# আমার কুশ্রী চেহারার বিস্তারিত ঘটনাবলী

Author: নিতাই বাবু
Published: 2022-08-17
Category: একান্ত অনুভূতি
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d/

ছোটবেলা যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম, তখন স্কুলের সমবয়সী ক্লাসমেট ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে দেখে হাসা-হাসি করতো। আবার দু’একজনে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকতো। কেউ কেউ আবার একটু ভয়ও পেতো। এর কারণ হলো, আমার চেহারা আরও দশজনের মতো নয়। এককথায় বলতে গেলে বলতে হয়, আমার চেহারা আরও দশজন সুশ্রী মানুষের চেয়ে কুশ্রী। এমনিতেই আমার গায়ের রং কালো। তার উপর আবার মুখমণ্ডলে বিশ্রী দাগ। আসলে মুখমণ্ডলে এই দাগগুলো আমার জন্ম থেকে নয়। দাগগুলো জন্মের চার বছর পর থেকে আজ অবধি। ছোটবেলায় আরও ভয়ানক দাগ ছিলো। বয়স বাড়ায় সাথে সাথে মুখমণ্ডল-সহ শরীরের দাগ অনেক মিশেছে।

এখন আমার অনেক বয়স হয়েছে। তবুও আমার মুখমণ্ডলে এরকম দাগ দেখে অনেকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, “মুখমণ্ডলে এগুলো কীসের দাগ”? তখন মানুষের কথার উত্তর দিতে গিয়ে সহজেই বলে ফেলি, “বসন্ত’র দাগ”। কিন্তু যে-সময় আমি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম এবং কীভাবে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে সেরে উঠেছিলাম; আর কীভাবে আমার মুখমণ্ডল কুশ্রী হয়েছে- তা আর কারোর কাছে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলতে পারি না।

তাই আমি কয়েকদিন আগে থেকে মনস্থির করেছি, কীভাবে আমার মুখমণ্ডলে দাগ হয়েছে, কীভাবে আমার চেহারা সুশ্রী থেকে কুশ্রী হয়েছে, সেবিষয়ে বিস্তারিত লিখে সবার মাঝে শেয়ার করবো। তা হলেই মানুষ বুঝতে পারবে, জানতেনও পারবে। তো শুনুন, কীভাবে কী হয়েছিল!

এক সময় এই বঙ্গদেশে কলেরা ডায়রিয়ার মতো রোগের আলামত দেখা দিতো, অহরহ। যখন যে-ই গ্রামেই রোগ দেখা দিতো, তখন সেই গ্রামে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে যেতো। স্বজন হারা মানুষের আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠতো। এই রোগের মতো আরেকটা রোগ ছিলো গুটিবসন্ত বা জলবসন্ত রোগ। এই রোগ দেখা দিলে, রুগির সমস্ত  শরীরে গোটা বা গুটি দেখা যেতো। তাই এই রোগটাকে কেউ-কেউ গুটিবসন্ত বা জলবসন্ত রোগও বলতো। তখনকার সময়ে এই কঠিন প্রাণঘাতী রোগের কোনও ডাক্তারি চিকিৎসা ছিলো না। তাই তখনকার সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই রোগটাকে দেবীরূপে পূজা করতো। সেই দেবীর নাম, শীতলা দেবী, আর পূজার নাম হলো ‘শীতলা পূজা’।

আমার বয়স যখন চার বছর, তখন আমার শরীরে এই রোগ দেখা দেয়। শুনেছিলাম, মা-বাবা’র মুখে, বড় দিদি’র মুখে, বড় দাদা’র মুখে। প্রথমে আমার শরীরে কয়েকটা গোটা বা গুটি দেখা দেয়। যেদিন আমার শরীরে গোটা বা গুটি দেখা দেয়, সেদিন আমার শরীরে খুব জ্বর ছিলো। শরীরে জ্বর দেখে আমার মায়ের সন্দেহ বাড়তে থাকে। সাথে সাথে পাশের বাড়ির হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার জ্বর মাপার যন্ত্র থার্মোমিটার দিয়ে মেপে-ঝেপে বললো, “ওর শরীরে লুন্তি উঠেছে।  {লুন্তি হলো বসন্ত রোগেরই এক জাত। বসন্ত হলো, সাত জাত। যথাঃ সৈদ, দাদ, ব্রন, ছালা কাটা, মুশরি কাটা, লুন্তি ও বসন্ত বা জলবসন্ত} “ওকে সাবধানে রাখতে হবে। কারোর ছোঁয়া যাতে না লাগে”। এই বলে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার কিছু ঔষধ দিয়ে আমাকে আর মা-কে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো।

বাড়িতে আসার পরপরই মা পড়ে গেলেন ভীষণ চিন্তায়! শুরু হলো আমার পরিচর্যা! সাবধানে রাখা। মানে, বন্ধ ঘরে আবদ্ধ করে রাখা। রুগীর ঘরে কেউ না যাওয়া। যদিও যেতে হয়, তা হলে পায়ের জুতো খুলে বাইরে রেখে খালি পায়ে পাক-পবিত্র হয়ে ঘরে ঢোকা। বিছানার সামনে সবসময় নিম গাছের পাতা-সহ একটা ডালা রাখা। ধূপবাতি জ্বালিয়ে রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি সাবধানতা অবলম্বন করা। 

এতকিছু করার পরও যখন আমার শারীরিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল না, তখনই মা চলে গেলেন নিকটস্থ বাজারে থাকা পোস্ট অফিসে। পোস্ট অফিস থেকে বাবাকে জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি আসার জন্য টেলিগ্রাফ পাঠালো। বাবা টেলিগ্রাফ হাতে পেয়ে তাড়াতাড়ি বড় দাদাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো। উদ্দেশ্য আমাকে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে এসে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলের এক কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করানো। বাবা’র যা উদ্দেশ্য ছিলো, তা-ই হলো। বড় দাদা বাড়িতে গিয়ে আমাকে-সহ মা-কে নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন আদর্শ কটন মিলে নিয়ে এলো। আদর্শ কটন মিলে এসে আমাকে আর মা-কে রাখা হলো, বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাসায়। 

সেইদিনই আদর্শ কটন মিলের পাশই ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলের ভেতরে থাকা কবিরাজের কাছে আমাকে নিয়ে যায়। যেই কবিরাজের কাছে আমাকে নিয়ে গেলো, সেই কবিরাজ ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলে কাজ করার পাশাপাশি বসন্ত রোগের চিকিৎসাও করতো। বসন্ত রোগের চিকিৎসা করাতে কোনও টাকা-পয়সার দরকার হতো না, কবিরজও চিকিৎসা করে কারোর কাছ থেকে কোনও টাকা-পয়সা নিতেন না। চিকিৎসা করতেন সম্পুর্ন ফ্রি-তে। তবে যতদিন চিকিৎসা চলতো, আর যখনই কবিরাজ রুগীর বাড়িতে যেতো; কবিরাজের জন্য এক বোতল “মৃতসঞ্জীবনী” সুরা দিতে হতো। মানে একটা মদের বোতল দিতেই হতো। এটাই ছিলো কবিরাজের চাওয়া বা হাদিয়া। 

যাইহোক, কবিরাজের বাসায় আমাকে নিয়ে যাবার পর কবিরাজ আমাকে দেখলো। দেখে প্রাথমিক ঝাড়-ফুঁক দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিলো। পরদিন সকালে কবিরাজ নিজেই আদর্শ কটন মিলে গিয়ে আমাকে দেখে বলল, “মায়ের পূজা করতে হবে”। মানে, শীতলা দেবী‘র পূজা করতে হবে। কবিরাজের কথা শুনে আমার মা-বাবা তা-ই করলো। পূজা করতে যা-যা লাগে, তা সংগ্রহ করা করলো। তারপর থেকে প্রতিদিন একদিকে চলতো শীতলা দেবীর পূজো আর ঝাড়-ফুঁক, অন্যদিকে বিছানায় পড়ে থাকতোআমার পচা-গলা নিথর দেহ!

এভাবে দিন যায়, মাস গড়ায়। গত হতে লাগলো প্রায়ই চার মাস। কিন্তু আমার শারীরিক অবস্থা উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। আমার সমস্ত শরীরের মাংস খয়ে-খয়ে পড়তে লাগলো। তখন আমার শরীরে নাকি মাংস ছিলো না। আমাকে রাখা হতো বিছানার উপর কলাপাতা বিছিয়ে। কলা পাতায় তিলের তেল ঢেলে তৈলাক্ত করে তার উপরে আমাকে শোয়াইয়া রাখা হতো। তখন আমি নাকি আমার দু’হাত দিয়ে শুধু সারা শরীলটা চুলকাতাম। চুলকাতে চুলকাতে একসময় আমার শরীরের মাংস-সহ মুখমণ্ডলের ত্বক খসে পড়ছিলো। 

এ অবস্থা দেখে কবিরাজ আদেশ দিলেন, রুগীর হাত-পা চৌকির চার পায়ার সাথে বেঁধে রাখতে হবে, যাতে হাত-পা দিয়ে শরীর চুলকাতে না পারে। কবিরাজের কথামতো তা-ই করা হলো। আমার হাত-পা চৌকির চার খুঁটির সাথে সবসময়ের জন্য বেঁধে রাখা হতো। আর কলা পাতার বিছানায় ঢেলে দেয়া হতো,  খাঁটি তিলের তেল। 

এভাবেও যখন মাসের পর মাস গত হতো লাগলো, তখন আমার অবস্থা দেখে আমার মা-বাবা ও বাড় দাদা আমার বেঁচে থাকার আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু কবিরাজ তখনও বলছিল, রুগীর কিছুই হবে না, তোমরা কেউ ঘাবড়াবে না। যে করেই হোক আমি শীতলা দেবী মায়ের কাছে প্রার্থনা করে এই রুগী ভালো করবোই করবো। কিন্তু তাতে একটু সময় লাগবে। কারণ, রুগীর শরীরের যেই জলযুক্ত গোটা দেখা যাচ্ছে, তা হলো জলবসন্ত।  শুধু জলবসন্তই ওঠেনি, জলবসন্তের সাথে সৈদ, দাদ, ব্রন, ছালা কাটা, মুশরি কাটা, লুন্তি, এই ছয় জাতের গোটাও ওঠেছে। তাই তোমরা একটু ধৈর্য ধরো, সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। 

কবিরাজ থেকে এরকম আশ্বাস পেয়েও আমার মা-বাবা বড় দাদা নিজেদের মনকে শান্তনা দিতে পারছিলেন না। তাঁরা একরকম খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে শুধু কান্না-কাটির মধ্যদিয়ে দিন পার করতে লাগলো। কবিরাজও তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে কবিরাজ তার বাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে রাত-দিন নিয়মিত আমার পাশেই থাকতো শুরু করলেন। খাওয়া-দাওয়া, স্নান-ধূতী সবই চলছিল আমাদেরই বাসায়। কবিরাজ প্রতিদিন সকালে দেবীর পূজা সারতেন। সন্ধ্যার পর করতেন মন্ত্রপাঠ, ঝাড়-ফুঁক। সেইসাথে চলতো উনার মদপান।

 আমি বড় হয়ে মায়ের মুখে শুনেছি, কবিরাজ মন্ত্রপাঠ করার সময় মদপান করতো। মদপান  করার সময় আমার সমস্ত শরীর তার জিভ দিয়ে চেটে খেতো। এভাবে কেটে গেলো ছয়মাস। তারপর আস্তে আস্তে আমার শরীর শুকাতে শুরু করলো। সাত মাসের সময় আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আমি আমার দু’চোখে কিছুই দেখতাম না। অন্ধ মানুষের মতো ঘরের বেড়া আর বাঁশ-খুঁটি ধরে ধরে এদিক-সেদিক হাঁটা-চলা করতাম। এমন অবস্থায় কবিরাজ উপদেশ দিলো, পুকুরে জন্মানো জ্যান্ত বড় শামুক এনে একটা কাঁসার বাটিতে রেখে দিতে। তারপর ওই শামুক থেকে কিছু স্বচ্ছ জল বের হবে। সেই জল প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুই ফোটা করে আমার দু’চোখে দিতে হবে। কারণ আমার চোখেও জল-বসন্তের গোটা উঠেছিল। তাই শরীর শুকানোর পরও আমি আমার চোখে দেখতে পেতাম না। যার কারণেই কবিরাজ  আমার চোখে সকাল-বিকাল দু’বেলা শামুকের জল দিতে বলেছিল।

কবিরাজের কথা শুনে আমার মা তা-ই করেছিল। প্রতিদিন সকাল-বিকাল দু’বেলা দু’চোখে দুই ফোটা শামুকের জল দিতে দিতে একসময় আমি আমার চোখের পরিপূর্ণ জ্যোতি ফিরে পেয়েছি। কিন্তু শরীর-সহ মুখমণ্ডলের দাগ এখনো মিশে যায়নি। মিশে যায়নি চোখের মনিতে ওঠা জলবসন্তের গোটার দাগও। চোখের মনিতে যে জলবসন্ত গোটার এখনো আছে, তা আমার জানা ছিলো না। তা জানতে পারলাম গত কয়েক বছর আগে যখন আমি চোখের সমস্যা নিয়ে এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলাম, তখন। 

চোখের ডাক্তার আমার দু’চোখ পরীক্ষা করার জন্য  আমার চোখে টচ্-লাইট জ্বেলে ভালো করে দেখলো। দেখার পর চোখের ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার চোখের মানিতে ছোট গোলাকার একটা দাগ দেখতে পাচ্ছি। আপনি কি বলতে পারেন, এটা কীসের দাগ হতে পারে? আমি আমার জীবনে অনেক চোখের রুগী দেখেছি। কিন্তু কারোর চোখের মনিতে এরকম দাগ আজ পর্যন্ত দেখিনি। তাই জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি এবিষয়ে আমাকে একটা ধারণা দিতে পারেন”? 

ডাক্তারের কথা শুনে আমি কিন্তু অবাক বা বিস্মিত হইনি। কারণ, আমার তো জানা আছে যে, চার বছর বয়সের সময় আমার জলবসন্ত উঠেছিল। সেই জানা থেকেই ডাক্তারের কথার জবাবে বললাম, “আমার যখন চার বছর বয়স, সে-সময় আমি সাত মাস বসন্ত রোগে ভুগেছিলাম। সে-সময় আমার সমস্ত শরীরের জলবসন্তে ছেয়ে গিয়েছিল। সাত মাস পর যখন আমি সেরে উঠি, তখন চোখে কিছুই দেখতাম না। অন্ধ মানুষের মতো চলাফেরা করতাম। তারপর শামুকের জল সকাল-বিকাল ছোখে দেয়ার পর এপর্যন্ত ভালোই ছিলাম। হঠাৎ কয়েকদিন ধরে চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই আপনার শরণাপন্ন হলাম”।

আমার কথা শুনে ডাক্তার অবাক হয়ে বললো, “এতে করে কি আপনি ভালোভাবেই দেখতেন”?

বললাম, “হ্যাঁ, আমিতো টেক্সটাইল মিলে সুতার কাজেই করে আসছিলাম। যেই নাইল সুতা খালি চোখে দেখা যায় না, সেই সুতার কাজও আমি দিব্বি করেছিলাম। আমার কোনও সমস্যা হয়নি”। 

ডাক্তার আরও অবাক হলেন! তারপর বললেন,” আপনি আমাকে একদিনের জন্য একটু সময় দিবেন? যদি আমাকে সময় দেন, তা হলে আমি আপনার এ-বিষয়টা জানার জন্য একটা বোর্ড গঠন করবো। এতে আমারা যারা বোর্ডে থাকবো, তাদের সকলেরই একটু অভিজ্ঞতা বাড়বে এবং আরও দশজন চোখের রুগীর উপকার হবে। সেইসাথে আপনার চোখের বর্তমান সমস্যারও সমাধান হবে। আপনার চিকিৎসা হবে সম্পূর্ণ ফ্রি-তে”। 

আমি বললাম, “যদি আমি আপনাকে সময় দিতে পারি, তা হলে আমাকে কোথাও যেতে হবে”?

ডাক্তার বললেন, “এবিষয়ে বোর্ড গঠন করবো ঢাকা আগার গাঁ সংলগ্ন জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতালে”।

আমি ডাক্তারের কথায় রাজি হলাম। এরপর দিন-তারিখ নির্ধারণ হলো। একদিন রবিবার আমার সাথে আমারই এক পরিচিত বন্ধুকে সাথে ঢাকা জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতালে গেলাম। ছয়জন ডাক্তার আমার দু’চোখ ধাপে-ধাপে দেখতে শুরু করলো। এতে পরীক্ষা করা হলো কয়েকবার। তারপর কী হলো আর কী হলো না, তা আমাকে আর কিছুই জানায়নি। আমাকে আবার তিনদিন পর জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতালে যেতে বললো।

আমি আবার তিনদিন পর জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতালে গেলে আমার চোখ আবার একবার পরীক্ষা করা হলো। ঘণ্টা খানেক পর রিপোর্টের কাগজ-সহ একটা প্রেসক্রিপশন হাতে দিয়ে বললো, “এই দুটো ড্রপ নিয়মিত ব্যবহার করবেন”। 

এপর্যন্ত-ই আমার চোখ নিয়ে গবেষণা শেষ! আমি প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে জাতীয় চক্ষু ইন্সটিটিউট হাসপাতাল থেকে বের হয়ে নারায়ণগঞ্জ চলে এলাম। ড্রপ কিনলাম। সেই ড্রপ দুটো নিয়মিত ব্যবহার করে অনেকটা ভালো হলাম। তারপর একদিন সেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, “আমার চোখের মনিতে যেই দাগ দেখে গবেষণা করলেন, তাতে আপনাদের কীরকম অভিজ্ঞতা হলো”?

আমার প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তার জবাব দিলো, “আমি অবাক! আমি বিস্মিত হলাম, চোখের মনিতে এই কঠিন দাগ থাকা সত্ত্বেও আপনি কীভাবে পরিপূর্ণভাবে সবকিছু স্পষ্ট দেখছেন”! 

আমি আবারও জিজ্ঞেস করলাম, “আমার চোখের মনিতে এটা কীসের দাগ? আমি আপনাকে আগে যা বলেছিলাম, সে-টা-ই?

ডাক্তার বললো, “এটা বসন্তের না অন্য কোনও রোগ থেকে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা সবাই আপনার কথাই বিশ্বাস করেছি। যেহেতু আপনার পায়ের তালুতে এখনও গুটি-বসন্তের দাগ স্পষ্ট দেখা যায়। তাই আমরা আপনার কথাতেই একমত”। 

এই ছিলো আমার বর্তমান চোখের অবস্থা। আর উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো ছিলো আমার চেহারা কুশ্রী হওয়া ঘটনাবলী। তো নিজের এরকম কুশ্রী চেহারা নিয়ে এখন আর কোনও ভাবনাচিন্তা আমার নেই। ভাবনাচিন্তা তখনই ছিলো, যখন ছিলো বিয়ের বয়স। তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারা দেখে ভাবতাম, আমি মনেহয় বিয়ে-শাদি করতে পারবো না। আমার এই চেহারা দেখে কোনও মেয়ে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। এ-নিয়ে সময়-সময় মা-কেও বলতাম, “মা, আমি মনেহয় জীবনে বিয়ে করতে পারবো না। আমার যেই চেহারা, এই চেহারা দেখে কারোর কুশ্রী মেয়েও আমার কাছে বিয়ে দিতে রাজি হবে না”।

আমার কথা শুনে মা চোখের জল ফেলে বলতেন, “ভাবিস না,বাবা। ‘কবিরাজ বলেছিল, ওর কুশ্রী চেহারা দেখে কেউ ঘৃণা করবে না, বরং সবাই ও-কে কাছে ডাকবে। বড় হলে সুন্দর মেয়েও বিয়ে করবে’। কবিরাজের কথা যদি সত্যি হয়, দেখবি তোর কপালেও ভালো সুশ্রী, সুন্দর, ভাগ্যবান মেয়ে জুটবে। ভগবান কাউকে নিরাশ করে না”। 

শেষমেশ মা’র কথাই বাস্তবায়িত হলো। আজ পর্যন্ত কারোর ঘৃণার পাত্র হইনি। বিয়েও করেছি একরকম সুশ্রী মেয়ে। তা-ও আবার প্রায় দু’বছর প্রেম-প্রেম খেলা করে। দুই সন্তানের পিতা হয়েছি। মেয়েও বিয়ে দিয়েছি, ভালো সংসারে। তিন  নাতি-নাতকুরের মুখও দেখেছি। যদি মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বছর চারেক বেঁচে থাকতে পারি, তা হলে হয়তো বড় নাতিনের বিয়েও দেখে যেতে পারবো। তারপর মরণের সাথে সাক্ষাৎ হলেও আর কোনও আফসোস থাকবে না। আমার এই কুশ্রী চেহারা নিয়েও কেউ আর ভাববে না।
