# গল্পঃ বেলা অবেলা

Author: ইসিয়াক
Published: 2021-03-04
Category: গল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%83-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be/

\[১\]

অনেকক্ষণ ধরে ডোরবেল একটানা বেজে চলেছে। বাথরুম থেকে তো জুলেখা ঠিকই শুনতে পাচ্ছেন আর কেউ শুনতে পারছে না নাকি!

তুতুল কি করছে কে জানে? এই দুপুর বেলা পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে হয়তো।

আর এ অসময়ে কে ই বা এলো।জুলেখার আরও কিছু কাজ বাকি ছিলো স্নানঘরে, খানিকটা বিরক্ত হয়ে সব কাজ ফেলে, গায়ে কোন রকম দু চার মগ হাপুস হুপুস পানি ঢালল বেলা গড়িয়েছে অনেকটা তারপর ভেজা শরীর কোন রকম আলতো করে মুছে, হুড়োহুড়ি করে কাপড় বদলিয়ে, জুলেখা বানু দরজা খুললেন একরাশ বিরক্তি নিয়ে।

দরজা খুলতেই জবাকে দেখে তার বিরক্তি আরও বেড়ে গেলো।

– তুই?

জবারও এমনিতে রাগে শরীর জ্বলছে। এতোক্ষণ লাগে দরজা খুলতে? বাড়িতে কি সব মরে গেছে নাকি? সেই ধরে বেল দিচ্ছে তো দিচ্ছে কারো আসার নাম নেই।

তার উপর মায়ের অমন প্রশ্ন। কার না রাগ হয়? সেও ঝাঁঝিয়ে উঠল,

– কেন এ বাড়িতে আমার আসা বারণ নাকি?

– বারণ হবে কেন?

– তোমার কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে । তা না হলে…… যাক সে যাক বলো মুখ অমন গোমড়া করে রেখেছো কেন?

– হাসাহাসির কি যথেষ্ট কারণ আর অবশিষ্ট আছে? খেটে খেটে মরে গেলাম কেউ খোঁজ নেবার নেই, আবার সবার ঝাড়ি ও খাচ্ছি সারাদিন, বড় কপাল করে এসেছিলাম তো পৃথিবীতে তাই এই দশা ।

– মা এত খোঁচা মারো কেন? খোঁচা খুঁচি আমার অসহ্য লাগে।

– আমার অবস্থায় পড়তিস তবে বুঝতি, কত ধানে কত চাল।সারা জীবন তো সবাই গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়ালে, তা আর বুঝবে কি?

– আবার বুঝি ভাবির সাথে ঝগড়া করছো? তা দরজা থেকে সরবে ,না চলে যাবো।

জুলেখা একপাশে সরে দাড়ালেন তবে আবার বললেন,

\-দাড়া আগে হ্যান্ড ওয়াশ আনি,আর মাস্ক পরিসনি কেন?

– ওসব মাস্ক টাস্ক আমার ভালো লাগে না। তুমি দেখি ঝগড়া করার মুডে আছো সরো তো সরো, সোজা ওয়াশরুমে যাচ্ছি। এমনিতে গোসল হয়নি। ভালো কথা তোমাদের ওয়াশরুমে তো সাবান শ্যাম্পু থাকে না। না থাকলে দিয়ে যাও।আর হ্যাঁ লেদার খুলে লাল রং এর ম্যাক্সি আছে একেবারে উপরে, ওটা দিয়ে যেও।

– শ্যাম্পু শেষ, সাবান আছে।

তারপর জুলেখা বানু লেদারের দিকে তাকিয়ে বেশ উষ্মা প্রকাশ করলেন,

\-এত ভারি ব্যাগ বয়ে এনেছিস কি কারণে?

– থাকবো ক’দিন।

– কদিন থাকবি মানে? এই তো সাত দিন আগে গেলি।

– আচ্ছা মা আমাকে কি ও বাড়িতে বেঁচে দিয়েছো?

– ও কথা আসছে কেন? মানুষ কি বলে বাপের বাড়ি এত ঘন ঘন এলে?

– আমি আমার বাড়িতে এসেছি ব্যাস তাতে কে কি বলল না বলল শুনতে আমার বয়ে’ই গেছে।

\-তুই কারো ধার না ধারলেও আমাদের সমাজ নিয়ে চলতে হয়।

– আরে রাখো তোমার সমাজ। এটা আধুনিক যুগ। আমার সিদ্ধান্ত আমার, ব্যস। আর জুবায়েরের সাথে আমার থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চলে এলাম।

– এসব আবার কি বলছিস তুই? দুদিন অন্তর নাটক আমার ভালো লাগে না। তোরা কি একটু শান্তিতে থাকতে দিবি না আমাদের? কি বলবো আর।

আমার হয়েছে যত জ্বালা, সব কপালের লিখন,কোন পাপে যে এমন শাস্তি তিনিই জানেন।

সোমত্ত ছেলে স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে আছে,তার বউ রাত দিন হুমকি ধামকি দিচ্ছে, এখানে তার নাকি আর পোষাচ্ছে না।তার উপর তুই নিত্য নতুন অশান্তি। আমাদের বয়স হয়েছে জবা। আমরা আর পারছি না।

– মা দয়া করে তোমার বকবকানি থামাবে? এই একই ভাঙা রেকর্ড শুনে শুনে আর ভালো লাগে না ।

\[২\]

জবা মায়ের কাছ থেকে সরে এসে গোসল সেরে ভাবির রুমে উঁকি মারলো। যেহেতু ভাইয়া অসুস্থ সেহেতু উঁকি মারতে দোষ নেই।

– ভাবি কি করো?

তুতুল চমকে ওঠে। চোখ বড় বড় করে তাকায়।যদিও সে একটুও চমকায়নি এসব তার ভান। সে বহু আগেই জবার আগমন টের পেয়েছে। জবা যখন গেটের মুখে জানালা দিয়ে তুতুল তাকে দেখতে পেয়েছে। মা মেয়ের গরম গরম বাক্য বান,তাকে নিয়ে আলাপ সবই তার কর্ণকুহরে যথাসময়ে প্রবেশ করেছে। সে এসব আর এখন পাত্তা দেয় না, গায়েও মাখে না।

জেনে শুনে ঢং করা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

– ওমা ননদিনী কখন এলে? কি কিউট লাগছে তোমাকে।

– এইতো কিছুক্ষণ। এসেই তো ঝগড়াঝাটি করলাম তুমি কোথায় ছিলে ,শোননি কিছু?

– আমার না কারো পারসোনাল ম্যাটারে ইন্টার ফেয়ার করা একদম পছন্দ না। তাই আমি ওসব কানে নেই না।

– তুমি না একদম আমার মতো, এজন্য তো তোমায় এত পছন্দ করি। সে যাক ভাবি কি রেঁধেছো আজ? আমার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে, কিন্তু মায়ের কাছে খাবার চাইলে হাজারটা কথা শোনাবে। তাই তোমার কাছে এলাম।

– তোমার পাগলামি আর যাবে না, এই অবেলায় কেউ না খেয়ে বের হয়?

– আর বলো না ,মা ছেলে দুজনার সাথে ঝগড়া করে খাওয়ার মুডটা নষ্ট হয়ে গেছিলো।

– কি নিয়ে আবার গোল বাঁধালে?

– আরে ভাইয়া সুস্থ হয়ে ওঠা অবধি ভাইয়ার মটর সাইকেলটা জুবায়ের দেখে শুনে রাখবে বলে নিয়ে গেল না। ওটা ও গতকাল বেঁচে দিয়েছে।

– কি? তুতুলের মুখ দিয়ে আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো।

– বেঁচে দিয়েছে মানে কি জবা? ওটা তোমার ভায়ের অনেক শখের মোটরসাইকেল ছিলো।

– সে আমি জানি না বলছো? তাই নিয়ে তো ঝগড়া। মহা ঝগড়া।

– তো বেঁচে দিলো কেন?

– কে জানে? নেশাখোর হলে যা হয়।বেঁচে জুয়া খেলেছে নয়তো কি? ও তো বলছে ও নাকি মায়ের জন্য এক জোড়া ঝুমকো গড়াতে দিয়েছে। তুমি বলো বুড়ো বয়সে কেউ ঝুমকো পড়ে ,না তাকে মানায়। সবটা শুনে আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিলো। আমার বাপের বাড়ির জিনিস আর তোরা মা ছেলে ভাগ বাটোয়ারা করছিস। লজ্জা হওয়া উচিত , না কি বলো?

– ওই মোটরসাইকেল মোটেও তোমার বাপের বাড়ির জিনিসের মধ্যে গন্য হবে না, ওটা তোমার ভায়ের খুব শখের। ওটাতে আমার টাকাও দেয়া ছিলো। শুধু ব্যবহার করলে ভালো থাকবে বলে দেওয়া। এখন যদি তোমরা বেঁচে খাও। তোমার ভাই সুস্থ হলে আমি কি কৈফিয়ত দেবো?

– ভাইয়া সুস্থ হবে? তুমি এখনো আশা করছো? আমার তো মনে হয় না ভাইয়া কোনদিন সুস্থ হবে। তুতুল জবার কথায় পাত্তা দিলো না।ফয়সালের ভালো হওয়া মন্দ হওয়ায় এখন আর তার কিছু যায় আসে না। সে যা সিদ্ধান্ত নেবার নিয়ে ফেলেছে।

কথা ঘুরিয়ে তুতুল বলল,

– তুমি প্রেম করার জন্য আর ছেলে পাওনি ননদীনি।এ তোমাকে তোমার পরিবারকে সারাজীবন জ্বালাবে।

– আমি কি করবো, বিয়ের আগে তো ভালোই ছিলো। লেখাপড়ায় ভালো, বাবার বড় ব্যবসা। সে কারণে তো মা বাবার অমতে গিয়ে বিয়েটা করলাম। কত কান্ড করে তারপর সব মীমাংসা হলো।জানো তো সবই।

তুতুলের মনটা জবার কথা শুনে হঠাৎ করে বিগড়ে গেছে, এই সব দায়িত্বজ্ঞানহীন লোভী মানুষগুলো দেখলে তার রাগে গা জ্বলে। এবার সে নিজের কাজে মন দিলো। আজ বিজয়ের সাথে দেখা করতে হবে। এ বাড়িতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

\[৩\]

রাকিব সাহেব অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। অবসরে গিয়েছেন তিন বছর হলো। সারা জীবন স্কুল আর টিউশনি করে তার দিন পার হয়েছে এ যাবৎকাল । দারিদ্রতার কারণে পুরোটা জীবনে অন্য কোন দিকে নজর দেবার ফুরসত খুব একটা পাননি তিনি।

যদিও এ নিয়ে আক্ষেপ বা অভিযোগ কোনটিই তার নেই। তিনি তার কাজ আর জীবন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট।সবচেয়ে বড় কথা তিনি সৎ ভাবে জীবন যাপন করতে পারছেন এটা তার কাছে অনেক গর্বের বিষয়।

তার জীবনটাও নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কেটে গেছে। একই ধারায় বয়ে গেছে, মেয়েটা যা একটু বেয়াড়া তা বাদে আর সব ঠিক ঠাক চলেছে বরাবরই যেমনটি তিনি চেয়েছেন । যদিও ছেলের পড়াশোনা বেশি দূর হয়নি।সবার দ্বারা সব কিছু হয় না তাও তিনি জানেন ,এনিয়ে তার কোন আফসোস নেই। তিনি ছেলেকে শর্ট একটা কোর্স করিয়ে ফার্মেসীতে বসিয়ে দিয়েছেন।

রায়হান এক্ষেত্রে বেশ বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে, দ্রুত ব্যবসা দাঁড় করিয়ে সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বাবার টিউশনি ছাড়িয়েছে। বাবাকে সে জান প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে।বাবার কষ্ট সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।

তারপর আর কি, রাকিব সাহেবের কাজ বলতে বাজার করা আর নাতিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা।তার বাইরে অখণ্ড অবসর।

তার এত অবসর দেখে জুলেখা মাঝে মাঝে খোঁচা মারতে কম করেন না।

– নবাব সাহেব আপনার মতো ঝাড়া হাত পা হলে আমি একটু বাঁচতাম। কবে যে সংসারের ঝামেলা থেকে মুক্ত হবো আল্লাই জানেন!

রাকিব সাহেব স্বভাবে বেশ রাশভারি হলেও রোমান্টিকতায়ও তিনি কম যান না তৎক্ষনাৎ তিনি উত্তর দেন,

\-এবার তাহলে চলো যেখানে যা আছে , ছেলে আর ছেলের বউকে সব বুঝিয়ে দিয়ে দুচোখ যেদিকে যায় সেদিকে চলে যাই।

\-এই যে মাস্টার মশাই দুচোখ যেদিকে যায় সেদিকে না হয় গেলাম কিন্তু খাওয়া জুটবে কি হাওয়া থেকে? গেলে তুমি যাও আমার অত শখ নেই।

– সব শখ তাহলে মিটে গেছে বুঝি? আলহামদুলিল্লাহ।

– গলা অত চড়াচ্ছো কেন? আস্তে কথা বলো, ওরা সবাই শুনছে।

রাকিব সাহেব চুপ করেন বটে তবে ঠোঁট চেপে মিটমিটিয়ে হাসেন তাই দেখে জুলেখা ঝনঝনিয়ে উঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,

\-বুড়ো বয়সে যত সব ভীমরতি, দেখলে গাঁ পিত্তি জ্বলে যায়। বয়স বাড়ছে আর ফাজিল হচ্ছে। যাচ্ছেতাই লোক একটা।

\[৪\]

জীবন কখনো সাজানো ছকে চলে না, কখন যে কার জীবনে কি ঘটবে কেউ তা জানে না। দিন ভালোই কাটছিলো রাকিব সাহেব ও তাঁর পরিবারের এর মধ্যে হঠাৎ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো মহামারী করোনা,অনেক মানুষের মতো করোনা রাকিব সাহেবর জীবনও লন্ড ভন্ড করে দিলো।

লকডাউনে রায়হানের ওষুধের দোকান খোলা থাকলেও বেচাবিক্রি সর্ব নিম্ন পর্যায়ে নেমে এলো,তবুও সংসার চালানোর দায় থেকে রায়হান ফার্মেসি খুলে বসে নিয়মিত।

এর মধ্যে একদিন প্রচন্ড গায়ে ব্যথা আর জ্বর নিয়ে সে বাড়ি ফিরে আসে। দিন পার হতে না হতে তার অবস্থার ক্রমাবনতি হয়।বাড়ির সবাই ধারনা করেন রায়হানের করোনা হয়েছে কারণ করোনার প্রায় সব লক্ষ্মণ তাঁর মধ্যে বিদ্যমান, রাকিব সাহেব ঠিক করেন ছেলে সহ বাড়ির সকলের করোনা টেস্ট করাবেন। দেরি করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

কিন্তু রায়হানের স্ত্রী তুতুল হঠাৎ বাঁধ সাধে তাঁর মায়ের পরামর্শে। সে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে যে, করোনা হোক বা না হোক ,টেস্ট করতে গেলে আশে পাশে পাড়া প্রতিবেশি সবার চোখে তারা নাকি ছোট হয়ে যাবে। আর যদি করোনা পজেটিভ হয় তাহলে তো ষোলকলা পূর্ণ, নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে সবাইকে । এক ঘরে হতে হবে, বাড়ি লকডাউন হবে,পাড়া প্রতিবেশি উঁকি ঝুকি মারবে, বাজে কথা বলবে। ইট পাটকেলও নিক্ষেপ করতে পারে। করোনা সেরে গেলেও তেমন একটা কেউ মিশতে চাইবে না। নানা কথার খোঁচায় জর্জরিক করবে।

তুতুল এই বিপথ থেকে উদ্ধারের বিকল্প পথও বাতলে দেয়। এলাকার এক কোয়াক ডাক্তার আছেন নাম তার ফুল ডাক্তার। তাকে দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে।

ফোনে ফুল ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করলে তার ওষুধে রায়হান ঠিকই সেরে উঠবে। অনেকে নাকি এমন গোপন চিকিৎসায় ভালো হয়ে গেছে। এতে নিজেদের সামাজিক অবস্থানের কোন সমস্যা হবে না। বলা যায় সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।

রাকিব সাহেব বারবার অসম্মতি জানালে জবা আর তার মা ও তুতুলের পক্ষ নেয়। আসলে তুতুল তাদের আগে থেকে নানা রকম উল্টা পাল্টা বুঝিয়ে হাত করে রেখেছে।

এভাবে ফুল ডাক্তারের চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়

দিন দুই পরে রায়হানের শারীরিক অবস্থা মারাত্নক অবনতি হলে, হাসপাতালে নিতে সেখান থেকে তারা জানালো রুগি স্ট্রোক করেছে। রুগির ব্লাড প্রেশার মারাত্মক হাই। ডায়বেটিস ও আছে। অথচ রায়হানের পরিবারের লোকজন রায়হানের এ ধরনের শারিরীক সমস্যার কথা এত দিন জানতেন না।

কিভাবে কি হলো কে জানে?

নানান টেষ্টের পরে আশার কথা রায়হানের করোনা লক্ষ্মণ থাকলেও করোনা হয়নি। সিজেনাল জ্বর। কিন্তু ভুল চিকিৎসায় শারীরিক পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

স্রোতের মত টাকা খরচ হলো।অমানুষিক ভোগান্তি তার বদলে রায়হানের শারীরিক উন্নতি হলো যৎ সামান্য। মাস খানিক পরে যখন রায়হান বাড়িতে এলো তখন সে কোন রকমে পা টেনে টেনে হাঁটতে পারে। আর অনেক ক্ষণের প্রচেষ্টায় আব্বা বলে ডাকতে পারে।

যেহেতু ফার্মেসী ব্যবসার কিছু বোঝেন না রাকিব সাহেব তাই ফার্মেসী বেঁচে দিলেন পানির দামে। এছাড়া কি আর করবেন?

সংসারই বা চলবে কি করে? রাকিব সাহেব আবার ফিরে গেলেন পুরানো পেশায়,টিউশনিতে।

প্রথমদিকে টিউশনি পাওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে গেলো। ফার্মেসি বেঁচা পয়সার হাত দিতে হলো বাধ্য হয়ে। জুলেখার গয়নাগুলো হাতছাড়া হয়ে গেলো।

পরবর্তীতেও পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আয়ের বেশির ভাগ খরচ হয়ে যেতে লাগলো রায়হানের চিকিৎসায়।

এর মধ্যে জবা আর তার জামাই নিয়ে হাজির হলো নতুন বায়না নিয়ে।

\[৫\]

সেদিন জবার জন্মদিন ছিলো। করোনা, রায়হানের অসুস্থতা সাথে বিবিধ পারিবারিক সমস্যার কারণে জুলেখার মনটা অস্থির থাকে সবসময়।

সন্ধ্যাবেলা জবা ফোন দেয় মাকে,

– মা কি করো।

– এই নামাজ পড়ে উঠলাম।

– আমার কথা এখন আর তুমি অতটা ভাবো না তাই না?

– ওমা তা কেন হবে। এই তো নামাজ শেষে তোর, জামাই আর কণার জন্য দোয়া করলাম।

জবা অভিযোগের সুরে বলল,

\-তোমাদের চিন্তা ভাবনা এখন শুধুই ভাইয়াকে নিয়ে।আমাকে তো পর করে দিয়েছো।

– তোর ভাইটা অসুস্থ তাকে নিয়ে এত অভিযোগ করা কি ঠিক?

– অভিযোগ করলাম কোথায়? আমি কি তোমাদের ব্যাপারে কিছু বলার অধিকারও হারিয়েছি?

– কি ভুল ভাল বকছিস।এসবের জন্য ফোন করেছিস?

– জানি তোমরা এখন আর আমাকে ভালোবাসো না, আমাকে তোমরা পর করে দিয়েছো। এখন আমার সব কথা তোমাদের তিতা লাগে যাহোক যা বলার জন্য ফোন দিয়েছিলাম, আজ আমার জন্মদিন তোমরা মনে রাখার প্রয়োজন বোধটুকুও করনি। ভালোই হলো আমি জানলাম আমার পরিবারের আমি অবাঞ্ছিত।

জুলেখা অস্বস্তিতে পড়লেন তার অন্তত এই বিষয়টি মনে রাখা উচিত ছিলো। নানা অশান্তিতে সব ভুল হয়ে যায় ইদানিং।

– মা রাখছি। আরো একরাশ অভিমান ঝরে পড়লো তার কন্ঠে।

জুলেখা বানু ফোনে ওদের নিমন্ত্রণ জানালো রাতে খাওয়ার। জবা আসলে জামাইকে নিয়ে এ বাড়িতে আসার বাহানা খুঁজছিলো। সেটা হয়ে গেলো।

– দেখি তোমার জামাইকে বলে ও যদি আসতে চায় তো একবার ঘুরে যেতে পারি তোমাদের ওখান থেকে। আমি পরে জানাচ্ছি।

জুলেখা জানেন জবা আসবে। তিনি রান্নাঘর ঘরে যান, আজ এমনিতে শুক্রবার ছিলো। মাংস আর ডিম ভূনা করা ছিলো। তুতুল তার মায়ের বাড়ি গেছে মেয়েকে নিয়ে। খাবার প্রায় সবটাই রয়ে গেছে। মাছ ভাজি আর সরষে ইলিশ সাথে প্লেইন পোলাও করে দিলে ভালোভাবে সব ম্যানেজ হয়ে যাবে।

জুলেখা ফ্রিজ খুলে অবশিষ্ট ইলিশ মাছ বের করে আনলেন।

তুতুল আর কাজরী এখনো ফেরেনি। হয়তো ফিরবে না। আজকাল তুতুল বাপের বাড়িতে থাকতে বেশি পছন্দ করে অথচ রায়হানের এখন সবচেয়ে বেশি তাকে প্রয়োজন। জুলেখার কানে অনেক কথাই আসে তুতুল সম্পর্কে তিনি অনেকবার ভেবেছেন কিছু জিজ্ঞেস করবেন।তারপর কি জানি কি ভেবে আর জিজ্ঞেস করা হয় নি।

রায়হানের বাবা এখনো সম্ভবত এসব ব্যাপারে কিছু জানেন না বা শোনেন নি। পুরুষ মানুষ অত শত বোঝেনও না, তবে জানতে পারলে ভীষণ আঘাত পাবেন।

এ ক’মাসে তার উপর দিয়ে অকল্পনীয় ঝড় ঝঞ্ঝা গেছে তার উপর জবার জ্বালাতন। না আজকাল মনে হয় এসব দেখার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো ছিলো। অন্তত এতো কষ্ট পেতে হতো না।।

(৬)

রাকিব সাহেবের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তিনি প্রচন্ড রেগে আছেন। এর কারণ আছে অবশ্য,আজকাল তিনি জবা আর জবার স্বামীকে সহ্যই করতে পারেন না। মেয়েটা দিনে দিনে এত লোভী হয়ে উঠছে কি কারণে কে জানে? তার সন্তান যে এমন হবে তা তার কল্পনার বাইরে ছিলো।

একে তো খাওয়ার টেবিল তার উপর জামাই বসে আছে। এই জামাইকে তিনি দুচোখে দেখতে পারেন না। একমাত্র জামাই হওয়া স্বত্ত্বেও এই ছেলেটিকে তিনি প্রচন্ড রকমের অপছন্দ করেন। কেন অপছন্দ করেন তারও বহুবিধ কারণ আছে । সবচেয়ে বড় কারণ ছেলেটি মারাত্মক রকমের লোভী। সে জবাকে লোভী বানিয়ে ফেলেছে নিজের স্বার্থে। কাজ হাসিলের উদ্দেশ্যে।

খাবার টেবিলে কিছুটা সময় চুপচাপ পার হবার পর জবা যখন বুঝলো যে পরিবেশটা ঠিক তার অনুকূলে নেই। তখন নিজেই উপযাচক হয়ে মায়ের সাথে এটা সেটা আলাপ শুরু করলো সে।জুলেখা বানুর ও আজ মন মেজাজ খারাপ। কথাবার্তা কিছুতেই জমছে না যে সেই প্রসঙ্গ ধরে জবা মূল প্রসঙ্গে আসবে।

অথচ জুবায়েরের কড়া হুশিয়ারি যে আজই যা করার করতে হবে।কিছুক্ষণের মধ্যে জবা আসল প্রসঙ্গে এলো,

– মা তোমার জামাই নতুন একটা ব্যবসা শুরু করবে বলে ভাবছে।

– ভালো তো।

– শুধু ভালো সাথে আরো কিছু বলো, একটু সৌজন্য তো আশা করতে পারি নাকি?

জুলেখার গা জ্বলে, সে জানে এরপর কি হবে, টাকা পয়সার কথা উঠবে। মেয়েটা এমন কেন।ও কি পাগল নাকি বোকা?

মেয়েটা একটু দুরন্ত ও জেদি ছিলো ছোটবেলা থেকেই, কন্ট্রোলে আনা যায়নি, বর্তমানে দিন দিন তা আরো বেশিমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।বেশি আদর দেওয়ার ফল এখন হাতে হাতে পাওয়া যাচ্ছে। আদরে একেবারে বাঁদর যাকে বলে।

অপমানটুকু সয়ে জুলেখা জানতে চাইলেন,

– তা কিসের ব্যবসা। কোথায় করবে? আগেও তো কয়েকটি করেছে। যদিও সফল হতে পারেনি। এবার নিশ্চয়ই পারবে আশা করি।

– হ্যাঁ মা, বাবা তোমরা দোয়া করো। সেজন্য তো তোমাদের এখানে আসা। দোয়া নিতে।

রাকিব সাহেব সগোক্তি করলেন

– দোয়া নিতে এলে? তোমার মা’তো বলল জন্মদিন তাই বায়না করে এসেছো। কেউ তোমার খোঁজ নেয় না নাকি?

– অমন করে ঠেস দিয়ে বলছো কেন বাবা? দোয়া নিতে তো আসছি জন্মদিন তো উপলক্ষ, একটু অন্য কথাও ছিল অবশ্য। মা বাবা দুজনেই আছো যখন, বলছিলাম কি? ভাইয়ার এই অবস্থা তোমরাও আর কদিন। এই বাড়িটা শেষ পর্যন্ত তো আমরা দুই ভাই বোনই পাবো , নাকি?

যাহোক আসল কথায় আসি তোমরা যদি বাড়িটা বেঁচে আমার মানে আমাদের অংশটা বুঝিয়ে দিতে তাহলে আমরা জীবনটাকে নিজের মত করে গুছিয়ে নিতে পারতাম। এভাবে আর কতদিন?

আর ভাইয়ার অংশের টাকা দিয়ে ভাইয়ার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেতাহলে ভাইয়াও তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে। টাকা পয়সাই তো মূল সমস্যা তাই না?

রাকিব সাহেব মেয়ের স্পর্ধায় যারপর নাই অবাক হলেন,তাঁর ভ্রু কুচকে উঠলো। সমস্ত শরীর রাগে জ্বলে উঠলো। মাখা ভাত রেখে তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বেসিনে হাত ধুতে গেলেন।

আর কোন কথা হলো না বাকি সবাই খাওয়া শেষ করে যার যার মতো টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লো।

হঠাৎ করে পুরো বাড়িটা জুড়ে মধ্য রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এলো যেন।

তেমন সুবিধা করতে না পেরে রাত বাড়লে জবা জানায় তারা এখন চলে যাবে, আর এ বাড়িতে আসা হবে কিনা সে ব্যাপারে তাকে ভাবতে হবে ,ইত্যাদি ইত্যাদি।

– এত রাগ কেন তোর?

\-এতে আবার রাগের কি দেখলে মা।আমি চাই না আমার জন্য জুবায়ের তোমাদের বাড়িতে এসে অপমানিত হোক।

– ওকে কে অপমান করলে? কি যা তা বকছিস।

\-ন্যাকামি রাখো তো, আর হ্যাঁ ভাইয়ার অসুখের সময় যে কুড়ি হাজার টাকা নিয়েছিলে ওটা কি দিতে পারবে?

\-তোর বাবার কাছে শুনি?

\-না পারলে সমস্যা নেই, ভাইয়ার তো একটা মোটর সাইকেল ছিলো। ওটা তো পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে যাবে। চাইলে ওটা ধার দিতে পারো। ভাইয়া সুস্থ হলে না হয় তখন ফেরত দিয়ে যাবো। ভাইয়ার শখের জিনিস ভেবো না ,যত্নে থাকবে।

জুলেখা মেয়ে বিচার বুদ্ধি স্বার্থপরতায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে তুতুল ফোন দিলো জুলেখা বানুকে।

– মা জবা নাকি কাল খুলনায় যাবে? কি একটা জরুরি কাজে?

– আমি জানি না। তো কি হয়েছে?

\-রায়হানের বাইকটা একটু নিতে চাচ্ছিলো। পরে ফেরত দিয়ে যাবে।

– কিন্তু………….

ওকে চাবিটা দিয়ে দিন মা। আমি আপনার সাথে এ ব্যাপারে পরে কথা বলছি। একটু ব্যস্ত আছি।

কলকাঠি কোথেকে নড়েছে জুলেখার বুঝতে একটুও দেরি হলো না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।তাদের মৃত্যুর পর এতো সাধের সংসার তছনচ হতে খুব বেশি সময় লাগবে না এটা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।

কারো কাছে কিছু শুনলেন না আর ,আর শুনাশুনি করে অশান্তি বাড়িয়েও লাভ নেই বুঝতে পেরে ,জুলেখা বানু মটর সাইকেলটার চাবিটা জবার হাতে ধরিয়ে দিলেন। শুধু বললেন,

– তোর এত লোভ? এত লোভ ভালো না’রে জবা।

জবা ও জুবায়ের দুজনেই সমান বেহায়া। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যে মটর সাইকেলটা নিয়ে হাসতে হাসতে বিদায় হলো।

(৭)

দিন কয়েক পরে…..

আছরের নামাজ পড়ে জায়নামাজ গুছিয়ে তসবি হাতে জুলেখা বানু তুতুলের ঘরে ঢুকলেন।

আজ তাকে কয়েকটি কথা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিতে হবে তুতুলকে। সমস্যা জটিলতর হবার আগে সমস্যার সমাধান করতে হয়।

ইদানিং তুতুলের মতিগতি জুলেখার একটুও ভালো লাগছে না। প্রায় প্রতিদিনই অনেক কথাই কানে আসছে তার, এমনিতে রায়হানের বাবার শরীরটা আজ কদিন খুব বেশি ভালো না। বুকে চাপ চাপ ব্যাথা বলছে। এই বয়সে এত পরিশ্রম তার পক্ষে সবকিছু একা হাতে সামলানো বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু করারও কিছু নেই।ডক্তিারের পরামর্শ দরকার এখন মাসের শেষ হাত একেবারে খালি।

তাই মাসের প্রথমে ছাড়া ডাক্তারের কাছে যাওয়া হবে না।এই নিয়ে জুলেখা বানু বেশ চিন্তায় আছেন কারণ মাস পুরতে এখনো বেশ কদিন বাকি,লোকটার কিছু হলে পুরো পরিবারটা ভেসে যাবে। এতোদিন তুতুলের ব্যাপারটা তিনি তাই ইচ্ছে করে রাকিব সাহেবের কানে তুলেন নি। বেচারা জানতে পারলে প্রচন্ড কষ্ট পাবেন। এমনিতে চারপাশ ঘিরে আসছে ঘোর অন্ধকারে।

অন্যদিকে তুতুলের ব্যপারটা নিয়ে জুলেখা বানু নিজেও কি কম কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু কিছুই করার নেই যেন।

প্রথম প্রথম তিনি ব্যাপারটা ততটা আমলে নেননি।তারপর বহুমুখে শুনে আর অবিশ্বাস করবেন কি করে।

তুতুল এক মনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে সাজগোজে ব্যস্ত। খুব সুন্দর লাগছে তাকে।যার স্বামী পক্ষাঘাতগ্রস্থ পঙ্গু তার এত সাজগোজ অন্য কারণ নির্দেশ করে।

তুতুল বরাবরই সুন্দরী তবে সে যখন এ বাড়িতে বউ হয়ে আসে তখন এত ভালো তাকে দেখাতো না ইদানীং যেন রূপ তার কাছে মোহময়ী হয়ে ধরা দিয়েছে।

\-তুমি কি এখন কোথাও বের হচ্ছো মা?

– হ্যাঁ একটু কাজ আছে বাইরে। ফিরতে রাত হতে পারে।রায়হানের সব চেঞ্জ করে দিয়েছি,তেমন কোন অসুবিধা আর হবে না হয়তো। হলে আপনারা তো আছেনই,দেখবেন। ওষুধ গুলো সব বাইরে রেখেছি। বাবা এলে খাইয়ে দিতে বলবেন ।

– কাজরীও যাচ্ছে?

– ওকে কার কাছে রেখে যাবো মা?

– ওর পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।

– সে আপনাকে না ভাবলেও চলবে মা,আমি তো আছি নাকি?

– তুমি ওর মা,আসলে সবচেয়ে তুমি ভালো বুঝবে কিসে ওর ভালো কিসে মন্দ। যা হোক তোমার সাথে একটু কথা ছিল।

– আমার দেরি হয়ে যাবে, এমনিতে দেরি হয়ে গেছে তারপর কি ভেবে বলল,

– ঠিক আছে কি বলবেন বলুন।

– তুমি এই যে প্রতিদিন অসুস্থ স্বামীকে রেখে চলে যাও কোনদিন বাড়ি ফেরো আবার কোনদিন ফেরো না এতে নানা জনে নানা কথা বলে।

– মানে? আপনার সাথে আবার কে কি বলল।আর কে কি বলল না বলল আমার তাতে কিছু যায় আসে না মা।

– তোমার মেয়ে বড় হচ্ছে?সমাজে আমাদেরএকটা সামাজিক অবস্থান।

– আমি আগেও বলেছি আপনারা আপনাদের অর্থব ছেলেকে নিয়ে ভাবুন।আমাকে আর আমার মেয়েকে নিয়ে নয়। আর আমি ঠিক করেছি ওকে হোস্টেলে দিয়ে দিবো।

\-এইটুকু বাচ্চা মেয়েকে তুমি হোস্টেলে দেবে? কেন?আমরা তো এখনো বেঁচে বর্তে আছি।

– আর আপনাদের আমি জ্বালাতন করতে চাই না।মা অনেকদিন বলবো বলবো ভাবছি বলা হয়ে উঠছে না,যেহেতু আপনি কথা তুললেন সেহেতু ভালো হলো।আসলে আমিও তো রক্ত মাংসের মানুষ, আমার নিজের একটা জীবন আছে। এভাবে আর ক’দিন? আপনাদের এখানে আমার মনে হয় খুব বেশি দিন থাকা হবে না।

– থাকা হবে না মানে? এসব তুমি কি বলছো? থাকা হবে না মানেটা কি? আমাদের কথা না হয় বাদ দিলাম তুমি এই সংসার ছেড়ে স্বামী সন্তান ছেড়ে কোথায় যাবে? কেন যাবে?

– মা আমি না এইসন ন্যাকামি একদম সহ্য করতে পারি না। আপনি দিব্যি সবাইকে নিয়ে চুটিয়ে সংসার করছেন। আমার অবস্থা বয়স এসব নিয়ে কি একবারও ভেবেছেন? নিজের মেয়ে হলে ভাবতেন।

কিসে আমার দিন রাত কাটে একবারও খোঁজ নিয়েছেন? নেননি।

জুলেখা বানু থমকে গেলেন রূঢ় বাস্তবতার কাছে,

তিনি কোন রকমে বললেন,

– তোমার একটা সন্তান আছে মা। ওর ভবিষ্যৎ আছে।

\-আর আমার ভবিষ্যত?

\-সব ঠিক হয়ে যাবে মা একটু সময় লাগবে হয়তো।

\-আমি জানি, কিছুই ঠিক হবে না।

\-তোমার মেয়েটার কথা একটু ভাবো।

– ভেবেছি, ওটাই তো পথের কাঁটা না হলে কবেই পথ দেখতাম।আমার পক্ষে দীর্ঘ দিন এই পঙ্গু অসুস্থ স্বামীর ঘর করা সম্ভব না।

(৮)

রাকিব সাহেবের এক বন্ধু ক’দিন আগে জানিয়েছিলেন, নবী নগরে নাকি একজন কবিরাজ আছে। তার দেওয়া তেল পড়া প্যারালাইসিস রুগীর শরীরে মালিশ করলে, রুগী খুব দ্রুত সেরে ওঠে। বিপদের সময় মানুষের সব বিশ্বাসের ভিত্তি দূর্বল হয়ে যায়। রাকিব সাহেব কখনোই এই সব তেল পড়া পানি পড়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু ওই বলে বিপদ মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তি মূলে আঘাত করে।

সেই কবিরাজের বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে রাকিব সাহেব সাভার থেকে ফিরছিলেন।সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, বাসের মাঝামাঝি ছিটে বসে আছেন তিনি। জ্যামে পড়ার কারণে অনেক যাত্রী নেমে গেছে। বাস প্রায় ফাঁকা।

পথ চলতে নিজের সাইড ব্যাগে সবসময় বই রাখেন তিনি,এটা তার অনেক দিনের পুরানে অভ্যাস। সময় কাটানোর জন্য এখন তিনি বাসের মৃদু আলোয় বই পড়ার চেষ্টা করছেন। জ্যামে পড়া সময়টা কাজে লাগানো তার পুরান অভ্যাস। গাড়ি এগুচ্ছে ধীর গতিতে। মাঝে মাঝে কিছু যাত্রী উঠছে, আবার গন্তব্য এলে নেমে যাচ্ছে কেউ কেউ। রাকিব সাহেব ডুবে আছেন বইয়ের মাঝে।

হঠাৎ সামনের সিটে নারীর কন্ঠটি তার চেনা মনে হলো।একটু খেয়াল করে কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি বুঝতে পারলেন এটা তুতুলে গলা। তিনি কিছু বলার উদ্যোগ নিতেই কয়েকটি কথা তার কানে এলো, তিনি বরফের মত জমে গেলেন। একি বলছে তুতুল…… সঙ্গের লোকটিই বা কে? মেয়েটি তাদের প্রতি এতটা ঘৃণা পুষে রেখেছে অথচ তারা….

ছেলেটি বলল,

– তারপর কি ফাইনাল করলে?

– কতবার বলবো।বললাম তো সামনের মাসে বিয়ে করছি আমরা।

– তোমার মেয়েটাকে কি করবে?

– বোডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেবো।

– সেই ভালো নির্ঝঞ্ঝাট থাকা যাবে।

\-আর ওই পঙ্গুটাকে?

\-ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়ে দেবো দু একদিনের মধ্যে।

আমি আর পারছি না, অভিনয় করে করে ক্লান্ত জানো তো।

\-আসলেই।

\-বুড়ো বুড়িকে কি করে ম্যানেজ করবে?

\-আরে রাখো তো,ওরা আমার কিছু করতে পারবে না। আর আমার ওত মায়া টায়া নেই। বরং সারাদিন ঘ্যানঘ্যানানির হাত থেকে বাঁচা যাবে। আমাকে নীতি নৈতিকতা শেখাতে আসে, যত সব বিরক্তিকর লোকজন। রায়হান সুস্থ থাকলে এতদিনে ওল্ড হোমে পাঠিয়ে দিতাম ঠিক। কপাল ভালো বুড়ো বুড়ীর। ওদের মেয়েও তো চায় ওরা ওল্ড হোমে যাক। করোনা এসে সব প্লান ভন্ডুল হয়ে গেলো।

– করোনা এসে ভালো হয়নি বলছো?

তুতুল এবার হো হো হো করে হেসে ছেলেটির গায়ে গড়িয়ে পড়লো।

– একেবারে যে খাবাপ হয়েছে তা বলা যাচ্ছে কোথায়? করোনা না এলে তো তোমার কাছে আসা হয়ে উঠতো না। তোমাকে নিজের করে পাওয়া হতো না। ঝামেলাটা মিটিয়ে নেই তারপর দুজনে চুটিয়ে সংসার করবো।

–

(৯)

দরজা খুলে রাকি সাহেবের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলেন জুলেখা,

– কি হয়েছে তোমার?এমন দেখাচ্ছে কেন?

– শরীরটা ভালো লাগছে না।মাথা ঘুরছে জুলেখা।

\-বেসিন থেকে হাত ধুয়ে ফ্যানের নিচে বসো ফ্যান ছেড়ে দিচ্ছি। পানি খাবে? পানি দেবো?

রাকিব সাহেব অস্ফুট স্বরে বললেন

\-দাও।

\-ঠিক আছে হাত মুখ ধুতে হবে না,গোসল করবে তো।আগে ফ্যানের নিচে বসো বিশ্রাম নাও,তারপর গোসল করো। গোসল করলে নিশ্চয় ভালো লাগবে।

– আর বিশ্রাম আর ভালো লাগা,আমাদের সব আশা শেষ হয়ে গেছে জুলেখা সব আশা শেষ হয়ে গেছে।

পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে জুলেখা প্রশ্ন করেন

\-কোথাও কোন ঝামেলা হয়েছে? কোন সমস্যা। আশা সব শেষ হয়ে যাবে কেন? আমরা এত সহজে হার মানবো না। কি হয়েছে কি?

মুখে প্রায় এসে গেছিলো কিন্তু রুচিবোধ এসে বাধা হয়ে দাড়ালো। কি করে তিনি ছেলের বউ দিকে আঙ্গুল তুলবেন?

রাকিব সাহেব মাথা নাড়ালেন, মুখ খুলতে দ্বিধাগ্রস্থ তিনি। যদি মুখ ফসকে কোন অসংলগ্ন কথা বের হয়ে যায়।

বুকের ব্যাথাটা আবার ফিরে আসছে সেই সাথে মাথা ব্যথা ।হয়তো গ্যাসের ব্যথা। জুলেখা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

\-ডাক্তার ডাকবো?

\-না ঠিক হয়ে যাবে।এখন একটু ভালো বোধ হচ্ছে।

\-এ মাসের টাকা পেলে একটা ভালো ডাক্তারের কাছে তোমাকে নিয়ে যাবো। আর আমি বলি কি এবার ভ্যাকসিনের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করে ফেলো। ভ্যাকসিনটা নিয়ে নাও। এর পর নাকি সরকার আর ফ্রী দেবে না। কিনতে হবে।

\-তুমি দেবে না ভ্যাকসিন।

\-আমি তো বাড়িতে থাকি।তোমার নেয়াটা বেশি জরুরি। আর ডাক্তার দেখানোটাও।

সে রাতে তুতুল বাড়ি ফিরলো না।রাত বাড়ার সাথে সাথে রাকিব সাহেবের বুকের ব্যথা বাড়তে লাগলো।জুলেখা জবার কাছে ফোন দিলো সে জানালো তারা সবাই নাকি গ্রামে বেড়াতে গিয়েছে। এখন আসতে পারবে না। তুতুলের ফোনও বন্ধ পাওয়া গেলো।

রাকিব সাহেব বললেন

– আমার সমস্যা হচ্ছে না তুৃমি খামোখা অস্থির হচ্ছো আগামীকাল ডাক্তারের কাছে যাবোভাবছি,তুমিও সাথে যেও কিন্তু খোকার কাছে কে থাকবে?

জুলেখাবানুর চোখ ভারি হয়ে এলো।তিনি কান্না লুকাতে পাশের ঘরে চলে গেলেন।

(১০)

শেষ রাতে ব্যথাটা একটু কমলে রাকিব সাহেব ও জুলেখা বানু দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লেন।হঠাৎ কারো বিভৎস গোঙানির আওয়াজে জুলেখা বানুর ঘুম ভেঙে গেলো, ঘুম ভাঙতেই দেখলেন অনেক বেলা হয়ে গেছে।পাশের ঘর থেকে রায়হান চেঁচাচ্ছে ,গোঙানির আওয়াজটা তার, রায়হানের সারা শরীর মল মূত্রে একাকার।

জুলেখা তাড়াহুড়োয় উঠতে গিয়ে রাকিব সাহেবের গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে চমকে উঠলেন,

\-একি রায়েহানের বাবার শরীর এত ঠান্ডা কেন?

কিছুক্ষণ পরে জুলেখা লজ থেকে গগন বিদারী চিৎকার ভেসে এলো

– ওরে রায়হান রে এসে দেখে যা বাপজান কি সর্বনাশ হলো রে।তোর আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে রে।ওরে আমাদের কি হবে রে। কে দেখবে রে। আল্লাহ তুমি এতো নিষ্ঠুর কি করে হলে। আল্লাহ আল্লাহ……

শেষ
