# ইরার ডাইরী – পর্ব-৪

- Author: [নীরা সাদীয়া](https://sonelablog.com/author/neera-sadeea/)
- Published: 2020-04-05T16:08:30+00:00
- Updated: 2020-04-05T16:26:36+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a7%80-4/

---

দেখতে দেখতে এপ্রিল শেষ হয়ে মে মাস চলে এলো। আর এক সপ্তাহ বাকি।মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কেসটা কোটে উঠবে।ইরার হাতে আরেকটা কেস আছে। আজ ঐ কেসটার শুনানির দিন। তাই ইরা কোটে যাচ্ছে।সে নীল রঙের একটা জামদানী শাড়ি পরেছে, তার ওপরে কালো গাউন। নীল শাড়িতে তাকে বেশ মানায়। রাস্তার মোড়ে বেশ কয়েকটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। সে রিকশা ঠিক করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় কোথা থেকে কারা যেন এসে পেছনে দাঁড়ালো এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের একজন ইরার মুখে রুমাল চেপে ধরল। ইরা জ্ঞান হারিয়ে প্রায় পরেই যাচ্ছিল। তারা ধরাধরি করে একটা বড় গাড়িতে ইরাকে তুলল। প্রকাশ্যে দিনের আলোকে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো। চারপাশের কেউ কিছুই বললো না। কয়েকজন দূরে দাঁড়িয়ে দেখল এবং কেউ কেউ স্মার্টফোন বের করে তার ছবি তুললো।

জ্ঞান ফিরে ইরা দেখতে পেল সে সেই চিরচেনা ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়িটিতে অবস্থান করছে, যেখানে কাটিয়েছে বিগত তিনটি বছর। এখন এক বছর হলো সে এ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছে। প্রথমে ইরা ভাবলো, মাঝের দিনগুলো বোধহয় স্বপ্ন ছিলো। সে এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়নি। এখানেই ছিলো অনন্তকাল ধরে… কিছুক্ষণ পর তার সবকিছু মনে পড়লো। সে পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। পুরো বাড়ি জুড়ে জিনিসপত্র এখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানো। মেঝের টাইলসগুলো আঁঠালো হয়ে আছে। রান্নাঘরের জিনিসপত্রে নোংরা লেগে আছে। কী একটা জঘন্য অবস্থা! ইরার আগে থেকেই হালকা মাথাব্যথা করছিল এসব দেখে যেন গা গুলাতে শুরু করল। চারপাশে শুনশান নীরবতা, পুরো বাসা জুড়ে একটি মানুষ, শুধু ইরা। অথচ একটা সময় এ বাড়িটা গম গম করতো। শফিকের বন্ধু বান্ধব, নামকরা ব্যবসায়ী, আত্নীয় স্বজনরা আসতো, ইরার বন্ধু, আত্নীয় কেউ না কেউ আসতোই। সর্বদা একটা উৎসবমুখর পরিবেশ থাকত চারপাশে। অথচ আজ খা খা করছে পুরো বাড়িটা। এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ তার মাথায় ঢুকলো নিজ বাড়িতেই সে আজ বন্দী, সে অপহৃত হয়েছে নিজ অর্ধাঙ্গের দ্বারাই। যদিও এখন আর তাকে অর্ধাঙ্গ বলা যায় না, কারণ এখন দুজনের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ দুদিকে চলে গেছে।

শোবার ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর ইত্যাদি সব মিলিয়ে আটটি ঘর এই বাড়িতে। বাড়িটা অবশ্য দোতলা। এরই মাঝে শোবার ঘর, বসার ঘরসহ আরও কয়েকটা ঘর ঝাড়ামোছা করে পরিষ্কার করে রান্নাঘরের দিকে গেল ইরা। আর মনে মনে ভাবছে “আমি তো অপহৃত হয়ে এখানে রয়েছি। তাহলে আমি এসব কেন করব?” কিন্তু না করেও পারছে না। কেন যেন তার ভীষণভাবে মনে হচ্ছে “এটা আমার বাড়ি,আমার সংসার।”

অপহৃত হলে খুব ভয়ে ভয়ে থাকার কথা। কিন্তু তার বিন্দু মাত্র ভয় লাগছে না। একমনে বলছে, “এ বাড়ি আমার, এ সংসার আমার।” আরেক মন বলছে, “আমি অপহরণের শিকার। এসব কিছুই আসলে আমার নয়।”  
মনের এই দোটানায় পড়ে মাথাটা যেন আরও ভীষণ ব্যাথা করতে শুরু করলো। ব্যাথায় মাথাটা যেন ফেটে দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। মন চাইছে নিজের সবকিছু আবার আঁকড়ে ধরতে, কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি তাকে তা করতে দিচ্ছে না। এই অবস্থায় ইরা বুঝতে পারলো সে প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। খাবার ঘরে গিয়ে ফ্রীজ খুললো। খুলতেই ভীষণ রকম দুর্গন্ধ নাকে এল। আবার তা লাগিয়ে দিল। এমন সময় বাইরে থেকে চাবি দিয়ে কে যেন ভিতরে ঢুকলো। একসময় এই বাসার দুটো চাবি ছিলো। একটা ইরার কাছে, অন্যটা থাকত শফিকের কাছে। দুজনের কেউ একজন ইচ্ছে করলেই বাইরে থেকে তালা খুলে ভিতরে ঢুকতে পারত। আজ একথা আবার মনে পড়ে গেলো। শফিক বাইরে থেকে খাবার নিয়ে ফিরেছে। খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে ইরাকে বললো,  
:আজকাল বাসায় কাজের লোক রাখি না। আমি বাইরে থেকে খাবার এনে খেয়ে নেই। এই দেখ গরম গরম বীফ তেহারী এনেছি। তুমি অনেক পছন্দ করো, তাই।

শফিকের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই ঘটেনি। ইরা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শফিকের দিকে। তারপর বললো,

:আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছো?  
:আগে খেয়ে নাও তারপর সব বলছি।  
:আমি যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দাও।  
:বললাম তো…  
:সেই তোমার এক স্বভাব! যে কোন প্রশ্নের সোজা কোন উত্তর নেই। উত্তর না দেবার জন্য কত বাহানা…  
: খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ইরা।  
:খাবারে কি মিশিয়েছ?  
:কিচ্ছু না। এই দেখ, আমি খেয়ে দেখাচ্ছি।

শফিক হাতে তুলে কিছুটা খেয়ে দেখালো। এরপর ইরাও আর ক্ষিদে সহ্য করতে না পেরে খেতে বসে গেল।

:ইরা তোমার মনে পড়ে কতদিন আগে আমরা এরকম একসাথে বসে খেয়েছি?  
:নাহ্  
:ভুলে গেলে সব?

আর কোন উত্তর নেই। খেয়ে শেষ করে ইরা ঘুমোতে গেল তার সেই ঘরটিতে। আর শফিক সারা রাত বারান্দায় বসে মশার কামড় খেলো। ফজরের সময় ইরা উঠে দেখল শফিক দু হাতে মশা মারছে আর দুচোখে ঘুম। তার বড্ড মায়া হলো। সে শফিককে ডাকলো।

:শফিক, তুমি এখানে কেন?  
: তাহলে কেথায় থাকব?  
:গেস্ট রুম ছিল তো।  
: ওটা কি আর এখন থাকার যোগ্য আছে?  
:কে বলেছে যোগ্য নেই? গিয়ে দেখ ঘরটা আমি কেমন করে গুছিয়েছি।

শফিক আরমোড়া দিতে দিতে উঠে গেস্ট রুমে গেল। গিয়ে যেন অন্য রকম একটা ঘর দেখতে পেলো।কতদিন পর ঘরটা এমন ঝকঝকে, গোছানো…বিছানায় পরিষ্কার চাদর বিছানো। সে এক লাফে বিছানায় উঠেই দিলো ঘুম। এদিকে ইরা সারাদিন টুকটাক কাজ করে ঘরটা ঠিকঠাক করলো, বাড়িতে যেন ছন্দ ফিরে এলো। পাশাপাশি সে এখান থেকে বের হবার উপায় খুঁজতে লাগলো। বাইরে যাবার চাবিটা কোথায় রাখতে পারে তা খুঁজে দেখলো।তার ব্যাগ, ব্যাগে মোবাইল ফোন ইত্যাদি খুঁজে হয়রান, কিন্তু কিছুই খুঁজে পেলো না। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। শফিক দুপাটি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ইরার সামনে এসে বললো,

:যতই খোঁজ করো, বেরোবার কোন উপায় পাবে না।  
:কি হবে আমাকে জোর করে আটকে রেখে?  
:তা কদিন পর নিজেই বুঝতে পারবে।

চলবে…

---

Comments: 17 — https://sonelablog.com/%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a7%80-4/#comments
