# আকাশ ডাকে বলেই তো বলাকারা ওড়ে……বাংলাদেশ ভ্রমণ(দুই)

- Author: [নীলাঞ্জনা নীলা](https://sonelablog.com/author/nilanjana/)
- Published: 2015-08-15T21:56:59+00:00
- Updated: 2015-08-15T21:56:59+00:00
- Category: [বিবিধ](https://sonelablog.com/category/misc/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be-2/

---

 

প্লেনে বসেই ঊর্মীকে ম্যাসেজ করলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই যে উড়তে যাচ্ছি। খুব কান্না পাচ্ছিলো। হ্যামিল্টন আসার পর থেকে ঊর্মীকে রেখে কোথাও যাইনি। অন্যদিকে দেশ। এ যে কি দোটানা জীবন! মনে হচ্ছিলো ঊর্মীটাকেও যদি নিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার যে সেই ক্ষমতা নেই! প্লেনটা ছাড়লো, তীর্থ আমার ছেলে হঠাৎ বললো, ‘মাম মন খারাপ না খুশী?’ বললাম না কিছু শুধু একটু হাসি দিলাম। আস্তে আস্তে প্লেনটা মাটি থেকে উপরে উঠছে। টরেন্টো শহরটা হাতের মুঠোয় চলে এলো। ছেলে টি.ভি দেখছিলো। আমার আবার টি.ভিতে এলার্জি। খুবই কম দেখি। তাই গান ছাড়লাম আর সাথে গল্পের বই নিয়েছিলাম। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘চক্র।’ বই আর গান আমায় কেমন জানি আচ্ছন্ন করে ফেলে। ঠিক বুঝিনা। এখানে শুক্রবার রাতে পথ দিয়ে হাঁটলে প্রায়ই দেখা যায় নেশা করে এলোমেলোভাবে হেঁটে যাচ্ছে কিছু মানুষ। বই আর গান পেলে আমিও নেশাগ্রস্ত হয়ে যাই। তাইতো বাসে বসে ব্লগের লেখা পড়ি। এই যে কোথায় চলে এলাম কথায় কথায়।

দোঁহা গিয়ে যখন পৌঁছুলাম, নেট পেয়েই জানালাম ঊর্মীকে। ঠিক অমন সময় আমার আরেকটা বন্ধুও ম্যাসেজ করলো। ওর নাম দীপ। ঊর্মী আর দীপ দুজনকেই ছবি দিলাম। দীপ অনেক মজা করতে পারে। অনেক দুষ্টুমী। নেট খুব জ্বালাচ্ছিলো। এতো মন খারাপ লাগছিলো, দীপকে লিখলাম কান্না পাচ্ছে। বললো হাউমাউ করে কাঁদতে। অনেক ক্ষ্যাপায় আমায়। বহুদিন হয়ে গেলো এই পাগলটারও খবর পাইনা। যাক অবশেষে আবার যাত্রা শুরু হলো। আমার ছেলে শেষ যখন দেশে আসে, তারপর ভুলেই গেছে অনেক কিছুই। দোঁহা থেকে প্লেনে ওঠার সময় বেশ কিছু দৃশ্য চোখে পড়লো। তাও ছেলের চোখে। ওখানে ৯৯% যাত্রী বাংলাদেশের। পারলে ধাক্কা-ধাক্কি করে উঠছে প্লেনে। ঠিক যেমন দেশে ট্রেন-বাস ধরার সময় ধাক্কা দিয়ে উঠে যাত্রীরা। ছেলে তো অবাক, বললো “আচ্ছা প্লেন তো ছেড়ে চলে যাবে না। কেন লাইন ধরে যাচ্ছেনা?” কি আর উত্তর দেবো! বললাম এখানেই দাঁড়া সবাই উঠুক তারপর আমরা ভেতরে যাবো।  পাঁচটি বছর পর আবার বাপি-মামনিকে দেখবো। ভুলেই গিয়েছিলাম প্লেন থেকে নেমে এবার ওদের মুখ দেখা হবে না। দু’দিন পর আসবে, কারণ এম্বুলেন্স পাওয়া গেছে দু’দিন পর। নেমেই মাসতুতো বোন জয়ীতাকে ফোন দিলাম। জয়ীতা ঢাকার গ্রীন লাইফ হাসপাতালের ডাক্তার+লেকচারার। বাপিকে ঢাকায় এনে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করাতে চাই। আমার সময় কম, তাই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের অধীনে নিতে চাই। ফোন দিতেই জয়ী তো চিৎকার “দিদিইইইইইই আগে আমাদের বাসায় এসো।” আমি এখন ঢাকার কিছু চিনিনা। এয়ারপোর্টে নেমে ছোট বোনের হাজবেন্ড অপুকে খুঁজে পাচ্ছিনা। ফোন করে যে বলবো, ফোনও তো নেই। একজন এগিয়ে এসে বললো ওই যারা ট্যাক্সি ঠিক করে দেয়। বললো “আপা, ফোন করবেন?” যাক পেয়ে গেলাম অপুকে। বাসায় যাবার পথে অবাক হয়ে গেলাম এতো পরিষ্কার ঢাকা শহর? আর কিছু কিছু দৃশ্য, পথ-ঘাট একেবারে বিদেশ লাগছিলো। অপু আমায় বোঝে বেশ। বললো, “দিদি আরোও দেখবেন। তবে আজ কিন্তু হরতাল।” অবাক হলাম হরতাল এমন? সবকিছুই চলছে। আমাদের ছাত্রজীবনে হরতাল মানে ভয়ঙ্কর একটা দিন। মানে পথ-ঘাট খালি। আর দেশে যতদিন রইলাম হরতালই ছিলো। এমনকি ঢাকা থেকে বাসে সিলেট গিয়েছি সেদিনও হরতাল। মানুষ জাগছে, ভয় কমছে দেখে ভালো লাগলো।

[!\[জয়ীতা এবং আমি গ্রীনলাইফ হাসপাতালে\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/08/2015-03-15-19-45-01-539.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/08/2015-03-15-19-45-01-539.jpg)

***জয়ীতা এবং আমি গ্রীনলাইফ হাসপাতালে***

বাসায় পৌঁছেই ফোন রানাকে। তুই কেন এলি না? বেশ বকাঝকা করলাম। কেমন যে আমার এই ভাইটা রাগ করেনা। বুঝে পাইনা ও কি দিয়ে তৈরী? একটা মানুষের অদ্ভূত ক্ষমতা রাগ ছাড়াই জীবনের সবকিছু সুন্দর করে নিয়ে চলছে। যাক এরপর ফোন দিলাম জয়ীতা আমার মাসতুতো বোনকে। ও ডাক্তার ঢাকার গ্রীন লাইফ হাসপাতাল ও কলেজের লেকচারার। জয়ী বললো, “দিদি আমাদের বাসায় এসো। এখান থেকে যাবো।” আরে ঢাকা শহরের রাস্তাই সব এলোমেলো। এদিকে রিক্সা চলে তো ওদিকে না। রানা এলো, ভাইরে আমায় নিয়ে চল। কতো বছর পর আমার প্রিয়রও প্রিয় রিক্সায় উঠলাম। আহ এতো শান্তি-স্বস্তি। রিক্সা চললো ইন্দিরা রোড থেকে এলিফেন্ট রোডের দিকে। গিয়ে তো জয়ী পারলে আমায় চেপেই মেরে ফেলে। “দিদিইইইইইইইইইইই কত্তোদিন পর! ও দিদি তুমি কি এনেছো আমার জন্যে? দেখো দি’ভাই মাত্র বিয়ে হয়েছে আমার কিন্তু ভালো গিফট চাই। কঞ্জুসামী করোনা।” ওকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। কিন্তু নিজের বেতন থেকে কেনা এটুকুই শুধু বললাম। আমায় বেশ ক্ষ্যাপালো। এরপর ওর বিয়ের গল্প। পাগলী একটা বোন আমার। অনেক ভালো। তারপর জয়ীর মা আমার বাচ্চু আন্টি দুনিয়ার খাবার। ছেলে আমার বলে “এখন কিভাবে খাবো?” এমনই অবস্থা আদরের যে ও খাওয়া দেখে ভয়ই পেলো। আমায় এসে বললো, “মাম এখানে ফাইভ টাইমস খাওয়া কেন? আমি এখানে কিভাবে রাখবো?” পেট ধরে বললো। কারণ জয়ীদের বাসায় আসার আগে মৌ খাইয়ে দিয়েছে। এসে লুচি-সব্জী-মাংস-নুডলস আরোও জানি কি কি! যাক খাওয়া শেষ হতেই সব ঠিক হলো পরের দিন জয়ীর সাথে হাসপাতাল গিয়ে ডাঃ কৈরীর সাথে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখবো। আর বলবো উনাকে যদি পারা যায় এম্বুলেন্স থেকে সরাসরি হাসপাতালে বাপিকে ভর্তি করার কথা। এখন উনি রাজী হলেই হয়। নয়তো বাপিকে বাসায় উঠিয়ে আবার হাসপাতাল সইবে না শরীরে। রানা আমায় হাসপাতালের রাস্তা দেখিয়ে দিলো। বললাম রানারে একা পারবো না। বললো “পারতে হবে। অফিস আছে আমার, পথ শিখে নে।” মনে পড়লো জীবনে একা চলা শিখিয়েছিলো রানা। কি ভয় একা চলার! তারপর বলেছিলো, “তুই না বড়ো হয়েছিস! এখনও মেশো নয়তো কারো না কারুর উপর নির্ভর করিস। ছিঃ লজ্জ্বা করেনা?” ওর সবগুলো কথাই আমার মাথায় ঘুরতো। সেটাও। তারপর থেকেই না সিলেট কিংবা ঢাকা থেকে শমশেরনগর চা’ বাগান বাসায় একা আসা শুরু করলাম। ভালো লাগতো। হুম কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকা শহরের সেই নীলা হয়ে গেলাম। কেউ বুঝতেই পারেনি আমি দেশের মুখ দেখলাম পাঁচটি বছর পর! “এই রিক্সা গ্রীনলাইফ যাবেন? শুনেন বারো টাকা পাইবেন।” ——-“আফা এইডা কি কন? বিশ টাকার নীচে না।” ঠিক আছে যান। “ও আফা আঠারো টাকায়  যামু।”  শুনেন পনেরো এর এক টাকাও বেশী না।

[!\[রানা-আমি-তীর্থ(আমার ছেলে)\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/08/2015-03-09-22-16-52-879.jpg)](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/08/2015-03-09-22-16-52-879.jpg)

***রানা-আমি-তীর্থ(আমার ছেলে)***

আমাকে দেখেছে পথ।  
কিভাবে উত্তাপে মাখামাখি করে গন্তব্যের খোঁজে চোখ এদিক-ওদিক।  
গ্রীন রোডের ঔষুধ আর  
পরোটা-মাংসের গন্ধ একাকার হয়ে যাওয়া  
মুহূর্তগুলোকে জড়িয়ে নিয়ে  
ছুটে চলা  
প্রচন্ড ভীড়ে—  
কেমন করে পরবাসী পেয়ে যায়  
এক টুকরো আশ্রয় কড়কড়ে নোটের বিনিময়ে।  
প্রতিদিনকার ভাঙ্গা-চোরা রাস্তায়  
টুংটাং শব্দে রিক্সায় চড়ে যাওয়া  
অচেনাকে চেনার আলোয় নেয়ার কি আকাঙ্খা!  
পেয়েছিলো কি এই আমিটা?  
এর উত্তর হয়তো অক্ষরের বিনিময়ে  
কথায়-লেখায় পেয়ে যাবো কোনো একদিন সন্ধ্যে কিংবা রাতে  
অথবা ভোরের ব্যস্ততায়।

ক্রমশ…

হ্যামিল্টন, কানাডা  
১৫ আগষ্ট, ২০১৫ ইং।

---

Comments: 37 — https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b6-%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be-2/#comments
