ভ্রুনো

মেহেদী পাতা ৫ ডিসেম্বর ২০১৪, শুক্রবার, ০৬:৩৭:২১অপরাহ্ন বিবিধ ৪ মন্তব্য

এক ফোঁটা ঘাম নিচে পড়তেই তপ্ত পিচঢালা পথ তা দ্রুত শুষে নেয়। আমার এক ফোঁটা ঘামও কেবল শুষে নিল। আমি তা দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অনেক কিছুই দেখতে হয় আজকাল অনাকাঙ্খিতভাবে। সেক্ষেত্রে প্রকৃতির দোষ দিয়ে লাভ কি? প্রকৃতিও আজকাল বড় স্বার্থপর।

আমি হাঁটছি সকাল থেকে। পিঠটা ভিজে উঠছে ঘামে। তবুও আমি থামছি না। মনে হয় থামলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। জুতোর অবস্থাও ভালো না। যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে। মা’র কাছে টাকা চাইলে মা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। ওটাকে তাড়ানো বললে ভুল হবে, ওটাকে বলে খেদানো। সাথে বেশ্যা নামক নিত্য গালিটা তো ছিলই। আমি চলে আসলাম কারণ জানি চেয়ে লাভ হবে না। বান্ধবীদের কাছ থেকে টুক টাক করে টাকা ধার নিলাম। টাকাগুলো একজনের কাছ থেকেও নেয়া যেত। কিন্তু তাহলে পরে তাকে তা ফেরত দিতে হতো। আমি জানি এইটুকুন টাকাও এই মুহূর্তে ফেরত দেয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। তাই টুক টাক করে নিয়েছি সবার কাছ থেকে। এখন আর কাউকে ফেরত দিতে হবে না। কেউ আর ২০০ ৩০০ টাকা লজ্জার ভয়ে চাবেও নাহ। আমি হাঁটছি পরবর্তী ক্লিনিকের জন্য। পিছনে তিনটা ক্লিনিক ফেলে এসেছি। অনেক কাকুতি মিনতি করার পরও একটা ক্লিনিকও আমার অ্যাবোরশন করতে চাইল না।

ক্লিনিকগুলো এতো সততার পরিচয় দেবে ভাবিনি। পুলিশের পরে টাকা খাওয়ার অস্ত্র যদি কারও কাছে থেকে থাকে তা হল ডাক্তার।পুলিশের রাইফেল আর ডাক্তারদের সিজার। সেই টঙ্কা খাদকরাও আজ টাকা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। ভাবতেই অবাক লাগে। ফাহিমও ওর জীবন থেকে আমাকে এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিবে সেটাও কখনো মাথায় ছিল না। আমি নিজে যখন সিওর হলাম যে আমি প্রেগন্যান্ট, নিজের খুশি আমি নিজেই ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল আমি সারা পৃথিবীকে বলি, আমি মা হব!! আমি মা হব!! সাথেই সাথেই জানাই ব্যাপারটা ফাহিমকে, বলি, আমাদের ‘মুগ্ধ’ আসছে পৃথিবীতে। ‘মুগ্ধ’ নামটা ও আর আমি দুজনে মিলেই ঠিক করেছিলাম। ও জেনে প্রথমে খুশিই হয়। তারপর হঠাৎ বলে ওঠে, এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না !

তখনই ওর সাথে আমার ঝগড়াটা বাধে। আর এই ঝগড়াই যেন কাল হয়ে এল আমার জীবনে। আগের ঝগড়ার সাথে এ ঝগড়ার যেন অনেক পার্থক্য ছিল।

ফাহিমের লেখাপড়া শেষ হতে এখনও দু বছর। তারপরই ও বলেছিল আমার ব্যাপারটা ফ্যামিলিকে জানাবে। কিন্তু এর মাঝেই একটা অঘটন ঘটে গেল। প্রথমে আমি খুশিই হয়েছিলাম কিন্তু এখন ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেও অঘটন ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। নিজেকে অনেক নিচ মনে হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। একটা জীবনকে আমি নিজ হাতে শেষ করতে চলেছি। আমার নষ্ট প্রেমের কারণে একটা জীবন কেন নষ্ট হবে ? এই একটা প্রশ্নই মাথায় ভর করছে সেকেন্ডে সেকেন্ডে কিন্তু বাস্তবতার দোহাই দিয়ে যেন এই প্রশ্ন কে আমি সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছি সহসা। সামনে আরেকটা ক্লিনিক দেখা যাচ্ছে। আমি এগুচ্ছি রোবটের মতো। হঠাৎ আমি মুগ্ধ’র কথা যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কানে। ও যেন বলছে, ”মা ওখানে যেওনা তুমি, যেওনা প্লীজ”।

আমি আর হাঁটার শক্তি পাচ্ছি না পায়ে। মনে হচ্ছে পা দুটি যেন মাটির ভিতর ডেবে যেতে চাইছে। আমি এখন ক্লিনিকটার সামনে দাঁড়িয়ে। ক্লিনিকটা খুব একটা উন্নত বলে মনে হচ্ছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে এই ক্লিনিকে ঢুকলে আমি আমার মুগ্ধকে নিয়ে আর বের হতে পারব না ! আমাকে একাই বের হতে হবে ! মায়ের মনে কামড় দেয় বলে একটা কথা আছে। আমি কি ঐটাই উপলব্ধি করছি এখন ? আমি ক্লিনিকটার সামনের রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি এবং ভাবছি। কি করব আমি ? কি করা উচিৎ ? সামনের রাস্তায় ঝাপ দিব ? নাকি রাস্তা পার হয়ে ক্লিনিকে ঢুকব ? নাকি আরেকটা বার ফোন দিব ফাহিমকে ?

এমন ভাবনার সন্ধিক্ষণে এক মহিলা কে দেখতে পেলাম ক্লিনিক থেকে বেরোতে। সম্ভবত ক্লিনিকে কাজ করে। আয়া টায়া হবে হয়ত। তার হাতে অনেক ময়লার বাস্কেট। সম্ভবত ক্লিনিকের বর্জ্য হবে। সে ওসব নিয়ে পাশের গলিতে ঢুকল। আমি গেলাম কথা বলার জন্য। সে ময়লার স্তূপে বর্জ্যগুলো রেখে চলে যাচ্ছে। আপাতত তার ডিউটি মনে হয় শেষ। সামনে হেঁটে আর কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না মহিলার সাথে। তাই আবার আমি ক্লিনিকের দিকে আসতে লাগলাম। হঠাৎ আমার চোখ গেল সেই ময়লার স্তূপটার দিকে। আমি আঁতকে উঠলাম। একটা ছোট্ট হাত যেন বের হয়ে আছে বাস্কেট থেকে। এটাকেই কি ভ্রূণ বলে ?

হয়ত কোন নষ্ট প্রেমের স্পষ্ট নিদর্শন আজ ময়লার স্তূপে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হয়ত এরও কোন ভবিষ্যৎ ছিল। ছিল ভবিষ্যতব্য ডাকনাম। শুধু ময়লার স্তূপে ফেলতে দেরী হয়ে গেছে হয়ত। নাহলে হাতটা বোধহয় আর আমার চোখেই পড়তো না। ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝার উপায় নেই যে এটা একটি ছোট্ট হাত। আমি আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলাম। আঙ্গুলগুলো যেন এখন স্পষ্ট। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম সব আঙ্গুলগুলো বুজে আছে কিন্তু একটি আঙ্গুল যেন বুজে নেই। এইটা কি মধ্যমা আঙ্গুল ? হ্যা আমি তাই দেখছি। সব আঙ্গুল বুজে থাকলেও এই মধ্যমা আঙ্গুলটি বুজে নেই। যেন খুব গৌরবে, সমারোহে আঙ্গুলটি সোজা হয়ে আছে। যেন কোন বাধাই আর নোয়াতে পারবে না, নামাতে পারবে না এই আঙ্গুলকে। আমি ভাবছি ওই বাচ্চাটি তার মধ্যমা আঙ্গুলের দ্বারা সমাজের প্রতি কিছু ইঙ্গিত করে যাচ্ছে নাতো ? তা হতে পারে তার এই নষ্ট সমাজের প্রতি প্রবল ঘৃণা। তার তো কোন দোষ ছিল না। না, দোষ তো একটা ছিলই ! না বলে কয়ে পৃথিবীতে আসার চেষ্টা। এটাই তো তার সবচেয়ে বড় দোষ।

বিষয়গুলো আমার মাথায় খুব দ্রুত কাজ করছে। আমার মুগ্ধ আমার কাছে থাকবে। ওকে আমি ময়লার স্তূপে পড়ে থাকতে দিব না। কক্ষনো না। আমার মুগ্ধতা দিয়ে আমি মুগ্ধকে বড় করব। পায়ে যেন এখন আমার শক্তি ফিরে পাচ্ছি। মনে হয় এখন অনন্ত পথ আমি হাটতে পারব। আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম। ভাবছি আমার মতো এরকম ভুল এখন কত মেয়েই না করছে। একটু ক্ষণস্থায়ী আবেগের কাছে বিসর্জন দিচ্ছে সব। আবার ক্লিনিকে যেতেও তাদের সময় লাগছে না। মুহূর্তেই হত্যা করছে একটি জীবনকে। হত্যা করছে নিজের সন্তানকে। আমি হয়ত ওইদিক দিয়ে লাকি যে ক্লিনিকের বেড পর্যন্ত আমি যাইনি। কিন্তু আমার অতীতের জন্য আমি খুবই অনুতপ্ত। ভীষণ অনুতপ্ত।

এখন পড়ন্ত বিকেল। আকাশে মৃদু মেঘ। আস্তে আস্তে করে মেঘ সরে আকাশের লাল আভাকে পরিস্ফুটিত করে দিচ্ছে। এখন হয়ত কুৎসিত কাকটাও তার সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আমিও আমার মুগ্ধকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি।

৪১৯জন ৪১৯জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ