# ওয়াইল্ড টেলস, লংমার্চ, প্রধানমন্ত্রী নির্ভরতা, পহেলা বৈশাখ এবং আমাদের সেফুদা

Author: অপার্থিব
Published: 2019-04-14
Category: অন্যান্য
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%a1-%e0%a6%9f%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%b8-%e0%a6%b2%e0%a6%82%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9a-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0/

১)  সম্ভবত বছর দুয়েক আগে একটা আর্জেন্টাইন সিনেমা দেখেছিলাম, সিনেমার নাম ওয়াইল্ড টেলস বা বাংলায় বন্য গল্প।  ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি  সে সময় বিশ্ব  চলচ্চিত্রে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।  পেয়েছিল বিদেশী ভাষার সেরা  চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার মনোনয়ন।  সিনেমাটায় একক  কোন গল্প নেই।  ছয়টা আলাদা আলাদা গল্প নিয়ে নির্মিত, দৈর্ঘ্য  ১২২ মিনিট। প্রতিটা গল্পের একটা কমন থিম আছে, সেটা হচ্ছে ওয়াইল্ডনেস বা বুদ্ধি  বিবেচনার বদলে মানুষের নিজ প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হওয়া।  আমরা জানি যে মানুষের সাথে অন্য জীব জন্তর একটা প্রধান পার্থক্য হচ্ছে অন্য সব জীব জন্ত পরিচালিত হয় নিজ ইন্সটিংক্ট বা প্রবৃত্তি দ্বারা আর মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাইলেও নিজের  প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। একটা শিশুকে তার  জন্মের পরপরই  মুল্যবোধ  শেখানোর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়  এবং সেটা হয় তার পরিবারের মাধ্যমে।  এর পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রক্রিয়ার নানা ধাপের মধ্য দিয়ে  সে সামাজিক বিভিন্ন নিয়ম কানুন শেখে, তৈরী  হয় তার চিন্তা চেতনার  দক্ষতা। শেখানো এই সব নিয়ম কানুন আর চিন্তার দক্ষতা দিয়ে সে প্রতিটা কাজের কার্যকরণ খোঁজে,  যাচাই করতে শেখে প্রতিটা কাজের ভাল মন্দ।   সমাজ থেকে অর্জিত মুল্যবোধের আলোকে এক সময় সে অর্জন করে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। সমাজ বদ্ধ প্রতিটা মানুষ তাই নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, করতে হয়।  তারপরও মানূষের জীবনে কখনো কখনো এমন সিচুয়েশন তৈরী হতে পারে যখন সে যাবতীয় চিন্তা চেতনার  ঊর্ধ্বে উঠে নিজের প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয় , তখন আসলে কি ঘটে এমন ছয়টি গল্প নিয়েই নির্মিত সিনেমাটি।

আধুনিক বাঙালি সমাজের একটা প্রধান  বৈশিষ্ট্যে হচ্ছে এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান নানা রকম  চাপ ও ক্ষোভ। অনেকে অবশ্য বলতে পারেন তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল গণতান্ত্রিক সমাজে চাপ ও ক্ষোভ একটা  খুবই কমন বিষয়।  যাই হোক, নানা রকম চাপে পড়ে চিড়ে  চ্যাপ্টা আজ ব্যস্ত  নাগরিক মানুষের জীবন। যাদের চাকরী নেই তাদের জন্য আছে বেকারত্ব থেকে মুক্তির চাপ, যাদের চাকরী আছে তাদের জন্য অফিসে বসের চাপ, জ্যাম ঠেলে ঠিক টাইমে অফিসে কিংবা ঘরে ফেরার চাপ,  বউয়ের কাছ থেকে “পাশের বাসার ভাবী ডায়মন্ড সেট কিনছে আমারে কবে দিবা” টাইপের চাপ,  যাদের বউ নেই তাদের জন্য বউ জোগাড়ের চাপ, বাজারে মুল্যস্ফীতির চাপ, সর্বোপরি সমাজে চলমান নানা রকম প্রতিদ্বন্দিতায় যেন পিছিয়ে না পড়ি টাইপের চাপ। নানা রকম চাপে বিদ্ধ ক্লান্ত মানুষ  থাকে নানা ভাবে বিক্ষুব্ধ।  তার ক্ষোভ সরকারের প্রতি, জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত শহরের মেয়রের প্রতি, সুন্দরী বউয়ের অধিকারী পাশের ফ্লাটের প্রতিবেশী কিংবা অফিসের কলিগটির প্রতি,  ওজনে কম দেওয়া  দোকানদারের প্রতি , দুই টাকা বেশি চাওয়া বাস কন্ডাক্টরের প্রতি ইত্যাদি।  মানুষ  আজকাল এত ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হলেও  সে তার নিজের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে পারছে না কারন তাকে একই সঙ্গে  সমাজ থেকে অর্জিত মূল্যবোধের আলোকে একটা ভদ্রতার মুখোশ পড়ে চলতে হচ্ছে, করতে হচ্ছে তাকে নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে আপোষ। এই আপোষকামী  আধুনিক মানুষের সমাজে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে ফেইসবুক তথা অনলাইন মাধ্যম। সেখানকার  নীল  রঙ্গমঞ্চে একদিন সেফাত উল্লাহ ওরফে সেফুদার আবির্ভাব  তারপর বাকিটা ইতিহাস। সেফুদার দ্রুত জনপ্রিয়তার প্রধান কারন হচ্ছে সেফুদা যা বলে সেটা আসলে আমাদের  সচেতন কিংবা অবচেতন মনের ভাবনা। পার্থক্য হচ্ছে আমরা সেটা ভদ্রতার কারনে প্রকাশ করতে পারি না , সেফুদা সেটা প্রকাশ করছে অবলীলায়।  সেফুদা  যখন যা তা ভাষায় সরকারের মন্ত্রী এমপিদের গালি দেয় আমরা তখন বিনোদিত হই  কারন নানা কারনে বিক্ষুব্ধ আমরাও তাদেরকে  ঠিক এভাবেই গালি দিতে চাই। দেশের  সমসাময়িক যে কোন বিষয় নিয়ে আমরা সেফুদার কাছে সেই সব মতামত আশা করি যা আমরা ভয় কিংবা ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ্যে বলতে পারি না। সেফাত উল্লাহর কন্ঠে কচি কচি সুন্দরী মেয়ের প্রতি আকাংখা আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী পুরুষের কনশাস কিংবা সাবকনশাস সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি। এভাবেই সেফাত উল্লাহ  ওরফে সেফুদা হয়ে উঠেছে সমাজের আয়নায় দাঁড়ানো আমাদের প্রতিবিম্ব, ঠিক আমাদের মত, কিন্ত আমরা নই কিংবা নিদেন পক্ষে আমরা সেটা দাবী করি না। তবে সেফুদার সার্থকতা  এখানেই যে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আমাদেরও একটা প্রবৃত্তি  আছে আর আমাদের চোখের সামনে থাকা ভদ্রতার পর্দা আসলে কতটা ঠুনকো!

সেফুদার ভিডিও দেখে জীবন ধন্য করার লিংকঃ [https://www.youtube.com/watch?v=9lhyWzUNn40](https://www.youtube.com/watch?v=9lhyWzUNn40)

ওয়াইল্ড টেলস ট্রেলার লিংকঃ [https://www.youtube.com/watch?v=Utq0aDEp084](https://www.youtube.com/watch?v=Utq0aDEp084) 

২) মানুষের পেটে যখন ভাত জুটে তখন তার মধ্যে বিনোদনের চাহিদা তৈরী হয়। যার পেটে ভাত নেই, তার কাছে ভাতই বিনোদন। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল ভোগ করে শহরাঞ্চলে একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরী হয়েছে। এই শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিনোদন প্রয়োজন। দিবস কেন্দ্রীক উৎসব মানব সমাজে প্রচলিত একটা পুরনো ও জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম।  কর্পোরেটরা যেহেতু মানুষের মৌলিক চাহিদা ও বিনোদনের ক্ষেত্রগুলোকে ব্যবসার উপকরণ বানিয়ে ফেলে, কর্পোরেটদের ব্যবসার স্বার্থেই তাই নুতুন নুতুন বিনোদনের ক্ষেত্র তথা নুতুন নুতুন উৎসব দিবস উদ্ভাবন প্রয়োজন।  উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের  উদযাপন এদেশে নুতুন না হলেও গত এক দশকে উৎসব হিসেবে এর ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। ব্যবসায়ীদের কাছে পহেলা বৈশাখ কেন্দ্রীক  অর্থনীতির অবস্থান  এখন দুই ঈদের পরেই তৃতীয় অবস্থানে। মনে রাখবেন পহেলা  বৈশাখকে একই সঙ্গে লড়তে হচ্ছে  মৌলবাদীদের বিপক্ষেও। মুলত নব্বই দশক থেকে এদেশে “পহেলা বৈশাখ হারাম” মতবাদের জন্ম হয়। এই মতবাদীরা যে বর্তমান সমাজে দুর্বল অবস্থানে আছে এমনটা ভাবার কোন কারন নেই।  তবে এই মতবাদীদের জন্য দুঃসংবাদ এই যে, মানুষ এখন কর্পোরেট প্রচার প্রচারণার  সুবাদে  কালচারের সাথে রিলিজিওনের কোঅর্ডিনেশন ঘটাচ্ছে অর্থাৎ ধর্মের সাথে সাথে পহেলা বৈশাখের বিরোধ নেই, দুটোকে কোঅর্ডিনেট করা যায় বলে দাবী করছে। বিশ্বাস না হলে আজ একবার টিএসসিতে যান, দেখবেন সাদা-লাল পাড়ের শাড়ী আর কালো হিজাবের এক অদ্ভুত লাল-সাদা-কালো কম্বিনেশন!    

৩) বাসটা এসে  দাঁড়াল বাসস্টপে। কানায়  কানায় পূর্ণ,  তিল ধারনের জায়গা নেই। চোখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে  বাদুরের মত ঝুলন্ত এক দল ক্লান্ত শ্রান্ত মানুষ। বাসটা ছেড়ে দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে এক মধ্য বয়সী মহিলা তার দুই সন্তান সহ রাস্তার ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। তার একটাই দাবী  তিনি এক ঘণ্টা ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন কিন্ত কোনমতেই বাসে উঠতে পারছেন না তাই তাকে বাসে উঠার সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে তিনি কিছুতেই ঐ বাসকে এখান থেকে যেতে দেবেন না। মুহূর্তেই তৈরী হয়ে গেল জটলা, তাকে পাগল বলে সম্বোধন করে কিছু লোকের হাসাহাসি এবং লম্বা ট্রাফিক জ্যাম। নানা ভাবে তাকে বোঝানোয় ব্যস্ত দেখা গেল দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবলটিকে। এক পর্যায়ে  ভদ্র মহিলা রাস্তার মাঝখানে দুই শিশু সন্তান সহ শুয়ে পড়লেন। এই পর্যায়ে এসে তার দাবী খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি এখন প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে এই সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চান, তাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে, তা  না হলে তিনি রাস্তা ছাড়বেন না।

ঘটনাটা বাস্তব। এই ভদ্র মহিলাও নিজের ইন্সটিংক্ট দ্বারা চালিত হলেও তার শেষ দাবীটা আসলে ইদানীংকার বাঙ্গালী সমাজে একটা জনপ্রিয় ধারণা থেকেই তৈরী হয়েছে। সাম্প্রতিক সমাজে  একটা ধারণা প্রবল ভাবে তৈরী হয়েছে যে, যে  কোন সমস্যার দ্রুত সমাধান আসলে প্রধান মন্ত্রীর কাছে।  সমস্যাটা তাই যে কোন উপায়ে প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌছাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে  পৌঁছালেই সমাধান নিশ্চিত।  এটা গণতান্ত্রিক কোন দেশের জন্য মোটেও কোন ভাল লক্ষণ নয়, ভাল নয় আওয়ামী লীগের জন্যও।

৪) তখন লং মার্চের সময়,

মাওসেতুং তার বিপ্লবী সঙ্গীদের নিয়ে পাড়ি দিচ্ছিলেন দীর্ঘ পথ।

দীর্ঘ পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের নিচে থামলেন তারা –  বিশ্রাম নেবেন বলে,

দেখলেন একটু দূরে নদীর ধারে গাছের নিচে এক যুবক যুবতী পরষ্পরকে গভীর আলিঙ্গনে বেঁধে রেখেছে।

মাওসেতুং এর  বিপ্লবী সঙ্গীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন -আমরা কিনা দেশের জন্য প্রাণপণ  সংগ্রাম করছি  আর ওরা গাছের নিচে নদীর হাওয়াতে প্রেমে মশগুল হয়ে  বসে আছে। এ কিছুতেই হতে পারে না, ওদেরকেও আমাদের সঙ্গে লং মার্চে যেতে হবে।

মাও সেতুং মৃদু হাসলেন, বললেন- না ওরা ওখানেই থাকুক, আমাদের যা কিছু সংগ্রাম সে তো ওদের জন্যই।

পাদটীকাঃ সামনে ভারতে লোকসভা  নির্বাচন। পত্রিকায় একদিন পড়লাম ক্ষমতাসীন বিজেপির একটা মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের মাটিতে আন্তঃ ধর্মীয় বিয়ে (তাদের ভাষায় লাভ জিহাদ) ঠেকানো!
