গত দু’সপ্তাহ যাবত তাঁরা আমার অতিথি। রাত পোহালেই ফিরে যাবেন দেশে। তাই সন্ধ্যাকালীন চা’য়ের সময়টাতে হাসি, আনন্দে গল্প হচ্ছিলো। পরিবেশ ধীরে ধীরে গুমোট হয়ে উঠছিলো। আমি নির্বিকার হয়ে শুনছিলাম। তরুণ বয়সে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে কতটা সংগ্রাম করে আজকের অবস্থানে এসেছেন, সেই সব গল্প। দেশে রেখে আসা স্ত্রী এবং আদরের ছোট্ট ছেলেটির গল্প। কেমন করে এতটুকুন ছেলেটি একটু একটু করে বেড়ে উঠবার সাথে সাথে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করে বাবার কাছ হতে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, অর্থ না পেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আক্রমণ করছে, ভাঙচুর করছে ___ সেইসব গল্প। সর্বোপরি জীবনের পড়ন্তবেলায় একজন অসহায় পিতা নিজগৃহে সার্বক্ষণিক নিজ সন্তানের আক্রমণের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকার গল্প।
প্রবাসী পিতার অনুপস্থিতিতে মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠা শিশুটি কিছু চাইলে কোমল হৃদয়ের মা সাতপাঁচ না ভেবেই চাহিদাগুলো পূরণ করেছেন। সেদিনের ছোট্ট ছেলেটি আজ পরিনত এক যুবক। বেড়ে উঠবার সাথে সাথে তাঁর চাহিদাও বেড়েছে। বাড়তে বাড়তে কখন যে তা সামর্থ্যের বাইরে, নাগালের বাইরে আকাশ ছুঁয়ে যেতে চেয়েছে, তা কেউই খেয়াল করেনি হয়তো। নানান শারীরিক জটিলতা আর পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত সেই পিতা দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পাট চুকিয়ে বাধ্য হয়েই যখন দেশে ফিরে যান, ততদিনে কিছুই রয় না আর আগের মতন।
জানি, ঘরে ঘরে এমন ছেলে অনেক আছে যাঁদের অত্যাচারে জন্মদাতা পিতা’রা কাঁদে পাঁজর ভাঙ্গা কান্না। অসহনীয় কষ্ট বুকে নিয়ে দিনের পর দিন অনিদ্রা আর দীর্ঘশ্বাসের মাঝে হাঁসফাঁস করা জীবন নিয়ে বেঁচে থাকে। দেহ থেকে আত্নার বিচ্ছেদ মানেই কি মৃত্যু !! শারীরিক মৃত্যুর আগেও যে মানুষের মৃত্যু ঘটে, তা নিয়ে আমাদের কোন হাহাকার নেই। দেহ থেকে প্রাণটুকু গেলেই আমাদের যত আহাজারি !
লেখাটি যখন শেষ করছি, সমস্ত ঘর অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্যে ছেয়ে আছে। শূন্যতায় ঘিরে আছে ঘরের আনাচ-কানাচ। আমি ঘরদোর পরিস্কার করছি। এখানে ওখানে ওষুধের খালি বাক্স, ক্যাপস্যুলের খোসা, ইনসুলিন, সিরিঞ্জ… সবকিছুর মাঝে কেবলই একজন অসহায় পিতার জল টলোমলো মুখচ্ছবি দেখি। কানে বাজে পৃথিবীর সবচাইতে বিষাদের, হতাশা’র কিছু শব্দ____ ” কতোটা হতভাগা হলে নিজ সন্তানের ভয়ে ভীত এই জীবন বয়ে বেড়াই… !! “
হুম, আমি ঘরদোর পরিস্কার করি। বিষাদমাখা স্মৃতিগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলি। বড়দিনের ছুটিতে অন্য অতিথিরা আসবে। তাঁদের জন্যে বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন করি। আমার রোজকার জীবনে এমন কিছু বিষাদময় স্মৃতি কোন পরিবর্তন আনে না। নতুন উদ্যমে নতুন অতিথিদের স্বাগত জানাবার অপেক্ষায় থাকি…
১) আমরা মায়েরা যেন সন্তানদের অন্যায় আবদারগুলো মেনে না নেই, প্রশ্রয় না দেই।
২) যে মানুষটি পরিবারের সকলের সুখের জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে, তাঁকে যেন যথার্থ মূল্য দেই।

 

৪৪৫জন ৪৪৫জন
0 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ