন্সপ্যান্ট পরা যুবক। তারা লাঠিসোটা নিয়ে মসজিদের দোতলায় হামলা চালায়। এমনকি গুলি করার জন্য ছাত্রদলের এক নেতাকেও উস্কানি দিতে দেখা যায়। সভামঞ্চে জামায়াতের এক নেতা পর্যন্ত ছিল বলেও বলছেন স্থানীয়রা। হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হলেও এখনও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তৌহিদী জনতার প্রতিবাদের নামে তান্ডব ও পুলিশের এ্যাকশনের ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজসহ অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ভোলার ঘটনায় বিপ্লব চন্দ্র শুভ’র নিজের নাম ও ছবি সম্বলিত ফেসবুক আইডি Biplob Chandra Shvuo থেকে আল্লাহ তায়ালা ও নাবী করিম (স) কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ গালাগাল করে তার কয়েকজন ফেসবুক বন্ধুর কাছে মেসেজ করে। এক পর্যায় কয়েকটি আইডি থেকে মেসেজগুলোর স্ক্রিন শর্ট নিয়ে ফেসবুকে ভাইরাল করা হলে বিষয়টি   সকলের নজরে আসে। এ অবস্থায় সন্ধ্যার পর বিপ্লব চন্দ্র বোরহানউদ্দিন থানায় আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে জিডি করতে আসলে থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিপ্লব চন্দ্রকে তাদের হেফাজতে রাখেন। বিপ্লব চন্দ্র শুভ বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের চন্দ্র মোহন বৈদ্দের ছেলে। সে ডিগ্রী পাস করেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে বোরহানউদ্দিনের কুঞ্জেরহাট বাজারে সর্বস্তরের মুসলিম তাওহিদী জনতার ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়েছে এবং থানার সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে তাওহিদী জনতা। এ ঘটনার সত্যতা যাচাই করে বিপ্লব চন্দ্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। রাতে পুলিশের সঙ্গে সমঝোতা মুসল্লিদের বৈঠক হয় এবং সোমবার সকালে সমাবেশ না করার জন্য অনুরোধ করা হয়। তার পরও পুলিশের অনুরোধকে উপেক্ষা করে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় মুসল্লিদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ মুসল্লি নিহত হয়। নিহতরা হচ্ছে মাহফুজ পাটওয়ারী, মিজান, শাহিন, মাহবুব। এদের মধ্যে মিজানের বাড়ি মনপুরা উপজেলায় এবং অন্য ৩ জনের বাড়ি বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। এদিকে ২ সাংবাদিক, ২০ পুলিশসহ ২ শতাধিক লোক আহত হয়েছে।

২০ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে বোরহানউদ্দিনে সংখ্যালঘু সম্প্র্রদায়ের এক যুবকের বিচারের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে এক কিশোরসহ চারজন নিহত হন। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে ১০ পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হন। সকাল ১১টার দিকে উপজেলা সদরের বোরহানউদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে উত্তেজিত জনতা বোরহানউদ্দিন বাজারে ভাওয়ালবাড়ির একটি মন্দির ও সাতটি ঘর ভাঙচুর করে। পুলিশ বলছে, বিপ্লব নামের ওই যুবকের হ্যাক হওয়া আইডি থেকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনা থেকে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

ফেসবুকে সোশাল ভূয়া খবর বা ফেইক নিউজের মাধ্যমে অনেক দেশেই সাম্প্রদায়িক হামলা, দাঙ্গা, হত্যা এমন অনেক কিছুর জন্য দায়ী ফেইসবুকে বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া ভুয়া খবর। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যার উৎস ফেইসবুকে কোন মন্তব্য অথবা ছবি। কিন্তু পরে সেসব ছবি বা মন্তব্যের সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাই বাংলাদেশে বেশি ঘটেছে। আর বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে একই রকম ছকে।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জেলা কক্সবাজার জেলার রামুতে হঠাৎ শোনা গেলো সেখানকার একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়ুয়া নামে কোন এক বৌদ্ধ তরুণের ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম, ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কোরআন অথবা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে এমন খবর বেশ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছিলো। সেদিন রামু উপজেলার চৌমোহোনি মোড়ে একটি মিছিল ও সমাবেশ হয়েছিলো। স্থানীয় রাজনীতিবিদরা তাতে বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মিছিল শেষমেশ গড়িয়েছিল সাম্প্রদায়িক হামলা পর্যন্ত। সেসময় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকটি দল ১৯ টি বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। বৌদ্ধদের প্রচুর বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছিলো। সবচাইতে বেশি আক্রান্ত হয়েছিলো কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার বৌদ্ধ পল্লী। উখিয়া ও টেকনাফেও এই ঘটনার কিছুটা রেশ ছড়িয়ে পড়েছিলো। কিন্তু ঐ ঘটনার কোন বিচার হয়নি।

এর পরের ঘটনা ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর। সেখানে সেদিন যে হামলাটি হয়েছিলো তাও ঘটেছিলো একই কায়দায়, ভূয়া গুজবের কারণে। ফেইসবুকে কথিত একটি ইসলাম বিদ্বেষী ছবি পোস্ট করার অভিযোগে নাসিরনগরে হিন্দুদের অন্তত ৫টি মন্দির ও বহু বাড়িঘর ভাংচুর করা হয়েছিলো। আর এই ঘটনায় সামনে এসেছিলো রসরাজ নামের এক ব্যাক্তির নাম। তবে ঘটনার সূত্রপাত হামলার দুদিন আগে। নাসিরনগর থেকে বারো কিলোমিটার মতো দুরে হরিপুর নামের একটি গ্রামে এক হিন্দু যুবক রসরাজ দাস। তার নামে একটি ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে যে ছবি প্রকাশের অভিযোগ উঠেছিলো তা সেখানকার গ্রামবাসীকে ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। অভিযোগ ছিল মুসলমানদের কাবা ঘরের সঙ্গে হিন্দুদের দেবতা শিবের একটি ছবি জুড়ে দিয়েছিলেন রসরাজ।

স্থানীয় লোকজন সেদিনই রসরাজ দাসকে ধরে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছিলো। তার বিরুদ্ধে পরদিনই মামলা করে তাকে চালানও দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তবুও থেমে যায়নি বিষয়টি। সেদিন একাধিক স্থানীয় ইসলামপন্থী সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করেছিলো। হঠাৎ করেই ক্ষুব্ধ জনতা যেন সংঘবদ্ধ হয়ে উঠলো এবং নাসিনগরের হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করা শুরু করলো। প্রথম দিনই আটটি হিন্দু পাড়ায় অন্তত তিনশোটি বাড়ি-ঘর, মন্দির, দেব-দেবীর মূর্তি ভাংচুর করা হয়। ভাঙচুর হয় রসরাজের বাড়িও। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নভেম্বরের চার তারিখ আরেক দফা হামলা হয় নাসিরনগরের হিন্দুদের উপরে।

ঘটনার আড়াই মাস পর জামিনে বের হয়েছিলেন পেশায় জেলে রসরাজ। বের হয়ে তিনি বলেছিলেন তিনি ফেইসবুক চালাতে জানেন না। পাসওয়ার্ড কাকে বলে সেনিয়েও তার কোন ধারনা নেই। যে পোস্টটিকে ঘিরে এত ঘটনা সেটিও পরে আর পাওয়া যায়নি। নাসিরনগরে ঐ হামলার ঘটনায় মোট আটটি মামলা হয়েছিলো। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, সেগুলোর একটিতে শুধুমাত্র অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। একটি মামলার তদন্ত করছে গোয়েন্দা বিভাগ। আর বাকি ছয়টির তদন্ত করছে নাসিরনগর থানার পুলিশ।

 নাসিরনগরে হামলার ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১৭ সালের নভেম্বরের ১০ তারিখ রংপুরের গঙ্গাচড়ার ঘটনাটি গড়িয়েছিল গুলি ও একজনের মৃত্যু পর্যন্ত। আবারো ফেইসবুকের ছড়ানো খবরই এই ঘটনার সূত্রপাত। আর এক্ষেত্রেও এক হিন্দু যুবকের ফেইসবুক থেকে ইসলামের নবীকে অবমাননার অভিযোগে স্থানীয়ভাবে দানাবাঁধা ক্ষোভ থেকে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছিলো। সেসময় পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন, টিটু রায় নামে যে ব্যক্তির ফেইসবুক পোষ্ট ঘিরে এই ঘটনা সেই টিটু রায়ের বাড়ি গঙ্গাচড়ায় হলেও তিনি নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন। গঙ্গাচড়ার অবশ্য সেসময় কয়েকদিন ধরে গ্রামে মাইকিং হয়েছে। ঘটনার দিন একটি মানববন্ধন শেষে হঠাৎ করে আশপাশের গ্রাম থেকে শতশত মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেছিলো। তারপর মিছিল আকারে হিন্দু-পাড়ায় গিয়ে হামলা করা হয়েছিলো। পুলিশের গুলিতে সেদিন একজন নিহত হয়। গঙ্গাচড়ায় দুটো মামলা হয়েছিলো। রংপুর সদরে হয়েছিলো একটি মামলা। যে টিটু রায়ের বিরুদ্ধে অবমাননার অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে সেসময় যে মামলাটি দায়ের করা হয়ে সেটিতে চার্জশীট দেয়ার পর গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি। তবে তিনি এখন জামিনে রয়েছেন। খুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় গঙ্গাচড়া থানায় করা একটি মামলা ও রংপুর সদরে আরেকটি মামলায় শীঘ্রই চার্জশীট দেয়া হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।

 **২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে নিহতের সংখ্যা বিতর্ক** এই দৃশ্য সম্ভবত অনেকেরই মনে আছে। ২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকার শাপলা চত্বরে জড়ো হয়েছেন কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার সমর্থক। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার অভিযোগে বেশ কজন ব্লগারের বিরুদ্ধে কর্মসূচীর অংশ হিসেবে সেদিন তাদের ঢাকা অবরোধ ছিল। ভোর থেকে ঢাকার প্রবেশপথগুলো দখলে নিয়েছিলো হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা। এক পর্যায়ে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিলো হাজার হাজার মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক। টিভির পর্দায় সেদিন যে দৃশ্য আলোড়ন তুলেছিল তা হল শাপলা চত্বর, পল্টন মোড় থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের চারপাশের রাস্তায় আশপাশে নানা ভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের দৃশ্য। সেদিন শাপলা চত্বর রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিলো। পরদিন ভোর নাগাদ পুরো মতিঝিল এলাকাকে মনে হয়েছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি অঞ্চল। কিন্তু ৫ই মে দিবাগত রাতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চালানো পুলিশি অভিযানে মৃতের সংখ্যা আসলে কত ছিল সেনিয়ে সেসময় নানারকম দাবি উঠেছিলো। ছড়িয়েছিল নানা ধরনের গুজব। সারারাত জুড়ে নানা ধরনের ফেইসবুক পোস্ট চোখে পড়ছিল। যেখানে দাবি করা হয়েছিলো আড়াই হাজারের মতো নিহত হওয়ার। শাপলা চত্বর ট্রাজেডি বলে নানা রকমের খবর বের হয়েছিলো সারারাত জুড়ে। তখন ফেইসবুকে নানা খবরে গণহত্যার দাবি তোলা হচ্ছিলো। ট্রাকে করে মরদেহ গুম করার অভিযোগ উঠেছিলো। আর সেই সাথে নানারকম ছবি ছড়িয়েছিল ফেইসবুকে।

এর পরের ঘটনা মাত্র বছর দেড় আগের। সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে নানা গুজব এবছর জুলাই মাসের শেষে ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা আর এরপর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে সরকারের এক মন্ত্রীর করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকার স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এরপর এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সকাল সন্ধ্যা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। মিছিল করেছেন, স্লোগান দিয়েছেন।,রাস্তায় বের হওয়া সকল গাড়ি ও চালকের কাগজপত্র যাচাই করা থেকে শুরু করে সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে গেছেন দিনভর। কিশোরদের আন্দোলনে রীতিমতো বিব্রত হয়ে উঠেছিলো সরকার। এক পর্যায়ে এসে আন্দোলনকারী কিশোর কিশোরীরা হামলার শিকার হয়েছেন। হামলার অভিযোগ উঠেছে সরকারি দলের সমর্থকদের দিকে। শেষের দিকে এসে ফেইসবুকে এই আন্দোলনকে ঘিরে নানা খবর ও ভিডিও ভাইরাল হয়ে উঠছিল। পিস্তল হাতে যুবকরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করছেন সেই ছবি যেমন ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে, তেমনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মেরে ফেলো হচ্ছে, ছাত্রীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে এমন দাবী করা কিছু ফেসবুক পোষ্টও ফেইসবুক লাইভ ভাইরাল হয়েছে। সেসময় গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বাংলাদেশের আলোকচিত্রি শহিদুল আলম তার বিরুদ্ধে তখন মিথ্যা প্রচার, উস্কানি দেয়াসহ একাধিক অভিযোগ আনে সরকার। আরেকজন ছিল মডেল ও অভিনেত্রী নওশাবা। ছাত্ররা যেদিন হামলার শিকার হয়েছিলেন, নওশাবা সেদিনই ফেইসবুকে একটি লাইভ করেছিলেন। যাতে তিনি আন্দোলনরত ছাত্রদের মৃত্যু ও এক ছাত্রের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। সেসময় গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এখন তিনি জামিনে বাইরে আছেন।মাত্র কিছুদিন আগে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে গুজব রটিয়ে সারা দেশের মানুষের শান্তির ঘুম কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এসময় ছেলেধরা সন্দেহে কয়েকজন নিরপরাধ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। হেনস্তা হয়েছিল শত শত মানুষ।

যাক, ইতোমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত ও হেফাজতের একটি অংশের সরকারবিরোধী ফায়দা লোটার চেহারা। ঘটনায় ক্ষুব্ধ পুরো দেশ। তবে আগের ঘটনাগুলোতে তা-বের পর অপকৌশলের প্রমাণ মিললেও এবারই প্রথম পুলিশ শুরুতেই জানিয়েছে, তারা এটি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে যে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একজন হিন্দু ব্যক্তির বিরুদ্ধে নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও এটি করেছেন দুজন মুসলিম। সংখ্যালঘু ওই ব্যক্তি আগেই তার আইডি হ্যাকের কথা পুলিশকে জানিয়েছিলেন। পুলিশ বলছে, যে দুই ব্যক্তি একজন হিন্দু ব্যক্তির ফেসবুক হ্যাক করে নবী অবমাননাকর বার্তা দিয়েছিলেন তাদের আটক করা হয়েছে।

তবে তারপরেও সহিংসতার পথেই হেঁটেছে মৌলবাদী গোষ্ঠীটি। পুলিশের ওপর হামলা চালানোর পর হতাহতের ঘটনার পর এবার উল্টো প্রতিবাদ নিয়ে মাঠে নেমেছেন তারা। বিএনপি ও তাদের মিত্র জামায়াত মহানবীর অবমাননাকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো সংখ্যালঘু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলে উস্কানি দিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে হেফাজত।

পরিশেষে বলতে চাই ফেইসবুকে পরিকল্পিতভাবে বার বার গুজব ছড়ানোর শিকার হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার, প্রগতিশীল ধারার মানুষ।বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে এমন একটি ঘটনাও কিন্তু ঘটেনি। দেশি বিদেশি যে চক্র আওয়ামীগ তথা শেষ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে অস্বস্থিতে ভোগে তারাই শেখ হাসিনা আমলে এসব গুজবসন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়।  গুজব কিভাবে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে তার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে অতিসম্প্রতি ভোলায় সংগঠিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস।আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনে ব্যর্থ হয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে ষড়যন্ত্রের ছক কষছে অশুভ চক্র। ইতোমধ্যেই বিদেশে তৎপরতা শুরু করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী।

**লেখক: কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ ও গবেষক**
