রেসিপি – দুই

নীলাঞ্জনা নীলা ১৮ আগস্ট ২০১৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:০৩:৪৮পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৪৮ মন্তব্য

পালং শাক ঃ-

পালং শাকের পিন্ডি... :D
পালং শাকের পিন্ডি… 

মজা করে নাম দিয়েছিলাম পালং শাকের পিন্ডি। না দিয়ে উপায় কি বলুন! এতো কুচিকুচি করে কাটতে হয়েছে, আমার মাথার বারোটা বেজেছে। এমনিতেই বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারিনা। এক্সিডেন্টের পর দুই পদ রান্না করতেই তিনঘন্টা লেগে যায়। যাক রান্নায় আসি এবার।

উপকরণ ঃ পালং শাক, রসুন (দুই কোয়া), শুকনো মরিচ (একটা), কালোজিরা (তিন আঙুলের এক চিমটি), আদা কুচি, হলুদ, লবণ, কাঁচা মরিচ, সরিষার তেল, ধনেপাতা।

শাক ধুয়ে নিয়ে (জল ঝরানোর প্রয়োজন নেই) কুচিকুচি (যতোটা সম্ভব ছোট) করে কেটে নিন। আদা-রসুন অল্প থেতলে নিন। চুলায় ফ্রাইপ্যান বসিয়ে গরম হলে তেল (সরিষার তেল বেশী খাওয়া ভালো না। তবে মাঝে-মধ্যে খেলে তেমন সমস্যা নেই) দিন। তেল গরম হলে ওর মধ্যে শুকনা মরিচ ভেঙ্গে দিয়ে, ওতে কালোজিরা দেবেন। কালোজিরা দেয়ার সাথে সাথেই অল্প লবণ ছিটিয়ে দেবেন। কালোজিরার সুন্দর ঘ্রাণ বের হবে। তারপর রসুন-আদা দিন। একটু বাদামী হলে শাক ঢেলে দিন। ওর মধ্যেই হলুদ আর অল্প পরিমাণে লবণ দেবেন। মিনিট কয়েক নাড়াচাড়া করে হাল্কা আঁচে ঢেকে দেবেন। শাকের জলেই শাক সেদ্ধ হবে। শাক যদি মাখা মাখা রাখতে চান, তাহলে জল শুকিয়ে নেবেন না। সবশেষে কাঁচা মরিচ চিরে আর ধনেপাতা কুচিকুচি করে কেটে শাকে দেবেন। হয়ে গেলো পালং শাকের পিন্ডি চটকানো।
**চাইলে চিংড়ি মাছও দিতে পারেন। আমি চিংড়ি মাছ খাইনা, তাই দেইনি।

পেঁপে-মাগুর মাছের বন্ধুত্ত্ব ঃ-

পেঁপে-মাগুর বন্ধুত্ত্ব...
পেঁপে-মাগুর বন্ধুত্ত্ব…

উপকরণ ঃ  মাগুর মাছ, পেঁপে, সাদা আস্ত জিরা, লং-দারচিনি-এলাচ-তেজপাতা, আদা বাটা, জিরা গুঁড়া, ধনেগুঁড়া, কারিপাতার পাউডার, হলুদ, লবণ, ভেজিটেবিল অয়েল, কাঁচামরিচ, গরমমশলা গুঁড়া।

মাগুর মাছ খুব ভালো করে লবণ-হলুদ দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ রেখে তারপর ধুয়ে ফেলুন। জল ঝরানোর পর আবারও হলুদ-লবণ দিয়ে মেখে অল্প ভেঁজে নিন। মাছ তুলে নিয়ে ওই তেলেই প্রথমে তেজপাতা, তারপর আস্ত জিরা দিন। জিরা দিয়েই ওর মধ্যে লবণ দেবেন, সুন্দর ঘ্রাণ বের হবে। অবশেষে এক এক করে লং-দারচিনি-এলাচ-আদা বাটা দিয়ে অল্প ভেঁজে নিন। টুকরো টুকরো করে কাটা পেঁপে ওই মশলার মধ্যে দিয়ে দিন। পেঁপে দেয়ার পরই জিরা-ধনে-কারিপাতার গুঁড়া-হলুদ-লবণ দিন। পেঁপেসহ মশলা সব ভালো করে নাড়াতে থাকুন। ভাঁজা ভাঁজা হয়ে এলে অল্প জল দিন। ঝোল বেশী রাখতে চাইলে সব্জীর পরিমাণে জল দেবেন। দেশের পেঁপে সহজে সেদ্ধ হয়না। তাই তরকারী রান্নার আগেই আলাদা করে হাল্কা ভাঁপ দিয়ে নিতে হয়। দেশের বাইরে পেঁপে খুব সহজেই সেদ্ধ হয়, আলাদা করে ভাঁপ দিতে হয়না। জল দেয়ার পর ঢেকে দিন। পেঁপে সেদ্ধ হয়ে এলে আগুণের জ্বাল কমিয়ে দিয়ে মাগুর মাছটা দিয়ে দিন। তারপর আবার ঢেকে দিন। ঝোলটা অল্প টেনে এলে ঢাকনা সরিয়ে দিয়ে কাঁচা মরিচ বেশী করে দিয়ে দিন। সবশেষে গরমমশলা গুঁড়া ছিটিয়ে দেবেন। আমি ঝোল বেশী রাখিনা, মাখামাখা করি। গন্ধে কি মনে হচ্ছে মাংস রান্না হলো, নাকি মাগুর মাছ?

আলু-ফুলকপি-পনির দম ঃ-

পনির বলে ওহে ফুলকপি আমি কতো সুস্বাদু...
পনির বলে ওহে ফুলকপি আমি কতো সুস্বাদু…

উপকরণ ঃ  আলু, ফুলকপি, পনির, সাদা আস্ত জিরা, তেজপাতা, লবঙ্গ, দারচিনি, এলাচ, আদা বাটা, জিরা গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া, আস্ত কারিপাতা (পাউডার নয়), লবণ, কাঁচামরিচ, ভেজিটেবল অয়েল, ঘিঁ, গরমমশলা গুঁড়া।

আলু ডুমো ডুমো করে কেটে নিন। সকলেই জানেন আলু কেটে কিন্তু বেশীক্ষণ রাখতে নেই, কালচে দাগ পড়ে যাবে। তাই আলু কেটে জলে ভিঁজিয়ে রাখুন। সবথেকে ভালো হয় ফুলকপি চাক চাক করে কাটুন, অবশ্যই আগে ধুয়ে নিয়ে কাটুন সে যে কোনো সব্জী-ই হোক। পনিরও টুকরো করে কেটে হলুদ-লবণ দিয়ে মেখে হাল্কা করে ভেঁজে নিন। পনির ভাঁজার পর ওই তেলেই আলু-ফুলকপিও হাল্কা করে ভাঁজুন। তারপর ফ্রাইপ্যান থেকে উঠিয়ে নিন। এবারে ওই তেলে আস্ত জিরা দিয়েই তার উপর অল্প লবণ ছিটিয়ে দিন। তারপর এক এক করে তেজপাতা-লং-দারচিনি-এলাচ দিন। দুই চা’ চামচ আদা বাটার মধ্যে এক চা’ চামচ হলুদ, দুই চা’ চামচ জিরা গুঁড়া, স্বাদ অণুযায়ী লবণ দিয়ে মেখে নিন। তারপর ফ্রাইপ্যানে ওই মিশ্রণ ঢালুন। অল্প ভেঁজে ওর মধ্যে আলু-ফুলকপি দিন। নাড়াচাড়া করুন, যাতে মশলাটা সব্জীতে ঢুকতে পারে। এবারে জল দিয়ে দিন। এই তরকারী মাখামাখা রাঁধি আমি। তাই অল্পই জল দেই। ফ্রাইপ্যান ঢেকে জ্বাল বাড়িয়ে দিলে সব্জী সেদ্ধ হয় তাড়াতাড়ি। সব্জী সেদ্ধ হয়ে এলে জল টেনে গেলে পনির দিয়ে দিন। সাথে সাথেই ঘিঁ দিন দুই টেবিল চামচ। তারপর আস্ত কারিপাতা এবং ফালি করে কেটে রাখা কাঁচামরিচ দিন। নামানোর ঠিক আগে এক চা’ চামচ গরমমশলা গুঁড়া দিয়ে নামিয়ে নিন।
**এই তরকারী আমার ছেলের খুবই প্রিয়। মাও কম যায়না। আমার মামনি নিজের হাতে পনির বানাতো একসময়। জার্সি গরু দুই বেলায় ১২ লিটার দুধ দিতো। পুরো চা’ বাগানে অনেককেই ফ্রীতে দুধ বিলি করা হতো। যেটুকু থাকতো, কখনো রসমালাই, কখনো ক্ষিরের সন্দেশ, কখনো রসগোল্লা, আর পনির।

মুরগী মাখানী ঃ-

মুরগী তুমি নীরবে জ্বলো...উফ ঝাল!
মুরগী তুমি নীরবে জ্বলো…উফ ঝাল!

উপকরণ ঃ হাড়ছাড়া মুরগী(ছোট টুকরো করে কাটা), ক্যাপসিকাম (সবুজ+হলুদ+কমলা লম্বা করে কাটা), পেঁয়াজ কুঁচি (বড়ো পেঁয়াজ পাঁচটা), রসুন কুঁচি(পাঁচ কোয়া), কাঁচামরিচ কুঁচি, আদাবাটা (চার চা’ চামচ), তেজপাতা, লবঙ্গ, দারচিনি, এলাচ, জিরা গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া, কারি পাউডার, লবণ, টম্যাটো সস, ধনেপাতা কুঁচি, সরিষার তেল।

ফ্রাইপ্যানে সরিষার তেল দিন। তেল গরম হলে পেঁয়াজ কুঁচি দিন। বাদামী রঙ হবার আগেই রসুন কুঁচি, আদাবাটা, কাঁচামরিচ কুঁচি দিন। বাদামী রঙ হয়ে এলে ওর মধ্যে তেজপাতা-লং-দারচিনি-এলাচ দিন। এবারে মাংস ছেড়ে দিয়ে নাড়াতে থাকুন। পাশাপাশি মশলা মাখিয়ে নিন। চার চা’ চামচ জিরা গুঁড়া, দুই চা’ চামচ কারিপাউডার+হলুদ গুঁড়া+ধনে গুঁড়া, আন্দাজমতো লবণ এবং জল দিয়ে মাখিয়ে নিন। তারপর মাংসের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আবার নাড়াতে থাকুন। বেশ ভাঁজা এবং মাংস খানিকটা সেদ্ধ হয়ে গেলে তার মধ্যে টম্যাটো সস ঢালুন। ্ফ্রাইপ্যানে নীচে যাতে আটকে না যায় অল্প একটু জলও দিন। জ্বাল কমিয়ে হাল্কা আঁচে মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হতে দিন। তবে খেয়াল রাখবেন যেনো পোড়া না লাগে। কিছুক্ষণ পর মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে ক্যাপসিকামের টুকরোগুলো ঢেলে দিয়ে নাড়াতে থাকুন। অল্প একটু সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে নিন সুঘ্রাণ ছড়াবে। ফালি করে রাখা কাঁচামরিচ ও ধনেপাতা কুঁচি তরকারীর উপর ছড়িয়ে দিন। টক+ঝাল স্বাদের এই মাংসের তরকারী পরোটা কিংবা পুরী দিয়ে খেতে দারুণ লাগে। একবার স্বাদ নিয়েই দেখুন।

লেবুপাতা দিয়ে মুশুর ডাল ঃ-

ঘ্রাণে অর্ধভোজন...কাগজী লেবুর পাতা বলে কথা!
ঘ্রাণে অর্ধভোজন…কাগজী লেবুর পাতা বলে কথা!

উপকরণ ঃ মুশুর ডাল, লেবুপাতা ৪/৫ টি (কাগজী অথবা গন্ধরাজ লেবুর পাতা), শুকনো মরিচ, কালোজিরা, হলুদ, লবণ, কাঁচামরিচ, ভেজিটেবিল তেল।

আমার ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মামনি মুশুর ডালে কোনো না কোনো সব্জী(ফুলকপি/বাঁধাকপি/মুলা/টম্যাটো/পেঁপে ইত্যাদি) দিয়ে রান্না করতো। মাঝে-মধ্যে স্বাদ বদলাতে লেবুপাতা দিয়ে মুশুর অথবা মুগ ডাল রাঁধতো মামনি এবং বরিশালের মা (দিদিমা মানে মায়ের মা)। আর ডালের সাথে অবশ্যই কোনো ভাঁজা থাকতোই।
যাক এবারে আসি রান্নায়। মুশুর ডাল ভালো করে ধুয়ে নিন।  সসপ্যানে জল দিন, জল ফুঁটে এলে ওর মধ্যে মুশুর ডাল ঢেলে দিন। আমি অবশ্য তাড়াহুড়ো থাকলে একইসাথে ডাল+জল+লবণ বসিয়ে দেই। ্ডাল যখন সেদ্ধ হয়ে যাবে, ডাল ঘুঁটুনী দিয়ে ঘুঁটে নিন এবং তারপর হলুদ গুঁড়া দিয়ে দিন। ওদিকে ডাল ফুঁটতে থাকবে। অন্যদিকে আলাদা ফ্রাইপ্যানে তেল ঢালুন। ডাল ফোঁড়নের ওপরেই কিন্তু সুস্বাদ নির্ভর করে। তেল গরম হলে শুকনো মরিচ ছেড়ে দিন। খুব সাবধান হাঁচি-কাশি থেকে। সুস্থ মানুষও এই ঝাঁঝে কাশি দেবেনই। এবার এক চা’ চামচ কালোজিরা ছেড়ে দিয়ে সাথে সাথেই লবণ ছিটিয়ে দিন। সুন্দর ঝাঁঝ বের হবে। এবার ওই ফ্রাইপ্যানে ডালটা ছেড়ে দিয়ে ফুঁটে উঠতে দিন। ফুঁটে উঠলে লেবুপাতা এবং ফালি করে কেটে রাখা কাঁচামরিচ দিয়ে মিনিট পাঁচের মতো রেখে নামিয়ে নিন। ওহ ভালো কথা লবণ দেখে নেবেন।
**এই ডালের সাথে ঘিঁ দিয়ে আলু ভাঁজা, পুর দিয়ে ফুলকপি ভাঁজা, মাছ ভাঁজা দারুণ খেতে। আমি আমার প্রিয়টা জানালাম। অবশ্যই হাল্কা গরম ভাত। আহ!

আজকের মতো এই কয়টি রেসিপি রইলো। সামনে আরোও আসবে ছবিসহ। যাঁরা মঙ্গলগ্রহ যেতে চান, তাঁদের জন্য দুঃখ ফ্রোজেন+রেডিমেড ক্যান নিয়ে যেতে হবে। বাঙ্গালী রান্না অনেক দামী, কারণ ভর্তা বাসী খাওয়া যায়না। ভাঁজা গরম গরম ভেঁজে খেতে হয়। সবাই জানে পৃথিবীর সবচেয়ে ঝামেলাদায়ক কিন্তু সুস্বাদু খাবার আমাদের কাছেই। যেমন ভিন্নতা আছে, একই মশলা দিয়ে রান্না অথচ স্বাদ আলাদা। একটা কথা না বলে পারছিনা। এই যে খাবার পোষ্ট লিখছি অনেক কঠিন। তার চেয়ে অন্যকিছু লেখা খুব সহজ। অফিস থেকে এসে লেখা নিয়ে বসেছি বিকাল তিনটার সময়। এখন প্রায় সাড়ে ছয়টা। তাও এই লেখা লিখছি আজ থেকে নয়। গত তিনদিন থেকে চলছে। আজ পোষ্টটা দিতেই হবে এই প্রতিজ্ঞা করে বসেছি। ওহ আর নীচের ওই কয়টি লাইন যার সাথে রেসিপির কোনো মিল নেই। দিলাম তাঁদের জন্য, যাঁরা রান্না খেয়ে পছন্দ করেছেন। 😀  “আজ তবে এইটুকু থাক, বাকী কথা পরে হবে।”

তোমাকে দেবো রূপালী রাত্রি অজস্র তারায় ভরা আকাশ
এমন করে সকল প্রেমিকাই তার প্রেমিককে দেয়।
তুমি ভাবতে পারো এ আর এমন কি! কিছুটা আফসোসও হতে পারে,
এ কার সাথে প্রেম করছি? অসাধারণ নয়তো মোটেও!
তোমার এই ভাবনার বদলে আমিও একই কথা বলবো;
আমি মোটেও অসাধারণ নই, তেমনি নও তুমিও।
এই যে তোমাকে ভালোবেসেছি, সেটাই ঢের!
যদিও এই ভালোবাসা থেকে যে-কোনো সময় তোমাকে আমি মুক্তি দিয়ে স্বস্তি কুড়োতে পারি,
আবার তুমিও মুক্ত হতে চাইলে পথ খোলা।
সাধারণ আমি। তবে খোলামকুচি নই, শুধু এটুকুই জেনে রেখো।

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৭ আগষ্ট, ২০১৬ ইং।

রেসিপি – এক

৭০৭জন ৭০৭জন
0 Shares

৪৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ