# ক্রিকেটে পুঁজিবাদ, ভারত বিরোধীতা ও  বাংলার আবেগ

Author: অপার্থিব
Published: 2016-03-23
Category: খেলাধুলা, সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%9f%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%ac/

যারা এখনো শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে খেলাধুলাকে বিনোদন আর শরীর গঠনের উপায় মনে করেন তারা এখনো বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। ফুটবল ক্রিকেট সহ সকল জনপ্রিয় খেলা অনেক আগেই বাণিজ্যের উপকরনে পরিণত হয়েছে। ফিফা, আইসিসির মত সংঠন গুলোও এখন কর্পোরেট স্বার্থের সুতিকাগার। কর্পোরেটদের প্রধান স্বার্থ মুনাফা। ইন্ডিয়ার ১২৫ কোটি জনসংখ্যা, বিশাল মার্কেট তাই ইন্ডিয়ার স্বার্থ সংরক্ষণ করা কর্পোরেট স্বার্থের জন্যই সহায়ক। ইন্ডিয়ার চেয়ে বিশাল কোন মার্কেটের সন্ধান পেলে এই কর্পোরেটরা ইন্ডিয়াকেও ছেড়ে দিতে দ্বিধা করবে না এটাই বাস্তবতা। কাজেই যারা আইসিসিকে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল বলে উপহাস করছেন তারাও ভুল করছেন। আইসিসি ইন্ডিয়া চালায় না , আইসিসি চালায় কর্পোরেটরা।  
![sw](http://s21.postimg.org/8okfbb30n/CAdd_HOh_WYAAXuu_T_1.jpg)

একটা সময় ছিল যখন খেলাটাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব আর বিনোদনের উপকরন হিসেবে দেখা হতো। খেলায় জয় পরাজয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল খেলার স্পিরিট। খেলোয়াড়রা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব আর দর্শকদের বিনোদিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নামত। দর্শকরাও নির্মল বিনোদন পাওয়ার আশায় মাঠে আসতো। বিপক্ষ দলের কেউ ভাল খেললেও হাততালি দিত। পুঁজিবাদের আগ্রাসনে খেলার সেই ষ্পিরিট এখন ধবংসের পথে। পুঁজিবাদ মানুষের মৌলিক চাহিদা ও বিনোদনের ক্ষেত্রগুলোকেও মুনাফার উপকরণে বানিয়ে ফেলে। দর্শক এবং খেলোয়াড় উভয়ের মধ্যে তৈরী করে যে কোন মুল্যে জিতার মানসিকতা। একটা টিম যখন জিততে শুরু করে তখন সেই জয়ের হাত ধরেই আসে কর্পোরেট স্পন্সরশীপ। কাজেই জয় ভিন্ন অন্য কিছু তাদের কর্পোরেট স্বার্থের জন্য সহায়ক নয়। এই জয়ের নেশায় প্রতিটি খেলোয়াড় তাদের কাছে হয়ে উঠে একজন আদর্শ “বিজনেসম্যান”। খেলার যে উদার চেতনা সেই চেতনা ধবংস হয়, খেলায় ঢুকে পড়ে আন্ডার আর্ম বোলিং, স্লেজিং, ম্যানক্যাডিং। প্রচারযন্ত্র ও গণ মাধ্যমও তাদের নিয়ন্ত্রনে। এই প্রচারযন্ত্র ও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু গুলো থেকে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরিয়ে ফেলা হয়। খেলা শুরুর আগেই অমুক ম্যাচে হারের বদলা নিতে হবে, তমুককে দেখিয়ে দিতে হবে টাইপের কৃত্তিম উন্মাদনা তৈরী করা হয়। এই ক্ষনিকের উন্মাদনায় মানুষ ভুলে যায় তাদের দৈনন্দিন সমস্যা, বেনিয়াদের শোষণ। ক্রিকেট কাজ করে আফিমের নেশার মত। পুঁজিবাদ তার নিজ স্বার্থেই জাতীয়তা বাদকে প্রমোট করে। শ্রমিক শ্রেনীকে দুর্বল করতে তাদের নিজ শ্রেণী সত্ত্বার বাইরে জাতীয় সত্ত্বাকে গুরুত্ব দিতে শেখায়। দেশে দেশে জন্ম হয় উগ্র জাতীয়তাবাদ। মওকা মওকা ভিডিও, তাসকীনের হাতে ধোনির কাটা মুণ্ডু তারই কিছু সাম্প্রতিক নিদর্শন। কাজেই অমুক ধারাভাষ্যকার বাংলাদেশকে কটাক্ষ করছে শুনে আপনি যখন “কি এত বড় সাহস” বলে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠছেন জেনে রাখবেন আপনি আসলে কর্পোরেটদের পাতানো ফাঁদেই পা দিচ্ছেন।

এদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধী দুই ধরণের মনস্তত্ব কাজ করে। একটি হচ্ছে ফারাক্কা, তিস্তা, বানিজ্য ঘাটতি, সীমান্তে গুলি সহ নানা ক্ষেত্র থেকে উদ্ভুত নির্যাতিত মনস্তত্ব এবং আরেকটি হচ্ছে সাম্প্রদায়ীক মনস্তত্ব অর্থাৎ ওরা মালাউন কাফের, সারাজীবন আমাদের ক্ষতি করতে চায় এই জাতীয় ভাবনা। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই দুই ধরনের মনস্তত্ব ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে এক হয়ে যায়। ফলে এক দিক দিয়ে দেখলে ক্রিকেট এদেশে বাম ও ডান উভয় শ্রেনীর মধ্যে মেকি জাতীয় ঐক্যও তৈরী করে বটে। যদিও বাংলার জনগণের ভারত নির্ভরতা বহুমুখী ও ঐতিহাসিক। সেটা আলু ভর্তায় ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ থেকে শুরু করে টিভি রুমে দীপিকা পাডুকোন, বেডরুমে সানি লিওন পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্ত একদিকে বঞ্চনা-নির্যাতন এবং অন্য দিকে সাম্প্রদায়ীকতা এই দুটোর ফিউশন থেকে উদ্ভুত অত্যন্ত শক্তিশালী এই ভারত বিরোধী মনস্তত্বের কাছে ভারত নির্ভরতা বিশাল ব্যবধানে হেরে যায়। যে কোন মুল্যে ভারতকে হারানোই তখন এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হয়ে যায়। মানুষ ভুলে যায় দুই দলের শক্তির ব্যবধান কিংবা ক্রিকেট ঐতিহ্য। ক্রিকেট ম্যাচে ভারতকে হারানো তাদের কাছে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে হারানোর সমতুল্য বলে মনে হয়। সেই লক্ষ্য পূরণ না হলে ষড়যন্ত্র, অন্যা্‌য় অবিচার প্রভৃতি তত্ব হাজির করে সান্তনা খোঁজার চেষ্টা করা হয়। স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ষড়যন্ত্র খোঁজা বাঙ্গালী কালচারের অংশ, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ইলেকশনে হারলেও বাঙ্গালীরা ষড়যন্ত্র খোঁজে! পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফরের ষড়যন্ত্রের গল্প শোনে নাই এমন বাঙ্গালী খুব কমই আছে এদেশে। তখন থেকেই এটা বাঙ্গালীর ডিএনএ তে ঢুকেছে কিনা কে জানে। ছোটবেলায় পড়েছিলাম ঘর পোড়া গরু নাকি সিদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায় !!!  
![sdd](http://s18.postimg.org/p9ax15kq1/e7627f167ecbb50e930f6a706700770b.jpg)

তাহলে কি তাসকীন সানি অন্যায় অবিচারের শিকার নয় ? সত্যি বলতে কি ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতিতে বিশ্বজুড়ে প্রতিটি ক্রিকেট প্রেমীর খুশিই হওয়া উচিত তা তিনি অস্ট্রেলিয়ান, ইংলিশ, ইন্ডিয়ান যেই হোন না কেন। ক্রিকেট এমনিতেই যেখানে হাতে গোণা মাত্র কয়েকটি দেশ খেলে সেখানে নুতুন কোন দেশের উঠে আসা নিঃসন্দেহে খেলাটার জন্যই মঙ্গলজনক। আমার ধারনা প্রতিটি প্রকৃত ক্রিকেটপ্রেমীই সেটা বোঝে। বাংলাদেশের অসাধারণ উন্নতিতে তাদের সবারই খুশি হওয়া উচিত এবং তারা হচ্ছেও। কিন্ত সেই বাংলাদেশের কাছে নিজেদের টিমের হার মেনে নিতে তাদের এখনো অনেক কষ্ট হয়। তারা বাংলাদেশের উন্নতি ঠিকই চায় কিন্তু দ্রুত উন্নয়নশীল সেই বাংলাদেশের কাছে নিজেদের টিমের হার এখনো ঠিকভাবে মেনে নিতে পারে না। নবীন ক্রিকেট ঐতিহ্যের সেদিনের সেই পুচকে বাংলাদেশ তাদের মত সমৃদ্ধ অতীত সম্পন্ন প্রতিষ্ঠিত দেশকে হারাবে এই জাতীয় ভাবনা তাদের ইগোতে তুমুল আঘাত করে। ক্রিকইনফোতে মন্তব্যের সুবাদে এমন ইগোওয়ালা ভারতীয়কে কম দেখা হয় নাই। উল্লেখ্য একশন রিপোর্টকারী দুই আম্পায়ারের একজন অষ্ট্রেলীয় এবং অপরজন ভারতীয়। ব্যক্তিগত ভাবে আমার ধারণা এরকম এক ইগোর লড়াইয়ের বলি হয়েছে তাসকীন-সানি ।

কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে আপনাকে সঠিক কৌশল অবলম্বন করে টিকে থাকতে হবে। আইসিসি বাংলাদেশের কোন সংগঠন না। বাংলার জনগণের আবেগ অনুভূতির কোন মুল্য নেই তাদের কাছে, তাদের কাছে মূল স্বার্থ একটাই, মুনাফা। মনে রাখবেন শাহবাগে আইসিসি বিরোধীতার নামে আপনি যখন ভারতকে গালি দিচ্ছেন তখন কিন্ত দেশী বিদেশী মিডিয়াগুলো সেটা ফলাও করে প্রচার করছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের মানুষ বিশেষ করে ভারতীয়দের মধ্যে বাংলাদেশ বিরোধী আবেগ আরো শক্তিশালী হচ্ছে। আইসিসির মার্কেট ষ্ট্রাটেজি যেহেতু ভারত নির্ভর তাদের কাছে ভারতীয়দের আবেগ অনুভূতি গুরুত্ব পেতে পারে, বাংলাদেশেরটা নয়। এটাই বাস্তবতা, আপনি চান বা না চান এটা আপনাকে মানতে হবে। বিশ্বকাপে নো বল কান্ড এবং সাম্প্রতিক তাসকীন সানি ইস্যুতে অতি প্রতিক্রিয়া ক্রিকেটের বৈশ্বিক কুটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ খানিকটা্ দুর্বল করে ফেলেছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব কি হতে পারে তা জানার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। মনে রাখবেন এক সময় ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম নির্ধারণের পুরো দায়িত্বটাই ছিল আই সি সির হাতে, এখন আর সেটা নেই। এখন ক্রিকেট বোর্ডগুলোই নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে খেলার সূচি নির্ধারণ করতে হয়। ক্রিকেট কুটনীতিতে সফল হওয়ার জন্য সফল আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা তাই এখন অত্যন্ত জরুরী।
