# অচেনা ভুবন

Author: নাজমুল আহসান
Published: 2019-05-27
Category: গল্প
URL: https://sonelablog.com/%e0%a6%85%e0%a6%9a%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%a8/

১)  
বিকেলের দিকে অফিসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। রোজার দিন, দুপুরের পর শরীর আর চলতে চায় না। কোনোমতে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কাটিয়ে দিয়ে বের হয়ে পড়ি। পিয়ন এসে বলল, স্যার আপনার একজন গেস্ট এইসেছে।

আমি একটু অবাক হলাম। কে আসতে পারে? অফিসে কখনোই আমার কোনো অতিথি আসেনি। আমি নিজে চাই না কেউ আমার অফিসে আসুক। আর আমার অফিস তেমন কেউ চিনেও না।

বললাম, পুরুষ না মহিলা?

প্রশ্নটা করেই মনে হল এটা জিজ্ঞেস করা ঠিক হয়নি। পিয়ন ছেলেটা মুচকি মুচকি হাসছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েদের বেশি বোঝার বাতিক থাকে। সতের-আঠার বছরের এই ছেলেটা গত মাসে এসেছে। বয়সের তুলনায় বেশি ঝানু। নাম সবুজ। কুচকুচে কালো একটা ছেলের নাম কালু না হয়ে সবুজ কেন হল জিজ্ঞেস করতে হবে।

বললাম, হাসছ কেন? গেস্ট কি পুরুষ না মহিলা?  
– স্যার, দুইজন এইসেছে। একজন মেয়েছেলে আছে।

গেস্টরুমে গিয়ে দেখি প্রমা। প্রথম দেখায় চিনতে পারিনি। সে নিজেই বলল, চিনতে পেরেছ?

কেউ যখন আন্তরিকতার সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এরকম প্রশ্ন করে, তখন হুট করে ‘না’ বলা যায় না। আর তাছাড়া আমারও চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কীভাবে চিনি সেটা মনে করতে পারছি না।

প্রমা বলল, আমি প্রমা। আমরা একসাথে পড়তাম! কাছেই আমার অফিস।  
সে একটা কার্ড বের করে আমার হাতে দিল।

এবার আমার মনে পড়ল। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের ভর্তি হয়েছিলাম। কিছুদিন ক্লাসও করেছিলাম। প্রমা ওখানে আমার ক্লাসমেট ছিল। এরপর আমি হঠাৎ করে দেশের বাইরে চলে যাই। তা, কত বছর হবে? দশ বছর? এতদিন পর অল্পদিনের পরিচিত একটা মেয়েকে চিনতে পারার কথা না। বললাম, চিনতে পারব না কেন? অনেকদিন পর! কী খবর?

আমি কি প্রমাকে তুমি করে বলতাম নাকি আপনি করে? আমাদের সময়ে শুরুর দিকে ক্লাসমেটদেরকে মোটামুটি সবাই আপনি বলত। এরপর কারও সাথে খাতির হয়ে গেলে সেটা তুমি-তে নামত, কখনো কখনো তুই-য়ে। তবে এই মেয়ের সাথে আমার এতোটা ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে পড়ছে না। কিন্তু সে যেহেতু তুমি দিয়ে শুরু করেছে, আমারও তা-ই করা উচিৎ।

প্রমা বলল, আছি ভালো। তোমাকে অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হয়েছে। তাও ভালো ফেসবুক ছিল। তোমার নাম লিখে খুঁজতে গিয়ে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে তোমার অফিসের ঠিকানা পেলাম। তারপর চলে এলাম।

ওর কথা শুনে আমি চমৎকৃত হলাম। গড়বড় করে অনেকগুলো কথা বলে গেল। আমাকে কীভাবে খুঁজে পেল, এই প্রশ্নটা আমি করতাম। তার আগেই সে পুরো ইতিহাস বলে দিল।

আমি বললাম, কতখন এসেছ?  
প্রমা বলল, পাঁচ মিনিট। এর নাম রতন। আমার কলিগ। ওর ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছি। তোমার অফিস শেষ কয়টায়? আমরা কি কোথাও বসতে পারি?

ওদেরকে বসতে বলে আমি উপর থেকে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে এলাম।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে প্রমা সংক্ষেপে রতনের সম্পর্কে বলল। রতন প্রমার কলিগ। প্রায় তিন বছর এক সাথে চাকুরী করছে। ওরা যে অফিসে চাকুরী করে, সেটা ছোটোখাটো। অফিসের সবাই সবাইকে খুব ভালো করে চেনে। রতনের ছোট বোন যে গতমাসে পিছলে পড়ে পা ভেঙ্গেছে সেটাও প্রমা বিশদ বর্ণনা করল। রতন বয়সে আমাদের জুনিয়র হবে। অবিবাহিত। কিছু ব্যাচেলর বন্ধুর সাথে একটা ভাড়া বাসায় থাকে। ইদানীং খুব অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটেছে। সে সেগুলো নিয়ে প্রমার সাথে আলাপ করেছে। এরপর প্রমার ধারনা হয়েছে, আমি এটার ব্যাখ্যা করতে পারব।

ক্যান্টিনে এলাম। রোজার দিন বলে পুরোটা ফাকা। আমরা একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে বসে পড়লাম।

রতনকে বললাম, রতন সাহেব কী হয়েছে খুলে বলুন তো।  
রতন বলল, ভাই আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।  
– আচ্ছা বলব।  
– আমি ভার্সিটি পাশ করার পরপরই এই অফিসে ঢুকেছি। বেতন যা পাই, তাতে বেশ চলে যায়। বন্ধুদের সাথে থাকি। গ্রামে বাবা আর ছোট বোন আছে। বোনটা কলেজে পড়ে। বেতন পেলে বাবার কাছে টাকা পাঠাই। মা মারা গেছে আড়াই বছর হচ্ছে। দুতিন মাস পরপর বাড়ি যাই। বেশ সুখেই ছিলাম বলতে পারেন। হঠাৎ করেই এই ঝামেলায় পড়লাম।

এসিতে বসেও ছেলেটা ঘামছে। আমি আন্দাজ করলাম, আসলেই খারাপ কিছু ঘটেছে। বললাম, তুমি একটু রেস্ট নাও। আমার হাতে এখন কোনো কাজ নেই। আমরা ধীরেসুস্থে কথা বলি।

২)  
রতন যা বলল, সেটা এরকম-

একদিন অফিস থেকে ফিরে বাসার তালা খুলতে গিয়ে রতন আবিষ্কার করল, দরজা ভিতর থেকে আটকানো। সে একটু অবাকই হল। বন্ধুরা সবাই অফিস থেকে দেরি করে ফেরে। কেউ কি আজ আগেভাগেই চলে এসেছে? রতন কলিংবেল চাপল। কেউ খুলছে না দেখে সে বেল চেপে ধরে রাখল। বেশ অনেকক্ষণ পর দরজা খুলে দিলেন রতনের মা। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। মা বললেন, তুই এতো অস্থির কেন?

রতন খুব স্বাভাবিকভাবেই ভিতরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে কাপড় ছাড়তে গিয়ে সে চমকে উঠল! সে এটা কী দেখল! দরজা কে খুলে দিল? মা? তা কীভাবে হয়! মা মারা গেছেন অনেক আগে! সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো কোনো বন্ধুই দরজা খুলেছে। সে দেখতে ভুল করেছে।

মা দরজায় এসে বললেন, নোংরা শার্ট পড়ে বিছানায় শুয়েছিস কেন? নিষেধ করেছি না!  
রতন যন্ত্রের মতো বলল, মা কেমন আছ?  
মা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন, এ্যাহ ঢং! তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হ। খাবার দিচ্ছি।

মুখহাত ধুয়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল খাবার ঢেকে রাখা আছে। কাঁচকলা দিয়ে ইলিশ রান্না হয়েছে। রতনের প্রিয় খাবার। মা এটা খুব ভালো রান্না করতেন। খাবার মুখে দিয়েই মনটা বিষাদে ভরে উঠল। সে একটু আগে যা দেখেছে, সব মনের কল্পনা। এই ইলিশ আর কলা সে নিজে গতকাল বাজার থেকে কিনেছে। বুয়াকে বলেছিল রান্না করতে। বুয়া রান্না করে রেখে চলে গেছে।

মা এসে চেয়ার টেনে বসে বললেন, খাচ্ছিস না যে? ভালো হয়নি?  
রতন মৃদু কণ্ঠে বলল, হয়েছে। পানি খাব।  
পানি ঢালতে ঢালতে মা বললেন, চুল এতো বড় করেছিস কেন? কালকেই চুল কেটে ফেলবি।

চুপচাপ খাওয়া শেষ করে রতন বিছানায় শুয়ে পড়ল। পুরো ব্যাপারটার ব্যাখ্যা তার কাছে আছে। কয়েকদিন হল ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছে না। অফিসেও কাজের চাপ যাচ্ছে খুব। তাছাড়া বেশ কিছুদিন থেকেই মায়ের কথা মনে পড়ছিল। সব মিলিয়ে দৃশ্যটা তার কল্পনায় তৈরি হয়েছে। এটার নাম হেলুসিনেশন। এটা দুর্লভ কোনো ঘটনা না। অনেকেরই এরকম হয়েছে।

সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ঘরে সিগারেট ধরানোর সাহস হচ্ছে না। হুট করে মা চলে আসতে পারেন। রতন উঠে জামা পড়ল। সাথে সাথে মা এসে বললেন, কোথাও যাবি?  
রতন বলল, হ্যা, একটু নিচে।  
– তাড়াতাড়ি আসিস।

দোতলায় বাড়িওলা থাকেন। রতন কী মনে করে কলিং বেল চেপে দিল। অমিতাভ সাহেব দরজা খুললেন প্রায় সাথে সাথেই। ওকে দেখে একটু অবাকই হলেন, কিছু বলবেন?  
রতন বলল, কাল যে কাগজগুলো দিলাম একটু দেখাতে পারবেন?  
অমিতাভ সাহেব কাগজ আনতে ভিতরে গেলেন।

ভাড়াটিয়াদের তথ্য দেওয়ার জন্যে মেট্রোপলিটন পুলিশের একটা ফর্ম আছে। প্রতি বছর সেটা পূরণ করতে হয়। রতনদের সবার ফর্ম সে নিজে গতকালই বাড়িওলাকে দিয়ে গেছে।  
পুরো বিষয়টাই হাস্যকর। তবু রতনের মনে হল কাগজগুলো দেখি। ওদের বন্ধুদের সবার নামে একটা করে ফর্ম পূরণ করা হয়েছে। সে যে স্বপ্ন দেখছে না, কাগজগুলো পেলে হয়তো সেই বিশ্বাসটা জোরদার হবে।

অমিতাভ সাহেব কাগজগুলো রতনের হাতে দিয়ে বললেন, কোনো সমস্যা?  
রতন একদৃষ্টিতে কাগজের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর হাতে দুইটা ফর্ম, একটা ওর নিজের নামে আরেকটা মায়ের নামে!

বাইরে ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে রতন বাসায় ফিরল। তার ধারনা ছিল, সে বাসায় গিয়ে দেখবে বন্ধুরা চলে এসেছে। কিন্তু যথারীতি মা দরজা খুলে দিলেন।

সকালে ঘুম ভাঙল উজ্জ্বলের ধাক্কাধাক্কিতে। ঘড়িতে সাড়ে নটা। রতন বলল, আগে ডাকবি না?  
উজ্জ্বল বলল, তোকে এক ঘণ্টা থেকে ডাকছি। সবাই অফিসে চলে গেছে। আমি শুধু থেকে গেছি তোকে ডাকার জন্যে। ঘুমে মধ্যে কী সব ‘যাব না মা’, ‘যাব না মা’ বলছিলি।

রতন অফিসে গেল। এবং তখন থেকেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে এল।

এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর বাসায় ফিরে আবার মায়ের সাথে দেখা হল। রতন এবার অবাক হল না। কেন যেন তার মনে হচ্ছিল এরকম হবে। মা খাবার দিলেন। সেও খুব স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় গেল।

পরদিন সকালে বন্ধুর ধাক্কায় ঘুম ভাঙল না, ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকে। মা নাস্তা দিলেন, দুপুরের জন্যে খাবার দিয়ে দিলেন। অফিস থেকে ফেরার পথে রতন আবার ইলিশ আর কাঁচকলা কিনল। সেটা মা রাতে রান্না করলেন। রতন পুরোপুরি এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেল।

একদিন অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। রতন ধরেই নিয়েছিল মা অনেক বকাঝকা করবেন। কিন্তু সে বাসায় ঢুকে দেখল বন্ধুরা মেঝেতে বসে তাস খেলছে। মা নেই!

এরপর থেকে নিয়মিত এই চক্র চলতে লাগল। হঠাৎ হঠাৎ করে মা চলে আসেন। দুই-চারদিন থাকেন, তারপর সব আবার আগের মতো হয়ে যায়।

রতন একদিন মাকে বলল, মা চল বাইরে যাই। তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেই।  
মা বললেন, আমি শাড়ি দিয়ে কী করব? শাড়ি লাগবে না।  
– লাগবে। এই দুইটা শাড়িই দেখি প্রতিদিন ঘুরে ফিরে পর। আজ চল, নতুন শাড়ি কিনে দেব।  
মা বললেন, এখন না, বেতন পেলে আনিস। তোর পছন্দে আনলেই হবে, আমাকে যেতে হবে না।

পরের সপ্তাহে রতনের বেতন হল। সে প্রমাকে বলল, আপা একটা কথা।  
প্রমা বলল, বল।  
রতন বলল, আজ একটু আমার সাথে বাজারে যেতে পারবেন? একটা শাড়ি কিনব।  
– ঠিক আছে যাব। কার জন্যে শাড়ি কিনবে?  
– আমার আম্মার জন্যে।  
প্রমা রতনের দিকে তাকাল, কার জন্যে বললে?  
রতন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, খালাম্মার জন্যে। আমার ছোট খালা।

দুজনে অনেক ঘুরে বেশ দামি একটা শাড়ি কিনল। রতন বাসায় ফিরে দেখল, বন্ধুরা তাস খেলছে।

সে-ই শেষ। রতনের সাথে ওর মায়ের আর দেখা হয়নি।

তারপর থেকে রতন খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছে। অফিসে মনমরা হয়ে থাকে। নতুন কেনা শাড়িটা সবসময় সাথে নিয়ে ঘোরে। প্রমা ব্যাপারটা খেয়াল করেছে। রতনকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। রতন স্বীকার করেনি। শেষে প্রমার জোরাজুরিতে রতন সবকিছু খুলে বলেছে।

৩)  
আমি সব শুনলাম। প্রমাকে বললাম, তোমরা আমার কাছে এসেছ কেন?  
প্রমা বলল, তুমি এগুলো বিষয় নিয়ে আগে থেকেই ইন্টারেস্টেড ছিলে। আর তাছাড়া আমি পত্রিকা-ম্যাগাজিনে তোমার লেখাগুলো নিয়মিত পড়ি।  
বললাম, দেখো প্রমা, আমি পত্রিকায় যেসব লিখি, সেগুলো কোনোটাই প্রতিষ্ঠিত তত্ব নয়। হাইপোথিসিস মাত্র। প্যারালাল ওয়ার্ল্ড কনসেপ্টটা এখনো হাস্যকর পর্যায়েই আছে। আর রতনের ব্যাপারটা তুমি বুঝতেই পারছ কী ঘটছে। ইনফ্যাক্ট রতনও বুঝতে পারছে। এটা হচ্ছে কল্পনা। হেলুসিনেশন।

রতন বলল, হ্যা, হয়তো। কিন্তু কিছু ব্যাপার আছে সেগুলো আমি ব্যাখ্যা করতে পারছি না।  
বললাম, যেমন?  
– যেমন, আমি বাড়িওলার কাছে যে ফর্মগুলো দেখলাম, সেখানে একটা আমার মায়ের নামে।  
– এটার ব্যাখ্যাটা খুব সহজ। তুমি ধরতে পারছ না কেন?  
– কী রকম?  
আমি বললাম, বাড়িওলার সাথে তোমার কথোপকথনের অংশটাও হেলুসিনেশন। বুঝতে পারছ?

রতন মাথা নিচু করে থাকল। আমি বললাম, তোমরা বোসো। আমি একটু আসছি।

আড়ালে গিয়ে প্রমাকে ফোন দিলাম। বললাম একটু দূরে সরে গিয়ে কথা বলতে। প্রমার সাথে আমার আলাপচারিতা এরকম-  
– ছেলে হিসেবে রতন কেমন? নেশাটেশা করে?  
– খুবই ভালো ছেলে। এরকম বদ অভ্যাস আছে বলে জানা নেই।  
– আচ্ছা প্রমা, রতনের মা কি আসলেই মারা গেছেন?  
– রতনের মা মারা গেছেন রতন আমাদের এখানে জয়েন করার কয়েক মাস পরেই। আমরা অফিসের সবাই তখন ওদের গ্রামে গিয়েছিলাম।  
– তুমি কি ওর বন্ধুদের কাউকে চেন?  
– না।  
– এমন কি হতে পারে, সে যা বলছে পুরোটাই মিথ্যা?  
– হতে পারে। কিন্তু এরকম মিথ্যা সে কেন বলবে? আর তুমি হয়তো খেয়াল করোনি, শাড়ির প্রসঙ্গ এলে সে খুব আপসেট হয়ে যায়। মায়ের জন্যে শাড়ি কিনেছে, দিতে পারছে না -এরকম কোনো দুঃখবোধ হয়তো আছে। তাছাড়া সারাক্ষণ শাড়িটা সাথে নিয়ে ঘোরে।  
– কেন?  
– জানি না।

আমি ওদের কাছে এলাম। রতনকে বললাম, তুমি শাড়িটা সবসময় সাথে নিয়ে ঘোরো কেন?  
রতন চুপ করে থাকল। আমি বললাম, তোমার ধারনা হঠাৎ আবার তোমার মায়ের সাথে দেখা হবে, তখন শাড়িটা তাঁকে দিবে -এই আশায়?  
সে খুব হালকা করে মাথা নাড়ল।

আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা অসুস্থ। চিকিৎসা করানো দরকার। বললাম, দেখো রতন, সমস্যাটা যে তোমার মনে ছিল সেটা কি বুঝতে পারছ?  
– জ্বি।  
– গুড। এখন সেই সমস্যাটা দূর হয়ে গেছে, তুমি এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক আছ। তুমি কি স্বাভাবিক জীবন পছন্দ করছ না?  
– করছি।  
– তাহলে শাড়ি সাথে নিয়ে ঘুরছ কেন? শাড়িটা তোমার কাছাকাছি থাকা মানে ওই চিন্তা মাথায় ঢুকানো। চিন্তাটা মাথা থেকে বের করে ফেল।  
– আচ্ছা।

আমার আরও বেশি মন খারাপ হয়ে গেল। ছেলেটা মাকে প্রচণ্ড ভালবাসত। এই কয়দিনের ঘটনা তার বহিঃপ্রকাশ। বললাম, তোমার মা দেখতে কেমন ছিলেন?  
রতন বলল, সবাই বলে মায়ের সাথে আমার চেহারার মিল আছে।  
– তুমি কি তোমার বন্ধুদের সাথে এসব ব্যাপারে আলোচনা করেছ?  
– না।  
– কেন?  
– ওরা হাসাহাসি করবে। আর যেহেতু এটা এখন আর ঘটছে না, ওদেরকে জানানোর দরকার কী?  
– তাও ঠিক। কিন্তু তোমার এখন বন্ধুদের হেল্প সবচেয়ে বেশি দরকার। সবসময় একসাথে থাকছ, ওরা তোমার খেয়াল রাখতে পারবে।  
রতন বলল, আমি এসব নিয়ে ওদের সাথে আলোচনা করতে পারব না।  
আমি কী মনে করে বললাম, চল, আমি তোমার বাসায় যাব। তোমার বন্ধুদের সাথে কথা বলব।  
– আমার বন্ধুরা অনেক রাতে বাসায় ফেরে।  
– সমস্যা নেই। আমি অপেক্ষা করব।

৪)  
প্রমাকে বিদায় করে দিয়ে আমরা রতনের বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। প্রমা আসতে চেয়েছিল, আমি জোর করে না করে দিলাম। বললাম, পরে ফোনে সব জানাব।

রতনদের বাসার সামনে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ইফতার কিনলাম। বাসাটা সুন্দর। এতো সুন্দর বাসা বাড়িওলা ব্যাচেলরদের ভাড়া দিয়েছেন ভাবাই যায় না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রতন বলল, বাড়িওলার সাথে কথা বলবেন?  
আমি বললাম, তার দরকার হবে না। কেন দরকার হবে না, তুমি সেটা জানো। তুমি কয় তলায় থাকো?  
রতন বলল, চার তলায়।

আমরা দরজার সামনে এসে দেখলাম দরজা খোলা। দরজায় একজন বয়স্ক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সালাম দিলাম।

রতন শাড়ির ব্যাগটা মহিলার হাতে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইনি আমার মা।

আমি রতনের দিকে তাকালাম। ওর চোখে পানি চলে এসেছে। সে প্রাণপণে সেটা গোপন করার চেষ্টা করছে। বৈদ্যুতিক আলোতে তার অশ্রু হীরকখণ্ডের মতো চিকচিক করছে।

আমি সরে গেলাম। এই বিপুল ভালবাসার দৃশ্যে আমার না থাকাই ভালো।
