# ‘আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশ বদলাবে’   নূহ-উল-আলম লেনিন-এর প্রবন্ধসাহিত্যের একটি অনবদ্য প্রকাশনা

Author: মাহবুবুল আলম
Published: 2020-05-27
Category: বুক রিভিউ
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80-%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be/

মাহবুবুল আলম //

কবি-প্রাবন্ধিক ও গবেষক নূহ-উল-আলম লেনিন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে যতটা পরিচিত তার চেয়ে কবি-প্রাবন্ধিক ও গবেষক হিসেবে কম পরিচিত নন। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার কবি ও লেখক সত্তা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কেও ছাপিয়ে যায়। বাংলাদেশে যারা লেখার সংখ্যা না বাড়িয়ে পাঠকদের ভাল লেখা উপহার দিয়ে থাকেন  নূহ-উল-আলম লেনিন তাঁদের অন্যতম। তবুও কেউ কেউ তাঁকে রাজনীতিবিদ হিসেবে উপরে তুলে ধরতে চাইলেও লেখক ও বোদ্ধা পাঠকদের কাছে তাঁর লেখক পরিচিতিটা টপকে যায় অনায়াসেই। অপ্রিয় হলেও সত্য আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের ভাবনা বা রাজনৈতিক দর্শনের বিষয়ে সব মানুষ একমত নন। এটাও কারণ হতে পারে যে, আমাদের দেশের সঘোষিত সুশীল সমাজের লোকদের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিরূপ প্রচারনার কারণে নতুন প্রজন্ম অনেকাংশেই রাজনীতি বিমুখ। কিন্তু তারা জ্ঞান পাপী সে-জন্যে বলেনা; পৃথিবীর কোন দেশ, কোন কালেই রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ছাড়া পরিচালিত হয়নি। তবু তারা জেনে-শুনে আমাদের দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রচারনা চালিয়েই যাচ্ছে। সেই কারণেই আমাদের নতুন প্রজন্ম রাজনীতিবিদদের নিয়ে মাথা ঘামায় না; বরং রাজনীতিবিদদের নিয়ে তাদের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা ও নির্মোহতা প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। সে হিসেবে নূহ-উল-আলম লেনিন রাজনীতিবিদের পরিচয়ের চেয়ে লেখক হিসেবেই অধিক পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য।

আমরা সাবাই জানি, দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাসাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়  নূহ-উল-আলম লেনিনের অবাধ বিচরণ। সৃজনশীল সাহিত্য চর্চায় তাঁর দু-হাত সমান সচল। প্রবন্ধসাহিত্যে তাঁর পদচারণা আরো গতিশীল ও সুদৃঢ়। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধে রাজনৈতিক বিষয়-আসয়গুলো সমাধিক মূর্ত হয়ে ওঠে এ কারণে। তাই দেশের জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায় নূহ-উল-আলম লেনিনের প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও কলাম বেশ গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়ে আসছে। সামগ্রীক বিবেচনায় তাঁর প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক কলামগুলো সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ও অগ্রসর পাঠকদের কাছে সমাদৃত (বিএনপি-জামায়াত অনুসারীদের ছাড়া)। সংগত কারণেই আলোচনার অবতারণা তাঁর প্রবন্ধসাহিত্য নিয়েই। ২০১২-এর একুশের বই মেলায় প্রকাশিত নূহ-উল-আলম লেনিনের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশ বদলাবে’ সম্প্রতি আমার সংগ্রহের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০০৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ২০১১ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪৬ টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ এ-গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এসব প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হিসেবে যেমন স্থান পেয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজ ভাবনা, তেমনি স্থান পেয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান অসংগতি; একই সাথে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিক নানা প্রসঙ্গও। একজন রাজনীতিবিদ হয়েও তিনি বস্তুনিষ্ঠ এবং আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মুক্তচিন্তার ভাববিশ্লেষণে সত্যাশ্রয়ি থাকার চেষ্টা করেছেন। একটু গভীরভাবে বীক্ষণ করলে দেখা যাবে তাঁর লেখায় নেই কোন চাটুকারিতা ও সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের কোন বাসনা এবং দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। অপ্রিয় হলেও নিজ দলের বিপক্ষে যায় এমন বক্তব্যও ওঠে এসেছে তাঁর লেখনিতে।

গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধগুলোর ওপর বিশদ আলোচনায় যাওয়ার আগে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই গ্রন্থটির ওপর সামগ্রীক আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। একজন পাঠক গ্রন্থটির ভেতরে প্রবেশ করেই অবধারিত লক্ষ্য করবেন কী অসাধারণ কাব্যিক ভাষাশৈলীর সংমিশ্রনে চিত্রিত করেছেন পূর্ববর্তী দুইটি সরকারের নানা প্রসঙ্গ, সমস্যা ও মূল্যায়ন। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই তিনি থেমে থাকেননি বাত্লে দিয়েছেন উত্তরণের উপায়ও। গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধগুলোতে নিজস্ব ভাবনা ও চিন্তার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন গণমানুষের ভাবনা প্রত্যাশার কথাও। তাঁর প্রবন্ধগুলোতে বিষয়বস্তু হিসেবে ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ-সমাজের মানুষ তাদের জীবনধারার বিষয়াবলী যেমন বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি বিশেষভাবে উপজিব্য হয়ে ওঠেছে অভ্যন্তরীণ ও অন্তর্জাতিক নানা ইস্যু। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে এনেছেন দেশের বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা ও হীন ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলোও। লেখকের প্রতিটি লেখায় বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক চিন্তা-চেতনার পূর্ণাঙ্গ অভিব্যক্তি লুকায়িত থাকলেও বিষয়বস্তু হিসেবে সামগ্রীক প্রসঙ্গই ওঠে এসেছে। ওঠে এসেছে ধর্মান্ধতা, জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদের বিষাক্ত ছোবলে কিভাবে ধ্বংস হওয়ার পথে আমাদের গৌরবময় অর্জনগুলো। বিষয়বস্তুর দিক বিবেচনায় গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধগুলো রাজনৈতিক হলেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, চিন্তা ও দর্শন বা আবেগকে এখানে প্রশ্রয় দেননি।

আমার ইচ্ছা ছিল প্রতিটি প্রবন্ধ নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করার, কিন্তু লেখার কলেবর বৃদ্ধির কথা চিন্তা করে সে ইচ্ছাকে অবধমন করতে হয়েছে। তাই বিশেষ বিশেষ কিছু প্রবন্ধের ওপর আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। প্রথমেই নাম প্রবন্ধটি দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করছি। ‘আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশে বদলাবে’ এই প্রবন্ধটি স্থান পেয়েছে বইটির ২০৭ পৃষ্ঠায়। প্রবন্ধের নামটিতেই কেমন এক ধরনের কাব্যিক ব্যঞ্জনা ফুটে ওঠেছে। তিনি একজন কবি বলেই হয়তো নান্দনিক ছন্দ বিন্যাসের এমন একটি নামকরণ করতে পেরেছেন। তিনি নিজেই এ প্রবন্ধের শেষাংশে এ নামকরণের সপক্ষে তাঁর নিজের লেখা দুইটি চরণ উদ্ধৃত করেছেন এভাবেই-

“দিন বদলাবে? বদলাবে দিন? বদলাতে হবে নিজেকে

তোমাকে দেখেই শিখবে মানুষ, দিন কতটুকু বদলাবে।”

২২ এপ্রিল ২০১০ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এ প্রবন্ধটির ভাষাই বলে দেয়; এ নামকরণের মাধ্যমে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন। একজন সত্যাশ্রয়ি মানুষ হিসেবে প্রবন্ধটির এ নামকরণের প্রেক্ষাপটও অকপটেই ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সিলেটের এক কর্মী সমাবেশে প্রদত্ত বক্তব্যের অংশবিশেষের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই তিনি প্রবন্ধের এ শিরোনামটি করেছেন। এ নামকরণের ব্যপারে তিনি ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ‘দিনবদলের সনদ’ তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে তাও বলেছেন অত্যন্ত বিনয়ী উচ্চারণে। নূহ-উল-আলম লেনিন তাঁর এ নিবন্ধের মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন, মানুষের ভোটের অধিকার অর্জনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা ও সফলতা অর্জনের নানা ঘটনাবহুল ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠ, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনের ইস্তেহার ‘দিনবদলের সনদ’ তাঁকে কতটা উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করেছে তা নিজ জবানীতেই উল্লেখ করেছেন-

“…নির্বাচনী ইস্তেহারটি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির যে সভায় চুড়ান্তভাবে গৃহীত হয়, সে সভাতে স্বয়ং শেখ হাসিনাই নির্বাচনী ইস্তেহারটির ‘দিনবদলের সনদ’নামকরণের প্রস্তাব দেন। নতুন প্রজন্মকে উৎসর্গ করার প্রস্তাবও তিনি করেন। সভায় তার এ প্রস্তাবটি গৃহিত হয়; আমার দ্বিধান্বিত ও কিছুটা সংশয়বাদী মন মুহূর্তেই প্রবলভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। নির্বাচনী ইস্তেহার প্রণয়ন প্রক্রিয়ার এটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে থ্রিলিং ব্যাপার।”

এ নামকরণের ব্যাপারে আলোচ্য প্রবন্ধের চার ও পাঁচ অনুচ্ছেদে আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সময়ের প্রয়োজনে কিভাবে বদলে গেছে তার একটি বর্ণনা করেন এভাবে-

“বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিজকে বদলাতে সক্ষম হয়েছিল বলেই ‘৭১-এর বাংলাদেশ বদলে গিয়েছিল; এবং সম্ভব হয়েছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতা। …নিজকে প্রয়োজনে বদলে ফেলার একটা অন্তর্নিহিত শক্তি আছে আওয়ামী লীগের। এ শক্তি উৎসারিত এ দলটির সামাজিক ভিত্তি শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য এবং রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত ঐতিহাসিক প্রবনতা থেকে।”

এই নিবন্ধে নূহ-উল-আলম লেনিন আওয়ামী লীগ কিভাবে বিভিন্ন সময়ে অত্যাচার নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য ও বিভিন্ন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে একটি মাল্টিক্লাস সংগঠনে পরিনত হয়েছে তারও বিশদ ব্যাখ্যা দেন। এ দলটির মূল চালিকাশক্তি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে বিকাশশীল মধ্যবিত্ত পেটিবুর্জোয়া উঠতি ধনিকশ্রেণী। কিন্তু মূল শক্তি গরীব-দুঃখী-মেহনতি ও অসহায় মানুষ। এ শ্রেণীটিই ‘শ্রমিক পিঁপিলিকা’র মতো দিন-রাত পরিশ্রম করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর অন্য পক্ষটি সবসময়ই দলের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ গুলজারে ব্যস্ত থাকে। আর প্রথম পক্ষটি দল ক্ষমতায় থাকলে হয় বঞ্চিত এবং বিরোধী দলে থাকলে হয় অমানুসিক নির্যাতনের শিকার। দলের কাছে তাদের কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নেই। দলকে ক্ষমতায় দেখতে পেলেই তারা খুশি। দলের দুর্দিনেও এরা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। এই শ্রেণীর ত্যাগী কর্মীরাই হলো ‘ফিনিক্স পাখি’। ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকেও বার বার জেগে ওঠে বাদলে দিতে পারে বাংলাদেশের সামগ্রীক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র। প্রবন্ধের শেষভাগে এসে নূহ-উল-আলম লেনিনের মধ্যে আবার প্রশ্ন জাগে, সংশয় দানা বাঁধে-আওয়ামী লীগ সত্যিকারভাবে বদলাতে পারবে কি না? এর পরেই তিনি সকল সংশয়, দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে উত্তর দেন-

“…আওয়ামী লীগ তার জন্মলগ্ন থেকেই সময়ের প্রয়োজনে নিজেকে বারবার পরিবর্তন করেছে। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ ছিল সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের অনুসারী এবং মুসলিম লীগেরই অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল অংশের দল। কিন্তু এ দলটিই ১৯৫২ সালে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ভাষা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চারাটি রোপন করেছে। এই আওয়ামী লীগই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন ২১-দফা প্রণয়ন করেছে। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম পরিবর্তন করে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নামে নতুন ভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।” তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস এরই ধারাবাহিকতায় দল আবোর বদলে গিয়ে ভিশন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ওয়ানের মাইলস্টোন স্পর্শ করবে।

এ নামপ্রবন্ধটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে-বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বারবার তার চলার পথের বাঁক পরিবর্তন করে দলটিকে আধুনিক ধ্যান-ধারণার বিজ্ঞানমনস্ক দল হিসেবে বদলে নিয়েছে। এই যে আওয়ামী লীগের চলার পথের বাঁক বদল; এ বাঁক বদলের মাধ্যমেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবী উপস্থাপনের মাধ্যমে স্বাধীকার আন্দোলনের ভিত্ রচনা, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও পাকিস্তানের সামরিক শাসক লৌহমানব খ্যাত আয়ুব খানের পতন। এ-পথ ধরে ‘৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মেন্ডেট পেয়ে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হত্যাস্তরের ষড়যন্ত্র, অত্যাচার নিপীড়ন নির্যাতন ও তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধকে; সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিহত ও পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে বদলে দিয়েছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মানচিত্রটিও। তারপর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দলে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে দেশকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দেশকে ৬০টি প্রশাসনিক জেলায় ভাগ করে ৬০ জন গভর্নর নিয়োগ করেন। এরপরই বঙ্গবন্ধু হাত দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিতে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বশীল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)’ গঠন করেন। কিন্তু এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগেই ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেয়া হয় বাংলাদেশের প্রগতির চাকা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করলে তাঁর নেতৃত্বে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় আওয়ামী লীগে। শেখ হাসিনা দলকে বদলাতে শুরু করেন নতুন আঙ্গিকে, নতুন ধ্যান-ধারণায়। বাকশালের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শে সংগঠিত করে সামাজতন্ত্রের বদলে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণায় ফিরিয়ে আনেন।

এ পর্যায়ে এখন দৃষ্টি ফেরাতে চাই এই গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘ভাল কাজের মন্দ ফল’ প্রবন্ধটির দিকে। এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ও আলোচ্য বিষয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রদ্বতির প্রবর্তন এবং একটি পর্যায়ে এসে এ পদ্বতিটি ত্রুটিযুক্ত ও বিতর্কীত হয়ে পড়ার বিষয়ে। ২০০১ এক সালের নির্বাচনে রাতের আঁধারে দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রে রেজাল্টসিট পাল্টে দিয়ে ন্যাক্কারজনকভাবে হারিয়ে দেয় আওয়ামী লীগকে। এই নির্বাচনটি ‘শালসা’ মার্কা নির্বাচন হিসেবে দেশে ও বিদেশে পরিচিতি লাভ করে। তারপর ২০০৬ সালে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের তালবাহানা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৪ দলের আন্দোলনের মুখেও তাদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে দশজন বশংবদ উপদেষ্টা ও বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলে। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের লাগাতার আন্দোলনের মুখে ১/১১ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরী হয়। সে প্রেক্ষাপটে ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগ করিয়ে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে তারাও বিরাজনীতিকরণের খেলায় মেতে ওঠে। কারাগারে থেকেও শেখ হাসিনা দলকে দিক নির্দেশনার মাধ্যমে আন্দোলনের মাঠে নামিয়ে আনেন। শেখ হাসিনার আপোষহীন নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লড়াকু আন্দোলনে বদলে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র। এ প্রসঙ্গে নূহ-উল-আলম লেনিন তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন এভাবেই-

“…এভাবেই ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি একদলীয়, অগ্রহণযোগ্য, প্রহসনমূলক নির্বাচনের ভেতর দিয়ে গঠিত নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মানদন্ডে অবৈধ পার্লামেন্ট ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ ব্যবস্থা সংবিধান সংশোধনী গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে একটি মন্দ কাজের ভাল ফল হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। …২০০১ সালের নির্বাচনে এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠলেও ২০০৬-০৭ সালে ড. ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে সে ব্যবস্থাটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। অনিচ্ছুক যে দলটি এ ব্যবস্থা সংবলিত সংবিধান সংশোধনী করেছিল সেই বিএনপির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বাস্তবায়িত করতে গিয়ে রাষ্টপতি ড. ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সংকটের সৃষ্টি করে। ২২ জানুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র দেশে এক সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।”

৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এ নিবন্ধে তিনি সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্দেশ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করতে অতিদ্রুত দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের গৃহীত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নির্বাচনকে কালোটাকা ও পেশীশক্তির দৌড়াত্ম্যমুক্ত করা, ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার সংবলিত ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত করে হালনাগাদ করা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাসহ বেশ কয়েক-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং এই বলেই তিনি উপসংহার টানেন-

“…মোদ্দাকথা আমরা চাইনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ডিসক্রেডিটিট হোক। জনগণের শেষ ভরসাস্থলটি হতাশা ও ক্ষোভের কারণ হোক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর ভুবনের ভার নেই। তারা নির্বাচিত সরকারের বিকল্প নন। আবার নির্বাচিত নন বলে তারা জবাবদিহিতারও উর্ধ্বে নন। নিজেদের জবাবদিহিতার উর্ধ্বে ভাবলে নির্বাচিত সরকার অথবা দলবিশেষের প্রতি অনুগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কী পরিনতি হতে পারে ১১ জানুয়ারি ও তৎপরবর্তী ঘটনা এবং ড. ইয়াজউদ্দিনের ভাষণটি তার প্রামাণ্য দলিল”  (পৃষ্ঠা-১৫)

১/১১ পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে নূহ-উল-আলম লেনিনের এ সাহসী নিবন্ধটি অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। কেননা সে সময় সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জেল, জুলুম, হুলিয়া, অত্যাচার-নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের ভয়ে অনেক বাঘা বাঘা নেতা কিংস পার্টিতে যোগদান বা তথাকথিত সংস্কারবাদী সেজে ঘোমটাসেটে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকলেও নূহ-উল-আলম লেনিন পারেননি প্রতিবাদহীন বসে থাকতে। তাই এমন উৎত্রাস ঝলসিত সময়েও তাঁর ভেতরের প্রতিবাদী লেখকসত্তা দ্রোহী হয়ে ওঠেছে। তা না হলে সেই ভয়ঙ্কর সময়েও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতির প্রতিক্রিয়ায় ২৬ মে ২০০৭ দৈনিক  যুগান্তরে এমন শিরোনাম লিখে বলতে পারেননা‘ আওয়ামী লীগ পারলে, এখন সম্ভব নয় কেন?’ প্রবন্ধটি।  (পৃষ্ঠা-৬৫)

১/১১ পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি দাবীদার যে গোষ্ঠী সবসময় সুযোগের ধান্ধায় থেকে, রাজনীতিবিদদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সুখ পান এমন কতক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ছোট দলের বড় নেতাসহ সুবিধাবাদী চরিত্রের মানুষ কিংস পার্টি গঠনের ইঁদুর-বিড়াল প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে মাইনাস ওয়ান মাইনাস টু খেলায় সামিল হয়েছিলেন। এবং দুই নেত্রীকে একপাল্লায় তুলে সমান সমান দোষ-ত্রুটি ভাগ করে দিতে থাকলেন, তাদের ধারণা এই দুই মহিলাই সব নষ্টের মূল: সুতরাং এ- সুযোগে তাদেরকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে কিংস পার্টিওয়ালাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেই সব ল্যাটা চুকে যাবে।  এ-মাইনাস-মাইনাস খেলার সাথে সামিল হয়েছিলেন, আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংকের বিশেষ বন্ধু! ড. ইউনুসও। তিনি একদিন সদম্ভে ঘোষণা করলে ‘দেশের সব সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যতদিন প্রয়োজন ততদিনই ক্ষমতায় থাকুক।’ এ ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই তিনিও গঠন করলে একটি কিংস পার্টি কিন্তু কিছুদিন না যেতেই মানুষ খাচ্ছে না দেখে ঘরে বসে থাকলেন। ঠিক এমনই একটা বিষয় নিয়েই নূহ-উল-আলম লেনিনের প্রবন্ধ‘একপাল্লায় ওজন, একটি ধাঁধা ও আত্মরক্ষার প্রস্তাব’-শিরোনামের প্রবন্ধে ( পৃষ্ঠা-১৯ ) একটা হাসির গল্প বলেছেন। প্রবন্ধের মতো সিরিয়াস বিষয় পড়তে পড়তে এটি পড়ে পাঠকরা কিছুটা হলেও হেসে নেয়ার সুযোগ পাবেন, এখানে যে গল্পটা উপস্থাপন করেছেন যার মাধ্যমে নূহ-উল-আলম লেনিনের রসবোধ ফুটে ওঠে-

…তাগড়া ষাঁড়ের ঝুলন্ত অন্ডকোষ দুটি দেখতে বেশ নরম ও তুলতুলে মনে হওয়ায় নবীন এক শৃগাল আর লোভ সংবরণ করতে পারছে না। বয়স্ক অভিজ্ঞ শৃগালের কাছে তরুণ শৃগাল তার মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে বলে ওই অন্ডকোষ জোড়া সে এক লাফে খাবলে আনবে এবং মজা করে খাবে। বয়স্ক শৃগাল কাজটা কঠিন বলে তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে বয়স্ক শৃগালের কথায় কান না দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে অন্ডকোষ ছিঁড়ে আনতে যায়। কিন্তু পলকেই দেখা গেল, ষাঁড়ের লাথি খেয়ে ক্ষতবিক্ষত আহত তরুণ শৃগালটি ১২-১৩ হাত দূরে ছিঁটকে পড়ে। বয়স্ক শৃগাল তখন তরুণ শৃগালকে জিজ্ঞেস করে কিরে, পারলি না? তরুণ শৃগাল তখন ছড়া কাটে এভাবে-‘দেখিতে নড়বড় গোড়ায় বড় দর, এক লাথিতে ফেলে দিল হাত বার তেরো’। এ-গল্পটি উদ্ধৃত করে নূহ-উল-আলম কি বোঝাতে ছেয়েছেন ওই সংস্কারবাদী ও কিংসপার্টি ওয়ালারা না বুঝলেও আমরা কিন্তু তা বেশ বুঝতে পেরেছি।

৪৩ পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত ‘মিথ্যাচার থেকে ইতিহাস মুক্তি পাক’ প্রবন্ধে লেখক বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠের মিথ্যাচারের কুশীলবদের ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে ক্ষুরধার প্রঞ্জল ভাষায় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে উত্তম জবাব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে ‘৭৫-এর সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর বিয়োগান্তক হত্যাকান্ডের ইতিহাস বিকৃতির যে নোংরা খেলা শুরু হয়েছিল তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ প্রবন্ধের অবতারণা করেন, তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন- “…১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের ইতিহাস এভাবেই শৃঙ্খলিত হয়। যেমন করে বেদখল হয়ে পড়ে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, তেমনি আমাদের গৌবোজ্জল ইতিহাস। শুরু হয় অস্বীকৃতির পালা।”…

আমি আগেই বলেছি নূহ-উল-আলম লেনিন আমার অগ্রজ কবি, তাই তাঁর লেখায় সেটা হোক গল্প, না হয় প্রবন্ধ সেখানে আমি কাব্যব্যঞ্জনা খুঁজে পাই। যা গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধের শিরোনামে ধরা পড়ে। যেমন-‘জেগে থাক বাংলাদেশ’ অথবা ‘রৌদ্র হানো,বান দাও, হে সূর্য, হে চৈতন্য আকাশ’ অথবা ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে’, ‘আসুন আমরা বদলে যাই’, মৃতরা জেগে ওঠবে কিংবা একটি স্বপ্নজয়ের পাদটীকা’ এসব নামকরণে প্রবন্ধগুলোয় অন্যমাত্রা যোগ করে। আর তাঁর রাজনীতিবিদের পরিচয়টি যেহেতু লুকোছাপা নয় সে হিসেবে তাঁর লেখায় সমাজ, সংস্কৃতি অর্থনীতির বিষয়াবলীর পাশাপাশি রাজনীতির বিষয়টিও অবধারিতভাবে ওঠে আসাটাই স্বাভাবিক। এ-ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হলো তিনি তাঁর লেখায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা ও তথ্য-উপাত্ত প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও সত্যনিষ্ঠতার দিচ্ছেন কি না। …এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘ছাত্র রাজনীতি: বিকল্পের সন্ধানে’ (পৃষ্ঠা- ২৫০) দেশের ছাত্ররাজনীতির বর্তমান বেহাল পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে নূহ-উল-আলম লেনিন যুগপৎ হতাশ ও ক্ষুব্দ। ছাত্র-রাজনীতি নিয়ে আলোচিত বক্ষমান প্রবন্ধে তাঁর নিজ আদর্শের রাজনৈতিক দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কড়াসমালোচনা করতেও পিছপা হননি। সাবেক একজন ছাত্রনেতা হয়েও তিনি তিন বছরের জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধেরও  সুপারিশ রেখেছেন। তিনি বলেছেন,‘ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ছাত্ররাজনীতিকে বাঁচাতে হলে আমি ছাত্ররাজনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। আর এ জন্যই একটা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিছুটা ব্রিদিং টাইম নেয়ার জন্য তিন বছর বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকান্ড স্থগিত রাখার কথা পুর্ব্যক্ত করছি’। কতিপয় ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তের অপকর্মের জন্য দল যে ভাবমূর্তি সংকটে ভোগছে তা তাঁকে কতটা পীড়িত করেছে, তা অনস্বীকার্যভাবে ফুটে ওঠেছে এ লেখায়।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করে গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, আলী আহসান মুজাহিদ, কাদের মোল্লা প্রমুখের নেতৃত্বে রাজাকার, আলবদর আল-শামস বাহিনী গঠনের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে ‘পোড়া নীতির’ অংশ হিসেবে ত্রিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত আব্রু ছিনিয়ে নিয়ে, হাজার হাজার বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে ম্যাসাকার চালিয়েছিল। সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিভাবে বিচার প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত ও ঠেকানো যায় এ নিয়ে নানা অপতৎপরতার প্রতি ইঙ্গিত করে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও নিন্মচাপের আশঙ্কা’ (পৃষ্ঠা-২০১) লেখা প্রবন্ধে সংগতভাবেই বলেছেন,‘…এ বিচারকে নিয়ে কেন আমি নিন্মচাপ বা সুনামীর আশঙ্কা করছি এবং আওয়ামী লীগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছি তা ব্যাখা করা দরকার। …এ বিচারে প্রধান আসামীর কাঠগড়ায় যারা দাঁড়াতে পারে তার সিংহভাগ জামাতে ইসলামের সদস্য। …যুদ্ধপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামাত যেভাবে সোচ্চার…তাতেই প্রমানিত হয় তারা ভয়ানক উদ্বিগ্ন।…দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণটা হচ্ছে, বিএনপির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগী জামাতে ইসলামী দুর্বল ও গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা কার্যত একা হয়ে পড়বে।…যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক, পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এটা চায় না। তারা ইতিমধ্যে সরকারীভাবে প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে।’…যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠোকাতে দেশী-বিদেশী অভিন্ন ষড়যন্ত্র কিভাবে সরকারকে বিব্রত ও বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে তার একটা সরল সমীকরণের চেষ্টা করেছেন তিনি এখানে।

আর উদ্ধৃতি না বাড়িয়ে আমি এখন সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই ‘আওয়ামী লীগ বদলালে বাংলাদেশ বদলাবে’ গ্রন্থটির সাহিত্যমূল্য বিচারের মানদন্ডে কতটা উতরাতে পারলো। গ্রন্থকার নূহ-উল-আলম লেনিন গ্রন্থভূক্ত লেখাগুলোর সাহিত্যমূল্য কতটুকু এ বিষয়ে তাঁর ‘কথামুখ’ বা ভূমিকায় বলেছেন,‘এ-সব লেখায় সাহিত্যমূল্য খুঁজে লাভ নেই।’ এটা হতে পারে তাঁর বিনয়ী উচ্চারণ। তবে আমি তাঁর এ মতের সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করতে চাই; যদিও এসব লেখার সাহিত্যমূল্য বিচারের মতো জ্ঞান বা সক্ষমতা বা সাহস কোনটাই আমার নেই। তবুও বলবো সাহিত্যের মূল্য বিচারে প্রায় প্রতিটি লেখাই উৎরে গেছে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ সাহিত্য  অর্থের যে ব্যাখ্যা দিয়েছে; তা এখানে উল্লেখ করতে চাই। এ অভিধানে ‘সাহিত্য’ বলতে মানুষের চিন্তাধারা ও কল্পনার সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত লিখিত রূপকেই বোঝানো হয়েছে। আর প্রবন্ধের অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে- পূর্বাপর যুক্তিপূর্ণ রচনা। যেহেতেু প্রবন্ধসাহিত্য প্রত্যেক ভাষারই  একটি শক্তিশালী ও উচ্চমার্গীয় বিষয় তাই আলাদাভাবে এর সহিত্যমূল্য বিচার করা ঠিক নয়।

প্রবন্ধসাহিত্য বাংলাসাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এর পরিধি ও আওতা কোনো নিদ্দিষ্ট গন্ডিসীমার সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আধুনিক প্রবন্ধসাহিত্যে যে কোনে বিষয় নিয়ে এর পরিধি, বিষয়বস্থু ও আওতা নির্ধারিত হতে পারে। আসল কথা হলো, যে বিষয়টি লেখকের ভাবনা-অভিজ্ঞতা-মন-মননের প্রত্যয় দ্বারা যথাযথভাবে চিহ্নিত হালকা বা গুরু গম্ভীর উভয় আঙ্গিকেই এর পরিধি ডানা বিস্তার করতে পারে। এর আওতায় মানুষের গভীর ভাবোদ্দীপক কিংবা একেবারেই নিজস্ব ব্যক্তিগত বিষয় বা কোন সার্বজনীন প্রসঙ্গ বা সমস্যা, ব্যক্তিগত অভিনিবেশ যে কোনো কিছুই লেখকের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুখপাঠ্য ও পাঠকনন্দিত হতে পারে।

সুতরাং প্রবন্ধ এমন একটি শব্দ, যা’কে সহজেই সংজ্ঞায়িত করার উপায় নেই। সেই কারণেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মনীষি-পন্ডিত প্রবন্ধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ নিয়েও মতের ভিন্নতা আছে; ড. স্যামুয়েল জনসন ও হার্ডসনসহ অনেক পন্ডিত প্রবন্ধের কোনো সংজ্ঞাকে একবাক্যে স্বীকার করে নেননি। সে হিসেবে প্রবন্ধকে কোন নিদ্দিষ্ট বাক্য বা বাক্যগুচ্ছে সংজ্ঞায়িক করা একটি কঠিন ও তর্কসাপেক্ষ বিষয়। তাই আমি কোনো তর্কে না যেয়ে অত্যন্ত সহজবোধ্যভাবে বলতে চাই প্রবন্ধ বলতে আমরা যা বোঝি তা হলো, কোনো বিষয় নিয়ে লেখা নাতিদীর্ঘ সাহিত্যিকের গদ্য রচনাই হলো প্রবন্ধ। আরো একটু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বললে, প্রবন্ধ সাহিত্যের সংজ্ঞা দেয়া যেতে পারে এভাবে-যারা সাহিত্য রচনা ও চর্চা এর উন্নতি বিধানে মানুষের চিন্তাধারা ও কল্পনার সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত লিখিত রূপকে চরিত্র চিত্রনের মাধ্যমে পাঠকের জন্য উপস্থাপন করেন তাই হলো প্রবন্ধ সাহিত্য। সে বিচারে নূহ-উল-আলম লেনিন অত্যান্ত যুক্তিগ্রহ্যভাবেই তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধেই চিন্তাধারা, কল্পনা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিতভাবে লেখ্য রূপ দিয়েছেন; তাই সাহিত্যের মূল্য বিচারে তা খুবই অমূল্য সম্পদ। প্রবন্ধের যে বস্তুনিষ্ঠ, তন্ময়, ব্যক্তিনিষ্ঠ বা মন্ময় এ দু-শ্রেণীতে বিভক্ত প্রবন্ধের বৈশিষ্ট্য ও শিল্পরূপ বিচারে নূহ-উল-আলম লেনিনের গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধগুলো উভয় শ্রেণীরই অন্তর্ভূক্ত। কেননা তাঁর প্রবন্ধগুলোতে যুক্তি, বিচার-বিশ্লেষণ, তত্ত্ব ও তথ্যের ব্যবহার, যৌক্তিক পারম্পর্য ঋজুতার সঙ্গে কল্পনা ও আবেগের প্রয়োগ ও বিষয় উপস্থাপন রীতি বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্য। তাঁর ভাবনার শৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভবের পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠা ও মননের প্রধান্য, ভাষা ও শব্দ প্রয়োগে সতর্কতা ও সংযমসহ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। তাই তাঁর গ্রন্থভূক্ত প্রবন্ধগুলো আমার কাছে সাহিত্যমূল্য বিচারে নিজের অবস্থান যথাযথভাবেই ধরে রেখেছে। এ নিয়ে আলোচনার কলেবর আরো বাড়িয়ে পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাইনা বলেই এখানেই আলোচনা শেষ করলাম।

পরিশেষে এই বলেই ইতি টানতে চাই, নূহ-উল-আলম লেনিন আমার মতে একজন সভ্যসাচী লেখক। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাটাই বলে দেয়, তিনি কোনো শৌখিন লেখক নন, একজন শিরিয়াস লেখক। পাঠকমাত্রই জানেন, নূহ-উল-আলম লেনিন কবিতা, প্রবন্ধ, ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে-‘আগামীর অন্বেষা’, ‘ব্রত্যজন কথা’, ‘স্বাধীনতা ও উত্তরকাল’, ‘সর্বব্যাপী বঙ্গবন্ধু‘,‘সমুখে শান্তি পারাবার’, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড প্রতিবাদের প্রথম বছর (যুগ্ম রচনা)’, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির স্বপ্ন’, ‘স্বাধীনতার সন্ধানে’, একজন প্রতিথযশা কবি হিসাবে নূহ-উল-আলম লেনিন একনামে পরিচিত। ইতিমধ্যে তাঁর যেসব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো-‘স্বপ্ন করপুটে’, ‘অনেকদূর যেতে হবে’,‘ভালবাসা হিসেব জানেনা’, ও ‘আকাশের সিঁড়ি’অন্যতম। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়; এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-‘তেভাগা সংগ্রাম’, ‘শেখ হাসিনা : শান্তির সহযাত্রী’ ‘দুঃশাসনের চার বছর:সংকট ও উত্তরণের পথ’,‘বাংলাদেশের নগরায়ন ও পরিবর্তনশীল গ্রামজীবন’, বেশ কিছু কবিতারগ্রন্থ। একজন সম্পাদক হিসেবে সম্পাদনা করছেন, সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণাধর্মী সাময়িকী ‘পথরেখা’ এছাড়াও যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন আরো ক’টি বই।

কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদে, জোনাকী প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করেছে। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে পাঁচশত টাকা, এ কারণে বইটি কিনতে যেয়ে প্রথমেই পাঠক হয়তো থমকে দাঁড়াবে। বইটির মূল্য চারশ’ টাকা রাখা হলে যুক্তিযুক্ত হতো। ছোটখাট দু’একটি ক্রুটি বিচ্যুতি বাদ দিলে এটি একটি অনবদ্য প্রকাশনা হিসাবে গন্য করা যায়। ভবিষ্যত গবেষক, ইতিহাসের ছাত্র ও সংবাদকর্মীরা এ বইটিকে রেফারেন্সগ্রন্থ হিসেবে নিজের সংগ্রহে যুক্ত করে বাংলাসাহিত্যকে তুলে ধরতে পারবে অন্য এক উচ্চতায়, যা আমার একান্ত বিশ্বাস।

————-
