# একজন বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট

Author: রোকসানা খন্দকার রুকু
Published: 2022-08-16
Category: চিঠি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%81/

প্রিয় বঙ্গবন্ধু ❤❤️

আপনার প্রিয় দেশের বুকে কাল শোকসভা ছিল। আপনি কি ভীষন খুশি হয়েছিলেন? আমার মনে হয় না। কারন আমার ধারনা আপনি সব দেখতে পান! যে স্বপ্ন এদেশকে নিয়ে ছিল আপনার তা তো আজ ধুলোয় ধুসর। তো, আপনি আর খুশি হবেন কি করে? শুনবেন কাল কী কী ঘটেছে আমার ছোট্ট শহরে?

কাল ছিল ভরা পূর্ণিমার ৩১ শ্রাবণ। এই দিনে বুকে গুলি নিয়ে আপনি সিঁড়িতে পড়ে ছিলেন। আমি প্রতিনিয়ত সিঁড়ি ছুঁয়ে দেখি, কি নির্মম! বিশ্বাস কিভাবে বেইমানী করে তার করুন চিত্র ছিলো দেয়ালে দেয়ালে। ভাবছিলাম, দেয়ালের বুকে যদি এমন গভীর ক্ষত হয় তাহলে আপনার কতোটা ক্ষত হয়েছিল, কষ্ট হয়েছিল ঝাঝরা হতে।

আপনাকে নিজেরা ঝাঝরা করে বলি, আমরা এই দিনে আপনাকে হারিয়েছি। সেজন্য সকাল ১১টায় আমরা দেয়া মাহফিলের জন্য একত্রিত হবো। সকাল ৯ টায় রিকশায় উঠেছি, বাবার জন্য একটু আগে আগে যেতে চাই। বাবা ডাকলাম, কারন নেতা ডাকা যায় না। কারন আপনি নেতার উদ্ধে সকল গুণসম্পন্ন অতি সাধারণ মানুষ, আমাদের দায়িত্বশীল অভিভাবক, একজন ঘরোয়া, একজন শিক্ষক, একজন জনমানুষের কল্যানীয়েষু, একজন হিতৈষী।

শহরের প্রথম মোড়, কলেজ গেইট মোড়। অসংখ্য অল্পবয়সী তরুন যারা দেশের ভবিষ্যত নেতা হবার তালিকায়। তাদের বেশ চৌকশ চেহারায় স্টাইল কাট রঙ- বেরঙের চুল- দাঁড়ি, ইস্ত্রী করা হাল ফ্যাশানের পান্জাবী, কায়দা করে লাগানো বোতাম। হাতে দামী টাইটান; সেলক্স ব্রান্ডের ঘড়ি। আর বুকের বা পাশে আপনার জন্য ছোট্ট কালো ব্যাজ।

অথচ আপনি  ছিলেন ১৫০ টাকার লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবিতেই একজন নেতা, একজন পিতা।

মাইক, সাউন্ড বক্স, নেতা চৌধুরী সাহেব বসা। হাজারো দামী মোবাইল ফোনের ক্লিক, ভিডিও, সেলফি। নেতার মুখে কষ্টের কোন ছাপ নেই, বরং গ্লেজ দিচ্ছে। কালই হয়তো জনগনের টাকায় ফেসিয়াল সেরেছেন। অথচ পোষ্টার লাগিয়েছে সেখানে আপনি রক্তমাখা পরে আছেন।

টেবিলে সারিসারি সাদাসাদা প্যাকেট, বিরিয়ানী হবে হয়তো। আলোচনা চলছে কিন্তু তাতে প্রচার, কোথাও শোক পেলাম না। আমারও বিরিয়ানীর জন্য জ্বীভে পানি এলো। বৈশাখীর বিরিয়ানী অনেক টেস্ট। কিছুপরেই নেতারা পেয়াজ, কাঁচামরিচ দিয়ে রসিয়ে খাবে। এ হলো আপনার জন্য আয়োজিত শোকসভা।

আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন জাতির পিতা!

এবার চলুন, শাপলা চত্বরে। আপনার পোষ্টারে বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। আপনার ক্রন্দনরত, বুক চাপরে ফেরা ছবির নিচে দাঁড়িয়ে দুজন ঝগড়া করছে। এক বয়সী রিকসা চালক ভাড়া বেশি চাইছে, একজন ভাড়া বেশি দেবে না। বাবা জানেন, এদের এ বয়সে বৃদ্ধভাতা কিংবা ছেলেমেয়ের ঘাড়ে বসে খাবার কথা। কিন্তু ছেলেমেয়েরাও নিজের পেটের ভাত জোগাতে পারে না। বাবা- মা দেখবে কি করে। তার বাড়ির ছোট্ট শিশু প্রতিদিন একটা ডিম খাবার জন্য কাঁদে। ৬০ টাকা ডিমের হালি। এতোদিন মাছ, মাংস সিকেয় উঠে ছিল, এখন ডিমও খেতে পারে না। দেশে অপুষ্টিতে বাচ্চারা পঙ্গু হবে একঅংশ।

অথচ এদেশেরই মানুষ বিদেশে প্রাসাদ বানায়, ব্যাংকে টাকা জমায়, নানা পাড়াও বানায়। বিলাশবহুল জীবন যাপন শেষে, দেশে ফিরে বলে চোর, ছ্যাচড়, অসভ্যের দেশ। ডিজগাস্টিং,  এই দেশে মানুষ থাকে?

” এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে,,, থাক পুরোনো কথা।

শাপলা মোড়ে আরও একটি আলোচনা সভা। নেতার চিৎকার কান রাখা দায়। পাশেই একটি পথশিশু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে। তার চোখ ওই সিঙ্গারা, মিষ্টির প্যাকেটে। নেতাদের সেলফি তোলা শেষ হলো, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো প্যাকেটে। খুব হেসে হেসে খাচ্ছে, যেন উতসব, আর কতোদিন খায়নি। পথশিশু তখনও দাঁড়িয়ে, কেউ অর্ধেক ফেলে দিলে খাবে। আর সামনে আপনার পোষ্টার, আপনি বুক চাপড়ে কাঁদছেন।

সামনে কাঁচাবাজারের পাশে অন্য কলেজ। সেখানেও সভা, শোরগোল। এদিকে বাজারের ভেতর দুজন পাঁচটাকার দরকষাকষিতে ব্যস্ত। কি করবে, যাপিত জীবন আর আয় প্রতিনিয়ত ঝগড়ায় লিপ্ত। মরিচ ২৫০ টাকা কেজি, আলু,পটল, সবজি সব ৮০ ছেড়ে গেছে। একটা পরিবারে দৈনিক কতোটুকু চাল, ডাল সবজি লাগে। অথচ চা বাগানের শ্রমিকের মজুরী ১২০ টাকা। কৃষকের সার নেই, ওষুধ নেই, ব্যবসায়ীরা সব আটকে রেখে সিন্ডিকেট ব্যবসা করে প্রাসাদ বানাচ্ছে।

অথচ আপনি বলেছিলেন- মজলুমদের ঠকিয়ে এদেশে থাকতে চাওয়ার অধিকার নেই, এ আমার কৃষক, মজলুমের দেশ। আপনার ছিয়াত্তরের সেই ৬ দফা দাবী আজ দেশেই পর্যুদস্ত। সেসময় আপনি যেমন ভাগের কম্বল খুঁজে পাননি। তেমনি আপনার জনগনও তাদেরটা পায় না।

সামনে ডাকবাংলো মোড়। দলে দলে কালো ব্যাজপরা মিছিল। আমার মন বলে, আপনি বলছেন এসব বন্ধ করো আমি নিতে পারি না। আমার দেশের জনগন ভালো নেই। তারা প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে, তাদের তোমরা রক্ষা করো। আজকের সারাদেশে যতো খরচ হবে তা আমার জনগনের ডিম খাবার পয়সা। যতো বিরিয়ানী সব তাদের কষ্ট, তোমরা না খেয়ে তাদের খেতে দাও।

বাসের ভেতর অনবরত চলছে কনট্রাকটার- প্যাসেন্জার মারামারি। তেলের দাম অন্যদেশে কমে গেছে। সোনার বাংলায় কমেনি, নানা অজুহাতে। বাসভাড়া বেড়েছে। আমরা যারা প্রতিনিয়ত রাস্তায় তাদের বেহাল দশা। দরকষাকষি দৈনন্দিন চিত্র।

আপনি যেদিন পাকিস্তান জেল মুক্ত হয়ে স্বাধীন এই দেশে ফিরেছিলেন, সেদিন দেশের প্রতিটি মানুষ, হাসতে হাসতে চোখের জল ফেলেছিল। আনন্দ অশ্রু ফেলে আপনাকে ফিরে পাবার সূখানভূতি তারা প্রমাণ করেছিল।

অথচ কিছু মানুষরুপি বেঈমান আপনাকে ঝাঁঝরা করলো।এসব ভাবলে আমার নিজেরই বুক ব্যথা করে। আমি ভেবে পাই না মানুষের নিষ্ঠুরতা ও বেঈমানি কতোটা তীব্র হলে তারা তখন মানুষ থেকে হায়েনায় রূপান্তরিত হয়।

আজও হাজারো হায়েনা ঘোরাফেরা করে। আপনার নাম ভাঙ্গিয়ে দেশ রসাতলে নিয়ে যায়। আপনি গরীবের বন্ধু ছিলেন। আপনার সেই বন্ধুদের শতবুলেটে পিষ্ট করে। আপনি চলে যাবার পর দেশটাকে নিয়ে কেউ ভাবেনি। সবাই নিজ পুজোয় ব্যস্ত! যেন – নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

এখনকার নেতার বউয়েরা দামী গাড়ি, শাড়িতে আসে। অথচ বঙ্গজননী, আপনার স্ত্রী কি নিদারুণ মা! সাধারনে মহীয়সী, অসাধারণ একজন নারী। পেশাক তার আমার মায়ের মতোই রসুইঘরের ঘামে ভেজা। ছোট্ট রাসেলের জন্য বুকে পোড়া গন্ধ অনুভব করি; কি দোষ ছিল তার!

বঙ্গবন্ধু জানেন, এখনকার নেতা বলে- আমরা নাকি বেহেশতে আছি।

আছিই তো! আমাদের প্রিয় দেশের ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, রাখালিয়া সুর, আইল, খানাখন্দ, পঁচা ডোবার পাট পঁচা গন্ধ সব আমাদের ছেড়ে যায়নি। সামান্য ডাল- ভাত খেয়েও আমাদের বারান্দায় যেন ভরা পূর্ণিমা!

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে বোঝা গেল একের পর এক সমস্ত দেশী শিল্প ধংস্ব করে কি করে আমরা পরমুখাপেক্ষী হয়ে সমস্ত জিনিস আমদানী করে চলতাম। অথচ আপনার দেশের আইনস্টাইন অন্য দেশে আবিস্কার করে। দেশ তাঁকে ধরে রাখতে পারে না। কি হবে আমাদের ভাবতে পারেন? একে একে সব বন্ধ হয়ে গেলে! আমরা কি ফিরে যাবো সেই ৭৬ এর মনন্তরে, সেই ৭১ এ। আবার কি আমাদের স্বাধিকারের জন্য যুদ্ধ করতে হবে?

চলে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু! শুনুন, নিতে পারছেন না তাইনা?

তাই ঝাপসা হয়ে যাওয়া মোটা চশমার কাঁচ মুছছেন? বেশ দেখতে পাচ্ছি।

প্লিজ, আর একবার ফিরে আসুন! আমাদের শাসন করুন আর একবার। আমাদের এই ছন্নছাড়া বাঙালি জীবন; কি নির্মম জীবন যাপন আমাদের! গুছিয়ে তোলার কেউ নেই। আপনার রক্তে রাঙা এই বাঙালির জন্য আপনার মতে করে কেউ কাঁদে না। আপনি আর একবার ফিরে আসুন!

আমরা শুধু লুটপাট করি। যেমন করেছিলাম আপনার রক্ত, আপনার কম্বল। আমরা যে বেঈমানের জাত। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন জাতির পিতা!

![](https://sonelablog.com/wp-content/uploads/2022/08/inbound4452130330588709147.jpg)

ছবি- নেটের
