# অ’পাক বাহিনী

- Author: [রিতু জাহান](https://sonelablog.com/author/mounata/)
- Published: 2016-12-15T14:02:11+00:00
- Updated: 2016-12-15T14:02:11+00:00
- Category: [একান্ত অনুভূতি](https://sonelablog.com/category/misc/personal/), [মুক্তিযুদ্ধ](https://sonelablog.com/category/freedom-war/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80/

---

প্রথমেই বলে রাখছি এটা আমার মেমন সোনার লেখা। একটি রূপক ছোট গল্প। বাস্তব ও তার কল্পনায় লিখেছে। তো ভুল ত্রুটি মার্জনীয়। ও গল্প লিখে বেশ কিছু পুরষ্কার পেয়েছে। ছেলেটা আমার যখন ক্লাস ফাইভে তখন লিখেছিল। এখন সে ক্লাস সেভেনে উঠবে। হ্যাঁ, মা হিসেবে তার কিছু লেখা আমি ঠিক করে দেই।  
অ’পাক বাহিনী  
জুহায়ের আফতাব মেমন।  
জায়গার নাম সৈয়দপুর। আমার দাদুবাড়ি। অনেকদিন পর এসেছি। আসলে এখন থেকে এখানেই আমরা থাকব। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন থেকে যেন মুক্ত আমি। প্রিয় এই সাইকেলটি এখন আমার বাহন। চারপাশটা ঘুরে দেখব বলে বাবুর দেওয়া এই সাইকেলটি নিয়ে বের হলাম।  
সৈয়দপুরে আছে রেলওয়ের অনেক পুরাতন কারখানা। এটা বৃটিশ আমলের তৈরি। আমি সাইকেলটি নিয়ে রেলওয়ে কারখানার পাশের রাস্তা দিয়ে সবুজ ধানক্ষেতের দিকে চলে এলাম। যতদূর চোখ গেলো শুধু সবুজ আর সবুজ।  
পাকা রাস্তার কোলঘেসে মেঠো পথের দিকে চলে গেছে গ্রামের ভিতরে যাওয়ার হাঁটা পথ।  
কিছুদূর যেতেই জঙ্গলঘেরা একটা পুরাতন সিমেন্ট প্লাস্টার খসে পড়া, দরজা জানালা বিহিন একটি ভাঙ্গা বাড়ি দেখতে পেলাম। আমি গল্পের বই এ এমন বাড়ির গল্প পড়েছি অনেক। ও হ্যাঁ, বলে রাখি, আমি খুব ভাগ্যবান জাফর ইকবাল স্যারের সব বই আমি পড়েছি। প্রতিবছরই মামনি ও বাবু আমাকে জন্মদিনে বেশকিছু বই উপহার দেয়। যাইহোক, কৌতুহল নিয়ে ঐ ভাঙ্গা বাড়িটার কাছে গেলাম। সাইকেল ও পায়ে দলে বুনো ফুলের গন্ধে নাকে এলো। কি চমৎকার গন্ধ! একেবারেই আমার অপরিচিত।  
বাড়িটার কাছাকাছি আসতেই এক লোক চিৎকার করে বলল,” খোকা ওখানে যেওনা” ।  
-কেন?  
– ওখানে ভূত আছে!  
– আমি অবাক হয়ে বললাম, এখন কি আর কেউ ভূতে বিশ্বাস করে ?  
লোকটা কি যেন বলতে বলতে হন হন করে চলে গেলো মেঠোপথ ধরে গ্রামের ভিতরে। আমি বাড়িটার ভিতরে যাওয়ার জন্য সাইকেলের প্যাডেল ঘুরালাম। কিছুদূর যেতেই ধপাস করে পড়ে গেলাম। আসলে এসবই রেলের যায়গা। তাই মাটির নিচে প্রায় দেবে যাওয়া অনেক রেলপাতি পড়ে আছে। আমার পড়ে যাওয়া দেখে, চশমা পরা এক লোক এমনভাবে হাসছিল যেন, হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে। আমি সাইকেল উঠিয়ে স্টান্ড করে গায়ের সব ধুলোবালি ঝেড়ে নিলাম। লোকটির হাসি দেখে লজ্জা লাগছিল বেশী। কিন্তু লোকটার হাসি দেখে আমারও হাসি পেল। কি জানি , হাসি হয়ত সংক্রামক রোগ!  
লোকটি হাসি থামিয়ে বলল,” ব্যাথা পাওনি তো?”  
– না।  
– বাসা কোথায়?  
– বলা যাবে না। আপনি অচেনা লোক। মামনি বলেছে অচেনা লোককে বাসার ঠিকানা বলতে নেই।  
– ও তোমার নাম কি?  
– মেমন।  
– মেয়ে মানুষের মন! হা হা হা।  
– না, মামনি বলেছে, আমি বেহেশতের ছোট সাদা ফুল। আপনার নাম কি?  
– জয়নাল।  
– বাসাটা আপনার? একা থাকেন ?  
– না, আমার না। কিন্তু আমরা অনেক মানুষ থাকি।  
আমি ফিরে আসতেই, লোকটি বলল, ” একটু বসো গল্প করি। কতোদিন কারো সাথে কথা বলি না”।  
কেন যেন কি এক আকর্ষনে তাঁর সাথে কথা বলতে সাইকেলটি পাশে রেখে চাচার পাশেই বসে পড়লাম। তাঁর পাশে বসতেই অদ্ভুদ এক সুন্দর গন্ধ নাকে এলো।  
– এই বাড়িতে দরজা জানালা নেই, বিদ্যুৎ নেই কীভাবে থাকেন ? কখন থেকে থাকেন ?  
-১৯৭১ সাল থেকে।  
– তাইলে তো আপনি যুদ্ধ দেখেছেন।  
– হ্যাঁ, দেখেছি।  
-একটা যুদ্ধের গল্প বলেন।  
-যুদ্ধ কোনো গল্প না। সত্যি ঘটনা।  
– ঐ একি কথ।  
-মোটেও একি কথা না।  
-ঠিক আছে বলেন।  
-শোন, আমি এই রেলের কারখানায় চাকরি করতাম। বাবারে যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধের সময় এখানে বিহারিদের যে কি অত্যাচার ! পিপড়ের মতোমানুষ মারতে লাগল। তাই আমরা অনেকেই ঠিক করলাম, আমরা ভারতে চলে যাব। আমরা সব কিছু ফেলে অনেক মানুষ মিলে রওনা করলাম, ভারতের উদ্দেশ্যে। কিছু লোক আমাদের বলল, আপনারা ট্রেনে উঠুন, আপনাদের নিরাপদে হিলিপৌছে দিব”। আমরা সরল মনে বগি ভর্তি লোকউঠে পড়লাম ট্রেনে। তারা আমাদের এখানে এনে নামিয়ে দিল। সবাইকে জড় করল এক যায়গায়।  
জয়নাল চাচার কথার এক পর্যায়ে সৈয়দপুর থেকে চিলাহাটি গামি ট্রেনটি ঝক ঝক শব্দ করে আসতে লাগল। জয়নাল চাচার মুখে কি যে এক আর্তনাথ ফুঁটে উঠল !চাচা উঠে ভাঙ্গা বাড়িটারদিকে দৌড় দিল। আমি চিল্লাতে লাগলাম,” চাচা আরো শুনব”।  
– তুমি কাল এসো।  
আমি বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।  
আজ দুপুরের পরে ডি এস আন্টিদের সাথে আমরা সৈয়দপুর রেল কারখানাটি দেখতে যাব। খুব বেশী খুশি আমি। অনেক কিছু দেখতে পাব।  
আমরা আন্টির গাড়িতে সবাই উঠে রওনা করলাম, কারখানার উদ্দেশ্যে। আন্টি গাড়িতে বলছিল, আংকেল কারখানার গেটের সামনে অদম্য স্বাধীনতার এক স্থাপনা তৈরি করছে। প্রথমেই ডি এস আংকেলের রুমে গেলাম আমরা। ওখান থেকে ধীরে ধীরে পুরো কারখানা দেখলাম। আন্টি আমাকে দেখালো বিশাল বিশাল চুল্লি। যাতে লোহা পোড়ানো হয়। আন্টি বলল, সেই চুলায় পাক বাহিনীরা বাংগালীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারত। শুনে শিউরে উঠেছিলাম আমি। আন্টি আর একটা বড় বয়লার দেখালো। যেটাতে পানি ফুটানো হত। ওটার ভিতরেও নাকি পাকিস্তানী হানাদাররা জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারত।  
এরপর আমরা এলাম যেখানে ট্রেনের নস্ট হয়ে যাওয়া বগিগুলো ঠিক করা হয়। কি বড় বড় ক্রেনে করে বগিগুলোকে উঠিয়ে নিয়ে এক যায়গা থেকে অন্য যায়গা নিয়ে যায়।  
এরপর এলাম আংকেলের পরিকল্পনায় তৈরি করা অদম্য স্বাধীনতার স্তম্ভটি দেখতে। দেখলাম অতি যত্নে তৈরি হচ্ছে সেই স্তম্ভটি। মামনি বলল, ” এটা ও দেশের জন্য ভালোবাসার এক প্রকাশ।” আমরা আংকেলের রুমে গিয়ে হালকা নাস্তা করে ফিরে এলাম বাসায়।  
দুপুরে খেয়ে কিছুক্ষন পরই সাইকেলটি নিয়ে বের হতেই, মামনি চিৎকার করে বলল,” এই ছেলে কোথায় যাও এই রোদে?” লেখা শেষ করো।”  
চোখ ছলছল করে লিখতে বসলাম। খুব তাড়াতাড়ি লেখাটা শেষ করে, সাইকেল নিয়ে বের হলাম। জয়নাল চাচার সাথে দেখা করার জন্য সাইকেলের প্যাডেল জোরে ঘুরাতে লাগলাম।  
আহ! জয়নাল চাচা বসে আছে। আমাকে দেখেই হেসে দিল। তাকে সালাম দিয়ে পাশে বসলাম।  
– জানো খোকা এই যায়গাটা একটা বধ্যভূমি। সৈয়দপুরে বিহারী ও পাকিস্তানী হানাদারদের ভয়ে যারা পালাতে চেয়েছিল তাদের এনে এখানে গুলি করে মেরেছিল। কতজন পানি খেতে চেয়েছিল, তাও দেয়নি। ওরা নাকি মসলমান !  
তুমি কখনো সৈয়দপুর রেলকারখানায় গেছো ?  
– হুম, গতকালই গেলাম।  
– ওখানে বড় বড় চুল্লি দেখেছো ?  
– হুম দেখেছি। আন্টি বলেছে ওখানে মানুষদের পুড়িয়ে মেরেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা।  
– তোমার আন্টি ঠিকই বলেছে।  
খোকারে, যাঁরা যুদ্ধ করেছে তারা বীর যোদ্ধা। আর যাঁরা নির্মম অত্যাচারে মারা গেছে তাঁরাও কিন্তু যোদ্ধারে বাবা।  
– আমি জাফর ইকবাল স্যারের বই পড়ে, আমার বন্ধু রাশেধ পড়ে, বঙ্গবন্ধুর কথা মামনির মুখে শুনে মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতার কথা জেনেছি। মামনির সাথে পি এস সি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা মুক্তি যুদ্ধ যাদুঘরে গিয়েছিলাম। ওখানে দেখেছি আমি অনেক কিছু। মামনির পরিচিত ওখানকার দায়িত্বে থাকা সত্যজিৎ কাকু আমাকে ও আমার ছোট ভাইকে কিছু বই উপহার দিয়েছে, তাতে অনেক কিছু দেখেছি ওজেনেছি। মামনি ও আমার বাবা আমাকে প্রচুর বই কিনে দেয়। মামনি বলে, দেশকে জানতে হলে মুক্তিযুদ্ধ জানতে হবে। এতে দেশকে আমি ভালবাসতে শিখব। আমি জানি এদেশ যদি স্বাধীন না হতো,তবে আমাদের একটা উদ্ভট ভাষাও শিখতে হতো। লিখতে হতো” এক কুত্তা মাটিমে ল্যাটা হ্য”। জাফর ইকবাল স্যারের বইয়ে পড়েছি।  
এবার জয়নাল চাচা জোরে জোরে হেসে দিলেন।  
হঠাৎ চিলাহাটি গামি ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে আসতে লাগল। চাচার মুখটা গতকালের মতো আৎকে উঠল যেন ব্যাথায়। দৌড়ে চলে যেতে লাগলেন বাড়িটার দিকে।  
আমি চিৎকার করে ডাক দিলাম।উনি কি যে এক চমৎকার হাসি দিলেন, আমার দিকে ফিরে! এক লোক পিছন থেকে এসে বলল, ” কাকে ডাকছ?”  
– জয়নাল চাচাকে।  
– এই যায়গাটা ভাল না। এখানে কেউ থাকে না। সন্ধ্যার আগে ঘরে যাও। এখানে মানুষ কাঁদে। যুদ্ধের সময় এখানে অনেক মানুষ এনে গুলি করে মেরেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা।  
আমি অবাক হয়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।  
মামনিকে রাতে জিজ্ঞেস করলাম,” আচ্ছা মা, পাক মানে কী?”  
– পাক মানে পবিত্র।  
মনে মনে ভাবলাম, পাকিস্তানীরা তাদের সেনাবিহিনীর নাম পাক বাহিনী রেখেছে কেন ? নাকি, আমরা বাঙ্গালীরা বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সংক্ষেপে পাক বাহিনী বলি। কারন যেটাই হোক না কেন, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে কোনো অবস্থাতেই পাক বাহিনী বলতে আমি নারাজ। কারস পাকিস্তানী হানাদারদের আগে পাক বাহিনী বললেই, পাক শব্দটিকেই নাপাক করা হয়। তাই আমার কাছে তারা অ’ পাক বাহিনী।

---

Comments: 16 — https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%95-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80/#comments
