# অপেক্ষা; অলীক দিনের

- Author: [ইকরাম মাহমুদ](https://sonelablog.com/author/ikram-mahmud/)
- Published: 2016-10-19T23:01:36+00:00
- Updated: 2016-10-20T02:50:23+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%95-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0/

---

সুমন আর আমার এসএমএস খেলা হতো,জমতোও বেশ। একটা সময় দেখতাম এসএমএস ভাণ্ডার শেষ তখন ও’র এসএমএস ওকেই দিতাম আর সেও তাই করতো। বিশেষ দিনগুলোতে কে কার আগে,কতো সুন্দর করে এসএমএস করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা চলতো। ফোন কোম্পানীও আমাদের এ খেলাকে আরো বেগবান করতো এসএমএস এর ফ্রি অফার দিয়ে। ধার করা এসএমএসও জায়গা করে নিতো আমাদের এ খেলায়। ও’র সাথে পরিচয় আমার বন্ধু আলম,মাহিদুলের মাধ্যমে। ও তখন অনার্স পার্ট-১ এ আর আমরা পার্ট-২। ক্লাসের হিসাবে আমাদের ছোট হলেও আমরা ওকে বন্ধুর মতোই ভালোবাসতাম। কোনো এক উৎসবে আমি পরিকল্পনা করলাম ১২ টা ১-এ কল করে উইশ করবো। তাই করলামও কিন্তু ওপাশ থেকে ও’র প্রথম কথা ছিলো এমন-‘কল করেন আর যাই করেন,এসএমএস আমার চাই-ই। এখনো না লিখলে,তাড়াতাড়ি করেন সময় আছে।’এখনো কানে বাজে ও’র কথাটা। সর্বশেষ এসএমএস টি এসেছিলো ২৭/১২/২০১২ইং ঈদের দিন সকাল ৭ টা ৪৯-এ। শুভেচ্ছা এসএমএসটি আমিই সেন্ড করেছিলাম রাতে।ততোদিনে ওর দেহে মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। বই,খাতার বদলে ওর হাতে শোভা পায় ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র,এই টেস্ট,সেই টেস্ট। প্রতিটা দিন কাটে শঙ্কায়,অসহ্য যন্ত্রণায়।রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারতোনা। তীব্র ব্যথায় কাতরাতো সে। ডাক্তার বলেছেন,সিঙ্গাপুরে নিলে ভালো না হলেও তিন/চার বছর বাঁচবে হয়তো, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় সদা হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটার রক্তে ক্যান্সার। ভিতরে ভিতরে একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। তবুও আমাদের এসএমএস খেলার খেলার গায়ে এতোটুকু আঁচর লাগতে দেয়নি সে। আমিও সব জেনেও ও’র সাথে আগের মতোই এসএমএস খেলায় মত্ত থাকতাম। সাময়িক আনন্দ যদি ওর যন্ত্র্রনা ক্ষণিকের জন্য ভুলিয়ে দেয় এই আশায়। সেও কখনো বুঝতে দেয়নি ভয়ানক রাত বা দিনের কথা। কখনো ফোনে বলতে শুনিনি -সে ভালো নেই। রাজ্যের হাসি লেগে থাকতো ও’র মুখে, চোখে, কথায়। যদিও ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের কোথাও ওর জন্য কোনোও ভালো খবর থাকতো না তবু অকপটে বলে যেতো‘ভালো আছি,আগের চেয়ে ভালো। এই ভালো বলে সান্তনা দিত নাকি নিজেই খুঁজতো তা ও’র চোখ দেখে বোঝার উপায় থাকতো না। ১/১/২০১৩ রাত ১২টা,অপেক্ষা করছি ও’র এসএমএস-এর। ও তখন ঢাকা হাসপাতালে ভর্তি। ওর অবস্থা বেশী ভালোনা জানি তবু ১ টা ৪৮ মিনিটে আমিই নতুন বছরের শুভেচ্ছা ম্যাসেজ পাঠালাম কিন্তু ওপাশ থেকে ফিরতি এসএমএস এলোনা। আসবে কীভাবে? যন্ত্রণায় কাতর ছেলেটার রাতদিন এক হয়ে গেছে। কত রাত যে ছেলেটা ঘুমায়না তার হিসাব নাই। চিৎ হয়ে বা কাত হয়ে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারতোনা ও। সারারাত তাঁর দুলাভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে চেষ্টা করতো। এমন অবস্থায় ডাক্তার কেমোথেরাপী পরামর্শ করেন। প্রতিবার কেমো নেওয়ার পর ৪ ব্যাগ করে রক্ত নিতে হয়। ১ম থেরাপীর পর ঢাকার বন্ধুরা রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বন্ধুদের দেওয়া রক্তে উপর বেঁচে আছে ছেলেটা। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। সর্বশেষ যে বার ঢাকায় ভর্তি হতে যাবে তার কয়েকদিন আগে আমাকে ও বন্ধু মাহিদুলকে বলেছিলো,“এই যে শুনুন মাহিদুল আর ইকরাম ভাই,আর যাই করুন রক্ত কাউকে দ্যান না যেনো, আমার লাগবো। ভালো মন্দ খেয়ে মোটা হোন। যখন লাগবো আপনাদের কল করবো,চলে আসবেন।” কথাটা বলেই রাজ্যের সবটুকু হাসি দিয়ে ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাকে আর মাহি কে। আমরাও ওর হাসির সাথে হেসে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলাম সেদিন। ২য় থেরাপী নেওয়ার পর ডাক্তার রক্ত দিতে বললেন। সকাল নয়টায় ও’র বাবা মাহিকে ফোন করে জানালো ২ ব্যাগ রক্ত লাগবে। মাহি আর আমি ছুটলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। টাংগাইল থেকে ঢাকা তিন ঘন্টার পথ। মনে শঙ্কার পারদ বাড়ছে তীব্র গতিতে। ৪৫ মিনিট পর খবর এলো, আমাদের সুমন সব কষ্ট, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চলে গেছে পরপারে। আমাদের আর যাওয়া হলোনা ওর কাছে। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে এক অচেনা পথে। তখন সুমনের ঐ কথাগুলোই বারবার কানে বাজছিলো -“ভাই,আর যাই করুন রক্ত কাউকে দ্যান না জানি, আমার লাগবো।” শুধুই মনে হতে লাগলো আমরা যদি সময়মতো যেতে পারতাম তাহলে হয়তো আমাদের রক্তে ভর করে আরো কিছু সকাল দেখতে পেতো!  
এখনো কাউকে রক্ত দিতে গেলেই থমকে দাঁড়াই। এখনো বিশেষ দিনগুলোতে এসএমএস লিখতে গিয়ে থমকে যাই। কিন্তু প্রতিযোগের সে কন্ঠ আর ভেসে আসেনা। অজান্তেই এসএমএস খেলায় মেতে উঠার অপেক্ষায় থাকি। অপেক্ষায় থাকি এক অলীক দিনের।

---

Comments: 3 — https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%95-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0/#comments
