# অতঃপর প্রস্থান করিলো তোহা

Author: মোঃ তোফাজ্জল হোসাইন
Published: 2026-05-01
Category: অণুগল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%a4%e0%a6%83%e0%a6%aa%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a7%8b-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%b9/

তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম। কথায়, যুক্তিতে, আবেগে—যতভাবে সম্ভব একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে টানতে পারে, আমি সবটাই চেষ্টা করেছি। কখনো শান্তভাবে, কখনো রাগে, কখনো আবার একেবারে ভেঙে পড়ে। আমি তাকে বলেছিলাম—“এই পথটা তোমার না, তুমি চাইলে এখনো ফিরতে পারো।”

কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি।  
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে ঢোকার সাহস করেনি। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও সে যেন অনেক দূরে ছিল। হয়তো দরজাটা তার কাছে শুধু কাঠের একটা কাঠামো ছিল না—ওটা ছিল ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ আর অজস্র অদৃশ্য শিকলের তৈরি এক দেয়াল।  
আমি জানতাম, সে এমন ছিল না।  
কেউ জন্মগতভাবে অন্ধকারকে ভালোবেসে ফেলে না।  
মানুষ ধীরে ধীরে সেখানে যায়—চাপা কষ্টে, অভাবের তাড়নায়, প্রতারণার শিকার হয়ে, কিংবা কখনো নিজেরই ভুল সিদ্ধান্তের দায়ে। তোহার ক্ষেত্রেও হয়তো এর ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। তার হাসির আড়ালে আমি বারবার একটা ক্লান্তি দেখেছি। তার কথার ভেতরে শুনেছি একটা হাল ছেড়ে দেওয়ার সুর।

কখনো কখনো সে চুপ করে থাকত, এমনভাবে—যেন তার ভেতরে হাজারটা কথা জমে আছে, কিন্তু বলার মতো ভাষা নেই।  
অনেক সময় মনে হতো—সে বাঁচতে চায়, কিন্তু যেভাবে বাঁচছে সেটা তার নিজের পছন্দ না… বরং এক ধরনের বাধ্যতা।  
একটা অদৃশ্য চুক্তি, যেটা সে নিজের সাথে করে ফেলেছে—“এটাই আমার জীবন, এটাই মেনে নিতে হবে।”

আমি তাকে মুক্তির পথ দেখাতে চেয়েছিলাম। শুধু পথ দেখানো না—আমি তার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। তাকে বলেছিলাম, “চলো, সবকিছু ছেড়ে দাও। নতুন করে শুরু করি। আমি আছি।”  
কিন্তু সে নেয়নি সেই হাত।  
তার একটাই কথা—  
“আমি নিরুপায়।”  
এই “নিরুপায়” শব্দটা যতটা সহজ শোনায়, এর ভেতরে ততটাই গভীর একটা ভাঙন লুকিয়ে থাকে। এটা শুধু পরিস্থিতির অজুহাত না—এটা এক ধরনের আত্মসমর্পণ, এক ধরনের বিশ্বাস হারানো।

সে যখন এটা বলছিল, আমি বুঝতে পারছিলাম—সে আমাকে না, নিজেকেই বোঝাচ্ছে।  
আমি বুঝলাম, আমি যতই চাই না কেন, তাকে জোর করে ফেরানো সম্ভব না।  
কারণ সত্যিটা খুব কঠিন—  
জোর করে কাউকে ভালো করা যায় না।  
জোর করে কাউকে আলোয় আনা যায় না।  
তাই আমিও ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে পিছু হটলাম। তার থেকে না, বরং আমার নিজের সীমাবদ্ধতা থেকে। কারণ একটা সময় এসে মানুষ বুঝে যায়—তার চেষ্টারও একটা সীমা আছে।  
সব যুদ্ধ জেতার জন্য না—কিছু যুদ্ধ শুধু লড়ার জন্য হয়।

তবুও একটা প্রশ্ন আমাকে ছাড়ে না…  
অপশন থাকা সত্ত্বেও কেন কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে না?  
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি কিছু সত্যের মুখোমুখি হয়েছি।  
প্রথমত, অভ্যাসের নির্মম শক্তি।  
মানুষ এমন এক প্রাণী, যে যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। প্রথমে যেটা অস্বাভাবিক, কষ্টকর, অপমানজনক লাগে—ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে যায় তার দৈনন্দিন জীবন। তখন সে আর বের হতে চায় না, কারণ অচেনা ভালো থেকেও চেনা খারাপ তাকে বেশি নিরাপদ মনে হয়।  
একটা সময় পরে সেই খারাপটাই তার কাছে “কমফোর্ট জোন” হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, অজানা ভয়।  
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মানে শুধু পরিবেশ বদলানো না—মানে নিজের অতীতের মুখোমুখি হওয়া, সমাজের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, নতুন করে লড়াই শুরু করা। “যদি আবার ভেঙে পড়ি?”—এই ভয়টা মানুষকে একই জায়গায় আটকে রাখে।  
ভয় কখনো কখনো শিকলের চেয়েও শক্তিশালী।

তৃতীয়ত, নিজেকে হারিয়ে ফেলা।  
একটা সময় আসে, যখন মানুষ নিজের প্রতিই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সে ভাবে—“আমি আর ভালো কিছুর যোগ্য না।” তখন সামনে হাজারটা সুযোগ থাকলেও, সে সেগুলো দেখতে পায় না। কারণ তার ভেতরের আয়নাটা ভেঙে গেছে।  
সে নিজেকে আর আগের মতো দেখতে পায় না।

চতুর্থত, নির্ভরতার শৃঙ্খল।  
কিছু জীবন এমন হয়, যেখানে কষ্ট আছে, অপমান আছে, কিন্তু একটা নির্ভরতা আছে। সেটা টাকা হতে পারে, পরিচিত মানুষ হতে পারে, কিংবা একটা নির্দিষ্ট চক্র। সেই জায়গাটা ছেড়ে বের হওয়া মানে পুরো অজানায় ঝাঁপ দেওয়া—যেটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।  
কারণ অনিশ্চয়তার ভয় অনেক সময় নিশ্চিত কষ্টের চেয়েও বেশি ভয়ানক।

পঞ্চমত, সময়ের সাথে তৈরি হওয়া মানসিক ক্লান্তি।  
বারবার ব্যর্থতা, প্রতারণা, অবহেলা—এসব মিলিয়ে মানুষ ভেতরে ভেতরে এতটাই ক্লান্ত হয়ে যায় যে, আর লড়াই করার শক্তিটাই থাকে না। তখন সে ভাবে—“যা আছে, এটাই থাক।”  
লড়াই করার ইচ্ছাটাই নিভে যায়।  
আর সবচেয়ে বড় কথা—  
পরিবর্তনের ইচ্ছা।

বাইরের হাজারটা হাত, হাজারটা সুযোগ, হাজারটা দরজা—সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যায় যদি ভেতর থেকে সেই একটুকু ইচ্ছা না জাগে।  
মানুষকে কেউ বদলাতে পারে না—মানুষ নিজেই নিজেকে বদলায়।  
তোহা সেই ইচ্ছাটা হারিয়ে ফেলেছে।  
অথবা হয়তো সে এখনও খুঁজে পায়নি।  
তোহা চলে গেছে।  
সে এখনও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো আরও গভীরে ডুবে যাবে—আমি জানি না।  
কিন্তু আমি জানি, আমি চেষ্টা করেছিলাম।  
আমার দিক থেকে কোনো কমতি রাখিনি।

তার চলে যাওয়ার পরেও অনেক পর্যন্ত আমি জেগে থাকি। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকি—হয়তো একটা মেসেজ আসবে, হয়তো সে বলবে, “আমি ফিরে আসতে চাই।”  
কিন্তু সেই মেসেজ আর আসেনি।  
আমি বুঝলাম, কিছু অপেক্ষা কোনোদিন শেষ হয় না—তবুও মানুষ অপেক্ষা করে।  
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে শেখানোর জন্য—থাকার জন্য না।

তোহা আমাকে শিখিয়ে গেছে, ভালোবাসা মানেই কাউকে নিজের মতো করে পাওয়া না। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে—চেষ্টা করা, ব্যর্থ হওয়া, তারপর নিঃশব্দে সরে দাঁড়ানো।  
সে আমাকে আরও একটা জিনিস শিখিয়েছে—  
সবাইকে বাঁচানো যায় না। প্রতি মুহুর্তে মাঝে মাঝে মনে হয়—  
যদি সে হাতটা ধরতো?  
যদি সে একটু সাহস করতো?  
যদি সে “নিরুপায়” শব্দটার বদলে “চেষ্টা করব” বলতো?  
হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।

হয়তো সে অন্য কোথাও চলে যাবে একদিন , অন্য জীবনে, অন্য আলোতে দাঁড়িয়ে থাকবে।  
কিন্তু সব গল্পের “যদি” গুলো বাস্তব হয় না।  
কিছু গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যায়…  
কিছু মানুষ ফিরে আসে না…  
আর কিছু প্রশ্নের উত্তর কখনো মেলে না।

তবুও জীবনের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে—  
সবকিছু থেমে থাকে না।  
তোহার অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।  
তার কথা প্রতিটা মুহূর্তে খুব মনে পড়ে, কিন্তু সেই তীব্রতা আর আগের মতো নেই। সময় সবকিছু বদলে দেয়—স্মৃতি রেখে দেয়, কিন্তু ব্যথার ধারটা একটু কমিয়ে দেয়।

তবুও কোথাও একটা শূন্যতা রয়ে যায়।  
যেটা পূরণ হয় না, শুধু সাথে নিয়ে বাঁচতে শিখতে হয়।  
হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক অচেনা রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে।  
হয়তো সে তখন অন্যরকম হবে।  
হয়তো সে বলবে—“তুমি ঠিক ছিলে।”  
অথবা হয়তো কখনোই দেখা হবে না।  
কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।  
কারণ কিছু সম্পর্কের শেষ দেখা দিয়ে না—বোঝাপড়ায় হয়, নীরবতায় হয়।  
অতঃপর প্রস্থান করিলো তোহা—  
আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, এক অদৃশ্য শূন্যতার সামনে…।

স্বপ্ন থেকে……

যেখানে ভালোবাসা ছিল, আছে, কিন্তু তার কোনো ঠিকানা নেই।
