# গাছের সমুদ্র নাকি আত্মহত্যার স্বর্গরাজ্য

Author: নীলাঞ্জনা নীলা
Published: 2017-05-01
Category: ইতিহাস, একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf-%e0%a6%86%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a6%a4/

![আত্মহত্যার স্বর্গরাজ্য আওকিগাহারা... ](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2017/05/Aokigahara_grande-300x211.jpg)

***আত্মহত্যার স্বর্গরাজ্য আওকিগাহারা…***

যেদিন আমার মৃত্যু হবে, সেদিন সমস্ত দিন আবহাওয়া থাকবে নাতিশীতোষ্ণ  
দিনের আলোতে গহীন সবুজের ভেতর চোখ মেলে দেখবো খোলা ওই আকাশ  
আর আমার নিঃশ্বাস হঠাৎ করেই চুপ।  
যেদিন আমার মৃত্যু হবে, স্বাধীনতার স্বাদ নেবো নাকি পরাধীন হবো, জানা নেই;  
তবে সেদিন আমাকে আর সন্ধ্যের মুখোমুখি হতে হবেনা, ভরপুর রোদের হাসি চোখে মেখে  
অজানায় পাড়ি দেবে নিঃশ্বাস সমস্ত টানাপোড়েনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে।

সত্যিই কি তা পারা যায়? মৃত্যু চিরন্তন, সেটা সকলেরই জানা। সে আসবেই চাইলে, কিংবা না চাইলেও। “না চাহিলে যারে পাওয়া যায়” প্রেমের গান যদিও, কিন্তু এই লাইনটির সাথে মৃত্যুর কি মিল! কবি এ-ও বলেছেন “মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে।” তবুও “সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে”যেতে হয়, হবেই। ভূমিকা ছেড়ে এবারে আসি মূল প্রসঙ্গে। আওকিগাহারা বন, জাপানি(নিহঙ্গ) ভাষায় **‘জুকাই’** পৃথিবীর মধ্যে এক রহস্যময় অভিশপ্ত জঙ্গল। কেউ বা নাম দিয়েছে “শয়তানের বন”, কেউ “আত্মহত্যার বন”, আর কেউ “গাছের সাগর।” যেখানে মানুষ নিজের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়ে বিসর্জন দিতে যায় নিজের একান্ত প্রিয় প্রাণ। জাপানের ফুজি মাউন্টেনের পাদদেশে এই বনটির অবস্থান। যার আয়তন প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। এই জঙ্গলে গাছের উচ্চতা ও ঘনত্ব এতোই যে, সাধারণ পর্যটক পথ হারাতে বাধ্য। যদিও ওই জঙ্গলে কারুরই সাহস হয়না যাবার। জঙ্গলটি কঠিন পাথর, আগ্নেয় শিলা দিয়ে গঠিত। সেখানে বরফের গুহাও নাকি আছে। এই বনে কোন বন্য জীবজন্তু বাস করেনা, যার কারণে খুবই সুনসান, নির্জন এই আওকিগাহারা। পৃথিবীতে আত্মহত্যার স্থান হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে এটির অবস্থান। কথিত আছে জাপানি লেখক সাইকো মাটসুমোটো **‘কুরোয় কাইজু (Black Sea Of Trees/বৃক্ষের কৃষ্ণসাগর)’** নামের একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, যেখানে উপন্যাসের দুটো চরিত্র ওই বনে এসে আত্মহত্যা করেছিলো। তারপর থেকেই এখানে আত্মহত্যার প্রবণতা নাকি বেড়ে যায়। আরেক জাপানি লেখক ওয়াতারু তসুরুমুইয়ের লেখা **‘দ্য কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল’** বইটিতে আত্মহত্যার বিভিন্ন ধরণ এবং সঠিক স্থান কোথায় সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর সেই সঠিক স্থানটি আওকিগাহারা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন লেখক। সে সময় সর্বাধিক বিক্রীত বই হিসেবে এটি বইয়ের বাজার দখল করে।

এতো সমৃদ্ধশালী একটি দেশ জাপান, অথচ এখানে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। আর একশ’রও বেশি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এই জঙ্গল থেকে। আমায় জাপানী ভাষা শেখাতেন যে দুজন শিক্ষিকা, তাঁদের একজন ওকাদা সান তিনি আমাকে বলেছিলেন, জাপানে সকলেই এতো ব্যস্ত থাকে। তাদের নিজস্ব সময় যখন আসে, তখন একাকীত্ব খুব মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। একধরণের ভয়ঙ্কর বিষণ্ণতার মধ্যে পড়েই আত্মহত্যা করে। বিশেষ করে সামাজিক সম্পর্ক শিথিল হয়ে যাওয়া, পরিবার ব্যবস্থার বিলোপ, অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি বিষণ্ণতার প্রধান কারণ। তবে এ কথা সত্যি জাপানীরা খুব বেশি ঘুমায় না, কেউ কেউ তো চার ঘন্টা ঘুমিয়ে বাকি সময় কাজে ব্যয় করে। আর আমরা জানি বিষণ্ণতা এমন এক ভয়ঙ্কর অসুখ, যা মানসিক ভারসাম্যতাকে শেষ করে ফেলে। তবে আত্মহত্যার এই স্বর্গরাজ্য নিয়ে একটা কিংবদন্তি আছে। একসময় জাপান খুবই অসচ্ছল ছিলো। দুর্ভিক্ষের কারণে না খেয়ে মারা যেতো অনেকেই। তখন পরিবারের সবচেয়ে বয়ষ্ক সদস্যদের ওই বনে ছেড়ে দেয়া হতো। তাতে সদস্য কমে যেতো আর তখন খাদ্যের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যেতো। ওদিকে যাদেরকে বনে ছেড়ে দেয়া হতো, তারা অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতো। অনেকেই মনে করে এই বনে নাকি সেসব অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। কেউ যদি শুধু বেড়াতেও যায়, সেইসব আত্মারা তাদের মায়ায় এমনভাবে ফেলে যে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।

বর্তমানে বনের প্রবেশমুখে বিরাট বড়ো এক নোটিশবোর্ডে লেখা আছে **“দয়া করে আরেকবার ভাবুন, যদি সত্যিই কোনো সমস্যা থাকে অথবা ঝামেলায় পড়েন, পুলিশের সাহায্য নিন। মৃত্যুর আগে দয়া করে আরেকবার নিজের কথা ভাবুন।”** এছাড়া বিভিন্ন আদর্শ কথাও লিখে টানিয়ে দেয়া হয়েছে গাছে, যেমন, **“তোমার জীবনটা বাবা মায়ের দেয়া এক অমূল্য সম্পদ, অনুগ্রহ করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পুলিশের পরামর্শ নাও।”** কিন্তু তারপরেও আত্মহত্যা বেড়েই চলছে দিনের পর দিন। পুলিশের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো তারা কি বাধা দিতে পারেনা? পুলিশ বলেছে কারো মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে কে বনের শোভা দেখতে এসেছে, আর কে নিজেকে শেষ করতে! বনের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মানুষের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, গল্পের বই, জলের বোতল, ট্যাবলেটের পাতা, জুতা ইত্যাদি। এদিক-ওদিক তাকালে গাছে লাশও ঝুলতে দেখা যায়, মাটিতে হাড়গোড়, কঙ্কালও। কেউ কেউ গাছে ঝুলে আত্মহত্যা করে, কেউবা ঔষধ, আর আজকাল মাদক গ্রহণ করে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে। বনের ভেতর পুলিশ একটি জরুরী কক্ষ স্থাপন করেছে, যাতে সঙ্কটাপন্ন মানুষের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। অবশ্য এমনও বলা হয়ে থাকে সবাই আত্মহত্যা করতেই আসেনা, কেউ কেউ দুর্ঘটনারও সম্মুখীন হয়। সেখানে ভূ-গর্ভস্থ লৌহ ও গুল্ম-লতাপাতা দ্বারা প্রাকৃতিক ফাঁদ রয়েছে, যে কেউ অসাবধানে আটকে পড়ে যায়। এভাবে অনেকের জীবনের ইতি ঘটে।

“শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে  
নিয়ে গেছে তারে;  
কাল রাতে—ফাল্গুনের রাতের আঁধারে  
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ  
মরিবার হ’লো তার সাধ।”—-জীবনানন্দের এই কবিতাটির সাথে আত্মহত্যার স্বর্গরাজ্য আওকিগাহারার কি অদ্ভুত মিল! কেন মানুষ আত্মহত্যা করে এই বনে? তার রহস্য আজও কেউ বের করতে পারেনি। বিখ্যাত গবেষক আজুসা হায়ানো ৩০ বছরের বেশি সময় নিয়ে গবেষণা করেও এ রহস্যের কোনো কূল-কিনারা বের করতে পারেননি। কোজি সুকিনো নামের একজন ব্যক্তির কথা বলে শেষ করবো আওকিগাহারা বনের কথা। আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু নিজেকে জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তারপর আত্মহত্যা প্রতিরোধ আয়োজিত একটি সেমিনারে শ্রোতাদেরকে বলেছিলেন, **“প্লিজ, নিজেকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে, বিষ বা বড়ি খাওয়ার আগে এক মিনিট অপেক্ষা করুন। অল্প কিছু শক্তি সঞ্চয় করে ইন্টারনেটে একটি ক্লিক বা একটি ফোন কল করুন।”** কিন্তু জীবনের প্রতি যখন বিতৃষ্ণা চলে আসে, তখন কি আর কোনো আদর্শের কথা মনে আসে? আমরা জানি আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান নয়। তাছাড়া এ কথাটি সবসময়ই মাথায় রাখা উচিৎ, আত্মহত্যার ভাবনায় যারা থাকে, তারা অন্যকে খুণও করতে পারে।

![আত্মহত্যার স্বর্গরাজ্য... ](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2017/05/640px-Aokigahara_forest_01-300x200.jpg)

***বৃক্ষের কৃষ্ণসাগর…*** 

(y) ***লেখাটি উৎসর্গ করছি আমাদের কুবিরাজ ভাই ছাইরাছ হেলালকে। যিনি এই জঙ্গল সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন খুব বেশী।*** (y)

হ্যামিল্টন, কানাডা  
৩০ এপ্রিল, ২০১৭ ইং।

**\*\*বেশিরভাগ পয়েন্ট বিভিন্ন পত্রিকার কলাম, ফিচার এবং উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।\*\***  
**\*\*বনের ছবি দিলাম, কিন্তু আত্মহত্যাকারীদের কোনো ছবি দিলাম না।\*\***
