# আমি কেন নয়?

- Author: [রোকসানা খন্দকার রুকু](https://sonelablog.com/author/ruku007/)
- Published: 2020-11-11T15:23:17+00:00
- Updated: 2020-11-11T17:52:14+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%af%e0%a6%bc/

---

” ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার,  
মস্ত ফ্ল্যাটে যায়না দেখা এপার ওপার,,,আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম- বিখ্যাত চোখ ভাসানো গানের কথা।

খালা কি বানাইছ? দাও খাইতে থাকি।  
= কি আর বানামু ওই প্রত্যেকবছর যা খাও তাই!  
– হুম তোমার এই চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, পাটিশাপটা খাওয়ার জন্যই তো শীতের অপেক্ষা করি।  
= আমিও খাওয়াবো বইলা না মরে বেঁচে থাকি।  
– ছি! এমন করে বলোনা। তা তোমার বেটা- বেটি কয়জন? এই বয়সে ঠান্ডায় দোকান কর কেন?  
= বেটা নাই; মইরা গেছে। আর বেটির কাছে মুখ দেখানোর জো নাই।  
– কোথায় যেন ধাক্কা লাগল। বহু বছর ধরে তিনি মোড়ে দোকান করেন। গরমের সময় পিয়াজু, বেগুনী, ডিম সেদ্ধ এসব বানিয়ে বিক্রি করেন কিন্তু তেমন চলেনা । শীতের সময়টা চলে মোটামুটি।  
এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ। খালার ছেলে মেয়ে সবই আছে। ছেলে তাকে উটকো ঝামেলা মনে করে দেখেনা। আর মেয়ের কাছে লজ্জায় যাননা। কারন ভিটেটুকু ছেলেকে লিখে দিয়েছেন। তাই তিনি স্বামী মারা যাবার পরও একাই দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের অনেক কিছুরই উন্নয়ন হয়েছে। যেমন- বাবা মাকে ছেড়ে থাকা, তাদের ভরনপোষন না দেওয়াও একটা উন্নয়ন।  
অনেক দেশেই আইন আছে। প্রয়োজনে বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। আদতে বাবা- মা তা করেননা। খেটে খাওয়া মানুষের চেয়ে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারে এ সমস্যা বেশি প্রকট। মন্ত্রীকে নিজের বাড়িতে ফেরত আসার জন্য আইনের আশ্রয় নিতে হয়। হাজারো মানুষের কারিগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রম। মাকে না জানিয়ে ছেলে বাড়ি বিক্রি করে দেয়। ফোনে মাকে বিনয়ের সাথেও বলে,”মা আপনি দয়া করে ফ্ল্যাট খালি করেন, আমি বিক্রি করেছি”। চোখের পানি ফেলে মা বলে, আমি জানিনা ছেড়ে যাব কোথায়।তারপরও আমি চাই আমার ছেলে ভালো থাকুক”। অথচ আমাদের কলিজা এতটুকুও কাঁপে না।  
সন্তান বলতে আমরা ছেলেমেয়ে উভয়কেই বুঝি। বাবা মাকে দেখার দায়িত্ব সন্তানদের।

মেয়েরা পরের বাড়ীতে যায় এজন্য বাবা-মায়ের দায়িত্ব থেকে শুরুতেই হাত-পা ছাড়া। আর ছেলেরা বউ আসার পরেই কেমন বদলে যেতে থাকে এবং একসময় তাদের ছেড়ে যায়। এটা হয় কেন? বা কে তৈরি করে এসব?  
এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব অভিমত রয়েছ, কারও সাথে নাও মিলতে পারে। আমার মনে হয় বাবা-মায়ের ও বিরাট বড় ভূমিকা রয়েছে মেয়েদের দায়িত্বহীনতার পেছনে।ছেলেজন্মে অতি খুশি, আহ্লাদিপনা করা এবং ছেলেদের তাদের সম্পদের একমাত্র উত্তরাধিকারী ভাবা কিংবা সম্পত্তি লিখে দেবার মত কাজগুলি অনেকাংশে দায়ী। এতে করে অবহেলায় মেয়েদের দায়িত্ববোধ নষ্ট হয়।আর ছেলেদের বাবা মায়ের প্রতি পরাধীনতা যেহেতু থাকেনা। তাই স্বাধীনতা, স্বাবলম্বীতা তাদেরকে অনেকসময় দায়বদ্ধতা থেকে দুরে রাখে। অধিকাংশ পরিবারের মেয়েদের সম্পদের অংশ দেয়া হয় না। সম্পদের অধিকার শুধু ভোগদখল নয়, মেয়েদের মর্যাদার প্রশ্নও বটে। ছেলে সন্তান বিধাতার কোন বিশেষ আশির্বাদ নয় যে, তাদের জন্য মেয়েদের ন্যায্য হক থেকে বন্চিত করতে হবে। আজ বিশ্বময় যে জেন্ডার ইস্যু চলছে এটার সৃষ্টি কিন্তু পরিবার থেকেই।

কেমন করে পরিবার থেকে? ধর্মীয় পার্সোনাল ল’তে যে অসম, অমানবিক বিধান সেটি পুরুষ কর্তৃক রচিত আর আল্লাহ প্রদত্ত বিধান। পুত্র সন্তানের অর্ধেক আর কন্যা সন্তান পুত্রের অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী। আমাদের পরিবার কিংবা সমাজ কি তা মানছে কিংবা পালন করছে? মোটেও না। মেয়ে সন্তানদেরকে মর্যাদাময় ভবিষ্যত এবং গ্লানিকর অসম্মান, পুরুষের গলগ্ৰহ হওয়া থেকে রেহাই দানের নিমিত্তে অবশ্যই পরিবারের উচিত সম অধিকার নিশ্চিত করে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। সমাজের দৃষ্টিতে নারীকে মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠার এ কঠিন সংগ্ৰাম ঘরে-বাইরে অনেকদিনের। তাহলে তারা কি মানুষ হয়ে জন্ম নেয় না? সমাজের দীর্ঘ দিনের লালিত কু-সংস্কার, ধর্মীয় আচার-অনুশাসন, স্থিত বিশ্বাস, কথিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে নিজের অভ্যন্তরে অবচেতন মনে ঘাপটি মেরে বসে আছে অন্ধ বিশ্বাস, পুরুষ মনের সুবিধাবাদ।এসব পাড়ি দিয়ে মেয়েদের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সচেতনতা এবং কঠোরভাবে সোচ্চার হতে হবে । তবেই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। আমরা মেয়েরা এতটা কঠিন হতে পারিনা। পরিবারের অসমতা মেনে নেই নির্বিবাদে ফলে শশুর বাড়িতে সম্মান থাকেনা, স্বামী অবজ্ঞা করে। আর তাই বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে চলি নিজের জীবন বাঁচাতে।

ফেসবুকে ছেলেদের স্ট্যাটাস দেখা যায় বৌ ভিত্তিক। অর্থাৎ এখনকার মেয়েরা শশুর শাশুড়ি দেখে না তাদের সেবা করেনা। এখানে আমার প্রশ্ন হলো তুমি ছেলে কি কর? বউএর উপর বাবা-মায়ের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে নিজে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াও কেন? তুমিও তোমার সন্তান হবার দায়িত্ব পালন কর? বেহেশতে তো নিয়ে যাবে তোমাকে, তোমার বউকে তো না! সন্তান জন্মের পর যদি তার ডায়াপার বদলাতে পার তাহলে বুড়ো বাবা-মায়ের দায়িত্ব অন্যের হাতে কেন? আর শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, শাশুড়ি কখনও মা হয়না, মায়ের মত হয়। বউ কখনো মেয়ে হয়না, মেয়ের মত হয়। সুতরাং আমার মাকে আমি যতখানি যত্ন করব বউ তার একগুনও করবেনা। অযথা সারাক্ষন একটা ফিকশন, ঝগড়া ফ্যাসাদ লেগেই থাকছে। সমাধান কিছুই নেই। একটা পুরুষ চাকরী ব্যাবসার পাশাপাশি পারিবারিক অন্য দায়িত্ব কম নেয়। মেয়েটাও চাকরী ব্যবসা কিংবা সারাদিন সংসারের ঘানি টেনে টেনে ক্লান্ত হয়। শশুর-শাশুড়ি , বাচ্চা-কাচ্চা সব দায়িত্ব একার তারই নয়।অযথা ফেসবুক না ভরিয়ে ভাগাভাগিতে সংসার শান্তিপূর্ণ হয়।

ইন্ডিয়ান এক মেয়েবাবা-মায়ের দায়িত্ব মেয়েদের দেয়ার কথা বলায় যথেষ্ট সমালোচনা হয়। সমালোচনার কিছু নেই। গর্ভধারণের মত ভয়ানক এবং কঠিন কাজ মেয়েদের দ্বারা হলে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়া কঠিন কিছু না। আমার মতে,মেয়েরা ছোটবেলা থেকে বাবা-মাকে দেখে দেখে বড় হয় । পছন্দ-অপছন্দ, রুচি-চাহিদা সবই জানা থাকে। সুতরাং বাবা- মায়ের টেককেয়ার করা মেয়েদের জন্যই সহজ। সময় বদলে গেছে এখন দায়িত্ব- কর্তব্য সমান সমান করে নেয়া যায়। ব্যবসা বাণিজ্য চাকুরী সমস্ত অঙ্গনে সমান বিচরন করতে পারলে মেয়েরা বাবা-মায়ের দায়িত্ব ও নিতে পারবে। সুতরাং ভূয়া নিয়ম ভেঙ্গে সমঅধিকার শুরু হোক পরিবার থেকে।

বাবা মায়ের প্রতি, ছেলে ছাড়া বাঁচব না!আপনারা এসব ছেলে প্রীতি বাদ দেন।কোরআন এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ” এক কপর্দকের হক হেরফেরকারী জান্নাতে যাবেনা”। ছেলেসন্তান নিয়ে আদিক্ষেতা না করে মেয়েসন্তানকেও সকল সুযোগ সুবিধা, সমঅধিকার নিশ্চিত করে বড় করুন। তারপর মেয়েদের ঘাড়ে ঝুলে পরে, পা ঝুলিয়ে দিন। সম্পত্তিনা থাক; সর্বোপরি সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলুন! মেয়ের বাড়িতে যাওয়া থাকা অশোভন এসব বাদ দিয়ে আমাদেরও সেবা করার সুযোগ দিন। দেখবেন সেও শান্তি দেবে, স্বস্তি মিলবে এবং পারবেও সব।  
আর আমরাও গান শুনতে চাই-  
“মেয়ে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার,  
মস্ত ফ্ল্যাটে যায়না দেখা এপার ওপার!  
একা একা থাকে সে ফিল করে বোর,  
তাই আমায় ছাড়তে হল বোরিং ছেলের ঘর”।😜😜😜

ছবি- সংগ্রহ।

---

Comments: 19 — https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%af%e0%a6%bc/#comments
