# কাব্যগ্রন্থ * বনলতা সেন * – জীবনানন্দ দাশ

- Author: [বনলতা সেন](https://sonelablog.com/author/bonolota/)
- Published: 2012-10-18T16:30:14+00:00
- Updated: 2012-10-18T16:30:14+00:00
- Category: [কবিতা](https://sonelablog.com/category/literacy/poetry/), [সাহিত্য](https://sonelablog.com/category/literacy/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%80/

---

***বনলতা সেন** * **কাব্যগ্রন্থ**

বাংলা কবিতায়  বনলতা সেন কবিতাটিই সবচেয়ে বেশী পঠিত কবিতা বলে মনে হয় আমার কাছে। কবিতাকে ভালবাসেন অথচ এই বনলতা সেন কবিতা পড়েননি এমন মানুষ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে।

[!\[\](http://www.jeshan4u.com/wp-content/uploads/2012/10/911_bonolota-sen1-185x300.jpg)](http://www.jeshan4u.com/wp-content/uploads/2012/10/911_bonolota-sen11.jpg)

বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের ২৯ টি কবিতা থেকে আজ ১৫ টি কবিতা দিলাম। অবশিষ্ট ১৪ টি পরের পোস্টে দিব।

 

**বনলতা সেন**

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাটিতেছি পৃথিবীর পথে,  
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে  
অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে  
সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে ;  
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারি দিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,  
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,  
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতি দূর সমুদ্রের পর  
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা  
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,  
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’  
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন  
সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ;  
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন  
তথন গল্পের তরে জেনাকীর রঙে ঝিলমিল ;  
সব পাখী ঘরে আসে – সব নদী – ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন ;  
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

 

**কুড়ি বছর পরে**

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি  
আবার বছর কুড়ি পরে-  
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে-  
কার্তিকের মাসে-  
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে – তখন হলুদ নদী  
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে!  
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,  
ব্যস্ততা নাইকো আর,  
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়  
পাখির নীড়ের থেকে খড়  
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল।  
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি, বছরের পার,-  
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!  
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে  
সরু -সরু কালো-কালো ডালপালা মুখ নিয়ে তার,  
শিরীষের অথবা জামের,  
ঝাউয়ের-আমের;  
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!  
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার-  
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!  
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে-  
বাবলার গলির অন্ধকারে  
অশথের জানালার ফাঁকে  
কোথায় লুকায় আপনাকে!  
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে।  
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার করে নিয়ে গেছে তারে-  
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!

 

**ঘাস**

কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয়  
পুথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;  
কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস-তেমনি সুঘ্রাণ-  
হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিড়ে নিচ্ছে।  
আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো  
গেলাসে – গেলাসে পান করি,  
এই ঘাসের শরীর ছানি- চোখে চোখে ঘষি,  
ঘাষের পাখনায় আমার পালক,  
ঘাষের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোন এক নিবিড় ঘাস-মাতার  
শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।  
**হাওয়ার রাত**

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল- অসংখ্য নক্ষত্রের রাত  
সারারাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে  
মশারিটা ফুলে উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,  
কখনো বিছানা ছিঁড়ে  
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে,  
এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার- আধো ঘুমের ভিতর হয়তো-  
মাথার উপরে মশারি নেই আমার  
স্বাতী তারার কোল ঘেঁসে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো উড়ছে সে!  
কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।  
সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল-আকাশে একতিল ফাঁক ছিল না;  
পৃথিবীর সমস্ত ধূসরপ্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি;  
অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চুড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির – ভেজা চোখের মতো  
ঝলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা;  
জোছনারাতে বেবিলনের রানির ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার  
শালের মতো জ্বলজ্বল করছিল বিশাল আকাশ!  
কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিল।

নে নক্ষত্রেরা আকাশের্ বুকে হাজার-হাজার বছর আগে ম’রে গিয়েছে  
তারাও কাল জানালার থিবর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে  
যে রুপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে বিদিশায় ম’রে যেতে দেখেছি  
কাল তারা অতিদূরে আকাশের সীমানায় কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে করে  
কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন-  
মৃত্যুকে দলিত করবার জন্য?  
জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?  
প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?  
আড়ষ্ট- অভিভূত হয়ে গেছি আমি,  
কাল রাতের প্রবল নীল অত্যাচার আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছে যেন;  
আকাশের বিরামহীন বিস্তৃর্ণ ডানার ভিতর  
পৃথিবী কিটের মতো মুছে গিয়েছে কাল!  
আর উত্তুঙ্গ বাতাস এসেছে আকাশের বুক থেকে নেমে  
আমার জানালার ভিতর দিয়ে, শাঁই শাঁই করে,  
সিংহের হুঙ্কারে উৎক্ষিপ্ত হরিৎ প্রান্তরের অজস্র জেব্রার মতো!  
হৃদয় ভরে গিয়েছে আমার বিস্তীর্ণ ফেল্টের সবুজ ঘাসের গন্ধে,  
দিগন্ত-প্লাবিত বলীয়ান রৌদ্রের আঘ্রাণে  
মিলনোন্মত্ত বাঘিনীর গর্জনের মতো অন্ধকারের চঞ্চল বিরাট সজীব রোমশ উচ্ছ্বাসে,  
জীবনের দুর্দান্ত নীল মত্ততায়!

আমার হৃদয় পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে গেল,  
নীল হাওয়ার সমুদ্রে স্ফীত মাতাল বেলুনের মতো গেল উড়ে,  
একটা দূর নক্ষত্রের মাস্তুলকে তারায়-তারায় উড়িয়ে দিয়ে চলল  
একটা দুরন্ত শুকনের মতো।

 

**আমি যদি হতাম**

আমি যদি হতাম বনহংস  
বনহংসী হতে যদি তুমি  
কোন এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে  
ধানক্ষেতের কাছে  
ছিপছিপে শবের ভিতর  
এক নিরালা নীড়ে,  
তাহলে আজ এই ফাল্গুনের রাতে  
ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে  
আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে  
আকাশের রুপালী শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম-  
তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন-  
নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালী ফুলের মতো অজস্র তারা,  
শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে  
সোনালী ডিমের মতো  
ফাল্গুনের চাঁদ।

হয়তো গুলির শব্দ;  
আমাদের তীর্যক গতিস্রোত,  
আমাদের পাখায় পিস্টনের উল্লাস,  
আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান!  
হয়তো গুলির শব্দ আবার :  
আমাদের স্তব্ধতা,  
আমাদের শান্তি।  
আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না;  
থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;  
আমি যদি বনহংস হতাম,  
বনহংসী হতে যদি তুমি;  
কোন এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে  
ধানক্ষেতের কাছে।

 

**হায় চিল**

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে  
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে-উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!  
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!  
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;  
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে  
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!  
হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে  
তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!

 

**বুনো – হাঁস**

পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে-  
জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহ্বানে  
বুনো হাঁস পাখা মেলে-শাঁই-শাঁই শব্দ শুনি তার;  
এক-দুই-তিন-চার-অজস্র-অপার-  
রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া  
এঞ্জিনের মতো শব্দে; ছুটিতেছে – ছুটিতেছে তারা।  
তারপর পরে থাকে, নক্ষত্রের বিশাল আকাশ,  
হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ-দু-একটা কল্পনার হাঁস;  
মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ;  
উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জোছনায় নীরবে উড়ুক  
কল্পনার হাঁস সব-পুথিবীর সব ধ্বনি সব রং মুছে গেল পর  
উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের শব্দহীন জোছনার ভিতর।

 

**শঙ্খমালা**

কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে  
সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,  
বলিল , তোমারে চাই :  
বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ  
খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি – কুয়াশার পাখনায় –  
সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক  
জোনাকির দেহ হতে – খুঁজেছি তোমারে সেইখানে –  
ধূসর পেঁচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে  
ধানসিঁড়ি বেয়ে – বেয়ে  
সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে  
তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।  
দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা;  
সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে সেই পাখি দেয় ধরা –  
বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর,  
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ শোনে যার স্বর।  
কড়ির মতন শাদা মুখ তার;  
দুইথানা হাত তার হিম;  
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম  
চিতা জ্বলে : দক্ষিণের শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়  
সে আগুনে হায়।  
চোখে তার  
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!  
স্তন তার  
করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র – কবেকার শঙ্খিনীমালার!  
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।  
ধূসর পেঁচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে  
ধানসিঁড়ি বেয়ে – বেয়ে  
সোনার সিঁড়ির মতো ধানে আর ধানে  
তোমারে খুঁজেছি আমি নির্জন পেঁচার মতো প্রাণে।  
দেখিলাম দেহ তার বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা;  
সন্ধ্যার আঁধারে ভিজে শিরীষের ডালে সেই পাখি দেয় ধরা –  
বাঁকা চাঁদ থাকে যার মাথার উপর,  
শিঙের মতন বাঁকা নীল চাঁদ শোনে যার স্বর।  
কড়ির মতন শাদা মুখ তার;  
দুইথানা হাত তার হিম;  
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম  
চিতা জ্বলে : দক্ষিণের শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়  
সে আগুনে হায়।  
চোখে তার  
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!  
স্তন তার  
করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র – কবেকার শঙ্খিনীমালার!  
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।

 

**নগ্ন নির্জন হাত**

আবার আকাশের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে :  
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।  
যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে  
অথচ যার মুখ আমি কোনদিন দেখিনি,  
সেই নারীর মতো  
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়েছে উঠছে।  
মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা  
সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।  
ভারতসমুদ্রের তীরে  
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে  
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে  
আজ নেই, কোন এক নগরী ছিল একদিন,  
কোন এক প্রাসাদ ছিল;  
মূল্যবাদ আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ;  
পারস্য গালিচা, কাশ্মিরি শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,  
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা;  
আর তুমি নারী –  
এই সব ছিল সেই জগতে একদিন।  
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,  
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,  
মেহগনির ছায়াঘন পল্লব ছিল অনেক;  
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল;  
অনেক কমলা রঙের রোদ;  
আর তুমি ছিলে;  
তোমার মুখের্ রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,  
খুঁজি না।  
ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী,  
অপরূপ খিলান ও গম্বুজের বেদনাময় রেখা,  
লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ,  
অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধূসর পান্ডুলিপি,  
রামধনু রঙের কাচের জানালা,  
ময়ূরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায়  
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের  
ক্ষণিক আভাস –  
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।  
পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,  
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!  
তোমার নগ্ন নির্জন হাত;  
তোমার নগ্ন নির্জন হাত।

**শিকার**

ভোর  
আকাশের রং ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল :  
চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।  
একটি তারা এখনো আকাশে রয়েছে :  
পাড়াগাঁর বাসরঘরে সবচেয়ে গোধূলী – মদির মেয়েটির মতো;  
কিংবা মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে – মুক্তা  
আমার নীল মদের গেলাসে রেখেছিল  
হাজার হাজার বছর আগে এক রাতে তেমনি =  
তেমনি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনো।  
হিমের রাতে শরীর ‘উম্’ রাখবার জন্য দেশোয়ালিরা  
সারারাত মাঠে আগুন জ্বেলেছে –  
মোরগ ফুলের মতো লাল আগুন;  
শুকনো অশ্বত্থ পাতা দুমুড়ে এখনো জ্বলছে তাদের;  
সূর্যের আলোয় তার রঙ কুসুমের মতো নেই আর;  
হয়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।  
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ  
ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।

ভোর  
সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে – বাঁচিয়ে  
নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে  
ঘুরে ঘুরে  
সুন্দর বাদামি হরিণ এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল।  
এসেছে সে ভোরের আলোয় নেমে;  
কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধী ঘাস ছিঁড়ে – ছিঁড়ে খাচ্ছে;  
নদীর তীক্ষ্ণ শীতল ঢেউয়ে সে নামল –  
ঘুমহীন ক্লান্ত বিহ্বল শরীরটাকে স্রোতের মতো একটা আবেগ দেওয়ার জন্য  
অন্ধকারের হিম কুঞ্চিত জরায়ু ছিঁড়ে ভোরের রৌদ্রের মতো  
একটা বিস্তীর্ণ উল্লাস পাবার জন্য,  
এই নীল আকাশের নিচে সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে উঠে  
সাহসে সাধে সৌন্দর্যে হরিণীর পর হরিণীকে চমক লাগিয়ে দেবার জন্য  
একটা অদ্ভুত শব্দ।  
নদীর জল মচকাফুলের মতো লাল।  
আগুন জ্বলল আবার- উষ্ণ লাল হরিণের মাংস তৈরি হয়ে এল।  
নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরনো শিশিরভেজা গল্প;  
সিগারেটের ধোঁয়া;  
টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা;  
এলোমেলো কয়েকটা বন্ধুক- হিম- নিস্পন্দ নিরপরাধ ঘুম।

 

**হরিণেরা**

স্বপ্নের ভিতরে বুঝি- ফাল্গুনের জোছনার ভিতরে  
দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে  
হরিণেরা; রুপালি চাঁদের হাত শিশিরের পাতায়;  
বাতাস ঝাড়িছে ফাঁকে- বনে বনে – হরিণের চোখে;  
হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর মুক্তার আলোকে।  
হীরের প্রদীপ জ্বেলে শেফালিকা বোস যেন হাসে  
হিজল ডালের পিছে অগণন বনের আকাশে-  
বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা আহা;  
ফাল্গুনের জোছনায় হরিণেরা জানে শুধু তাহা।  
বাতাস ঝাড়িছে ডানা, হীরা ঝরে হরিণের চোখে-  
হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর হীরার আলোকে।

 

**বেড়াল**

সারাদিন একটা বিড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলই আমার দেখা হয় :  
গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতর, বাদামি পাতার ভিড়ে;  
কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর  
তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর  
নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হয়ে আছে দেখি;  
কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে,  
সারাদিন সূর্যের পিছনে-পিছনে চলেছে সে।  
একবার তাকে দেখা যায়,  
একবার হারিয়ে যায় কোথায়।  
হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান রং -এর সূর্যের নরম শরীরে  
শাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে;  
তারপর অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনল সে  
সমস্ত পৃথিবীর রভিতর ছড়িয়ে দিল।

 

**সুদর্শনা**

একদিন ম্লান হেসে আমি  
তোমার মতন এক মহিলার কাছে  
যুগের সঞ্চিত পণ্যে লীন হতে গিয়ে  
অগ্নিপরিধির মাঝে সহসা দঁড়িয়ে  
শুনেছি কিন্নরকন্ঠ দেবদারু গাছে,  
দেখেছি অমৃতসুর্য আছে।  
সবচেয়ে আকাশ নক্ষত্র ঘাস চন্দ্রমল্লিকার রাত্রি ভালো,  
তবুও সময় স্থির নয়,  
আরেক গভীরতর শেষ রূপ চেয়ে  
দেখেছে সে তোমার বলয়।  
এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন  
তোমার শরীর; তুমি দান করো নি তো;  
সময় তোমাকে সব দান করে মৃতদার ব’লে  
সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত।

 

**অন্ধকার**

গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার;  
তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া  
গুটিয়ে নিয়েছে যেন  
কীর্তিনাশার দিকে ।

ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম- পউষের রাতে-  
কোনদিন আর জাগবো না জেনে  
কোনদিন জাগবো না আমি- কোনোদিন জাগবো না আর-  
হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,  
তুমি দিনের আলো নও, উদম্য নও, স্বপ্ন নও,  
হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে,  
রয়েছে যে অগাধ ঘুম,  
সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই,  
তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও–

জানো না কি চাঁদ,  
নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,  
জানো না কি নিশীথ,  
আমি অনেক দিন– অনেক অনেক দিন  
অন্ধকারের সারাতসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে  
হঠাত ভোরের আলোর মুর্খ উচ্ছাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব ব’লে  
বুঝতে পেরেছি আবার,  
ভয় পেয়েছি,  
পেয়েছি অসীম দুনির্বার বেদনা;  
দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে  
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য  
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে;

আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়- বেদনায়- আক্রোশে ভরে গিয়েছে ;  
সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদে  
উৎসব শুরু করেছে।  
হায়, উৎসব!

হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে  
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি, অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর  
মতো মিশে থাকতে চেয়েছি।

কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি।  
হে নর, হে নারী ,  
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন ;  
আমি অন্য কোন নক্ষত্রের জীব নই।

যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গীত, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ,  
সেখানেই সূর্য , পৃথিবী, বৃহস্প্রতি, কালপুরুষ, অনন্ত আকাশগ্রন্থি,  
শত শত শুকরীর প্রসব বেদনার আড়ম্বর ;  
এইসব ভয়াবহ আরতী!

গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;  
আমাকে জাগাতে চাও কেন?  
অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠবো না আর ;  
তাকিয়ে দেখবো না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে  
অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে  
কীর্তিনাশার দিকে ।

ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকবো- ধীরে- পউষের রাতে  
কোনোদিন জাগব না জেনে-  
কোনদিন জাগব না আমি- কোনদিন আর।

 

**কমলালেবু**

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব  
আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?  
আবার যেন ফিরে আসি  
কোনো এক শীতের রাতে  
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে  
কোমো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

 

*অসমাপ্ত* –

---

Comments: 7 — https://sonelablog.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%9c%e0%a7%80/#comments
