# গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সন্ধানে

Author: আজিজুল ইসলাম
Published: 2015-03-13
Category: বিবিধ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%97%e0%a6%a3%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%a8/

মেঘলা আকাশ, চৈত্রের দাবদাহের পূবার্ভাস, দেশজুড়ে হতাশা, কী হচ্ছে, হতে যাচ্ছে-ই বা কী! আর কতো পুড়বে মানুষ, কারো কী আমাদের আছে কোন নিরাপত্তা? যখন তখন যে কেউ পড়ে যেতে পারি বিপদে, পথ চলতে চলতে মারাও যেতে পারি আমরা যেকোন সময় অথবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গু। মনে প্রশ্ন জাগে, এ-কী বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে আমরা বাস করছি!  
একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজকের এই পরিস্থিতির উদ্ভব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ সাধন। তৎকালীন সরকার না হয় ক্ষমতা যাতে কোনদিন ছাড়তে না হয় অথবা আগামী পাঁচ বছর যাতে আরো ক্ষমতায় থাকা যায়, সেকারনে এই ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করেছে। কিন্তু সেজন্য সাধারন অসহায় নিবির্শেষে দেশের সকল মানুষকে পেট্রোলবোমা মেরে পুড়িয়ে ফেলে বিএনপিকে উক্ত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পূন:প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে হবে? পেট্রোলবোমার কাতরানী বিএনপি নেতাদের কানে পৌঁছায়না? উনারা বলবেন, ৩রা জানুয়ারী থেকে কেন সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে আটকিয়ে রেখেছে? এটাও ঠিক হয়নি মানলাম। কিন্তু তার জন্য সাধারন মানুষ কী করল, নিম্ন থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের যে নাভি:শ্বাস উঠছে দিন যাপনের ব্যবস্থা করতে, জীবনের তাগিদে বেরিয়ে যে মানুষটি পেট্রোলবোমায় মারা যাচ্ছে অথবা দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, কেন এই সকল কমর্কান্ড সরকারকে বাধ্য করার জন্য করতে হবে? জনগণের জন্য বিএনপি বিগত ছয়টি বছর কিছুই করেনি, শুধুই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে কিছু হুংকার দিয়েছে, সেই বিএনপির জন্য মানুষ কেন করবে, কেন তাদের ডাকে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়বে? এটা আশা কেন করে সংগঠনটি? বলবেন, নিবার্চন দিয়ে দেখুক না সরকার, দেয়না কেন।  
সেটা একটা কথা হতে পারে। কিন্তু আপনাদেরও বলতে হবে, কেন আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারছেন আপনারা? কিসের আন্দোলন এটা? এটা তো হত্যা, নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা করা। আন্দোলনে কেউ একটা গাড়ী পযর্ন্ত ভাঙ্গতে পারেনা, ভাঙ্গলে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে নীতিগতভাবে বাধ্য সে। বলতে পারেন, তাহলে আন্দোলন দানা বাঁধবে কীভাবে? সেটা সাধারন জনগণ জানবে কেন? তারা কোনও রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট নয়, কেন তারা আপনাকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নিজের ক্ষতির শিকার হবে? আর এখন তো জান পযর্ন্ত নিয়ে নিচ্ছেন আপনারা। মনে রাখবেন মহান আল্লাহ-তা’লা কোনদিন ছাড়বেননা আপনাদেরকে। আপনাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অভিশাপ এপযর্ন্ত যাঁরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তারা কী দেবেনা?  
আর আন্দোলন দানা বাঁধিয়ে তোলা লাগেনা। মানুষের কাছে যে আন্দোলন যৌক্তিক মনে হবে, সেটা আপনা-আপনিই দানা বেঁধে উঠবে। স্বাধীন এদেশে আসলে একানব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন, চুরানব্বইয়ের জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীর আন্দোলন আর ২০১৩-র গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ব্যতীত দানা বেঁধে ওঠার মতো কোন আন্দোলন হয়ইনি এদেশে। সফলও হয়েছে সেগুলি। আর কোন আন্দোলন জণসম্পৃক্ততা পায়নি বলে সফলও হয়নি।  
ছিয়ানব্বইয়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীর আন্দোলনে গণমানুষের সম্পৃক্ততা আগের তিনটি আন্দোলনের মত করে ছিলনা। তাই উক্ত আন্দোলনে অনেক লোকক্ষয় হয়েছিল। ওটা ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ পিচ্ছিল করার আন্দোলন, মুখে ছিল যা গণতন্ত্রের আন্দোলন। তাই বর্তমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পূন:প্রতিষ্ঠার দাবীতে সরকারকে বাধ্য করতে হলে বিএনপিকে সুনির্দিষ্ট কমর্সূচী নিয়ে জনগণের কাছে আসতে হবে। আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে তারা যুদ্ধাপরাধী এবং জঙ্গীবাদীদের সাথে সম্পকর্চ্ছেদ করবে, যুদ্ধাপরাধের রায়গুলি বাস্তবায়ন করবে, অতীতে দুর্নীতি করার জন্য ক্ষমা চাইবে, আর কখনো দুর্নীতি করবেনা এরকম এবং যারা তা করবে, তাদের সাজার ব্যবস্থা করবে, এসমস্ত ওয়াদা দেশবাসীর কাছে তাদেরকে করতে হবে। তখনই কেবল জনগণকে পাশে তারা পেলে পেতে পারে। আর তখনই কেবলমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুণ:প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার বাধ্য হতে পারে। অন্যথায় সরকার কখনো বিএনপির কথা মানবেনা এবং উভয়পক্ষের জিদাজিদি চলতেই থাকবে আর মধ্যে থেকে মানুষের জানমাল আরো অনিরাপদ হয়ে পড়বে।  
আওয়ামী লীগকে আজ হোক কাল হোক, কমপক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদ নিবার্চনের পথ থেকে সরে আসতে হবে। কারন দমনপীড়নের যে পথ তারা গ্রহন করেছে, তাতে সহিংসতা আরো বাড়বে এবং বাড়তে বাড়তে হয়তো এমন একটা পযার্য়ে যেতে পারে এই সহিংসতা যে, জানমালের চরম ক্ষয়-ক্ষতি হওয়া শুরু হলো, তখন হয়ত তত্ত্বাবধায়ক অথবা অন্যকোন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পন করতে হতে পারে তাদের।  
কারন দু’টি- (১) সরকার সেনাবাহিনী ব্যবহার করতে চায়না। কাজেই সেভাবে চলমান সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব নয়; শক্তি দিয়ে জনগণের হৃদয় থেকে উৎসারিত যে দাবী, তা কখনো দমন করা যায়না। কিন্তু বিএনপির এই আন্দোলন-সহিংসতা সেরকমটা মোটেই নয়, এটা বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার নিছক লড়াই মাত্র, এতে জনগণের এমনকি সমথর্ণও নাই, সম্পৃক্ততা তো অনেক দুরের ব্যাপার। তাই সেনাবাহিনী দ্বারা এই কমর্কান্ড কিছুদিনের জন্য হলেও নিবৃর্ত্ত করা যায়। কিন্তু যেকোন কারনেই হোক, সেপথে যাবেনা সরকার, জরুরী অবস্থাও জারী করবেনা। (২) জনতাকে প্রতিরোধের জন্য ডাক দিতে হবে সরকারকে। কিন্তু ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ জনতা এতে সাড়া দেবেনা। সরকারের বিগত ছয় বছরের শাসনামলের দুর্নীতি আর দলপ্রীতি এবং দুর্নীতিবাজদেরকে শাস্তি না দেওয়ার মাধ্যমে প্রকারান্তরে একে উৎসাহিত করার কারনেই প্রধানত: মানুষের সাড়া মিলবেনা। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু করার জন্য মানুষ এ সরকারের উপর সন্তুষ্ট ছিল শেয়ারবাজারের ধ্বস সত্ত্বেও। কিন্তু কেন যেন গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সাথে তূলনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, ওদের মত সরকার এবিষয়ে ততখানি আন্তরিক নয়। আর সবর্শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়ার কারনে একধরনের অনাস্থা-ই পোষণ করে মানুষ এই দলটির প্রতি। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেক নেতা গত সংসদ নিবার্চনের আগে বলতেন, তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা দিয়ে দিলেই হয়। আসলে মাননীয় শেখ হাসিনা দলবাজদের টানতে গিয়ে জনগণকে হারাতেই বসেছেন। মানুষ কিন্তু আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল, যেজন্য তারা ২০০৮-এ দলটিকে নিরঙ্কুশ সমথর্ণ দিয়েছিল এবং এখনো বিশ্বাস করি যে, এখনো তারা পূণ:রায় সমর্থণ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এই আওয়ামী লীগকে নয়, সম্পূর্নরুপে পরিবর্তিত আওয়ামী লীগকে।  
সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে এখন যা করতে হবে, তা হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা এর আদলে কিছু একটা করার ঘোষণা দিতে হবে, যাতে তাঁর নেতৃত্বে নিবার্চন হবেনা বলে বলা থাকবে। সংসদ নিবার্চন এক বছর পর হওয়ার কথা থাকবে এবং এই এক বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে জনগণের মন জয় করতে হবে ২০০৮-এর নিবার্চনের সময়কার মত করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচন্ড অবস্থান নিয়ে, দুর্নীতিবাজদেরকে সাজা দিয়ে, সম্পূর্ন সততার সাথে দেশের পৌণে তিনলাখ সরকারী শুন্যপদ পূরণের মাধ্যমে আর প্রমানিত সন্ত্রাসীদেরকে কঠোর-কঠিন সাজা প্রদানের মাধ্যমে মানুষের এই আস্থা অজর্ন করা যেতে পারে। এসমস্ত করলে বাকিটা যোগান দেবে এ সরকারের কট্টর জামায়াত-যুদ্ধারাধ বিরোধীতা।  
জাতীয় সনদ বলিনা, কারন ওটার প্রয়োজনীয়তা এমুহুর্তে ততোটা নাই বলে মনে করি। কারন এমুহুর্তে দু’টি দলের মধ্যে কিছু বিষয়ে একমত হওয়ার মতো অবস্থা বিরাজ করছে। এরা একমত হলেও আসলে ঐকমত্যটা স্থায়িত্ব পাবেনা। তখন জাতীয় সনদের জন্য প্রেশার আসবে। সেটা তখনকার কথা, এখন যেসমস্ত বিষয়ে দু’দলকে একমত হতে হবে, সেগুলো হলো-  
(১) ক্ষমতায় যেদলই যাক, অন্য দলকে তা মেনে নিতে হবে যদি দেখা যায় যে বিশ্বাসযোগ্য নিবার্চন হয়েছে। নিবার্চন বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে কি-না, তা বোঝা যায় আসলে। এটার কোন মাপকাঠি নাই, বিবেক-ই এটার মাপকাঠি।  
(২) নিবার্চনের পর বিরোধীদল দলন কোনমতেই চলবেনা। আগে যা-ই ঘটে থাকুক-না-কেন, এখন থেকে রাজনৈতিক কারনে কারো উপর কোন অত্যাচার করা যাবেনা। পরিবারের সদস্যের মত অন্য দলের রাজনীতিবিদদের সাথে আচরণ করতে হবে।  
(৩) নিবার্চনকালীন সরকার : নিবার্চনকালীন সরকারব্যবস্থায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকা যাবেনা, থাকলে সমঝোতা আপাতত: হলেও উক্ত সরকার পরিচালনার সময় অসুবিধা দেখা দেবে। তাই অরাজনৈতিক ব্যক্তিগণের সমন্বয়ে হতে হবে এই সরকার। এ উদ্দেশ্যে দুইদল থেকে সমান সংখ্যক অরাজনৈতিক, নিদর্লীয় ২০, ৩০ অথবা ৪০ জন ব্যক্তির একটি তালিকা প্রস্তুত করে সেটা থেকে ১১ জন উপদেষ্টা নিবার্চিত করতে হবে জনগণের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ভোটের ভিত্তিতে। এক মোবাইল এক ভোট, একের অধিক যাতে কেউ ভোট দিতে না পারে, প্রযূক্তির মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা করা যায়। এভাবে ১ জন প্রধানসহ ১১ জন মানুষের (মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভোট) ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত উপদেষ্টাগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় নিবার্চন করতে হবে।  
মানুষের মোবাইল ফোন ভোটের মাধ্যমে আমাদের নির্বাচন কমিশনও সাজাতে হবে। কারন এই কমিশনকে অবশ্য অবশ্যই যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে। নতুবা সাষ্ঠুভাবে নির্বাচন করা সম্ভব হবেনা। রাজনীতি যাতে এই প্রতিষ্ঠানে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করতে না পারে আর রাজনীতিবিদদের প্রতি সমীহতার কারনে, ভয়ের কারনে এসকল প্রতিষ্ঠান যাতে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে কোনরকমভাবে বাধাগ্রস্থ না হয়, সে ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। নতুবা বার বার গণতন্ত্র আমাদের হোঁচট খাবে এবং প্রতিবারই অনেক মানুষের অতি মূল্যবান জীবন নাশ হবে, যেটা কারো কাম্য হতে পারেনা।  
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আজ হোক বা কাল হোক, রাজনীতিবিদদের কায়েম করতেই হবে। তবে সেটা কত মানুষের জীবনের বিনিময়ে আর কত সম্পদ নষ্টের বিনিময়ে এবং এমনকি একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রান্তসীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর, না-কি সেই গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হওয়ার পর কায়েম হবে সেই ব্যবস্থা, সম্মানিত রাজনীতিবিদদেরই নিতে হবে সেই সিদ্ধান্ত ।
