শিকল

নীহার ১৯ এপ্রিল ২০১৬, মঙ্গলবার, ০৬:২১:৩৭অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি, গল্প ২৪ মন্তব্য

হাতের পেপার ওয়েটটার ওজন একটু বেশিই মনে হচ্ছে ডাক্তার হাফিজ এর। একটি সরকারি মানসিক হাসপাতালে ৩ বছর ধরে কর্মরত আছেন তিনি।কেস হিস্ট্রি টা আরেকবার পড়ার জন্য হাতে নিলেন।বাইরে দমকা হাওয়া বইছে। কালো মেঘগুলোর মতই ছড়িয়ে পড়ছে দুশ্চিন্তা তাঁর নিউরনে।
দেড় বছর আগের একটা দিনে ফিরে গেলেন তিনি-হসপিটাল এর রুম নং: ১৪৩,যেসব মাথার কলকব্জাগুলো অচল হয়ে গেছে তাদের ই একজনকে রাখা হয়েছে সেখানে।সেই বছর দেড়েক আগে,কোন অচেনা একজন রাস্তা থেকে তুলে দিয়ে গেল একে-আর কেউ কম্মিনকালেও দেখতে আসেনি ।হয়তো লোকটার কেউ নেই-ভেবেছিলেন তিনি। পাগলটার ছেড়া পাঞ্জাবির পকেট থেকে মানিব্যাগে পাওয়া একটি ফটোগ্রাফ এর পেছনে লেখা ছিল রুদ্রনীল- এই মাথা খারাপ লোকটার ই ছবি সেটা।তাই দেখেই রেজিস্ট্রি করেন হাফিজ সাহেব-“রুদ্রনীল-১৪৩ নং রুম।” ৩৪ সাঁটা বদলে দেওয়া পোশাকটা পড়িয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঘরটায়। দেড় বছরে একটুও উন্নতি হয়নি- বরং বেড়েছে পাগলামি।রুদ্র নামটাও হারিয়ে গেছে তার নাট বল্টুর সাথে সাথে।”পাগলা নাম্বার ৩৪”-এভাবেই ডাকা হয় তাকে এখানে।
কেস হিস্ট্রিতে ৩৪ নাম্বার রোগীর অতীত ব্যাপারগুলো লেখা নেই। তার আচরণ অ্যানালাইসিস করে ওষুধ থেকে শুরু করে শক ওয়েভ সবই চেষ্টা করা হয়েছে।কাজ হয়নি তেমন।ডা. হাফিজের মনে পড়ে যায় প্রথম চেক আপের দিনটা… রুদ্রনীল বসেছিল এক কোণায়। তিনি কাছে গিয়ে দেখেন বাতাসে অনবরত গিট্টু দিচ্ছে সে-

“-কী করছেন?
-গিট্টু লাগাই। শক্ত কইরা গিট্ না দিলে সব চইলা যাইব।সব সব যাইব..সব যাইব…

-কী বাঁধছেন?
-এই যে প্রথম টায় বানতেছি সুখ, দুই নাম্বারটায় ভালোবাসা আর তিন খানের টায় নী…”

এই পর্যন্ত বলেই রুদ্রনীল হঠাতৎই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছিল।

কথাটুকু শেষ করেনি-কিংবা করেছিল, তার জান্তব চিত্কার বুঝতে দেয়নি ডাক্তারকে হয়তো।এরপর অনেকগুলো সেশন গেল। পাগলটা এখন ও গিট্ লাগায় বাতাসে- সুখ বাঁধার চেষ্টা করে। নী কথাটুকু কোনোদিন পূর্ণ করেনি রুদ্র তার সামনে।
ডা. হাফিজ জানেন না-রুদ্র প্রায় ই বিড় বিড় করে “নী মানে হইল নীরা। নীরা জানি কে? কে জানি? নীল শাড়ি,না না লাল ওড়না? কে কে?”
অতি প্রিয় সেই মুখটার আদল অস্পষ্ট ভাবে আসে তার সামনে-আবছা ঘোরে রুদ্রের কানে কথা আসে –“রুদ্র,তোমাকে সুখ বেঁধে দেব-ভালোবাসার দড়ি দিয়ে…”

মরচে পড়া স্মৃতি টা চাড়া দিলেই সে বসে যায় গিট্টু দিতে। নীরার কথা বলবে না সে সুঁই অলা মানুষটাকে। বড্ড জ্বালায়-গিঁট দেওয়ার সময়, নীরার কথা মনে হলেই তো সব ওলট পালট হয়ে যায় তার। নীরাটা যেন কে? কী যে হয় তার-কিচ্ছু মনে থাকে না তার। তারপর রুমে আর চার কুঠুরিতে ভাংচুর চলে।

পাগল নং ৩৪ কে শিকল পড়িয়ে রাখা হয় এখন। ডাক্তার এ কথা জানেন। গিট্টু উপাখ্যান জানেন না তিনি,নীরা রূপকথাও তার অজানা। হাত পায়ের বদলে চার কুঠুরিতে মায়া নামক শেকল শূন্যতা তাই তার চোখে পড়েনি। গুপ্তধনের খোঁজ কে কাকে দেয়? রুদ্র ও দেয়নি।তাই নী পর্যন্ত বলেই থেমে যায় সে।

ডা. হাফিজ বেশ খেয়াল করেছেন বৃষ্টির দিনে রুদ্রের পাগলামি বেড়ে যায়। না,বর্ষাকাল নয়-যে কোনো বর্ষার দিন-যাচ্ছেতাই অবস্থা হয় তার। কাছেই যাওয়া যায় না। প্রায় বর্ষাকাল তাকে খাটের সাথে বেঁধে রাখা হয়। ডা. হাফিজ চিন্তিত-সেপ্টেম্বর এর সকালে আকাশে মেঘ হানা দিয়েছে হঠাৎ। ভোর বেলা কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না-৩৪ নং কে বেঁধে রাখা দরকার।।

ওদিকে ১৪৩ নং রুমে,ছোট্ট জানালা দিয়ে আকাশ দেখে রুদ্র-হাতে পায়ে শেকল।দুষ্ট লোকের কাজ। কিন্তু কালো কালো জিনিসগুলো যেনো কী! পানির মত ওগুলো কেমন যেন শব্দ করে-রুম ঝুম না না রিম ঝিম.. উফ্ফ রিন ঝিন রুম ঝুম… কত কাল আগে, সে নীরার হাতে এমন মেঘলা দিনে পড়িয়েছিল এক গোছা চুড়ি।নীরা হাত নেড়ে বজ্রনাদ ঢেকে দিয়েছিল-তখন রুদ্র জানত ঐ রিন ঝিন মানে ভালোবাসা। এখনকার পাগল নং ৩৪ এর কানেও উঠেছে সেই রিনঝিন সিম্ফনি।।

“নীরা-রিনঝিন”,বিড় বিড় করতে করতেই হাত দু’টো দিয়ে মাথায় চাপড়ে দেয় নিজের- শিকলের ঝন ঝন শব্দ তার ময়লা জমা কানে ঝিন ঝিন করে ওঠে।

“ডাকতর সাব,আইসা দেখেন পাগলায় কী করতাছে?”-কর্মচারীর এই ডাকে মোটামুটি নিশ্চত হয়েই ১৪৩ নং রুমে ছুটে যান হাফিজ সাহেব। পাগলটা তখন শিকল দিয়ে মাথা চাপড়াচ্ছে। মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে তার..কিন্তু হাফিজ সাহেব দাঁড়িয়ে শুনছেন-
“ রুন ঝুন রিম ঝিম,রিম ঝিম রুন ঝুন..”
একমনে বকে যাচ্ছে পাগলটা আর শিকল দিয়ে রক্তাভ ক্যানভাসের গাঢ়ত্ব বাড়াচ্ছে।।

ব্যাকগ্রাউন্ডে বৃষ্টি ছিল।সময়ের মঞ্চে পাগলের পার্টে ছিল রুদ্রনীল,আখ্যানভাগ না জানা দর্শক ছিলেন হাফিজ সাহেব।

আরও একজন ছিল মুখ্য ভূমিকায়-সে নীরা।।

আড়ালে থাকা নীরা কি জানত???

৫০০জন ৫০০জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ