# অপরিবর্তনীয়

- Author: [গোধূলি](https://sonelablog.com/author/krintonika/)
- Published: 2015-11-14T15:41:00+00:00
- Updated: 2015-11-14T15:43:10+00:00
- Category: [গল্প](https://sonelablog.com/category/literacy/story/)
- URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a7%9f/

---

[!\[11536443_949687095054294_3359909449929724709_o\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/11/11536443_949687095054294_3359909449929724709_o.jpg)](http://sonelablog.com/archives/37162/11536443_949687095054294_3359909449929724709_o)

লোকটা আবারো গায়েব। মহুয়ার জীবনটা হয়ত এভাবেই কেটে যাবে। ভবঘুরে মানুষদের ভালবাসতে নেই। কারণ ভবঘুরেরা সহজে কাউকে ভালবাসে না। আর যদিও বা ভালবাসে, তাদের ভালবাসাও তাদের মত ভবঘুরে স্বভাবের। মহুয়ার বিষণ্ণ লাগে ভীষণ।

মহুয়ার ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে একজন বলল, “হ্যালো, মহুয়া”

“হ্যালো”

“আমি লাবণী”

“ও। অনেক দিন পর। কেমন আছিস?”

“ভালো। তুই?”

“ভালো”

“হুম। একদম হুট করে বিয়ে করে ফেললি। তোর পাশে লোকটাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। সবাই এমন পারে না-জানিস?”

“হয়ত”

“ভাইয়া আছেন কেমন?”

“জানি না”

“মানে?”

“নিরুদ্দেশ”

“উনি বিয়ের পরও বদলান নি?”

“না”

“অদ্ভুত!”

“হুম। শুধু বিয়েই করেছি, সংসার না”

“সেটাই বা কম কি? বাই দ্যা ওয়ে, একটা খবর আছে”

“কি? তোর বিয়ে নাকি?”

“হুম”

“ওয়াও। তা দুলাভাই কি করেন?”

“সেকথা পরে হবে। তুই কখন ফ্রী থাকিস, বল। আমি কার্ড দিতে আসবো”

“যেকোনো দিন ফোন দিয়ে আয়”

 

মহুয়াকে কার্ড দিতে দিনকতক পরেই এল লাবণী। লাবণী আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।

ক্যাম্পাসে থাকতে লাবণী, মহুয়া ও আরশী সবসময় একসাথে থাকতো। মহুয়া ও লাবণী দুই সিনিয়রকে পছন্দ করত। আর আরশীকে পছন্দ করত ক্যাম্পাসের সবাই। সেজন্য তিনজনের আশেপাশে সবসময় আরশীর গুনমুগ্ধরা ঘুরঘুর করত। হারানো দিনের কথা মনে পড়ছিল লাবণী ও মহুয়া। আরশীকে মিস করছিল দুজনেই।

মহুয়া বলল, “আরশীর সাথে কথা হয় না তোর?”

“খুব একটা না। নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে। যোগাযোগ ঐই কমিয়ে দিয়েছে। তাই আমিও বুঝতে পারি না যোগাযোগ করব কি করব না। তবে ফোন করে বিয়ের খবর দিয়েছি। দেখি, কাল পরশু যাব কার্ড দিতে”

“তিনজন ক্যাম্পাস ছাড়তেই কেমন আলাদা হয়ে গেলাম। তাই না?”

“হুম”

“আমরা ভাবতাম, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে হ্যাপি বোধহয় আরশীই হবে”

দুজনই নিশ্চুপ। লাবণী বলল, “We live in a world of uncertainity”

“সমাজের মানুষগুলো খারাপ, ভীষণ খারাপ”

“আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল তুইই আছিস, মহুয়া”

“কি জানি? তবে লোকটা মানুষ খারাপ না। তোর জামাই সম্পর্কে বল”

“আমার ধারণা, তুই সব খবর অলরেডি পেয়ে গেছিস। তাই না?”

“কি?”

“এই যে আমি একজন বিপত্নীক লোককে বিয়ে করছি। উনার দুটো ছেলেও আছে”

“হুম”

“রাজি হলাম কেন জানিস?”

“আমাদের বাবাদের চোখে আমরা রাজকন্যা। তাই পক্ষিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসা রাজপুত্রের স্বপ্নে বিভোর থাকি আমরা। কিন্তু এই সমাজে বিয়ের বাজারে আমরা দাসকন্যা, আর শ্বশুরবাড়িতে দাসী”

“বিয়ের আগে এসব কি বলছিস?”

“তোর কি মনে আছে তূর্য ভাইয়ের কথা?

“হুম আছে”

[!\[th\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/11/th.jpg)](http://sonelablog.com/archives/37162/th-3)

লাবণী পছন্দ করত তূর্য ভাইকে। তূর্য ভাইও সবসময় লাবণীর খোঁজ নিত। তূর্য ভাই কবিতা লিখতেন। কখন জ্যোৎস্না নিয়ে, কখন নদী নিয়ে। লাবণী তূর্য ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ ভাইয়া, আপনার এত কবিতা জ্যোৎস্না নিয়ে কেন?”

“কারণ আমি জ্যোৎস্না ভালবাসি, ভালবাসি রাতের অন্ধকারকে, ভালবাসি কলঙ্কিনী চাঁদকে”

মহুয়া ও আরশী ভাবত, হয়ত তূর্য ভাইও লাবণীকে পছন্দ করে। তূর্য ভাইয়া যখন তখন ফোন করত লাবণীকে। আর লাবণী রাজপুত্রের স্বপ্নে বিভোর হত। একদিন তূর্য ভাই লাবণীকে ফোন করে বলে, “আমার মন খারাপ। কি করি? বলো তো, লাবণী”

সেদিন সারাদিন লাবণীর সাথে ঘুরেছেন তূর্য ভাইয়া। লাবণী দিনদিন দুর্বল হয়ে পড়ছিল। আকারে-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইছিল। তূর্য ভাই বুঝেও না বোঝার ভান করত। আরশীর রাগ লাগত। সে একদিন নিজে কথা বলল তূর্য ভাইয়ার সাথে। সেদিন থেকে তূর্য ভাইয়া যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। দু’দিন যেতেই কিভাবে পুরো ক্যাম্পাসে রটল, লাবণী প্রপোজ করে রিজেক্টেড হয়েছে। একদিন ক্যাফেটেরিয়াতে বসেছিল তিনজন- আরশী, মহুয়া ও লাবণী।

একটু দুরের টেবিলেই মহুয়ার মনের মানুষটি আর সাথে ছিল তার সার্কেল। একজন বলল, “তূর্য যে এমন করবে- এটা স্বাভাবিক”

আরেকজন বলল, “মেয়েটা বোকা নাকি? একবারো দিনে আয়না দেখে না নাকি?”

মহুয়ার সেই সিনিয়র বলে উঠল, “খেলায় রান কত আজ?”

মহুয়া ও আরশী লক্ষ করল, লাবণী ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকেছে। আর কিছু বোঝার বাকি থাকেনা।

 

লাবণী সেদিনই ফোন দিল তূর্য ভাইয়াকে। সে ধরল না। পরদিন অন্য একটা সিম থেকে ফোন দিল। সে ধরল।

লাবণী বলল, “আপনি কেন এমন করলেন?”

“দেখো, লাবণী, আমার পরিবার তোমাকে কখনোই মেনে নিবে না”

“আমি সেটা জিজ্ঞেস করি নি”

“তো?”

“ক্যাম্পাসের সবাই জানলো কিভাবে?”

“আমি জানি না, হয়ত শাহানা-”

“ভাইয়া, আপনি অন্ধকার ভালবাসেন, চাঁদ ভালবাসেন, ভালবাসেন জ্যোৎস্নার আলো। শুধু আমাকে ভালবাসতেই আপনার এতো অনীহা। কেন? কারণ আমি কালো?”

“আমি রেসিস্ট নই, লাবণী”

“আপনি কি- সেটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভুল মানুষকে ভালবাসার ভুল থেকে স্রষ্টা আমাকে রক্ষা করেছেন। ভাল থাকবেন”

 

 

মহুয়া লাবণীকে বলল, “নতুন জীবন শুরু করব। ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়ে’র শাহরুখকে বিয়ে করতে চাস নি?”

লাবণী হেসে দিল।

 

লাবণীর বিয়ে আগামী দিন। গায়ে হলুদ থেকে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়ল মহুয়া। রাত ২টোর দিকে বেল বাজল। মহুয়ার মনে হল, এই অসময়ে লোকটা ছাড়া আর কে আসবে?

দরজা খুলে দেখল, চাদর পরে দাঁড়িয়ে লোকটা। মহুয়া বলল, “কে আপনি?”

লোকটা হাসল। বলল, “তাতে কি কিছু যায় আসে? দরজা ছেড়ে দাঁড়াও”

“উহু। যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যান। মাঝরাতে ভদ্রলোকের ঘরের বেল বাজান কেন?” বলেই দরজা বন্ধ করে মহুয়া। দরজায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিল মহুয়া। লোকটা আবার দরজায় নক করল। বলল, “আমি জানি, তুমি দাঁড়িয়ে আছো। দরজা খোলো”

“খুলবো না” দরজার ওপাশ থেকে বলল মহুয়া।

“কেন? আমার বিছানায় কি আর কেউ আছে নাকি এখন? দরজা খুলছো না যে…”

“হুম। আছে। কিছু যায় আসে আপনার?”

“আচ্ছা, চলে যাচ্ছি”

“দাঁড়ান, দাঁড়ান” তারপর আবার মহুয়া বলল, “এক শর্তে খুলবো”

“কি?”

“কাল আমার সাথে বের হবেন” বলে দরজা খুলল মহুয়া।

লোকটা ঢুকতে ঢুকতে বলল, “আগে বাসার তল্লাসি নেই। পরপুরুষ কোথায় লুকিয়ে রেখেছ কে জানে? খাটের নিচে নেই তো”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুঁজুন, খুঁজুন। ভালমত তল্লাসি নিন। স্বামী যখন এমন, তখন পরপুরুষ পোষাটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?”

লোকটা ঘরে ঢুকেই চাদরটা খুলতে খুলতে মহুয়াকে বলল, “যাও তো দু’মগ কফি বানাও। তারপর কফি নিয়ে ছাদে যাও। আমার কফি যেন কড়া হয়”

“পারব না এই মাঝরাত্রিতে কফি বানাতে”

লোকটা তাকাল মহুয়ার দিকে। মহুয়া বলল, “এহ্, এসছেন মাঝরাত্রি, এসেই অর্ডার দিচ্ছেন। আমি যেন কাজের বুয়া”

“মনের বুয়া হওয়ার জন্য আগে কাজের বুয়া হতে হয়” শুনে ফিক করে হেসে দিল মহুয়া।

“ঠিক আছে, আমিই বানাচ্ছি” বলে লোকটা রান্নাঘরে ঢুকল। মহুয়াও ঢুকল। লোকটা মগ বের করে অনেকক্ষণ ধরে ধুতে লাগলো সিঙ্কে।

মহুয়া বলল, “কি ভাবছেন? আমি এখন বলবো, ‘হয়েছে। হয়েছে। দিন আমাকে। আমি করছি’”

“সেটা ভাবাটাই কি স্বাভাবিক না? আর দশটা বউ তো তাই করে, তাই না?”

“আপনি কি আর দশটা স্বামীর মতো?”

“গুড পয়েন্ট”

মহুয়া বলল, “যান। লজিক দেখাতে পেরেছি। এবার ফ্রেশ হন। আমিই বানাচ্ছি”

কফি বানাতে বানাতে মহুয়া বলল, “এমন কফি বানাবো যা জীবনে খান নি”।

দু’মগ কফি নিয়ে ছাদে গেল মহুয়া। পুরোটা শহর নিশ্চুপ। রাতের অন্ধকারে পুরো শহরটাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। কোন কোন বিল্ডিংয়ের কোন কোন তলায় এখনো আলো জ্বলছে। মাথার উপরে নক্ষত্রখচিত আকাশ। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটা চাদর জড়িয়ে এল। দাড়ির জঞ্জাল সাফ করে এসেছে। এসে বলল, “আমার কফি কই?”

“এই যে”

“মহুয়া, রাতের আকাশের তারাগুলোকে চেনো?”

“উহু”

“একজন লেখিকার অবশ্যই তারাদের চেনা উচিত” বলেই চুমুক দিল। মুহূর্তেই চেহারা বদলে গেল। অত্যন্ত নির্বিকারভাবে মগটা রেখে দিল দেয়ালের উপর। তারপর মহুয়ার কাছে এসে মহুয়ার মগটা ধরে চুমুক দিল।

মহুয়া বলে উঠল, “একি! আপনার কফি তো শেষ হয় নি!”

“ওটা কফি! না ইঁদুর মারার বিষ? কফির পুরোটা কৌটা ঢেলে দিয়েছো নাকি?”

“আপনি তো কড়া কফি চেয়েছিলেন”

লোকটা কিছুক্ষণ পর বলল, “একই মগ থেকে কফি খেলে ভালবাসা বাড়ে”

“তা তো দেখতেই পাচ্ছি”

কফিতে চুমুক দিয়েই লোকটা বলতে লাগলো, “ঐ দেখো। সবচেয়ে ব্রাইট স্টার, ঐ তারাটার নাম সিরিয়াস”

“হুম”

“ঐ হল কালপুরুষ, আর ঐ যে হল সপ্তর্ষিমণ্ডল”

“আচ্ছা”

“সপ্তর্ষিমণ্ডলের একটা তারার পাশে ঝাপসা একটা তারা আছে। দেখতে পাচ্ছো?”

“হুম”

“ঐ তারার নাম অরুন্ধুতী। পৌরাণিক একটা গল্প আছে”

“কোন পুরাণ? গ্রীক?”

“না, হিন্দু পুরাণ। সপ্তর্ষি মানে সাত ঋষি। স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্রের বেশ দুষ্ট ছিলেন”

“হুম। জানি। অহল্যার করুণ পরিনতির জন্য দায়ী”

“ইন্দ্রের নজর ঐ সাত ঋষিদের স্ত্রীদের উপরও পড়েছিল। ইন্দ্রের স্ত্রী শচীদেবী তা বুঝতে পারেন। ভবিষ্যতের বিপদের সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পাবার জন্য শচীদেবী ঋষিদের স্ত্রীদের রূপধারণ করে ইন্দ্রের কাছে অভিসারে যেতেন। সাত ঋষিদের মধ্যে ছ’জনার স্ত্রীদের রূপ নিতে পারতেন শচীদেবী, কিন্তু ঋষি বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধুতীর রূপধারণ করতে পারতেন না। কারণ অরুন্ধুতী ছিলেন সবচেয়ে পুণ্যবতী। ঘটনাটি জানতে পেরে ছ’জন ঋষি তাঁদের স্ত্রীদের পরিত্যাগ করেন। বলা হয়ে থাকে, বাকি ছ’টি তারার পাশে আগে অন্য তারা ছিল। এখন শুধুমাত্র ঋষি বশিষ্ঠের পাশে তার স্ত্রী অরুন্ধুতী স্থান পেয়েছে”

“হুম। এই গল্প বলার পেছনে কারণ কি? আমাকেও অরুন্ধুতীর মত সতী সাবিত্রী হতে হবে নাকি?”

লোকটা অবাক হয়ে বলল, “গল্পটা বলতে ইচ্ছা হল। বললাম”

“তাই?”

“হুম। কাল আমাকে কোথায় যেতে হবে?”

“লাবণীর কাল বিয়ে”

“ও। কার সাথে?”

“নাম বললে চিনবেন?”

“তা জানি না। ভাবলাম, তোমার মত সেও যদি…”

কিছুক্ষণ পর মহুয়া বলল, “আচ্ছা। তূর্য ভাইয়া এখন কোথায় আছে- জানেন?”

“দেশেই আছে”

“কি করেন? বিয়ে করেছেন?”

“হুম”

“তার সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?”

“জাস্ট ব্যাচমেট। নট মোর দ্যান দ্যাট। ওদের সার্কেলের সবাই কেমন যেন…। জানো, চাঁদ দেখতে এমন কেন?”

“না। এর পেছনেও গল্প আছে নাকি?”

“হুম। আছে। তোমার শীত করছে নাকি?”

“সেটা কি এতক্ষণে চোখে পড়ল? কতক্ষণ ধরে কাঁপছি। এত বড় চাদর জড়িয়ে এসেছেন”

“এসো, মহুয়া, আমার চাদরের নিচে”

লোকটা চাদর মেলে দাঁড়াতেই মহুয়া কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মহুয়াকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিল। এক চাদরে দু’জন। দু’জন দু’জনার নিঃশ্বাস টের পাচ্ছিল। আর লোকটা শুরু করল চাঁদের গল্প। গল্পের মাঝখানেই মহুয়া বলে উঠল, “আচ্ছা, আপনার সংসারের প্রতি এতো অনীহা কেন?”

“তোমার এই প্রশ্নের কোন উত্তর আমি দেবো না। আরো একটা ব্যাপার জেনে রাখো”

“কি?”

“দূরে থাকলে ভালবাসা বাড়ে। পরস্পরের কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে”

 

লাবণীর বিয়ে। মহুয়া তার জামাইকে নিয়ে এসেছে বিয়েবাড়িতে। লাবণীকে স্টেজে দেখল। অনেক সুন্দর লাগছে। বউসাজে সব মেয়েকে সুন্দর লাগে কেন জানি। মহুয়া আরশীকে খুঁজতে লাগলো। আরশী গায়ে হলুদে আসেনি। ফোনে বলেছিল, বিয়েতে আসবে।

কিছু কিছু ঘটনা মানুষের জীবনকে পুরো উলট-পালট করে দেয়। যেই আরশীর অস্তিত্ব দশমাইল দূর থেকেও টের পাওয়া যেত, তাকে মনে হয় এখন দশ সেন্টিমিটার দূরত্বেও থাকলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সময়ের সাথে বদলে গেছে আরশী, বদলে গেছে সবাই। ঘড়ির কাঁটাকে চাইলেও উলটো পথে ঘোরানো যায় না…আরশী এক কোণায় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। হয়ত বুঝতে পারতো না। কিন্তু একসাথে অনেকটা সময় থাকলে চেহারা না দেখতে পেলেও কাছেও মানুষদের চিনতে পারা যায়। মহুয়া আরশীর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, “আরশী, বিয়েবাড়ি এসে চুপটি মেরে বসে আছিস কেন?”

“চুপটি মেরে বসে নেই। বিয়েবাড়িতে হৈহুল্লোর করার বয়স কি আছে?”

“বয়স থাকুক বা না থাকুক, আমাদের লাবণীর বিয়ে”

“হুম” কিছুক্ষণ পর আরশী বলল, “মনে আছে, তোরা বলতি আমার বিয়েই সবার আগে হবে”

মহুয়া বুঝতে পারল না কি উত্তর দিবে। কিছুক্ষণ পর বলল, “বোস একটু, আমি উনাকে ডেকে নিয়ে আসি”

মহুয়া ফিরে আসার আগে জায়গা পরিবর্তন করল আরশী। লোকটা বলল, “কৈ তোমার বান্ধবী?”

“একটু আগে এখানেই ছিল…”

“অ্যাভয়েড করতে চাইছে”

“কিন্তু কেন?”

“সেটা উত্তর কি তোমার জানা নেই? নাকি মস্তিষ্ক জানলেও মনে পৌঁছায়নি?”

 

এক বছর পর। লাবণী, লাবণীর স্বামী ও মহুয়া এসেছে হাসপাতালে আরশীর নবজাতক সন্তানকে দেখতে। আরশীর কোলে ফুটফুটীক নবজাতক। ধবেধবে ফর্সা, চুলগুলোতে হাল্কা বাদামীভাব ঠিক ইকোসাহেবের মত। লাবণী ও মহুয়া লক্ষ করল আরশীকে আর দশটা মায়ের মতই লাগছে। লাবণী নিচুস্বরে বলল, “মহুয়া, ওর ফেস কিন্তু পুরোপুরি রিকোভার করা সম্ভব হয় নি। তাই না? তাও অকে আজ ভীষণ অন্যরকম লাগছে, অন্যরকম, তাই না?”

“মায়াবতী লাগছে”

“হয়ত মা হলে সবার চেহারায় এই পরিবর্তন আসে”

 

লাবণী এগিয়ে গেল বাচ্চাকে কোলে নিয়ে। আরশী চেঁচিয়ে উঠল। বেডের পাশে হেক্সিসল দেখিয়ে বলল, “ আগে হ্যান্ডওয়াশ কর। তারপর বাবুকে ধরবি”

লাবণী ও মহুয়া আরশীর এইটোনে কথা বলা শুনেছিল তিনবছর আগে।  লাবণী হেক্সিসল দিয়ে হ্যান্ডওয়াশ করে বাবুকে কোলে নিল। সুন্দর ঘুমাচ্ছে বাবুটা।

মহুয়া বলল, “বাবুর নাম কি রেখেছিস?”

“না। চৌদ্দগুষ্টি হাজার হাজার নাম বলছে। তোরাও একটা বল”

লাবণী বলল, “গেলমান”

আরশী ক্ষেপে গিয়ে বলল, “তুই রাখ তোর বাচ্চার নাম ‘গেলমান’”

“আমার আগে তো তুইই মা হয়ে গেলি। নইলে আমিই রাখতাম”

“আমার আগে বিয়ে করেও বাচ্চা আমার আগে নিতে পারলি না। এটা তোর ব্যর্থতা”

তিন বান্ধবীর এহেন আলাপ শুনে সরে পড়ল লাবণীর বর। লাবণী বলল, “দিলি তো আমার ভাগিয়ে আমার জামাইকে”

“তোর জামাই ছিল দেখেই বলেছি তোর ব্যর্থতা” বলে হাসতে লাগলো আরশী।

মহুয়া বলল, “ইকোভাই কোথায়?”

“এখানেই ভর্তি” উত্তর দিল মহুয়া। তারপর বলল, “ক্যামোথেরাপী নেবার জন্য ভর্তি হয়েছে। বাবুর মুখ যে দেখাতে পেরেছি-এটাই অনেক। আমি চাই বাবুর নামটা ঐই রাখুক”

আরশী বলে উঠল, “মহুয়া, তোর ‘তারাপদ’ কৈ?”

“ওর নাম তারাপদ না”

“জানি। কিন্তু এই নামেউ তাকে ডাকতাম আমরা”

“জানি না। হুটহাট গায়েব হয়, আবার আবির্ভাব হয়। কিছুই বুঝি না”

“তোদের বিয়েটাও আমাদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে ছিল” বলল লাবণী।

“আচ্ছা, আবীরের কি খবর?” বলল আরশী।

“জানিস না তুই?” বলল মহুয়া।

“সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলাম। যোগাযোগ নেই কারো সাথে। কিভাবে জানবো? পোড়ামুখীর পোড়াজীবনটা আলোকিত করেছে আমার এই বাবুটা। আমার মা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা, সেটা এ কারণে নয় যে সে আসলেই সুন্দর। কারণ সে আমার মা। আমিও এখন সবচেয়ে সুন্দরী কারণ আমি বাবুটার মা”

“হুম” বলল মহুয়া।

“আমাদের প্রত্যেকের জীবন এমনটা হবে- কেউ ভেবেছি কখনো? মহুয়া, তুই লোকটাকে ফাঁসালি কিভাবে?”

“জাদুটোনা করেছি। সেজন্যই বিয়েটা হয়েছে। বশীকরণ বিদ্যে এখনো রপ্ত করতে পারিনি। নইলে এমন ভবঘুরে হয়ে থাকে? অসহ্য!”

“পুরুষমানুষকে বশ করতে বশীকরণ বিদ্যে লাগে না। আলাদা চার্ম থাকা লাগে। আমার মুখটা পুড়লেও চার্ম যায় নি। বুঝেছিস?”

তিনজন একসাথে হাসতে লাগলো। শেষ কবে এভাবে তিনজন একসাথে হেসেছে মনে নেই কারো। তবে অনেক দিন আগে… এক বছর আগে? দু’বছর আগে?… খেয়াল নেই…

ওদের মনে হতে লাগলো- সময়, জীবন, পরিস্থিতি সব বদলেছে। কিন্তু মানুষগুলোর ভেতরটা সেই আগের মত আছে…

[!\[0c7c3ffed2036f74208ccb17444ac6df\](http://sonelablog.com/wp-content/uploads/2015/11/0c7c3ffed2036f74208ccb17444ac6df.jpg)](http://sonelablog.com/archives/37162/0c7c3ffed2036f74208ccb17444ac6df)

 

মহুয়া ও লোকটাকে নিয়ে লেখা গল্প-

[লেখিকার “ভবঘুরে ভালবাসা”](http://sonelablog.com/archives/24208)

[লর্ড অফ ইনসোমনিয়া](http://sonelablog.com/archives/27198)

আরশী, লাবণী ও ইকোসাহেবকে নিয়ে লেখা-

[সওদা](http://sonelablog.com/archives/32837)

---

Comments: 20 — https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a7%9f/#comments
