হারানো ভালোবাসা

ফ্রাঙ্কেনেস্টাইন ৮ জানুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ১০:১৬:৪০অপরাহ্ন বিবিধ ২ মন্তব্য

” এই প্রিয়ন্তী, উঠ ! উঠ ! আর কত ঘুমাবি ? ”

শীতের সকাল, এত সহজে কি আর ঘুম ভাঙ্গে ! তাও নাছোড়বান্দা মায়ের হাক-ডাকে উঠতে বাধ্য হলো কম্বল ছেড়ে। সকাল বাজে মাত্র ৮টা !

প্রতিদিন এই সময়ে তার ভার্সিটি যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। আজকেও স্বভাবসুলভ ভাবে তাই করতে গেলো সে। হটাত মনে পড়লো, ” তাদের ভার্সিটি তো উইন্টার ভ্যাকেশনের ছুটি দিয়েছে ! তাহলে এত সকালে মা কেন অহেতুক উঠিয়ে দিলো ! ”

মেজাজটাই খিচড়ে গেলো তার। ” মা আজ তো ভার্সিটি বন্ধ ! হুদাই আমারে উঠাইলা কেন এত সকালে ? ”
– আরে এত কথা না বলে তাড়াতাড়ি রেডি হ আগে !
– কই যাবো ?
– তোর নানু বাড়ি !
– মানে ? এখন রাজশাহী যাবো ?
– হ্যা
– কিন্তু কেন ?
– তোর তামান্না আপুর বিয়ে ঠিক হয়েছে ! পরশুদিন আকদ হবে ওখানে।
– কি ????!!!!!!! সত্যি ???!!!!!! ছেলে কি করে ?
– হ্যা। আর্মির ক্যাপ্টেন !
– ওরে বাবা ! তো এখনই যাবো কিভাবে ? মার্কেটিং ?
– কিচ্ছু করতে হবে না শুধু ভালো দেখে দুই সেট কাপড় নিয়ে নে। অনুষ্ঠান পরে হবে।
– ও কিন্তু আমরা যাবো কার সাথে ?
– তোর ছোট মামা যাচ্ছে আজকে, গাড়ি ভাড়া করেছে, সাথে তোদের কাজিনদের ব্যাটালিয়নকে নিয়ে যাবে ! তোকেও তাই পাঠিয়ে দিতে বলেছে !
– তোমরা যাবে না ?
– হ্যা কালকে তোর বাবা অফিস থেকে আগে আগে চলে আসবে, এরপরেই রওনা দিবো।

এবার বেশ খুশিমনে তৈরি হতে শুরু করলো প্রিয়ন্তী !
অনেকদিন পরে আনন্দের সুযোগ আসতে চলেছে যে !
ভার্সিটিতে উঠার আগে সে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত ছিল ! অন্য বাবা-মা রা যেখানে সন্তানকে এসএসসি পাশের পরেই মোবাইল দিয়ে দেন সেখানে তার বাবা-মা ছিল ব্যতিক্রম ! ভার্সিটি অ্যাডমিশনে চান্স পাওয়ার পরেই তাকে মোবাইল দেওয়া হয়েছে !

কলেজ লাইফ পর্যন্ত তার মা তাকে নিয়ে আসা-যাওয়া করতো যে কারণে স্বাধীনতা নামক জিনিসটা কি সে কখনই বুঝেনি। এই প্রথম সে তার মা-বাবাকে ছাড়া কোথাও যাবে !

মনে মনে বেশ উত্তেজিত সে কারণ গাড়িতে যে সব কাজিনরা একসাথে যাবে ! আর বাড়তি বিনোদন হচ্ছে ছোট মামা। ঘন্টাখানেক পরেই গাড়ি এসে হাজির তার বাসার নিচে, মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলো সে …

যেই সকালটাতে প্রিয়ন্তীকে উঠাতে মায়ের এত কষ্ট করতে হয়েছে সেই সকালেই মোবাইলের এলার্মে সকাল সাড়ে ৬ টায় ঘুম ভাঙ্গে ক্যাপ্টেন ইয়াসিরের ! এলার্ম কানে যেতেই বিন্দুমাত্র দেরী না করে চটপট উঠে পড়ে সে। উঠে কিছু হালকা ব্যায়াম আর মর্নিং ওয়াক করা তার ডেইলি রুটিন। প্রচন্ড শীতেও এর ব্যতিক্রম হয় না।

সকাল ৮টার দিকে বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময় ফোন এলো মেজর তুষারের। তুষার বিএমএতে ট্রেনিং-এর সময় তার রুমমেট ছিল। ঢাকা ভার্সিটি থেকে অনার্স করে আর্মিতে যোগ দেয় তুষার আর এইচএসসি পাশ করেই যোগ দেয় ইয়াসির। সেজন্য ৪ বছরের বয়সের ব্যবধান থাকলেও দুইজনের মধ্যে অনেক মধুর সম্পর্ক বিরাজমান। তুষারকে নিজের বড় ভাইয়ের মত সম্মান দেয় ইয়াসির অন্যদিকে তুষারও ইয়াসিরকে ছোট ভাইয়ের মতই স্নেহ করে। সেইজন্যই আকদের জন্য নিজের বন্ধুদেরকে বাদ দিয়ে একমাত্র ইয়াসিরকে দাওয়াত দেয় সে …

” কিরে কেমন আছিস ? ”
– আছি ভালোই, তোমার কি খবর, স্যার !
– ভালো খবর
– কি ? তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে নাকি ?
– তুই জানলি কেমনে ?
– মানে কি ? সত্যিই তোমার বিয়ে ঠিক ! আমি তো আরো মজা করছিলাম !
– হ্যা সত্যি। পরশুদিন আকদ হবে ! তুই যাবি আমার সাথে।
– কোথায় ?
– রাজশাহী !
– হায়রে ! ঢাকাতে কি মেয়ের অভাব ছিল ?
– নাহ তবে আব্বার ফ্রেন্ডের ভাতিজির সাথে বিয়ে !
– ও ঠিক আছে বস।

দুই দিন পর …………………

বরযাত্রার ৩টি গাড়ি পৌঁছে রাজশাহীতে ! গাড়ি থেকে নেমেই গেটে দাঁড়ানো মেয়েটার উপর চোখে পড়ে ইয়াসিরের ! চমকে উঠে সে … এতদিন পরে দেখার পরেও চিনতে এতটুকু দেরী হয়না তার প্রিয়ন্তীকে ! অন্যদিকে ইয়াসিরকে দেখে চমকে প্রিয়ন্তীও ! ভাবতেই পারেনি এভাবে ৬ বছর পরে আবার তাদের দেখা হয়ে যাবে ! …

****************

এসএসসি পরীক্ষা শেষে সারাদিন এখন ফেসবুকে সময় কাটায় ইয়াসির ! এছাড়া কিছু করার নেই যে ! একদিন ফ্রেন্ড সাজেশনে আইডিটা চোখে পড়ে তার, নাম প্রিয়ন্তী হক ! তাদেরই স্কুলে ছিল দেখে রিকুয়েস্ট পাঠায় সে। একটু পরে নোটিফিকেশনে দেখে তার রিকুয়েস্ট এক্সেপ্টেড ! এবার প্রোফাইলটা চেক করে সে, দুই দিন আগে আইডিটা খোলা হয়েছে, কয়েকটা ছবি রয়েছে ! আহামরি কোন চেহারা নয় মেয়েটার, তবে একটা সুশ্রী ভাব রয়েছে !

দেখে আর নক করার ইচ্ছা হলো না তার ! নিজে আবার আধ একটু লেখালেখি করে, সেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সেদিন রাতেই একটা গল্প পোস্ট করলো সে। আর ওইটাতে এসে আপনমনে কমেন্ট করলো প্রিয়ন্তী ! একটু অবাকই হলো সে, আবার কৌতূহলও ! তাই নক করে সে প্রিয়ন্তীকে ………

কয়েকদিনের মধ্যেই ভালো ফ্রেন্ড হয়ে যায় তারা। এসএসসির রেজাল্টে দুইজনেই গোল্ডেন এ-প্লাস পায়। কলেজে উঠে দুজন একই কোচিং-এ ভর্তি হলে প্রথম তাদের সামনাসামনি সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ হয় ! প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে ভালোই লাগে ইয়াসিরের ! ছবিতে দেখে যতটা ভেবেছিল আসলে দেখতে তার চেয়ে সুন্দর !

দিন চলে যেতে থাকে … প্রিয়ন্তী দিনে ১ ঘণ্টার বেশি থাকতে পারতো না কারণ তার নিজের মোবাইল নেই, বসতে হতো মায়েরটা দিয়ে ! আস্তে আস্তে ইয়াসির আবিষ্কার করে যে, প্রিয়ন্তীর প্রতি তার একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে ! সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার আসার অপেক্ষা করে। একদিন বুঝতে পারে আসল কারণ কি !

প্রিয়ন্তীকে কথাটা জানাতে সময় খুব বেশি নেয়নি সে ! শুনে অনেক বড় একটা ধাক্কা খায় প্রিয়ন্তী। ইয়াসিরকে সে বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতো, আর সেই কিনা … প্রচন্ড রাগে সে ইয়াসিরকে ব্লক করে, বন্ধ হয়ে যায় তাদের যোগাযোগ ! কোচিং পরিবর্তন করায় তাদের সামনাসামনি দেখাটাও সম্ভব ছিল না।

ইয়াসিরকে ব্লক করার পরেই তার প্রতি টান টা অনুভব করে সে। তাও নিজের পরিবার আর ক্যারিয়ারের কথা ভেবে সে চাপা দিয়ে রাখে নিজের অনুভূতিকে, প্রচন্ড কষ্ট করে সে সহ্য করতে থাকে একাকীত্ব ! এইচএসসির পরে অ্যাডমিশনের পরে ইয়াসিরের খবর নেওয়ার চেষ্টা করে সে। জানতে পারে যে সে আর্মিতে যোগ দিয়েছে। এরপরে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগের কোন উপায় বের করতে পারেনি সে।

ভার্সিটি লাইফে অনেক ছেলেকে দেখেছে সে ! ইয়াসিরের চেয়ে অনেক সুদর্শন ছেলেরাও তাকে প্রপোজ করেছে ! কিন্তু কাউকেই তার মনে ধরেনি, সে কেবলই ইয়াসিরের চিন্তায় আচ্ছন্ন ! অনেক মেয়েরাই তাকে বোকা, গর্দভ বলেছে এত ভালো ভালো ছেলে হাতছাড়া করার জন্য, কিন্তু সে অটল।

প্রিয়ন্তীর প্রত্যাখ্যানের পর ইয়াসিরের জীবনে যেন শনি নেমে আসে। এইচএসসিতে গোল্ডেন মিস হয় তার। ঢাকার কোন ভার্সিটির কোথাও অ্যাডমিশন হয় না, চান্স পায় চুয়েটে ! তখন সে আইএসএসবি দেয় যাতে সিলেক্ট হওয়াতে সে যোগ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। সাফল্যের সাথে ট্রেনিং শেষ করার পরে সে পোস্টিং পায়। এত কিছুর মধেও তার মনের একটা কোন দখল করে রাখে সেই গোলগাল, ফর্সা মুখটা !

****************

এতদিন পরে প্রিয়ন্তীকে দেখে কি করবে বুঝতে পারছে না ইয়াসির। তাও ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞেস করে, ” কেমন আছো, তুমি দেখি একদমই বদলাওনি ! ”
– ভালো, কিন্তু তুমি অনেক বদলে গেছ ! একেবারে কালো হয়ে গেছ ! চাপা ভেঙ্গে গেছে ! শরীর টা কেমন শ্রমিকের মত হয়ে গেছে !
– হাহাহা ! আর্মির ট্রেনিং বলে কথা !
– জানি !
– ও তাই !
– হুম। তুমি বিয়ে করেছ ?
– আরে এক বছর হইলো কমিশন্ড হয়েছি, এখনো বিয়ে করার কথাই ভাবছি না। তুমি ?
– আমি অনার্স থার্ড ইয়ারে ! আম্মু তো বিয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করেছে !
– তাই ? তোমার তো ভালো ডিমান্ড পাওয়ার কথা !
– তুমি বুঝি কম যাবা ! আর্মির ক্যাপ্টেন বলে কথা !
– হাহাহা ! তুমি এখনো আগে মত আছো।
– কিন্তু তুমি নেই।
– হয়তো কিন্তু তোমার প্রতি সেই ভালোবাসার কিছু একটা অংশ অবশিষ্ট রয়ে গেছে !
– আচ্ছা তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে ?
– তুমি কি পারবে আমার সাথে সারাজীবন কাটাতে ? আমি একজন মিলিটারি পার্সোনেল, অনেক শৃঙ্খলা মেনে চলি আমি।
– সব পারবো আমি ! জানো তোমার জন্য আমি কত ভালো ভালো ছেলেকে হাতছাড়া করলাম।
– ওরা আমার থেকে দেখতে ভালো ছিল ?
– সবদিক দিয়েই তো ছিল !
– তাইলে ওদেরকে বিয়ে করলা না কেন ?
– কারণ আমি যে তোমাকে ভালোবাসি ! কোন রিলেশনে যাওয়ার আগে খালি তোমার ওই হতচ্ছাড়া মুখটা ভেসে উঠতো চোখের সামনে ! ব্যস ! আমার সব ভুন্ডুল হয়ে যেত !
– লল। যদি আমাকে না পেতে ?
– তাহলে তোমাকে অভিশাপ দিতে দিতে কুমারী হয়ে কাটিয়ে দিতাম পুরো জীবন !

এইভাবে আবারো সেই দুজন ছেলে-মেয়ের দেখা যারা আগে একে অপরকে ভালোবাসলেও পরিস্থিতির কারণে, জগতের নির্মমতার কারণে এক হতে পারেনি। কিন্তু ওই জগতই এক আজব খেল খেলে তাদেরকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে !

জগতের কেউ ফিরে পাচ্ছে পুরানো ভালোবাসা, কেউ বা হারাচ্ছে !
নিয়তির এ এক আজব খেল ! যে খেলের শিকার প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ।
এটাই জগতের চরম বাস্তবতা।

৫০১জন ৫০১জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ