# এখনই মোক্ষম সময়

Author: রিমি রুম্মান
Published: 2020-07-19
Category: সমসাময়িক
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a6%87-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%9f/

করোনামহামারীকালীন পরিবর্তিত পৃথিবীর সাথে আমাদের সন্তানরা ধিরে ধিরে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে। ঘরে বসে টিভি স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা আর বিরামহীনভাবে প্রযুক্তির অযাচিত ব্যবহার শারীরিক ওজন বাড়িয়ে দিচ্ছিল ওদের। আর তাই একটু একটু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার তাগিদ বোধ করছিলাম। বাইরের আলো-বাতাসে বেড়ানো, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। ভার্চুয়াল গেইম খেলার সময়টুকু যতোটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করি। সপ্তাহে অন্তত তিনদিন সপরিবারে সবুজের কাছাকাছি, নদীর তীরবর্তী অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানগুলোয়, বিশেষ করে ষ্টেট পার্কগুলোতে ঘুরতে যাই। সাথে থাকে বৈকালিক চা-নাস্তা। এতে তারা নৈসর্গিক এক অনুভূতিতে প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালোবাসতে শিখেছে। একদিন বেড়িয়ে আসার পর জানতে চাইছে এরপর আবার কবে যাবো। নিরিবিলি কম মানুষের উপস্থিতির স্থানগুলোয় সাইকেল কিংবা স্কুটার চালানোর সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের সংস্পর্শ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকছে। অপ্রয়োজনীয় ছোঁয়া এড়িয়ে চলছে। মোদ্দাকথা, এটি এখন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।

নতুন পৃথিবীতে তারা দেখেছে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া অসংখ্য মানুষ মুখে মাস্ক ব্যবহার করছে। বাইরে বেরুবার আগে তারাও মনে করে নিজেদের মাস্ক দিয়ে মুখ ঢেকে বের হচ্ছে। আবার বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, গোসল করা, কিছুই বলতে হয় না তাদের। আগে এই শহরের সৌন্দর্য ছিল এক রকম। এখন অন্যরকম। শহরটি এখনো ছন্দে ফিরেনি। সর্বত্র মানুষ আছে, কিন্তু মানুষের মুখরতা নেই। ছুটেচলা গাড়ি আছে, কিন্তু মানুষের কর্মব্যস্ততা নেই। ব্যস্ততম সড়কের দুইপাশে গাড়ি পার্কিং এর স্থানগুলোতে কিছু দূরত্ব পর পর তাবুর মতো ছাউনি দেয়া। অর্থাৎ নিউইয়র্ক শহরের রেস্তোরাঁ, পানশালা গুলোতে আগের মতো আড্ডা দেয়া, হৈচৈ, খাওয়া-দাওয়া করার অনুমতি নেই। তাই রেস্তোরাঁ কিংবা পানশালার বাইরে সম্মুখভাগে সড়কের কিনার ঘেঁসে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে কাস্টমারদের বসার, খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবুজ গাছ, ফুলের টব দিয়ে সাজিয়ে মনোরম করা হয়েছে উন্মুক্ত স্থানগুলো। আমাদের সন্তানরা আগ্রহভরে এইসব পরিবর্তন দেখছে, জানার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন করছে। এতে একদিকে তাদের সাথে আমাদের কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সম্পর্ক গাঢ় হচ্ছে। আমরা হয়ে উঠছি আমাদের শিশুদের বন্ধু, সহযাত্রী।

আগে বাইরে বেড়াতে যাওয়া মানে অবধারিতভাবে বার্গার কিং কিংবা ম্যাকডোনাল্ড খাওয়া, জায়রো, ফ্রাইড চিকেন খাওয়া হত। করোনাভাইরাস মহামারীর এই সময়টায় তারা সেইসব খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে। ফার্স্টফুড সংস্কৃতি থেকে সরে এসেছে। যখন তখন কাছে এসে এটা সেটা আবদার করছে। মা, এই খাবারটা আজ রান্না করবে ? ওই খাবারটা অনেকদিন বানাওনি… ইত্যাদি। তাদের আবদারগুলো পূরণ করতে আমার উৎসাহ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এই সুযোগে নিজেরও নতুন নতুন রেসিপি শেখা হয়ে যায়। নিজের শৈশব কৈশোরে ফিরে যাওয়ার মতো আনন্দানুভূতি হয়। আমাদের বাবা-মা কখনোই বাইরের খাবারের প্রতি উৎসাহ দিতেন না। বরং অপরিচ্ছন্নতার কথা বলে নিরুৎসাহিত করতেন। বিশেষ কোনো উপলক্ষ্য থাকলে মা নিজের হাতে পোলাও-কোরমাসহ আমাদের পছন্দের খাবার তৈরি করতেন বাড়িতে। আমরা পরিবারের সদস্যরা একসাথে ডায়নিং টেবিলে বলে তৃপ্তি নিয়ে খেতাম। খাবারের সময়টায় গল্প হোত। হোত হাসি-আনন্দ। করোনামহামারী আমাদের সেই পারিবারিক বন্ধন আর ডায়নিং টেবিল সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে যেন।

আমি নিজেই যেহেতু বই পড়া, লেখালেখি করা উপভোগ করি, তাই এই সময়ে সন্তানদের সাথে নিয়ে একত্রে তা করতে পারার মাঝে আনন্দ খুঁজি। ওদেরও বই পড়তে উৎসাহিত করি। কোথাও বেড়াতে গেলে ফিরে এসে এ সম্পর্কে তাদের একান্ত অনুভূতি লিখতে বলি। হোক তা ছোট পরিসরে, তবুও লেখালেখির অভ্যাসটা অন্তত গড়ে উঠুক। গ্রাম বাংলার ছবি, নদী, মাঝি কিংবা বাংলাদেশের ফল আঁকার জন্যে রঙ পেন্সিলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তুলে দিয়েছি হাতে। সন্তানদের আঁকা ছবি দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হই। উৎসাহিত করি।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে স্কুল, মসজিদ, প্রাইভেট টিউটর, সবকিছু বন্ধ। বাড়িতে সন্তানদের অখণ্ড অবসর। ভাবলাম এটিই মোক্ষম সুযোগ। যেই ভাবা, সেই কাজ। সন্তানকে অনলাইনে ‘চারুকণ্ঠ বাংলা স্কুল’ নামের বাংলা শেখার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। এতে একদিকে শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষাটা রপ্ত হবে, অন্যদিকে কাগজে-কলমে অক্ষর শেখা হবে। বাংলা লিখতে এবং পড়তে শেখা হবে। আমার নয় বছরের ছোট ছেলে এরই মধ্যে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, গণনা লিখতে শিখেছে। প্রতিদিন একপাতা করে লিখছে বেশ আগ্রহের সাথে। শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা কবিতা শিখেছে গোটা কয়েক। প্রতিটি লাইনের মানে জেনেছে। নতুন অক্ষর শেখার সাথে সাথে সে যেন নতুন কিছু আবিষ্কার করছে। তার এমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠা দেখে আমি যারপরনাই আনন্দিত হই। বন্ধুদের অনেকে বলে থাকেন, ভিনদেশে বেড়ে উঠা শিশুরা বড় হতে হতে লেখাপড়ার চাপে বাংলাভাষা ভুলে যায়। কিন্তু আমি হাল ছাড়তে রাজি নই। বলি, একবার বাংলা লিখতে এবং পড়তে শিখে গেলে সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে শুধু চর্চাটা রাখলেই হবে। এতে করে তাদের শেখার এবং নিজস্ব চিন্তার জগত বিকশিত হবে বলে আমার ধারণা। একইভাবে বাস্তব জীবনে ধর্মীয় আচার আচরণ, বিধিনিষেধের সঠিক প্রয়োগের বিষয়েও শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছি।

মাঝে মাঝে সন্তানদের নিজের ভালোমন্দ, দুঃখ-বেদনা, যাপিত জীবনের পাওয়া-নাপাওয়া বিষয়ে শেয়ার করি। এতে তারা বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের খোঁজ নেয়। শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ে আলাপ করে। এই সুযোগে বলি, তোমরা কি নিজেরা নিজেদের কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখবে ? রুম পরিষ্কার করবে ? তারা বেশ স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে তা করে। বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করতে চায়। এভাবেই একটু একটু করে তাদের স্বনির্ভর হতে শেখাই। নিজের কাজটুকু নিজে করতে পারার মাঝে যে আনন্দ, তা তাদের অনুভব করতে শেখাই। ছোটবেলায় আমরা যেমন বাবা-মাকে অনেক ছোটখাটো কাজে সাহায্য করতাম, অনেকটা তেমন। আমরা মন্দ কাজের শাস্তি পেতাম। ভালো কাজে পুরস্কৃত হতাম। সেই সংস্কৃতি ফিরে আসুক আমাদের সন্তানদের রোজকার জীবনে।

করোনা মহামারীর এই সময়ে সন্তানদের অখণ্ড অবসর। তারা অনলাইনে নানান রকম ভিডিও গেইমস কিনতে চাইলো। চাওয়া মাত্রই পাওয়া, এমনটি হতে দেইনি। রয়ে সয়ে দিয়েছি। অধিকাংশই নাকচ করে দিয়েছি। আমাদের ছোটবেলায় চাহিদাগুলো ছিল ছোট। যখন যেটা প্রয়োজন, জানিয়েছি। বাবা-মা তাঁদের সুবিধামত সময়ে দিয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেতে কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ লেগে যেত। কিন্তু আমরা ধৈর্যহারা হয়েছি বলে মনে পড়ে না। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে যখন পছন্দের জিনিষটি হাতে পেয়েছি,পাওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছি। বাবা-মার প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতায় নত হয়েছি। মনে পড়ে আমার এক আত্মীয় বিদেশে থাকতেন। আমার সমবয়সী তার একটি কন্যা ছিল। তিনি যখন দেশে ছুটিতে আসতেন, কন্যার জন্যে নানান রকমের পুতুল আনতেন। চাবি ঘুরালেই সেইসব খেলনা পুতুল ঘুরে ঘুরে নাচত। কখনো কান্না করত, আবার কখনো হি হি করে উচ্চ শব্দে হাসত। সত্যিকারের মানুষের মতো পুতুলের আচরণ আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করত, বিস্মিত করত। এমন একটি পুতুলের আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন মনের গহিনে পুষে রেখেছিলাম। দামি এইসব খেলনা যে আমাদের বাবা-মায়ের সামর্থ্যের মধ্যে নেই, সেটি আমাদের বুঝানো হয়েছিল। ভেতরে ভেতরে না পাওয়ার বেদনা ছিল, হাহাকার ছিল। কিন্তু আমরা এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্চ করিনি। সময়ের সাথে সাথে মেনে নিতে শিখে গিয়েছিলাম। আমার বাবার কাছে তাঁর শৈশব, কৈশোরের সময়কার বেদনাবিধুর গল্প শুনতাম। তিনি একটি মাত্র বাইরে পরার প্যান্ট-শার্ট ধুয়ে, শুকিয়ে স্কুলে পরেছেন দিনের পর দিন। সেইসব গল্প শুনে শুনে নিজেকে তুলনামূলক ভাগ্যবান মনে করতাম। অল্পতে সন্তুষ্ট হতে শিখে গিয়েছিলাম। আমাদের কখনোই অতি স্বাচ্ছন্দ্য দেয়া হয়নি। তাই আমাদের সন্তানদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করছি। এতে দুর্দিনে অর্থ সাশ্রয়ের বিষয়টি তাদের মনোজগতে নাড়া দিয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার দীক্ষায় দীক্ষিত হবে।

রিমি রুম্মান  
নিউইয়র্ক
