# কবিকবি-ভাব ছন্দের অভাব

Author: শাহ আলম বাদশা
Published: 2017-01-29
Category: সাহিত্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%9b%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac/

**ছড়ার ছন্দ বনাম মাত্রাবৃত্ত এবং সেকেলে শব্দ:**  
আমি বিচ্ছিন্নভাবে ছন্দ ও পদ্যের ভাষা ও শব্দচয়ন নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছি। সবগুলো প্রবন্ধ কেউ পড়ে থাকলে আমাকে ভুলবোঝার বা আমার কথার অপব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমার মতামত বা বক্তব্য বলে অনেকেই এমন কিছুকথা লিখছেন বা বলছেন, যাতে ভুলবোঝাবুঝির অবকাশ আছে। তাই আমার এই আত্মপক্ষসমর্থন।

**স্বরবৃত্ত ছন্দ:**  
আমার শত শত ছড়া, কবিতা ও পদ্য রয়েছে স্বরবৃত্তছন্দে, যার অর্থ হচ্ছে এই যে, এই ছন্দে শুধুই ছড়া নয় পদ্য ও কবিতাও রচনা করা যায়, করতে বাধা নেই। কিন্তু যুগযুগ ধরে এই ছন্দের স্বভাবানুযায়ী ছড়াকার কর্তৃক চটুল ছড়ারচনার সাবলীলতা ও সিদ্ধহস্ততার দরুণই একে প্রাজ্ঞজনরা “ছড়ার ছন্দ” বলেই চিহ্নিত ও অভিহিত করেছেন। ফলে আর কোনো ছন্দেরই এই কৃতিত্ব নেই। তাই একে আমি ‘ছড়ার একমাত্র ছন্দ’ বলায় অনেকেই ভুলবুঝেছেন যে, অন্যছন্দে বুঝি ছড়ারচনা সম্ভব নয় বা নিষিদ্ধ।

আসলে এই ছন্দটি আমাদের এতই মজ্জাগত যে, পদ্যলিখতে গেলেই কেন যেন আপনাআপনিই এটি এসে যায়। উল্লেখ্য, আমার অধিকাংশ ছড়াই স্বরবৃত্তে রচিত। আমার নতুন একটি স্বরবৃত্তের ছড়া দিলাম দেখুন:

**খটকা**  
শাহ আলম বাদশা  
\[মুক্তক স্বরবৃত্ত\]

খটকা ভীষণ খটকা  
মনটা বলে দ্বন্দ্বঝেড়ে  
ফালতুকথা মন্দছেড়ে  
ঘাড় পাজিদের মটকা।  
খটকা ভীষণ খটকা!!

ভেজাল বেচি ভেজাল করি  
ভেজাল নিজেও চাই না  
ফাঁকিবাজের লিস্টে পড়ি  
মাস গেলে নিই মাইনা।  
নোংরা-পচার ব্যবসা-গড়ি  
নোংরা নিজে খাই না।।

বোমফাটালে কই না কিছু  
আবার কারো লই যে পিছু  
ফাটায় যদি পটকা।  
খটকা ভীষণ খটকা।।

পালের গোদা পাপ করে যেই  
তড়িঘড়িই মাফ করে দেই  
মফিজ হলে হাড্ডিফুটাই  
তেড়েমেরে চামড়া-গুটাই  
কেউ বলি ফের  
হয়নি তো ঢের  
লটকা ওকে লটকা।  
খটকা ভীষণ খটকা।।

ঋণ নিয়েছি পেটের দায়ে  
শোধতে যদি না-ই পারি  
দৌড়ঝাঁপে হয় ফোস্কাপায়ে  
নিলাম যে হয় ঘরবাড়ি!

কোটিপতি ঋণখেলাপী  
হয় না কেন আদৌ পাপী  
আইনমারে কে চটকা?  
খটকা ভীষণ খটকা!

পাকবাহিনী জ্বালিয়ে গেছে  
ঠেলায় পড়ে পালিয়ে গেছে  
চাই আবারো ঝটকা;  
দূর করে দেই  
চুর করে দেই  
ফটকাবাজি ফটকা!  
খটকা ভীষণ খটকা!!

**স্বরবৃত্তছন্দের বৈশিষ্ট্য:**  
এই ছন্দের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য আছে, এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন:  
১. দ্রুতলয় বা চটুল তালসৃষ্টিকারী।  
২. সাধারণত চারমাত্রার পর্বভিত্তিক।  
৩. অতিপর্ববাদে প্রতিপর্বের মাত্রা সমান হয়।  
৪. মুক্তস্বর ও বদ্ধস্বর সবই একমাত্রার হয়।

বলাবাহুল্য যে, আমাদের ছন্দের ব্যাকরণে বা সাহিত্যের আইনে এমন কথা বলা নেই যে, কোনো ছন্দের বা স্বরবৃত্তের এই নিয়মভেঙ্গে নতুন নতুনছন্দে ছড়ালেখা যাবে না। কিংবা ছড়ার ছন্দ হিসেবে আর কোনো নতুনছন্দ আবিষ্কৃত হবে না। এমন কাজ দক্ষছড়াকাররা করতেই পারেন, যদি গ্রহণযোগ্য হয়।

**মাত্রাবৃত্তছন্দ:**  
মাত্রাবৃত্তছন্দের চাল হয় সাধারণত ৪, ৫, ৬ ও ৭ মাত্রার পর্বযুক্ত। স্বরবৃত্তের মতন এতে ৪মাত্রার চাল থাকার কারণেই এই ছন্দেও ছড়ালেখা যায় যদিও এই ছন্দ মধ্যলয়ের পদ্য ও কবিতারচনার জন্য সাধারণত উপযুক্ত। বাকি ৫, ৬ ও ৭ মাত্রার চালে কিন্তু ছড়ার চটুল তাল আসা খুব একটা স্বাভাবিক নয় বলে মাত্রাবৃত্ত পদ্য বা কবিতার ধীরলয়সৃষ্টি করতে সক্ষম ও উপযুক্ত।

এবার চারমাত্রাযুক্ত দু’পর্বের মাত্রাবৃত্তছন্দে আমার একটি ছড়া দেখুন:

**আলুদম**  
শাহ আলম বাদশা  
\[মাত্রাবৃত্ত ৪+৪\]

টেরাকের ধাক্কায়  
লোকটা তো পাক খায়-  
পাক খেয়ে একদম  
ঢুকলোরে চাক্কায়!

চাক্কার তলে তার  
হাড্ডি তো ছারখার  
ঠিক যেন আলুদম  
ছিটকালো ফাঁক্কায়।  
টেরাকের ধাক্কায়।।

ফাঁকা অই রাস্তায়  
হতভাগা লাশটায়  
মাছিরাও হরদম  
কীযে ঘুরপাক খায়?  
রাজধানী ঢাক্কায়।।

**মাত্রাবৃত্তের বৈশিষ্ট্য:**  
মাত্রাবৃত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ,  
১. মধ্যলয়ের ছন্দ।  
২. ৪, ৫, ৬ ও ৭ মাত্রাভিত্তিক পর্ব হয়।  
৩. অতিপর্ববাদে সমসংখ্যক পর্ব থাকে।  
৪. ছড়া, পদ্য ও কবিতার জন্য উপযুক্ত।  
৫. বদ্ধস্বর ২মাত্রা এবং মুক্তস্বর ১মাত্রাবহনকারী।

**স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত দু’সহোদর:**  
উপর্যুক্ত দু’ছন্দে আমার দুটো ছড়াপড়ার পর নিশ্চয়ই এ ভুলধারণা দূর হবে যে, মাত্রাবৃত্তে ছড়ালেখা যায় না। যদিও মাত্রাবৃত্তের ছন্দ হচ্ছে মধ্যলয়ের বা স্বরবৃত্তের মতন দ্রুততালের চেয়ে ধীরলয়যুক্ত। কিন্তু স্বরবৃত্তের মতো ৪মাত্রা পর্যন্ত সমানপর্বে ছড়ারচনা করলে তাও স্বরবৃত্তের মতো চটুল ছন্দের হতেই পারে। সেজন্য আমরা এই দু’ছন্দকে পরস্পর সহোদর বলতেই পারি। স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে যেমন ছড়ারচনা করা যায় তেমনই পদ্য বা কবিতাও রচনা করা যায়। ফলে প্রায়শই একটা মজার ব্যাপার ঘটে যে, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের ছড়ার মধ্যে ফারাক করা কঠিন হয়ে যায়। সূক্ষভাবে মাত্রার হিসেব বের না করলে এদের গুলিয়ে ফেলতে হয়। এবার তবে ৪+৪/৪+৪+৩ চালের মাত্রাবৃত্তের আরেকটা উদাহরণ দেখুন:

সফদার ডাক্তার  
মাথাভরা টাক তার  
খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে।

চেয়ারেতে রাত দিন  
বসে গুনে দুই তিন  
পড়ে বই আলোটারে নিভিয়ে।  
\[হোসনে আরা বেগম\]

বিদ্রোহী কবি নজরুলের বিখ্যাত শিশুতোষ ছড়াটাও মাত্রাবৃত্তে ৪+৪/৪+৩ চালে দেখুন আর ভাবুন এরা কতটা সহোদর:

ভোর হলো দোর খোলো  
খুকুমণি ওঠো রে  
ঐ(ওই) ডাকে জুঁইশাখে  
ফুলখুকী ছোট রে।

খুলি হাল তুলি পাল  
ঐ(ওই) তরী চললো  
এইবার এইবার  
খুকু চোখ খুললো।

**পদ্যের ভাষা ও শব্দচয়ন:**  
আদিযুগের কবিসহ মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ ও অত্যাধুনিক যুগের কবিদের পদ্যের উদাহরণ দিয়েও আমি বাংলাভাষা এবং পদ্যে ব্যবহৃত শব্দচয়নের কালাক্রমিক ধারাবাহিকতা তুলেধরেছি। সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস, রুচি-সংস্কৃতিসহ আমাদের লেখ্য ও কথ্যভাষার পরিবর্তনের কথাও বলেছি। এই অত্যাধুনিক যুগে যেসব শব্দ আমরা কথ্যভাষায় ব্যবহার করি না যেমন মুই, মোরা, করিনু, হেরিয়া, সহিয়া ইত্যাদি পদ্যে ব্যবহারের যৌক্তিকতাই নেই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলসহ আমাদের অগ্রপথিক কবিদের উদাহরণ টেনে যারা বলেন, তারা এসব শব্দের ব্যবহার করলে আমাদের ব্যবহারে বাধা কোথায়? আমিও পালটা প্রশ্ন করি, তাহলে তো মহাকবি কালীদাস, কীত্তিবাস, আলাওল, শাহ সগীর, আব্দুল হাকিমদের তৎকালীন বাংলাভাষাতেও আমরা কাব্যলিখতেই পারি! বিবর্তিত আধুনিক বাংলাছেড়ে তা করাটা কি স্বাভাবিক নাকি যুক্তিসঙ্গত?

পছন্দের সেরাফুল দিয়ে যেমন আমরা মালাগাঁথি তেমনই বাংলা-অভিধানের লাখলাখ শব্দভাণ্ডার থেকে বেছে নিয়ে আমরা অতিসুন্দর, সহজবোধ্য ও চমৎকার শব্দগুলো দিয়েই শব্দের মালাগাঁথি। সবশব্দ আমরা কাব্যে ব্যবহার করি না। অভিধানের অনেক শব্দই থাকে অপ্রচলিত, দুর্বোধ্য ও সেকেলে। নন্দিত ও ছন্দিত ছন্দশিল্পের সূক্ষ্মছাচে ফেলতে আমরা বহুলপরিচিত আঞ্চলিক শব্দও পদ্যে আনতে পারি, আন্তর্জাতিক শব্দসহ বিদেশাগত পরিচিত শব্দের ব্যবহারেও বাধা নেই। মূলব্যাপার হচ্ছে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আধুনিকমনস্কতা আর রুচিবোধের প্রশ্ন।

একটা গামীণ নারীর সাজগোছ বা শাড়িপরা আর একজন আধুনিক নারীর সাজগোছ বা শাড়িপরার স্টাইলের যে ফারাক, সাহিত্যে আধুনিক ও সেকেলে বাংলাব্যবহারের বিষয়টাও তদ্রূপ। এককালের ধুতি বা লুঙ্গিপরার সংস্কৃতি আর আধুনিক সুট-টাইপরার সংস্কৃতির মাঝে শিল্পমনস্কতার সৌন্দর্যের কথাটা আমাদের ভাবতে হবেই যদি আমরা কালজয়ী সাহিত্যরচনা করতে চাই। আমি বলি না যে, আদিযুগ, মধ্যযুগের সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দমাত্রই বাতিলযোগ্য। বরং তাদের যুগে ব্যবহৃত ও বর্তমান আধুনিক যুগেও প্রচলিত শব্দসমুহ পরিহার করা মানেই বাংলাকে পঙ্গু করা। ভালোবাসা, প্রেম, বাবা, মা ইত্যাদি শব্দ যেমন কখনো সেকেলে হয় না তেমনই বর্তমানে ব্যাপক ও বহুলপ্রচলিত শব্দই আধুনিক শব্দ। আমাদের বর্তমান বাংলাভাষাই আধুনিক ভাষা। দরকার শুধু ভাষার ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ মানসিকতার পরিবর্তন।
