14642801_242588072810547_859588993_n
রাসায়নিক কোনো প্রকার দ্রব্য এই জৈব চুনে থাকে না বরং স্বাস্থ্যের জন্য এই চুন উপকার। তবুও কালের বিবর্তনে এই চুন শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। এই চুন শিল্পে জড়িত ‘চুনে’বা ‘জুগিরা’ আজ তারা তাদের বাপ দাদার আমলের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। এখানে আমার প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদ ‘ইবনে খলুদিনে্র একটি উক্তি মনে পড়ছে। তাঁর মতে, কোনো কোনো জাত বা সম্রাজ্যের স্থায়ী কাল চার পুরুষের অধিক  খুব একটা স্থায়ী হয় না। এর পিছনে কারন থাকে অনেক। ঠিক পেশাগত জাতী হিসেবে পরিচিত এই ‘চুনে’ও ‘জুগি’ জাতীদের পেশার পরিবর্তন ও এই শিল্পের বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে কারন ও অনেক। রয়েছে পরিবেশ বিপর্যয় ও সামাজিক বৈষম্য। আমি এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় কুড়িগ্রাম কাঠালবাড়ি জুগি পাড়ায় গিয়ে তাদের সাথে কথা বলেছি। জেনেছি তাদের সুখ দুঃখ। এই পেশার বিলুপ্ত হওয়ার কারনও জেনেছি। উত্তরাঞ্চলে সব থেকে বড় জুগি পাড়া হল ঠাকুরগাঁ জুগি পাড়া। ওদের মাধ্যমেও খবর নিয়ে জানতে পেরেছি এই বিলুপ্ত হওয়ার একই কারন। আমি সবার জানার জন্য তাদের নাম ও পরিচয় পরে তুলে ধরব। এখন এই শিল্প বিলুপ্ত হওয়ার কারন গুলো বলিঃ
এই শিল্পের নতুন প্রজন্ম বর্তমান সামাজিক অবস্থার সাথে টিকে থাকতে ও সামাজিক বিভিন্ন বৈষম্যের কারনে জীবন যুদ্ধের সাথে জয়ী হতে এই শিল্প থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে নতুন প্রজন্ম। যেমনঃ
১. জলবায়ুর পরিবর্তনের কারনে সমুদ্রের উপকূলের সুন্দরবনের ভিতরে ছোট ছোট খাল গুলিতে লবনাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারনে শামুক ও ঝিনুকেরর পরিমান কমে গেছে।
২. সুন্দরবনের খালগুলোতে বাগদা চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করার সময় প্রচুর পরিমানে ঝিনুক ও শামুক নষ্ট হয় আর এ কারনেও কমে যাচ্ছে শামুক ও ঝিনুক।
৩. খালবিল নদী নালায় মাছ উৎপাদন ও ধান চাষে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারনেও ঝিনুক ও শামুক কমে গোছে।
৪. বর্তমানে ফার্মের মুরগির খাবার, কবুতরের গ্রীড তৈরি এবং মাছের খাদ্যের গ্রিড তৈরি করতে শামুক ও ঝিনুকের ব্যবহারের জন্য ও চুন প্রস্তুতকারী শিল্পীরা শামুক ও ঝিনুকের সংকটে পড়ছে। আর যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তাও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে তাদের। আর মাত্র তিন কেজি শামুক ও ঝিনুক পেলে এক কেজী গুড়া চুন পাওয়া যায়। তাতে পানি মেশালে পাঁচ কেজি খাবার চুন পাওয়া যায়। এক কেজি গুড়া চুন বিশ টাকা। আর পানি চুন দশ টাকায় বিক্রি হয়। তিন কেজি শামুক ও ঝিনুকের দাম পড়ে ১০/১৫ টাকা, কাঠখড়ির খরচ ৩০/৪০ টাকা এবং পরিশ্রম ও সময় মিলায়ে বর্তমানে এ পেশায় টিকে থাকা মুশকিল। যেখানে আগে বস্তাই বিক্রি হতো ১০/২০ টাকাতে।
৫. চুন প্রস্তুতের সময় শামুক ও ঝিনুক পোড়ানোর সময় সামান্য যে ধোয়ার সৃষ্টি এবং দুর্গন্ধ হয় যা অতি সামান্য, এতে অনেক সময় আশেপাশের মানুষ অভিযোগ করে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতামতে শামুক ও ঝিনুক পোড়ালে তেমন দুর্গন্ধ ও ধোয়ার সৃষ্টি হয় না। তবে হ্যাঁ, এই শামুক ও ঝিনুক পোড়ানোর সময় এর ভিতরের শাষমূল ভালমতো পরিষ্কার না হলে গন্ধটা তীব্র হয়। তবে যেহেতু এটা কোনো ধরনের ক্যেমিকেল না বরং এক ধরনে ছোট ছোট প্রানী তাই এটা পোড়ানোর সময় এর গন্ধ ও ধোয়াতে সাস্থ্যের কোনো রকম ক্ষতি হয় না। যতটা যানবাহনের ধোয়াতে হয়। তাইলে তো আমরা সামান্য জায়গাতেই গাড়ি বের না করে হেঁটেই যেতে পারি। যাই হোক, আমার নানাবাড়ি ও দাদাবাড়ি সুন্দরবন সংলগ্ন রামপাল থানার ফয়লা গ্রামে। যদিও নানী আমার এই চুন প্রস্তুত শিল্পের সাথে জড়িত নয়, তবুও তখনকার সময়ে অনেক গেরস্থ বাড়ির মতো তিনিও বাড়িতে আসা মেহমান আপ্যায়নের জন্য ও নিজেদের খাওয়ার জন্য এই চুন তৈরী করত। তিনি ফয়লা বাজার হাটের ফৌড়েদের কাছ থেকে এটা সংগ্রহ করত। তো পুরো চুন প্রস্তুত প্রনালীটি আমি নিজে দেখেছি। এটা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যপার। আসলে এই আধুনিক যুগের মানুষের সবকিছুতেই ধ্যৈর্যচ্যুতি ঘটে। এর এসব অভিযোগের উপর ভিত্তি করে অনেকেই এ কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা গ্রহন করেছে অন্য পেশা। কারন সামাজিক বৈষম্য মতে তারা খুবই দুর্বল জাতি। এই কারনে তথ্যমতে,ঝালকাঠি শহরের পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকায় প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলে আসা চুন শিল্পের সাথে জড়িত ‘ গৌরিহরি ধরের পুত্র বিষ্ণুপদ ধর তার চুন তৈরীর জন্য শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করতেন মোংলার দিগরাজ বাজার থেকে। তিনি ও তার এই পেশা থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন এইসব অভিযোগের জন্য। এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে শামুক ও ঝিনুক পোড়ানোর গন্ধের, তাই সে এ পেশা বন্ধ করে দিচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলার কাঠালবাড়ি গ্রামের তারাপদ ধরের সাথে কথা বলে জেনেছি, সেও তার বাপ দাদার এই পেশা এখনো মায়ার টানেই ধরে রেখেছে। তিনি আমাকে বললেন তিনি তার বাবার সাথে পার্বতিপুর থেকে ট্রেনে করে চলে যেতেন খুলনা। সেখান থেকে মোংলা পোর্ট দিগরাজ বাজার থেকে বস্তাভরে সমুদ্রের শামুক ও ঝিনুক নিয়ে মালগাড়ির বগিতে করে চলে আসতেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন এতো দূরে যান শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করত? উত্তরে তিনি বললেন, সমুদ্রের শামুকের সাথে দেশীয় সনাতন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা পুকুর ও খালবিলের শামুক ও ঝিনুক মিশিয়ে চুন তৈ্রী করলে সেই শামুক ও ঝিনুকের স্বাদ হয় খুবই ভাল। এবং এর ক্রেতাও ভাল পাওয়া যায়। এক সময় এই চুন অন্যান্য দেশেও রপ্তানি হতো। এখন সবই বন্ধ। এখন তিনি অত দূরে যেতে পারেননা( দিগরাজ বাজার) । কাউকে দিয়ে আনিয়ে নেন। তাও অনেক চড়া দামে। যাতে কোনোরকম তার জীবন চলে। কিন্তু তিনিও এখন এই পেশা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
৬. অর্থনৈতিকভাবে বর্তমানে টিকে থাকতে এ পেশা তাদের জন্য ধরে রাখা একেবারেই অসম্ভব। বর্তমান বাজার দর, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা মেটানো এই পেশা থেকে তা পূরণ করা একেবারেই সম্ভব না।
৭. পাথুরে চুনের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকাও মুুশকিল।

রসনা বিলাসী মানুষের কাছে চুনের চাহিদা থাকলেও তারা পাথুরে চুনের খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে জানেই না। আর শামুক ও ঝিনুকের তৈরি চুন থেকে পাথুরে চুন সস্তা। তাই ক্রেতা তার অজ্ঞতার কারনে কমদামে ক্ষতিকর এই পাথুরে চুন কিনতে আগ্রহী হয়ে পড়ছে। মুখ থুবড়ে পড়ছে জৈব চুন শিল্প। পাথুরে চুনে ঠোট মুখ লাল হচ্ছে ঠিকই কিন্তু পাকস্থলি রক্তাক্ত হচ্ছে, ক্ষয় হচ্ছে ক্যালসিয়াম। অন্যান্য মুখের ঘা ও পেটের পিড়া তো আছেই।
আমি বলছি না এই জৈব চুন শিল্পীরা নিজেরা না খেয়ে না পরে, তারা বাংলার রসনা বিলাসী মানুষের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল করুক। কিন্তু সরকার থেকে এমন ব্যাবস্থা করুক যেন তাদের এই পেশা টিকে থাকে। কারন এটাও বাংলার শত বছরের এক ঐতিহ্য শিল্প। তারা অন্যান্য পেশার পাশাপাশি এই পেশাটি টিকিয়ে রাখুক। তারা শহর মুখি হচ্ছে। বাড়ছে বড় শহরে এইসব পেশার মানুষের চাপ।
আমরা এই আধুনিক যুগের মানুষগুলোকে সভ্যতার দ্বারে পৌছে দিয়েছে এইসব অবহেলিত শ্রমজীবী মানুষগুলো। তাদের জানতে নতুন প্রজন্মকে সাহায্য করেছে আমাদের ইতিহাসবিদরা। তাই তাদের আমরা শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের প্রজন্ম সভ্যতা বলতে বোঝে তথাকথিত উন্নতি প্রচার কৌশল ও স্ব প্রদর্শনকারী সংস্কৃতি সচেতন মানুষ।

এইসব শ্রমজীবী আদি মানবের নিত্য নতুন কৃষি বিপ্লব কারিগরি দিক গুলি অনেকে আপাতদৃষ্টিতে পশ্চাৎপদ, অমার্জিত আখ্যা দিয়ে নিজেদের উঁচু স্তরের লোক ভাবতে ভালবাসে। একটা দেশের জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটা যে কতোটা অন্তরায় তা এখনো ভাবতে শেখেনি বেশীরভাগ সংখ্যালঘিষ্ট সুবিধাভোগি জনগোষ্ঠী। তাই সুন্দরবনের কৃষিজীবী, জলজীবী ও সাধারন শ্রমজীবী এসব মানুষের প্রতি এখনো তথাকথিত ভদ্রলোকদের অবজ্ঞার বহর দেখে বিস্মিত হই। এ অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষগুলো জীবন যাপনে, জীবিকা অর্জনের জন্য নানা বাধা বিঘ্ন পার হয়ে আসছে। অন্যের খাদ্যের চাহিদার যোগান দিচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বেশীরভাগ শ্রমজীবী মানষের ঘর মাটির তৈ্রী গোলপাতার ছাউনি। তাই উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় একেকটি দীর্ঘশ্বাস।। লবণ পানির সাথে তাদের আজীবন বসবাস। পানযোগ্য পানির জন্য যেন আর এক দুর্যোগ। এক একটা দুর্যোগে সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবকরা এসব মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে সাময়িক উহ ! আহ! সমায়িক আশ্বাসের বানী শুনালেও বাস্তবে তা আর পূর্ণ হয় না। জোয়ার ভাটার এই লবন পানির সাথে সখ্যতা করেই জীবন চলছে মোংলা ও সুন্দরবন উপকুলবাসীর জীবন। বংশানুক্রমে সেই পর্তুগীজ, ওলন্দাজ,ফরাসী ও মারাঠাদের অত্যাচার এবং প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে, সুন্দরবনকে ভালবেসে বসবাস করে আসছে এসব শ্রমজীবী মানুষগুলো। সুন্দরবন ও তাদের মায়ের মতো রক্ষা করে আসছে, সমুদ্রের জলোচ্ছাস ও ঘূর্নিঝড় থেকে। এখন আবার মরার উপর এই খাড়ার ঘা “রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র” তাই এই আধুনিক অবকাঠামোর বাংলাদেশ হয়েও উপকূলবাসীর শেষ হয় না দুঃখ বেদনার সাদাকালো মলিন পথ।

/// এরপরের পর্বে মৌয়ালদের নিয়ে লিখব, আশা করছি।

সুন্দরবন সংলগ্ন শ্রমজীবী মানুষ – চুনশিল্প -১

সুন্দরবন সংলগ্ন শ্রমজীবী মানুষ – চুনশিল্প -২

৬৮৯জন ৬৮৭জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ