ভালোবাসি তোমায় (৩৪তম খন্ড)

ইঞ্জা ৫ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার, ১০:৩৯:২৮অপরাহ্ন গল্প ১৭ মন্তব্য

images-9

 

ছোট চাচা, চাচী, দাদী সহ সবাই দৌড়ে এসে অবণীকে ধরলেন আর ডাকতে লাগলেন অবণী অবণী করে, চাচী দ্রুত পানি নিয়ে এসে অবণীর চোখে মুখে পানি দিতে লাগলেন, অবণী একটু নড়ে উঠে অঁ অঁ শব্দ করে আসতে করে চোখ খুলল এরপর অভি অভি করে চিৎকার করে উঠলো আর আবার ঢলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। ছোট চাচা আর দেরী না করে অবণীকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে অবণীর দাদীর রুমে নিয়ে এলেন আর শুয়ে দিলেন দাদীর বিছানায়।

আমার বুড়ীটার কি হলো, এমন কেন হলো বলে দাদী কেঁদে দিলেন আর দাদীর কান্না দেখে ছোট চাচীও কেঁদে দিলেন।
পানিটা দাও, আর তোমরা কান্না বন্ধ করো, দেখছোনা মেয়েটা অসুস্থ, ছোট চাচা দিলেন এক বকা।
ছোট চাচী দ্রুত পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন চোখ মুছতে মুছতে।
ছোট চাচা হাতের মধ্যে পানি নিয়ে হাল্কা করে অবণীর চোখে কপালে পানি মাখতে লাগলেন।
অবণীকে কি হসপিটালে নিয়ে যাবে, ছোট চাচী আসতে করে বললেন।
যদি তাড়াতাড়ি জ্ঞান না ফিরে তাহলে তো নিয়ে যেতেই হবে আর এই বলতে বলতেই অবণী নড়ে উঠলো এরপর চোখ খুলল আসতে করে, কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকালো সবার দিকে এরপর জিজ্ঞেস করলো আমি এইখানে কেন?
মা তুমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে, আমিই তোমাকে নিয়ে এসেছি তোর দাদীর রুমে, ছোট চাচা জবাব দিলেন।

অবণী উঠে বসতে চেয়েছিলো কিন্তু ছোট চাচা না করলেন আর জোর করে শুয়ে দিলেন, বললেন তুই এইভাবে কিছুক্ষণ শুয়ে থাক মা, পরে তোর রুমে চলে যাস।
ছোট বাবা।
কি মা কিছু বলবি?
আমি দেশে যাবো।
মানে, দেশে যাবি কি করতে?
না আমি দেশে যাবো, তুমি তাড়াতাড়ি আমার টিকেট কেটে দাও, যত তাড়াতাড়ির ফ্লাইট হয় ততই ভালো।
ঠিক আছে দেখছি, তার আগে বল কি হয়েছে তোর, কে ফোন করেছিলো?
বাড়ী থেকে ফোন করেছিলো।
কেন কি হয়েছে, চাচা উদীগ্ন হলেন।
ছোট বাবা, বলেই অবণী কাঁদতে শুরু করে দিলো।
আচ্ছা থাক তুই ঘুমা, পরে কথা হবে।
অবণী ঝট করে ছোট চাচার হাত ধরে ফেললো আর কেঁদে বললো, ছোট চাচা, আমাকে টিকেট করে দাও।
আচ্ছা মা আমি দেখছি বলেই রুমের বাতি নিভিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন।
অবণী সেলফোনটা বের করে ওর বাবাকে রিং দিলো, কয়েকটা রিং হতেই অবণীর বাবার গলা শুনা গেলো, কেমন আছিস মা?
আব্বু তুমি কোথায়?
আমি একটু বাইরে আছি, কেন?
অভি নাকি এক্সিডেন্ট করেছে, বলতে বলতেই কেঁদে দিলো অবণী।
আরে কাঁদছিস কেন, আরে শুন শুন কাঁদিস না মা।
না বাবা তুমি বলো ও কেমন আছে?
অবণীর বাবা বড় একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমি হাসপাতালেই আছি মা, অভির জ্ঞান নেই।
ডাক্তার কি বলেছে?
অভির জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত কিছু বলতে পারছেন না উনারা।
আব্বু আমি আসতেছি।
তুই আসবি, তোর অফিস আছেনা।
জাহান্নামে যাক অফিস, আমি আসতেছি।
ঠিক আছে আয়।

অবণীর চাচা এসে দেখলেন মেয়ে কাঁদছে, কাছে এসে বসে মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন আর বললেন, তুই এইভাবে কাঁদছিস কেন মা, ছেলেটা তো তোর বস ছিলো শুনলাম।
কার কাছে শুনেছো ছোট বাবা?
বাসায় রিং দিয়েছিলাম, ফাল্গুনী বললো, তোর বসের চাইতে কি ছেলেটা আরো বেশি কিছু তোর কাছে?
বাবা ও আমাকে বাঁচিয়ে ছিলো।
কি বলিস, তুই এক্সিডেন্ট যেটা করছিলি এই ছেলেটাই তোকে বাঁচিয়ে ছিলো?
হাঁ আর আমি ওকে ভালোবাসি ছোট বাবা।
আর এই জন্যই তুই কাঁদছিস, আচ্ছা শুন রবিন গিয়েছে টিকেট আনতে, টিকেট কনফার্ম হয়েছে, আগামী ভোর পাঁচটাই ফ্লাইট, এখন তুই চল তোর ব্যাগ গুছাতে হবে, তোর ছোট মা হেল্প করবে।
চলো বলে অবণী বেড থেকে নেমে এগুলো, দুজনেই রুম থেকে বেড়িয়ে এলে চাচী এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন আর ফুঁফিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
ছোট মা কাঁদছো কেন?
আমি ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম, তুই নাকি দেশে যাচ্ছিস, চোখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলেন।
হাঁ যাচ্ছি।
যেতেই হবে?
হাঁ ছোট মা।
তুই এতো কষ্ট নিয়ে একুশ ঘন্টা জার্নি করতে পারবি?
অবণী কেঁদে দিলো আর কাঁদতে কাঁদতে বললো, ছোট মা, আমাকে যে পারতেই হবে।

রাত এগারোটাই রবিন এসইউভি নিয়ে এলো আর ওতেই অবণীকে নিয়ে ছোট চাচা, চাচী আর দাদী চেপে বসলেন এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, রবিন গাড়ী চালাচ্ছে, হিটারটা লো করে দিয়েছে কারণ বাইরে তুষারপাত না হলেও বেশ ঠান্ডা মাইনাস ফোর, সবাই চুপচাপ, কেউ কোন কথা বলছেনা, এয়ারপোর্ট প্রায় দুই ঘন্টার পথ, রবিন সামনের টার্ন নিয়েই এক্সপ্রেস ওয়েতে উঠে গেলো। অবণী চোখে এখনো টলটলে পানি আর তার সাথেই যেন আজ কানাডার আকাশ বাতাস বিষাদময়, দুই একটা গাড়ী স্যাত করে অবণীদের পাস করে যাচ্ছে যেন বলতে চাইছে “চলো চলো তাড়াতাড়ি চলো, অভি অপেক্ষা করছে”, গাড়ীতে রবিন একদম কম সাউন্ড দিয়ে ইয়ানির পিয়ানোর সিডি চালাচ্ছে যেখানে বিষাদের সুর উঠছে, রাত একটার আগেই অবণীরা পোঁছে গেল এয়ারপোর্টে, রবিন অবণীর লাগেজ নিজেই নামিয়ে ট্রলিতে দিয়ে গাড়ী পার্কিংয়ে রেখে আসতে গেল আর সবাই রবিনের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো, দাদী অবণীকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন, দশ মিনিট পর রবিন উঠে এলো নিচের পারকিং লট থেকে, ও এগিয়ে এসে বললো, চলুন ভিতরে যায়, সবার নিশ্চয় খিদে পেয়েছে, ভিতরে ভালো একটা স্নেক্স শপ আছে, চলুন চলুন ভিতরে যায়, রবিন অবণীর লাগেজ ট্রলিটা ঠেলে সবার আগে আগে এগুলো ভিতরের লাউঞ্জে।

ভিতরে স্নেক্স শপের সামনে এসে রবিন সবাইকে স্নেক্স চুজ করতে বললে অবণী ছাড়া সবাই কেউ পেস্ট্রি, কেউ পেটিস নিলো দেখে রবিন অবণীর সামনে এসে বললো, কি হলো কিছু নিলেনা তুমি?
আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা, এমনিতে তো ফ্লাইটে খাবার দিবে।
দেখ অবণী, আমি শুনেছি তোমার এক্স বসের কথা আনকেলের কাছ থেকে আর এও শুনেছি তুমি উনাকে ভালোবাসো কিন্তু তুমি যদি এইভাবে উপোস কর তাহলে কি উনার কোন লাভ হবে, বরঞ্চ তুমি খাও যেন দেশে গিয়ে তুমি ফিট এন্ড ফাইন থাকতে পারো, দাড়াও আমিই চুজ করে নিয়ে আসছি তোমার জন্য বলেই রবিন এগিয়ে গেল কাউন্টারে আর একটা চিকেন চিজ স্যান্ডউইচ উইত বইল্ড ভেজিটেবেল নিয়ে অবণীকে দিলো আর বাকি সবাইকে নিয়ে একটা টেবিলে বসে জোর করে করে অবণীকে সব খাওয়ালো।
ভাগ্যিস অবণী সব খেলো নাহলে তো আজ ওকে ফ্লাইটেই চড়তে দিতাম না, পরিবেশকে হাল্কা করার জন্য বললো রবিন আর অবণী ছাড়া বাকি সবাই হেসে উঠলো।
আচ্ছা চলুন সময় হয়ে এসেছে, অলরেডি চেকইনের সময় হয়ে গেছে বলে উঠে পড়লো রবিন আর বাকি সবাইও উঠে পড়লো, সবাই অবমীকে নিয়ে এগিয়ে চললো চেকইন কাউন্টারের দিকে, কাউন্টারের কাছাকাছি এসে রবিন বাকি সবাইকে বললো, আপনারা সামনের বসার স্থানে বসুন আমি অবণীকে নিয়ে চেকইন সেরে আসি বলেই অবণীকে নিয়ে এগুলো।

চেকইন করতে গিয়ে অবণী দেখলো অবণীর টিকেটটা বিজনেস ক্লাস, অবণী রবিনের দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকালে রবিন বললো, লাস্ট টিকেট তাই নিয়ে নিলাম কিন্তু বললোনা অবণীর অবস্থা দেখে অবণীর চাচাই বলেছে বিজনেস ক্লাস নিতে যেন কম্ফর্টেবেল ফিল করে অবণী। চেকইন সেরে দুজনেই এগুলো বাকিদের সাথে দেখা করতে তখন রবিন অবণীকে থামালো।
অবণী জানিনা তোমাকে আমি এই সময় কথাটি বলবো কিনা এরপরেও বলতে চাই, দোয়া করছি যেন তোমার প্রেম যেন মিলে আর আমি অপেক্ষা করবো তোমাদের এক সাথে দেখার জন্য আর আরেকটি কথা, আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি, আমাকে যখন তোমার দরকার হয় তখনই তুমি আমাকে পাবে তোমার পাশে।
সো সুইট অফ ইউ বলে অবণী এসে রবিনকে জড়িয়ে ধরলো এরপর ছেড়ে দিয়ে বললো তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আর হাঁ আমার একটা কাজ করবে?
কি বলো?
নিজের হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা এনভেলপ বের করে রবিনের হাতে দিয়ে বললো, আমার অফিসে আমার এই রিজাইন লেটারটা দিয়ে একটু বুঝিয়ে বলবে?
ঠিক আছে, তোমার চিন্তা করার দরকার নেই, আমি দেখবো।
তোমাকে ধন্যবাদ।
ভালো থেকো তুমি আর সময় সময়ে তোমাকে ফোন দেবো আমি।
ঠিক আছে, আমার নাম্বার সেইভ করে নাও বলে অবণী নিজের নাম্বার বললো আর রবিন সেইভ করে নিলো।

অবণী আর রবিন এগিয়ে এলে সবাই উঠে দাঁড়ালো, ছোট বাবা, ছোট মা, দাদী আমার সময় হয়ে গিয়েছে ভিতরে যাওয়ার, অবনী চোখে পানি নিয়ে বললো।
দাদী এগিয়ে এলে অবনী এগিয়ে গিয়ে দাদীকে জড়িয়ে ধরলো।
বুড়ী তুই আবার আসবিনে, দাদী টলোটলো চোখে জিজ্ঞেস করলো।
জানিনা দাদী, দোয়া করো তুমি।
হাঁ দোয়া করছি ছেলেটার জন্য আর তোর জন্য।
আসি দাদী।
অবণী গিয়ে জড়িয়ে ধরলো চাচীকে, ছোট মা, আমি আসি।
আয় মা, দোয়া করছি তুই যেন ছেলেটাকে নিয়ে আমাদের কাছে আসতে পারিস, নিজের প্রতি খেয়াল রাখবি, ফ্লাইটে আর দুবাইতে ভালো করে খাওয়া দাওয়া করিস।
জি ছোট মা।
ছোট চাচা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো অবণীকে আর বললেন, তুই ঠিক থাকবি, তুই ঠিক থাকলে তাহলেই ছেলেটার দিকে খেয়াল রাখতে পারবি।
ঠিক আছে ছোট বাবা, অবণী আর কান্না ধরে রাখতে পারলোনা, সবাই মিলে অবনীকে সান্তনা দিতে লাগলো।
অবণী চোখ মুছে নিয়ে ছোট চাচা, চাচী আর দাদীকে পা ছুঁয়ে সালাম করলো এরপর সবাই অবণীকে নিয়ে ডিপার্চার গেটের দিকে এগুলো, গেইটে গিয়ে অবণী আবার সবাইকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলো, এরপর নিজে এগুলো ভিতরের ফ্লাইট কাউন্টারের উদ্দেশ্যে।

________ চলবে।
ছবিঃ Google.

৫৫৫জন ৫৫৭জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ