বেশ কয়েকদিন পারমিতার দেখা নেই। একদিন তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে নক করে জানলাম সে অসুস্থ। দেশের বাইরে ট্রিটমেন্ট করতে গিয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে শুয়ে মরনব্যাধী ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে চলেছে।
শুনে আমি তাঁকে সাত্বনা দেই, ”বলি ঘাবড়াবে না। প্রাণবন্ত থাকো। মনের শক্তির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। মনের জোর আর ঈশ্বরের উপর ভরসা যে কি জিনিস আমি আমার খালাকে দেখেছি। উনার এই দুবছর হলো বোনমেরু ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়েছে। গত প্রায় আটবছর যাবত এই সমস্যা। এই নিয়েই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। ট্রিটমেন্ট যেহেতু চলছে, ভালো হবে। খারাপ এটাই যে, একেবারে ভালো হয় না। তবুও যতদিন আয়ু আছে ততদিন ভালো থাকো এই কামনা।” এরপর থেকে খবরাখবর নিতে তাঁর সাথে কথা চলতে থাকে।

এরপর একসময় সে জানায়, এই দুঃসময়ে তাঁর এক সময়ের খুব ভালো বন্ধু নাকি তাঁকে এড়িয়ে চলে! পারমিতা আমাকে বলে, নষ্ট করার মতো সময় নাকি তাঁর বন্ধুটির এখন নেই! বন্ধুটি এখন আর তাঁকে কোন রকম সময় দেয় না। বন্ধুটি পারমিতাকে বলেছে তাঁর তথাকথিত ‘টাইম’ নেই। আমি অবাক হয়ে বলি-
“হায়! হায়! কি বলো! তাহলে সে তোমার প্রকৃত বন্ধু ছিলো না।”
পারমিতা বলে এই সময়টাতে সে এটা না বললেও পারতো। আমি অনুভব করি পারমিতা খুব কাঁদছে। আমি তাঁকে শ্বান্তনা দিয়ে বলি-
“কেনো কাঁদছো? যার তোমার প্রতি কোন মমত্ববোধই নেই তার জন্য কান্না কেনো? বন্ধু কি কখনো এমন হয়? বিপদে তো বন্ধুই এসে আগে পাশে দাঁড়াবে। সে দাঁড়ায় নি। তারমানে সে তোমার বন্ধুই ছিলো না। তুমি তাকে ভুল জেনেছিলে!”

পারমিতা বর্তমানে যতোটা না শারিরীক অসুস্থতাজনিত কারনে কষ্ট পাচ্ছে তার থেকে বেশি কষ্ট পাচ্ছে মানসিক কারনে। গত তিনদিন যাবত আমি যখন পারছি তাঁর সাথে কথা বলে তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছি, শ্বান্তনা দিচ্ছি। শরীরের কষ্ট থেকেও মনের কষ্ট মানুষকে পোড়ায় বেশি। শরীরের কষ্ট দেখা যায় কিন্তু মনের কষ্ট দেখা যায় না, কেবলই অনুভব করার বিষয়! আমি পারমিতাকে বারবার বলি মনে জোর রাখো। ভেঙে পড়লে চলবে না। মানসিক শক্তি মানুষকে অনেক বড় ঝড়ও মোকাবেলা করতে সহায়তা করে। পারমিতা আমার কথা শুনে আম্বস্ত হয় কিনা জানি না। ওর কেমো দেয়া চলছে। প্রথম কেমো দেয়াকালীন খুব কষ্ট হয়েছে। মাঝেমাঝে কথা চলাকালীন সে বলতো “রুবা আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি আর পারছি না।” এরপর সে অনলাইন থেকে চলে যেতো। আর ভার্চুয়াল জগতের পর্দার এপার থেকে আমি কেবলই তাঁর কষ্টকে অনুভব করে হাসফাঁস করেছি। কয়েকঘন্টা পর আবার তাঁর দেখা পেয়ে জানতে পারি, এখন সে ভালো আছে। বলে আগামীকাল দ্বিতীয় কেমো পুশ করবে। আমি তাঁকে বলতে থাকি মনে জোর রাখো। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অনেক কথাবার্তা বলি এটা সেটা নিয়ে। পারমিতা বলে, তাঁর ফেবুপ্রীতি দেখে ডাক্তাররা তাঁকে জিজ্ঞেস করে সে ফেবু এডিক্টেড কি না! আমি হাসি। বলি, এটাই ভালো। জীবন মানেই একদিন মরন হবে। কিন্তু যতক্ষণ জীবন আছে ততক্ষন সেটা উপভোগ করাই উচিৎ। তোমার যা ভালো লাগে এখন তাই করো। বরং ফেবুতেই বেশি বেশি থেকো। তাহলে বোরিং লাগবে না। সে বলে, এফবি থাকাতে সে দেশে তাঁর পরিবারের সকলের সাথে কথা বলে সময় কাটাতে পারছে। তাঁকে বলি তোমার ছবিগুলো তো খুবই সুন্দর। ছবি দেখেই তো মুগ্ধ আমি, হাহাহা…..। সে আনন্দ পায়। এপাশ থেকে আমি তা খুব অনুভব করি। আমার ভালো লাগে। যতোটুকু সময় সে চায় আমি তাঁর সাথে কথা চালিয়ে যাই। মাঝেমধ্যে সে জানতে চায়, আমি বিরক্ত হচ্ছি কি না। আমি বলি তোমার যতক্ষণ ইচ্ছা কথা বলো। একসময় রাত বাড়তে থাকে। অনুভব করি কথা বলে একটু হলেও তাঁর পোড়া মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বলি এবার রিলাক্সমুডে ঘুমিয়ে পড়ো।

দ্বিতীয়দিন সকালে নেটে ঢুকেই পারমিতাকে খুঁজে ফিরি। ভাবলাম হয়তো ঘুমিয়ে আছে। অফিস থেকে বের হয়েই তাঁকে নক করে রাখি। ভাবি, সে নেটে আসলেই রেসপন্স করবে। একটু পরই সে জানায়, আজ তাঁর দ্বিতীয় কেমো দেয়া হয়েছে। শরীরের যন্ত্রণা তো আছেই আবার ক্যাথেটার রক্তে ভরে উঠছে বারবার। ডাক্তাররা ৩/৪ ঘন্টা চেষ্টা করেও থামাতে পারছে না। তাঁর মাঝে এক অজানা ভয় কাজ করছে। আমি সব কাজ ফেলে দিয়ে আবার তাঁকে সঙ্গ দিতে থাকি। একসময় সে ব্যাথায় আবারও ককিযে উঠে। আমি তা শুনতে না পেলেও প্রতিক্রিয়ায় অনুভব করি। জানায়, ৪ ব্যাগ রক্ত লাগবে। আবার জানায়, রক্ত পাওয়া গেছে। একটা সময় সে ব্যাথায় আরো যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়ে। বলে আমি এখন আর কথা বলতে পারছি না। আমি তাঁকে ঘুমানোর চেষ্টা করতে বলি। এরপর টানা ১৮ ঘন্টা আর তাঁর কোনরকম খবর পাই না। আমাকে একধরনের অস্থিরতায় পেয়ে বসে। মনেমনে প্রার্থনা করি। চোখে দেখা আরো কিছু ক্যান্সার রোগীদের অসুস্থ থাকাকালীন কন্ডিশন বিশ্লেষণ করে বুঝার চেষ্টা করি তাঁর অবস্থা কোনদিকে যেতে পারে। অপেক্ষায় থেকে একসময় তাঁকে ইনবক্স করে রাখি, যেনো সে ফেবুতে লগইন হলেই ইনফর্ম করে। অবশেষে ১৮ ঘন্টা পর সে জানালো এখন সে ভালো আছে। মনে আমার স্বস্তি ফিরে আসে।

আমি তাঁকে দুটু কারনে সঙ্গ দিচ্ছিলাম। প্রথমত, মরনব্যাধী ক্যান্সার, যা তাঁকে মৃত্যুর হাতচানি দিয়ে ডাকছে। ক্রমেই সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন হারিয়ে ফেলছে। দ্বিতীয়ত, তাঁর খুব কাছের বন্ধুটি এই দুঃসময়ে তাঁর হাতটি ছেড়ে দিয়ে তাঁর মনোবেদনা আরোও বাড়িয়ে দিয়েছে। শরীরের ব্যথা, মনের ব্যথা দুয়ে মিলে তাঁকে ঝাপটে ধরেছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, পর্দার অপাশে সে কেঁদেকেটে একাকার।

ভাবি, মানুষ কি করে পারে এমন করতে? মরনব্যাধীতে আক্রান্ত একটা মানুষ! যতোক্ষন সে সুস্থ ছিলো ততোক্ষণ তাঁর সাথে সুসম্পর্ক ছিলো আর অসুস্থ হওয়ার সাথেসাথেই তাঁর সাথে সমস্ত সম্পর্কের সমাপ্তি টানতে হবে? সাধারণ বন্ধুত্বটুকুও কি এসময় বজায় রাখা যেতো না? আরে! মানুষ তো মানুষেরই জন্য। তাইলে মানুষই আবার কি করে এমন করে?

আমি এখনো জানি না পারমিতার সেই স্বার্থপর বন্ধুটি কে! তবুও কামনা করি টানাপোড়নজনিত কোন কারনে বন্ধুটি দূরে সরে থাকলেও বন্ধুর দুঃসময়ের কথা ভেবে এখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবে। কি জানি! তেমন বোধোদয় ঘটবে কি না তাঁর মনে!!!

জগতের সকল মানুষ ভাল থাকুক। সকল মানুষের মাঝে মানবতা জাগ্রত থাকুক।

৪৭৫জন ৪৭৫জন
0 Shares

৩৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ