# ইরার ডাইরী শেষ পর্ব

- Author: [নীরা সাদীয়া](https://sonelablog.com/author/neera-sadeea/)
- Published: 2020-04-12T14:58:17+00:00
- Updated: 2020-04-12T15:21:15+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac/

---

আগামীকাল ৯ মার্চ। শফিকের কেসটা ২য় দিনের মত কোর্টে উঠবে। সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে যেতে হবে।তাই আজ রাত দ্রুত ঘুমিয়ে যাবার চিন্তা করছে ইরা৷ এর মাঝে শফিক অনেকবার ফোন করেছে। কিন্তু সে ধরেনি। এদিকে ওসমানের দেয়া আরও কিছু তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এবং সজীবের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কেসটা সুন্দরভাবে সাজিয়েছে ইরা। নিশ্চই কোর্টে গিয়ে তাকে আর কোন সমস্যায় পড়তে হবে না।

যথা সময়ে কোর্ট বসেছে, সকলেই হাজির। বিপক্ষ উকিলকে দিয়ে বক্তব্য শুরু হলো। তিনি আর কিছু না পেয়ে অবশেষে ইরাকে নিয়েই মেতে উঠলেন। ওসমানকে সামান্য জেরা করে তারপর শুরু করলেন জঘন্য খেলা! তার বক্তব্য এরকম:

: এই যে আপনারা দেখছেন আমার বিজ্ঞ প্রতি পক্ষ ইরা আদিবা কে, তার পরিচয়টা একটু খোলাসা করা দরকার। তিনি মূলত আমার মক্কেল শফিক তুহিনের স্ত্রী।তাদের বিবাহিত জীবনের এটা চতুর্থ বছর চলছে।তবে এক বছর আগে ওনি মনোমালিন্যের জের ধরে স্বামীর সংসার ত্যাগ করে অন্যত্র বসবাস করছেন। আর এরই প্রতিশোধ নিতে তিনি আজ মিঃওসমানকে লেলিয়ে দিয়ে এই কোর্টে প্রবেশ করেছেন।

রাগে, অপমানে ইরার চোখ ছলছল করছিলো। আর কোনদিন কোন কেস নিয়ে কোর্টে এসে তাকে এমনভাবে নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয়নি। এক ঘর ভর্তি লোকের সামনে উকিল সাহেবার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে যখন সাধনা করা হচ্ছিল, তখন চোখ মুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ালো ইরা। এ ধরনের আলচনাকে অপ্রাসঙ্গিক বলে তীব্র আপত্তি জানালো সে। বিচারক তাকে কথা বলার অনুমতি দিলেন।

: মহামান্য আদালত, যেহেতু আমার বিজ্ঞ বন্ধু অজ্ঞের মত আমার ব্যক্তিগত জীবনকে টেনেই আনলেন তখন আমি কিছু কথা না বলে পারছি না, যা এ কেসের সাথে সম্পর্কযুক্ত না হলেও এই দেশ, সমাজ তথা পৃথিবীর জন্য একটি বার্তা।  
:আপনি বলুন।  
:এই দেশে, এমনকি গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর সম্মান খুবই ঠুনকো। যত্রতত্র যেভাবে ইচ্ছে আঘাত করে একজন নারীকে অপদস্থ করা যায়, তার সম্মানহানি করা যায়। খুব সহজেই তাকে কলঙ্কের বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায়, ডাইনী, সর্বনাশী তকমা এঁটে দেয়া যায়। কোন একটা ভাঙন কিংবা অন্যায় সংঘটিত হলেই সমস্ত দোষের বোঝা তার ওপর চাপানো যায়। যেন, তুমি নারী সুতরাং সকল দায় তোমার,সকল দোষ তোমার। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন আমার বিজ্ঞ বন্ধুটিও তাই করেছেন। তিনি বললেন মনোমালিন্যের জের ধরে আমি সংসার ত্যাগ করেছি, অর্থাৎ সকল অন্যায় আমিই করেছি। আমি সংসার করতে পারিনি, তাই জেদ মেটাতে এসেছি। আপনি খেয়াল করলে আরও দেখবেন, একজন পুরুষ তার “মেল ইগো” নিয়ে এতটাই অন্ধ যে তিনি কিছুতেই একজন নারীর কাছে হারতে চান না। যুক্তিতে, বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠতে না পারলেও ঐযে একটা মারণাস্ত্র আছে, নারীর চরিত্র, ঐটাতে আঘাত করে বসবেন। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানা হেঁচড়া করে তার মনোবল ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করবেন। এখানে নারীকে চরিত্রের কলঙ্ক দেয়া এত সোজা যে এটা যখন তখন দেয়া যায়। পাবলিকও খায় এসব আয়েশ করে।

কিন্তু আমার বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ হয়ত ভুলে গেছেন যে মুখের কথায়, নারীর কলঙ্কে আদালত খুশি হয় না, আদালত প্রমাণ চায়। আমি এখন একে একে আমার সাক্ষী ও প্রমাণ পেশ করব।

এবার ইরা একে একে ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষী সজীব ও আজিজ মিঞার বক্তব্য পেশ করলো। বিচারক সমস্ত কিছু বিচার বিবেচনা করে শফিককে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত করল। জেলে যাবার পথে শফিক ইরাকে বারবার অনুরোধ করে গেল যেন একটিবার জেলে তাকে দেখতে যায়। ইরা বললো,

:জীবনে তো কোনদিন ঘরের কাজ করোনি, আমাকে কোনদিন বাসায় একটা কাজেও সহযোগিতা করেছ বলে মনে পড়ে না। সুতরাং এখন জেলে গিয়ে হলেও তোমার “মেল ইগো” ঝেড়ে ফেলে কিছু কাজ কর্ম শিখে এসো। আর হ্যাঁ, শুদ্ধ হয়ে ফিরে এসো।

এসব কথাকে পাত্তাই দিলো না শফিক। বরং হাতজোড় করে অনুরোধ করতে লাগলো ইরা যেন তাকে দেখতে যায়। শফিকের কথা রাখতে বেশ কবার সে গেছে জেলে দেখা করতে। একদিন শফিক তাকে অনুরোধ করলো “সুখসারী”তে ফিরে যেতে। সুখসারী হলো তাদের ধানমন্ডির সেই বাসাটা। ইরা তাই করলো। ঐ বাসাটা ছেড়ে সেও যেন আর দূরে থাকতে পারছিলো না। বাসাটাকে আবার মনের মত করে সাজিয়ে অপেক্ষা করছিলো কবে শুদ্ধ হয়ে ফিরবে শফিক।

বাসার অনেক জিনিসই পুরনো হয়ে গেছে। কিছু জিনিসে জং ধরেছে। কিছু আসবাবপত্রের রং উঠে গেছে। এগুলো একটা একটা করে ঠিক করায় আর ভাবে, শফিক বাড়ি এসে এই নতুন নতুন জিনিসগুলো দেখে,পরিপাটি সংসার দেখে চমকে যাবে হয়ত! কিন্তু মাঝের সময়টুকু তো এক দু বছর নয়, গুনে গুনে ১৪ টি বছর! এত দ্রুত কি আর ফুরোতে চায়? তবু সে অপেক্ষায় থাকে।

কোর্ট সেরে ইরা আজ আবার যাবে শফিককে দেখতে। তাই কাজ শেষ করে দ্রুত বের হয়ে রিকশা ধরল। জেলগেটে নেমে অনুমতি নিয়ে দেখা করতে গেল। আজ শফিককে দেখে সে যেন আর সইতে পারছে না। কখন যে চোখে পানি এসে গেল, তা নিজেই জানে না!

: ইরা, কাঁদছো কেন?  
: কই? না তো! (একথা বলতে বলতেই কপোল গড়িয়ে কলকল স্রোতে নেমে এল ঝর্ণা ধারা! আর আটকে রাখা গেল না)  
:কি হয়েছে ইরা?  
:মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার এ অবস্থার জন্য আমি দায়ী, আমার এ পেশা দায়ী! আমি যদি নিজেকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতাম! সাজগোজ আর রূপচর্চা করে সময়টা কাটিয়ে দিতে পারতাম, তাহলে আজ এ দিন দেখতে হতো না। তোমাকেও এত দূরে থাকতে হতো না। আমরা একসাথে সংসার করতে পারতাম। কিন্তু আমি কেন যে অমন মেয়ে মানুষ হতে পারলাম না! কেন যে আমার মাথায় অত যুক্তি, বুদ্ধি, আত্মসম্মানবোধ আসে! ঐগুলোই আমাকে তোমার সাথে একসাথে সুখী হতে দিল না।  
:তোমার কোন দোষ নেই ইরা। তোমার মত স্ত্রী সকলের ভাগ্যে থাকে না। তুমি কোনদিন আমাকে কাড়ি কাড়ি টাকা, শাড়ি, গয়না এসবের জন্য চাপ দাওনি। যেখান থেকে পারি, যেন রোজগার করে আনি, এমন কথা তুমি বলোনি। বরং তুমি সবসময় আমার পাশে থাকতে চেয়েছ, আমাকে ফেরাতে চেয়েছ অন্যায় পথ থেকে। হ্যাঁ, তোমার শাসনের মাত্রাটা একটু বেশিই ছিলো হয়ত, তাই আমারও বেশি বেশি জেদ চেপেছে। তারপরও আমি তোমার দোষ দেব না। তুমি একজন মানুষ, তাই তোমার ভেতর এই বোধগুলো কাজ করে। সত্যি বলতে এগুলো ছাড়া তোমাকে ভাবাই যায় না। কেমন যেন রোবট রোবট মনে হয়। আমি জানি, তুমি কী চেয়েছ। এটাও জানি তুমি অকৃতজ্ঞ নও। মনে আছে, তুমি কি বলতে? বলতে, “এদেশের সরকার আমাকে উপবৃত্তি দিয়ে পড়িয়েছে। এদেশের জল হাওয়ায় আমি বেড়ে উঠেছি। আমার নিজের দেশের প্রতি আমারতো একটা কর্তব্য আছে। আমি দেশের জন্য কিছু করব। যারা দুর্নীতি করে, দেশের ক্ষতি করে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।” আমি তখন হাসতাম তোমার এসব কথা শুনে। এখন কথাগুলোর মর্ম বুঝি। এখন আর আমার হাসি পায় না।  
:তুমি সত্যিই বদলেছ শফিক!  
:হয়ত…  
শোন, তোমাকে আজ ডেকেছি একটা বিশেষ কারণে। তোমার মনে আছে, ময়মনসিংহের ময়নাদ্বীপে আমরা দুজন মিলে একটা জমি কিনেছিলাম। তোমার শখ ছিলো গাছের ওপর বাড়ি বানিয়ে তুমি থাকবে। ছোট্ট একটা জানালা থাকবে সে বাড়িতে। গাছে অনেক পাখি থাকবে…  
:তোমার ওসব মনে আছে?  
:হ্যাঁ, সব। ঐ বিষয়টা গুছিয়ে ওঠার আগেই তো কি থেকে কি সব হয়ে গেলো, আর কিছুই করা হয়ে উঠলো না। যাই হোক। ঐ জায়গাটা তোমার নামেই কেনা ছিলো, কাগজপত্র সব তুমিই আলমারিতে তুলে রেখেছিলে। সুতরাং তুমি জানো ঐগুলো কোথায় আছে।  
:আমার ওসব কিচ্ছু চাই না…  
:আমি জানি। ঐ জায়গাটা আমরা সখীপুরের বস্তিবাসীদের দিতে পারি কিনা?  
:খুব ভালো বলেছ।  
:তাহলে কাগজপত্র বের করে কাল থেকেই ওদের পূনর্বাসনের কার্যক্রম শুরু করে দাও, কেমন?  
:আচ্ছা, আজ তবে আসি।  
:ইরা..  
:হুম…  
:আমাকে একটা ডাইরী কিনে দিতে বলেছিলাম। এখানে একা একা যখন ভালো না লাগে, তখন লিখব। এনেছো সেটা?  
:ওহ্, আমিতো সেটা দিতে ভুলেই গেছিলাম। এই নাও ডাইরী। পছন্দ হয়েছে?  
: হবে না আবার! কতদিন পর তুমি পছন্দ করে কিছু কিনে আনলে।

এরপর মাস পেরিয়ে বছর ঘুরলো। ইরা ঐ ময়নাদ্বীপের কাজ আর নিজ পেশা নিয়ে খুব ব্যস্ত। ঢাকা-ময়মনসিংহ দৌড়ঝাঁপের ফাঁকে ক্লান্ত হয়ে যখন বাসায় ফেরে তখন তার শফিকের কথা খুব মনে পড়ে। কিন্তু শফিকের কাছে কোন ফোন নেই। কতবার ভেবেছে একটা ফোন কিনে দিয়ে আসবে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। দেখাও করতে যেতে পারছে না। রোজই ভাবে আগামীকাল যাবে,কিন্তু তা আর হয় না। এভাবে চলতে চলতে একদিন থানা থেকেই ফোন এলো, ইরাকে জরুরী ভিত্তিতে দেখা করতে বলা হলো। ইরা খানিকটা চমকে গেলো। পরদিন সব কাজ ফেলে আগে শফিকের কাছে ছুটে গেলো। কিন্তু শেষ দেখাটা আর হলো না!

একজন জেলার এসে জানালো:

: ম্যাডাম, শেষ কদিন তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন। শ্বাসকষ্ট ছিলো। হাসপাতালে ভার্তিও করেছিলাম। আমরা বারবার আপনাকে ফোন দিতে চেয়েছি। কিন্তু শফিক সাহেব মানা করেছেন। বলেছেন,  
“ইরা হয়ত ব্যস্ত আছে। ফোন দেয়ার দরকার নেই। ও নিজেই আসবে।”  
প্রতিদিন জেলের গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ওনার প্রচন্ড বিশ্বাস ছিল আপনি একবার হলেও আসবেন। কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন ওনার দিন ফুরিয়ে এসেছে, আর হয়ত দেখা হবে না, তখন আমাকে এ ডাইরীটা দিলেন। দিয়ে বললেন,

“আজ থেকে এটা ইরার ডাইরী। এটার ওপর সম্পূর্ণ অধিকার শুধু ইরার।”

ডাইরীর একেক পাতা পড়ে আর চোখের জলে ভাসে, এভাবেই শফিকের না বলা কথাগুলোকে আগলে বেঁচে রয় ইরা। ময়না দ্বীপে বসতি গড়ে ওঠে, পাখি সুখে গান ধরে। ইরার সকল সুর আটকে আছে শুধু ঐ ডাইরীতে। প্রতিটা পাতায় শফিকের স্পর্শ, সেই স্পর্শকে মুঠোয় বন্দী করে বেঁচে রয় ইরা। কেননা শেষ পাতায় শফিক লিখে গেছে,

“আমাদের সংসার হবে ওপারে…”

---

Comments: 20 — https://sonelablog.com/%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b7-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac/#comments
