# লাশের খাটিয়ার মতো একা  (পর্ব – ১)

Author: মুহম্মদ মাসুদ
Published: 2020-06-28
Category: উপন্যাস
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be-2/

১.

ঝুমঝুৃান্তি বৃষ্টি হচ্ছে।

ভরদুপুর। কিছুক্ষণ আগেও আকাশে কোন মেঘ ছিলো না। কাকপক্ষী উড়ছিল দিব্যি। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কারণে রাস্তাটি জনশূন্য। কোথাও কেউ নেই। মাঝেমধ্যে দমকা হাওয়া ভেসে আসছে।

বৃষ্টি আসার আর সময় পেলনা। সবেমাত্র রিকশা থেকে নেমেছি। তারপর থেকে ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি। অবশ্য কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

দোকানি নিমাইয়ের দিকে তাকিয়েই বিরক্ত বোধ করলো। মনে মনে বেশ রাগ হতে লাগলো। কেন বাপু! বৃষ্টি কি তোমাকে বলেকয়ে আসবে নাকি। আল্লায় যখনতখন দিবার পারে। কেন যে মানুষের এতো সমস্যা। এইতো এখনই হয়তো বলবে, কড়া করে একটা চা দ্যান।

মামা! কড়া করে একটা চা দিন। বেশ ঠান্ডা লাগছে। চা খেলে জমবে বেশ।

বসুন। দিচ্ছি। তয় আমার নাম মামা নয়। আমি মজনু, মজনু মিয়া। এইখান থেইক্কা দশমিনিট হাঁটলেই আমার বাড়ি।

ও আচ্ছা।

তয় আপনাকে যে চিনতে পারলাম না। এইহানে নতুন নতুন লাগছ।

হ, আমি এখানে নতুন। আজই এসেছি। হয়তো দুতিনদিন থাকবো।

কার বাড়িত আয়ছেন?

ঠান্ডু মোল্লা। ঠান্ডু মোল্লার বাড়ি আসছি। আপনি চেনেন?

মজনু মিয়া নামটি শুনেই চুপ হয়ে রইলো। কোন কথা নেই। তবে, চোখেমুখে রাগের ছিটেফোঁটা। মনে হচ্ছে কতদিন পুষে রেখেছে।

একটা সিগারেট দিন।

না, তখনও মজনু মিয়ার কোন সাড়াশব্দ নেই। চোখে ঠোঁটে যেন তালাবদ্ধ।

কি হলো? সিগারেট দিন।

থতমত হয়ে এই নেন সিগারেট।

কোথায় সিগারেট আপনি তো বিড়ির প্যাকেট দিলেন।

ও আচ্ছা! ভুল হয়ে গ্যাচে। কোন সিগারেট দিমু?

গোল্ডলিফ।

একটি কথা জিজ্ঞেস করি –

হুমম, করুন। তবে, ঠান্ডু মোল্লাকে নিয়ে নয়।

কেন? কি হয়েছে?

না, তেমন কিছুই নয়। আগে বলেনতো আপনে এইখানে ক্যান আইচেন?

না, তেমন কোন দরকার আসি নাই। এই আরকি…

এই আরকি মানে! খুইল্যা কওন যায় না।

যাবে না কেন? অবশ্যই যায়।

তবে যে…

আসলে আমি এখানে এসেছি একটি রহস্যের গল্প লিখতে। শুনেছি এখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে।

হ, ঠিকি শুনছেন। এইখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। আপনে কি লেখক? কই আপনের নাম কুনদিন শুনি নাই? ও আচ্চা। আপনের নাম কি?

না, এখনো লেখক হয়ে উঠিনি। আর আমার তো জনপ্রিয়তা নেই। জনপ্রিয় হলে জানতেন। আমার নাম নিমাই।

হ, এইজন্য তো কই, মাঝেমধ্যে পত্রিকা পড়ি কিন্তু আপনের লেখা তো পড়িনি। রাগ করলেন কি?

না মামা। রাগ করবো কেন।

বৃষ্টি বাড়ছে।

তবে বাতাস একটু বেশি। গাছের ডালে শোঁ শোঁ আওয়াজটা একটু বেশি।

শব্দ। শুধু টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর নেই। বাতাসের সাথে মিশে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হঠাৎই বিদ্যুৎ চলে গেলো।

শালার একটু বাতাস বেশি অইলেই বিদ্যুৎ চইল্যা যায়। কি যে একটা অবস্থা। কখন যে আসে?

কেন মামা? কতক্ষণ লাগতে পারে?

তা কইতে পারি না। বিদ্যুৎের কি কোন ঠিক ঠিকানা আচেনি। এই আসে এই যায়।

ইস্! তাহলে তো বড্ড লস হয়ে গেলো।

কেন? আপনের আবার কি লস অইলো। এইতো দেকচি দিব্যি আচেন।

বৃষ্টিতে মোবাইলে ভিজে গেছে। অন হচ্ছে না। ভাবছিলাম…

এইখানে বইয়া থাকেন। বিদ্যুৎ আইলে তারপর না হয় যায়েন।

হ, মামা। ঠিক কথা বলেছেন।

আপ্নেরে আরেকটা চা দিই।

দিন আরেকটি। তবে সাথে একটি সিগারেট।

চায়ের কাপে চুমুক দিলো। দুর্দান্ত চা। আগেরবারের চেয়ে ভালো। এ-সব টঙ দোকানের চা সাধারণত ভালো হয়না। কিন্তু এই চা’টা বেশ ভালো হয়েছে।

নিমাই বললো, চা খুব ভালো হয়েছে।

মজনু মিয়া মিষ্টি হাসিমুখে বললো, এমন কথা ম্যালাদিন শুনিনি। আপনেই কইলেন। পরানডা জুড়ায় গেলো।

মামা, বৃষ্টি তো মনে হয় আরো বাড়ছে। মনে হচ্ছে সহজে ছাড়বে না।

মজনু মিয়া দোকানের ছাউনির দিকে তাকিয়ে বললো, জ্বি, ঠিক কথা কইছেন। ফাটাফাটি বৃষ্টি হইতেছে। আইজকা শুধু খিচুড়ি আর গরুর মাংস খাওয়ার দিন।

নিমাইয়ের জিভে…।

চারদিক অন্ধকার।

হঠাৎই আচমকা অন্ধকার।

অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু বাতাসের একটানা শোঁ শোঁ আওয়াজ।

হাসি।

হঠাৎই খিলখিলিয়ে হাসি। বৃষ্টির মধ্যে খিলখিলিয়ে হাসি। এরকম খিলখিলিয়ে হাসি সাধারণত শোনা যায় না। তাও আবার এরকম অন্ধকার, শোঁ শোঁ বাতাসের আঁচড়, বৃষ্টির মধ্যে? না রহস্যের গন্ধ আশেপাশে ম-ম গন্ধে ভেসে বেড়াচ্ছে।

মামা!

জ্বি, বলেন।

হাসির শব্দ শুনলেন?

হ, শুনচি তো।

কে হাসলো?

কে আবার অইবো। যদু পাগলা ছাড়া আবার কে?

যদু পাগলা?

হ, যদু পাগলা। খুবই শিক্ষিত ছিলো। গানবাজনাও করতো। ঐতো…, ঐতো…,

ঐতো, ঐতো কি মামা?

না, কওন যাইতো না। বেড়ারও কান আছে।

আমারে খুলে বলেন।

মজনু মিয়া শীতল গলায় বললো, এখানে তো ক’দিন থাকবেন। তা নিজেই বুঝতে পারবেন।

হিসাব যেন মিলছে না।

দরকষাকষির হিসেব। চারদিকে আঁধারে নিশ্বব্দ রহস্যের হিসেব।

যদু পাগলারে নিয়া ভাবতাছেন?

জ্বি, আপনি জানলেন কিভাবে?

অনুমান করে।

অনুমান করে কি জানা যায়?

কেন জানা যাবে না? যদু পাগলা যদি ভবিষ্যতের কথা কইতে পারে তবে আমি অনুমান করে কইবার পারমু না কেন?

কি বলছেন? সত্যি কি ভবিষ্যতের…?

হ, সত্যি কইতাছি। গ্রামের বেক্কেই জানে।

কেমন ভবিষ্যতের কথা?

শুনবেন আপনে…

বৃষ্টি যেহেতু থামছেই না তখন শোনায় যায়…

দক্ষিণ পাড়ার ঘটনা। এইতো গেলো কয়দিন আগে। শরীফ তখন শহরে ছিলো। শহরে কিসের যেন কামকাজ করে। হঠাৎ একদিন শরীফের বউ কাঁনতে কাঁনতে বাজারের দিকে যাইতেছিলো। আমি ডাক দিয়া জিজ্ঞেস করলাম কি অইছে। কিন্তু কোনকিছুই বললো না। বাজারের দিকে শুধু হাঁটতেই ছিলো, হাঁটতেই ছিলো। বেশ কয়েকবার ডাক ছিলাম। কিন্তু ফিরেও তাকায়লোনা। অবশ্য, কিছুক্ষণ পর দেহি ডাক্তার লইয়া বাড়ির দিকে যাইতেছে। পরে শুনি শরীফের পুলাডা পানিতে পড়ছিল।

তাহলে যে বললেন যদু পাগলা ভবিষ্যতের কথা বলতে পারে।

হুমম, পারেই তো।

কিভাবে পারে?

আগে তো শুনবেন নাকি?

জ্বি, বলুন। আমি তো ভেবেছিলাম আপনার গল্প বলা শেষ।

আরে না! এহনো শ্যাষ অয় নাই।

শুনুন –

ঐ দিনের পর পুলাডার শরীরে জ্বর বাসা বাঁধে। কালাজ্বর। জমিরউদ্দীন ডাক্তার কত্তো শত ওষুধ বাইট্টা খাওয়াইলো কিন্তু কিছুতেই জ্বর কমতে ছিলোনা। শরীফ শহরের বড় ডাক্তারকে দেখিয়ে আমার দোকানে পুলাডারে নিয়া কিছুক্ষণ বসেছিল। সেদিন কোত্থেকে যেন যদু পাগলা হুট করে চলে আসে। আর শরীফেরে বলে সামনের শুক্রবার দরগাহ শরীফে দুইটা মোরগ মানত কর। তোর পুলা ভালো অইয়া যাইবো। নইলে তোর কপালে দুক্কু আছে। পরের শুক্রবার ঠিকই আসলো। কিন্তু শরীফ দরগাহ শরীফে মোরগ করলো না। ঠিক তার পরের দিন পুলাডার শরীরে প্রচন্ড জ্বর এসে ভিড় জমলো। এত্তো কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে শ্যাষম্যাশ ওপারেই চইল্যা গেলো। তখন থেইক্কা গ্রামের সক্কলেই যদু পাগলের কথা বিশ্বাস করতে লাগলো।

নিমাই কিছুটা হতাশ হয়েই বললো, আমার বিশ্বাস হলো না। এখানে ভবিষ্যতের কিছুই তো পেলাম না।

কি বলেন আপ্নে? একথাও আপনের বিশ্বাস অইলো না। তাহলে, আরেকটি ঘটনার কথা শুনুন।

আরও ঘটনা আছে।

হ, আছে। ম্যালা ঘটনা আছে।

তাহলে বলুন। শুনি…

শরীফের পুলাডা মইরা যাওয়ার কিচুদিন আগে। আইজকার মতোই সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ঝুমঝুমান্তি বৃষ্টি। কিন্তু হঠাৎ করেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো। সত্যি! বহুবছর এইরকম বিদ্যুৎ চমকানি দেখিনি। আইজকার মতোই যদু পাগলা ঐখানটায় বসে হাসতে ছিলো। আর বৃষ্টির সাথে রঙবেরঙের কথা বলচিলো।

তপনদা। হিন্দু মানুষ। যদু পাগলারে মোটেই পছন্দ করতো না। যদু পাগলা নাকি তপনদার বাড়ি থেইক্কা মুরগী চুরি কইরা বেঁইচা দিচিলো। সেই থেইক্কা যদু পাগলারে তপনদা পছন্দ করে না। কিন্তু আইজ পর্যন্ত তপনদা সেটা প্রমাণ করতে পারে নাই। আর  গ্রাম লোকেরাও কুনদিন যদু পাগলারে চুরি করতে দেখে নাই।

সেদিন আপনের ঐখানেই তপনদা বইসা ছিলো। কত্তোবার কইলাম, দাদা একখান চা দেই। বইসা খান। কিন্তু সে খাইলোই না। আমি বারবার করে কইলাম, দাদা, টাকা দিতে অইবো না। তারপরেও চা-টা খান। কিন্তু সে কিছুতেই খাইলো না। আরও কইল মুসলমানের জিনিস নাকি খাইতে মানা। আমার জোড়াজুড়ির কারণে শ্যাষম্যাশ মানুষটা উঠেই চলে গেলো। ঠিক তখন ঐখান থেইক্কা যদু পাগলা কইল, এই তপনন্যা! বৃষ্টি থামুক পরে যা। নইলে তোর বিপদ আছে।

তপনদা যদু পাগলার কথা শুইন্যা আরো জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলো। ঠিক কিছুক্ষণ পর আকাশে বড়সড় করে বিদ্যুৎ চমকালো। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথেই চিৎকারের শব্দও ভেসে আসলো। চিৎকার শুনে আমিসহ আশেপাশের লোকেরা দৌড়ে   গিয়েই দেখি তপনদার শরীর পুড়ে পুড়ে খসে পড়ে আছে। এটা আমার চোখের সামনের ঘটনা। তারপরও কি বলবেন আপনের বিশ্বাস অচ্ছে না।

কিছুটা থতমত হয়ে গেলো নিমাই। একজন মানুষ হয়তো মিথ্যা কথা বলতে পারে। কিন্তু এতোটা মিথ্যা কথা! নাহ, মজনু মিয়া মিথ্যা বলছে না। তাছাড়া কেউকি অপরিচিত কারো সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারে। বললেও তার লাভ কোথায়? তাহলে নিশ্চয়ই ঘটনা সত্য। আর আমিতো এমনই একজনকে খুঁজছিলাম।

কি মনে মনে কি বিড়বিড় করচেন? আমার কথা বিশ্বাস অইতেচেনা। না করলে না করবেন।

না না মামা! বিশ্বাস হবে না কেন। অবশ্যই বিশ্বাস হয়েছে।

বৃষ্টির ছিটেফোঁটা কম।

শুধু হালকা হালকা বাতাস বইছে।

তবে অন্ধকার এখনো কাটেনি। মনে হচ্ছে আরও বেশ খানিক সময় লাগবে অন্ধকার কাটতে।

মামা, আপনার কতো টাকা হলো?

বেশি না। ৩০ টাকা।

এই নেন।

কেন? আপনে কি এক্ষুণি যাইবেন গা।

জ্বি মামা। অনেকক্ষণ তো হলো। তবে একটা সাহায্য করলে ভালো হইতো।

কি সাহায্য?

ঠান্ডু মোল্লার বাড়ি কোনদিকে?

সরাসরি হাঁটতে থাকেন। একটি পুকুর পাইবেন। পুকুরের পরে একটি বটগাছ। বটগাছের নিচদিয়া যে পথ গেছে ঐ পথের শেষ হতে যে বাড়ি। সেই বাড়িটাই।

ছবিঃ সংগৃহীত
