# “একবার না পারিলে দেখো শতবার”।

Author: শামীম চৌধুরী
Published: 2021-04-27
Category: পরিবেশ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a7%8b-%e0%a6%b6%e0%a6%a4%e0%a6%ac/

ছোট বেলায় কোন এক বইয়ে পড়েছিলাম, একটি পিঁপড়া তার দেহের ওজনের চেয় বেশী ওজনের খাদ্যবস্তু নিয়ে উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করছে। যতবার সে উঠার চেষ্টা করছে ততবারই পড়ে যাচ্ছে। এভাবে উঠতে উঠতে শতবারের মাথায় সে সফল হয়েছিলো। গল্পের শেষাংশে লেখা ছিলো-

“একবার না পারিলে দেখো শতবার”।

গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে এ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ১১ বার সাতছড়ি গিয়েছিলাম। প্রতিবারই ৩/৪ রাত ও ৪/৫ দিন করে থাকা হয়েছিলো। নভেম্বর মাসে ২ রাত, ডিসেম্বর মাসে ৩ রাত জানুয়ারীতে ২ রাত ফেব্রুয়ারীতে ২ রাত এবং সর্বশেষ মার্চ মাসে ২ রাত খোঁজার পর ১১ বারের মাথায় বিপন্ন বণ্যপ্রাণীটির দেখা পাইলাম। প্রাণীটির ছবি তোলার পর উপরের কথাগুলি বার বার মনে পড়ছিলো।

এতক্ষণ যে বিপন্ন প্রাণীটির কথা বললাম, সে এ দেশের ক্ষুদ্রতম বানর জাতীয় প্রাণী লজ্জাবতী বা লাজুক বানর। **ইংরেজি নাম Bengal Slow Loris, Slow Loris, Bengal Slow Loris ev Northern Slow Loris| Loridae গোত্রের স্তন্যপায়ী প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Nycticebus bengalensis।**

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/04/AMIM8096-400x290-1.jpg)

আমাদের বানরের যে কয়টি প্রজাতি পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে লজ্জাবতী বানর বা Bengal Slow Loris (Nycticebus bengalensis) সারা পৃথিবীতেই বেশ বিখ্যাত। ধীর গতিসম্পন্ন পান্ডার মতো দেখতে এই লজ্জাবতী বানের অনেক কার্যকলাপই আর পাঁচটা বানরের সাথে মিলে না।তার একটি বড় কারণ এরা পৃথিবীর একমাত্র বিষাক্ত জাতের বানর! তবে বিষাক্ত সাপ বা মাকড়সার মতো এদের বিষ থলি নেই। বিষের ধরণও বেশ আলাদা। এদের বিষ রয়েছে কনুই এর কাছে বিষ গ্রণ্থিতে। সেখান থেকে এই বিষ তারা সারা গায়ে মেখে নেয়, যা মানুষের চামড়ার লাগলে চুলকানী প্রতিক্রিয়া হতে পারে৷ তবে ঘটনা এখানেই শেষ নয়। তাদের এই বিষ মুখের লালার সাথে মিশিয়ে ধারলো দাঁত দিয়ে মরণ-কামড় দিতে পারে৷ এই লালা মিশ্রিত বিষ শরীরে গেলে প্রাথমিকভাবে এ্যানাফাইলাকটিক শক (Anaphylactic Shock) ও পরবর্তীতে নেক্রোসিস (Necroses) হয়ে একজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ মারা যেতে পারে৷

তবে লজ্জাবতী বানরেরা অন্য বিষাক্ত প্রাণীদের মতো শিকার ধরতে তাদের বিষ ব্যাবহার করেনা৷ তারা মুলত এই বিষ দিয়ে তার আবাসস্থল চিহ্নিত করে, প্রজননের সময় শক্তির প্রদর্শন করে ও আত্মরক্ষার কাজে ব্যাবহার করে৷ এছাড়াও তাদের ভেজা নাক তাদের প্রখর ঘ্রাণশক্তির পরিচয় দেয়। এছাড়াও এদের বড় বড় চোখগুলোতে বিশেষ প্রতিফলক আবরন থাকার কারনে এদের নাইট ভিশন (Night Vision) অত্যান্ত শক্তিশালী। এসকল কারণে লজ্জাবতী বানরেরা অনায়াসে রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার জংগলে ‘রাজত্ব’ করতে পারে৷ হ্যা, রাজত্ব এই কারণেই বলছি, বনের অভিজ্ঞতা থেকে জানতে পেরেছি যে, বনের অন্যান্য গেছো প্রাণীরা লজ্জাবতী বানর থেকে তাদের নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে চলে৷ কিন্তু বর্তমানে দুঃখজনকভাবে এই প্রাণীটা সারা পৃথিবীতে আই.ইউ.সি.এন. এর রেড লিস্ট (IUCN Red List) অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এবং বাংলাদেশে এদের অবস্থা ‘বিপদগ্রস্ত’ (Endangered)। আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো এদের অবৈধ পাচার (Illigal Trafficking)। সুন্দর ও রহস্যময় এই প্রাণীটি ও তার আবাসস্থলকে আমাদরে দেশের প্রকৃতিতে টিকিয়ে রাখতে সবার আগে প্রয়োজন বন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা৷

পান্ডার বাচ্চার মতো দেখতে লজ্জাবতী বানরের মুখমণ্ডল গোলাকার। চোখ বড় এবং গোলাকার। দেহের দৈর্ঘ্য ২৬-৪০ সেন্টিমিটার, লেজ ২-৩ সেমি.। ওজন ১.২-১.৬ কেজি। সদ্য জন্মানো বাচ্চার ওজন ৩০-৬০ গ্রাম। লেজ খাটো ও কান ছোট। দেহের ওপরটা হলদে-বাদামি থেকে হালকা-বাদামি ও নিচটা ফ্যাকাশে। পিঠের মাঝ বরাবর একটি লম্বা গাঢ় বাদামি রেখা থাকে। এ ছাড়া চোখের চারদিকে বাদামি রিং রয়েছে।

এরা মূলত চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। অবশ্য গত অক্টোবরে একটিকে মধুপুরের শালবনেও দেখা গেছে। এরা বনের গহিনে উঁচু গাছে থাকতে পছন্দ করে। নিশাচর প্রাণীগুলো দিনে গাছের খোঁড়লে বা ঘন পাতার আড়ালে অন্ধকারে ঘুমিয়ে কাটায়। ঘুমানোর সময় শরীরকে গোল বলের মতো করে রাখে। বিরল, নিশাচর ও লাজুক হওয়ায় দিনে সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। মূলত গাছে গাছেই থাকে, সহজে মাটিতে নামে না। গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে পারে। নিজের এলাকায় অন্যদের বরদাশত করে না, তাই মূত্রের মাধ্যমে নিজের এলাকা নির্ধারণ করে রাখে। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাফেরা করে। প্রধানত ফল, পাতা, উদ্ভিদের কষ, নির্যাস ইত্যাদি খায়। মাঝেমধ্যে বড় কীটপতঙ্গ, পাখির ডিম-ছানা, সরীসৃপ ইত্যাদিও খায়। সচরাচর নীরব থাকে।

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2021/04/AMIM8111-400x290-1.jpg)

লজ্জাবতী বানর বছরের যে কোনো সময় প্রজনন করতে পারে। ১৮৫-১৯৭ দিন গর্ভধারণের পর স্ত্রী একটি বাচ্চা প্রসব করে। পুরুষ ১৭ মাসে ও স্ত্রী ১৮-২৪ মাসে বয়োপ্রাপ্ত হয়। আয়ুস্কাল ১৫-২৫ বছর।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে এদের দেখা মেলে।

**ছবিগুলি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে তোলা।**
